চরম অবহেলায় কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনের স্মৃতি – Nobobarta

আজ বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:১০ অপরাহ্ন

চরম অবহেলায় কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনের স্মৃতি

চরম অবহেলায় কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনের স্মৃতি

কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনে
কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনে

কবি জয়প্রকাশ সরকার, মানিকগঞ্জ : খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন ছিলেন মানিকগঞ্জে জন্ম নেয়া একজন ক্ষণজন্মা কবি ও সাহিত্যিক। তিনি ১৯০১ সালের ৩০ অক্টোবর সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের বাবার নাম মুহম্মদ মমরেজ উদ্দীন খান ও মায়ের নাম রাকিবুন নেসা খানম। পিতা-মাতার চার ছেলে দু’মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম সন্তান। শৈশবকালেই তিনি পিতামাতা হারান এবং জানা মতে তাঁরা তাঁদের উত্তরাধিকারীদের জন্য কোনো ভূসম্পত্তি বা অন্য কোনো সহায় সম্পদ রেখে যাননি। ফলে অল্প বয়সেই মঈনুদ্দীনকে জীবিকার অনুসন্ধান করতে হয় এবং এ কারণে তিনি কলকাতা গিয়ে সেখানে পুস্তক-বাঁধাই কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

“ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ঐ আমাদের গাঁ,
ঐ খানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা”
কবিতাটি লিখেছেন কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন। ছোটবেলায় বই পড়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল কবি মঈনুদ্দীনের। নতুন বইয়ের গন্ধে আর ছড়ার ছন্দের ঝংকারে উৎফুল্ল হয়ে ওঠতেন। একবার কলকাতায় এসে তিনি নিজ হাতে বই বাঁধই করে সারি সারি ভাবে সাজিয়ে রাখেন সারা ঘর ভরে। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বই খুলে চোখ বুলান, গন্ধ শুকেন। নতুন বইয়ের গন্ধে মন আনন্দে ভরে ওঠে।

মঈনুদ্দীন একাকী মনে ভাবতে লাগলেন কবি হতে হলে ভাল লেখাপড়ার প্রয়োজন। সেই চিন্তা মনে পোষণ করে ভর্তি হলেন নৈশ বিদ্যালয়ে। দিনে কারখানার কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন আর রাতের বেলায় বই হাতে স্কুলে পড়তে যান। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কলকাতা কর্পোরেশন শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশন ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন এবং প্রায় বিশ বছর শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। শিক্ষকতাকালীন তিনি শিশুদের জন্য লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

এই সময় বালক কবি মঈনুদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় হয় একই মহল্লার ছাত্র খন্দকার আবদুল মজিদ নামে এক ছেলের সঙ্গে। আবদুল মজিদ তিনিও ছিলেন একজন সাহিত্য সেবক। সাহিত্য নিয়ে আলাপ আলোচনায় একসময় দু’জন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। দু’বন্ধু মিলে রাত জেগে হাতে লিখে প্রকাশ করেন ‘মুসাফির’ নামে একটি দেয়াল পত্রিকা। এই দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের পর মঈনুদ্দীন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তারপর তিনি তার লেখা পাঠাতে লাগলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। ১৯২১ সালে তার লেখা “খোদার দান” নামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয় মাসিক “সহচর” পত্রিকায়। পত্রিকার পাতায় ছাপাক্ষরে নিজের নাম দেখে কিশোর কবি আনন্দে হয়ে পড়েন আত্মহারা।

১৯২৩ সালে মুহম্মদ মঈনুদ্দীন সাপ্তাহিক মুসলিম জগত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ’ শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের দায়ে তাঁকে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয়। হুগলি জেলখানায় থাকাকালীন তিনি আরেক হাজতবাসী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরী হয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ‘আলহামরা লাইব্রেরি’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশ করতেন তিনি। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে মুহম্মদ মঈনুদ্দীন শিশুতোষ কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত অনেক ছড়া এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মুখে উচ্চারিত হয়। যেমন-“ঐ দেখা যায় তালগাছ ঐ আমাদের গাঁ,ঐ খানেতে বাস করে কানা বগির ছাঁ” প্রভৃতি।

তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছেঃ
মুসলিম বীরাঙ্গনা (১৯৩৬),
আমাদের নবী (১৯৪১),
ডা. শফিকের মোটর বোট (১৯৪৯),
খোলাফা-ই-রাশেদীন (১৯৫১),
আরব্য রজনী (১৯৫৭), বাবা আদম (১৯৫৮),
স্বপন দেখি (১৯৫৯),
লাল মোরগ (১৯৬১),
শাপলা ফুল (১৯৬২)।

তিনি অনেক কবিতা, গল্প ও উপন্যাসও লিখেছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

কবিতা-
পালের নাও (১৯৫৬),
হে মানুষ (১৯৫৮),
আর্তনাদ (১৯৫৮); উপন্যাস-
অনাথিনী (সহচর পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, ১৯২৬),
নয়া সড়ক (১৯৬৭); ছোটগল্প-
ঝুমকোলতা (১৯৫৬)।
তিনি যুগস্রষ্টা নজরুল (১৯৫৭) শিরোনামে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন।

খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন শিশুসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), যুগস্রষ্টা নজরুল রচনার জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬০) এবং একুশে পদক (১৯৭৮) লাভ করেন। কবির স্ত্রী বেগম রহিমা খানম । কবির সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন – খান মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন (মৃত); আশরাফ জাহান (মৃত); বেগম শামসুয জাহান নূর; খুরশিদ জাহান মিনু ; খান মুহাম্মদ শিহাব (মৃত)।

নিজস্ব স্মৃতি থেকেঃ সাহিতাঙ্গনে স্বল্প পরিসরে হলেও নিজস্ব পদচারণার কারণে কবিকন্যা কবি শামসূয জাহান নূরের সাথে পরিচয় । লেখা এবং বয়স উভয়ক্ষেত্রেই উনি আমার অগ্রজ। ওনার বক্তব্যে এতটুকু জানা যায়, অনেক আগের থেকেই “খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন একাডেমী এবং লাইব্রেরি ” প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েও সরকারের সার্বিক সহযোগীতার অভাবে পরিপূর্ণতা পায়নি। প্রতিবছর তার জন্মদিনে কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন একাডেমীর ব্যানারে তার কন্যা কবি শামসূয জাহান নূর এর প্রচেষ্টায় সাহিত্যক্ষেত্রে”কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন পুরস্কার” দেয়া হয় কয়েকজন কবি-সাহিত্যিককে সাদামাটাভাবে। একাডেমীক কার্যক্রম বলতে এতটুকুই। কখনও কখনও অর্থ ঘাটতি থাকায় কবি সংসদ বাংলাদেশ সাহায্য করে থাকে।

পরিতাপের বিষয় কবিকে নিয়ে বাংলা একাডেমীরও কোন উদ্যোগ নেই! সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই-জাতির শিক্ষা এবং মনন মানসিকতা উন্নয়ণের স্বার্থে কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিনের মত মহতী কবির চর্চার বিকল্প নাই। শুধু টেক্স্টবুকে একটি ছড়া স্থান দেওয়া যথেষ্ট নয়;তার পুরো সাহিত্যজীবন গবেষণায়”খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন একাডেমী” প্রতিষ্ঠা করাটাও জরুরী। ১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই খ্যাতিমান কবি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ১১৯ তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে ইতি টানছি।


Leave a Reply