কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীত সাধনা ।। রিয়েল আবদুল্লাহ - Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীত সাধনা ।। রিয়েল আবদুল্লাহ

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীত সাধনা ।। রিয়েল আবদুল্লাহ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  

জীবন বড় কঠিন-এই কঠিনতম জীবনে নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজ আমাদের এই বাংলাদেশের অথবা সারা উপমহাদেশের সবার নয়নের মণি। সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।  একদিন তাকে যারা কবি বলে স্বীকৃতি দিতে চাননি তারাই সময়ের পরিক্রমায় তাঁকে মেনে নিয়েছেন কবি হিসাবে। তাঁকে দিয়েছেন বরমাল্য। চোখের অবগুণ্ঠন সরিয়ে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন কবি নজরুল আসলেই কবি। সৈনিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে যখন পুরোদমে কাব্যচর্চা শুরু করে সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন,তখন তাঁর সাথে পেরে না উঠে;তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির গতির সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ,তার বিরুদ্ধে তারই সমসময়িক অনেক কবি সাহিত্যিকগণ তাঁকে নিয়ে নানা রটনা শুরু করেন। একসময় প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে তাকে নিয়ে গালমন্দ করেন মিথ্যে আলোচনা-সমালোচনায় সাহিত্য আসর রাশভারী করে তুলেন-তাঁর গুনকীর্তণ করেন, আবার তাঁকে কটাক্ষ করে নানা ধরণের সাহিত্যও রচনা করেন।

“একবার মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত-এর সম্পাদককে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, “কাজী সাহেবের কবিতায় কী দেখিলাম বলিব? কাব্যের যে অধুনাত্ম ছন্দঝঙ্কার ও ধ্বনিবৈচিত্রে এককালে মুগ্ধ হইয়াছিলাম, কিন্তু অবশেষে নিরতিশয় পীড়িত হইয়া যে সুন্দরী মিথ্যারূপিণীর ওপর বিরক্ত হইয়াছি, কাজী সাহেবের কবিতা পড়িয়া সেই ছন্দঝঙ্কারে আবার আস্থা হইয়াছে৷ “খেয়াপারের তরণী’র একটি স্তবক উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, কাকে প্রকৃত কবি ও কাব্যশক্তি বলে৷

কিন্তু পরবর্তীকালে মোহিতলাল মজুমদার তিনি নিজেই নজরুলকে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করেছিলেন কিংবা হিন্দু ও মুসলিম রক্ষণশীলদের মতো ভেবেছিলেন, তিনি কেন হিন্দুদের দেব-দেবী নিয়ে কবিতা লিখবেন, তেমনি তাঁর ছাত্র নীরদচন্দ্র চৌধুরীর কাছেও কবির কবিতা চিৎকারের বেশি কোনো স্বীকৃতি অথবা মর্যাদা পায়নি৷ তিনি একে অশিক্ষিত পটুত্ব ছাড়া আর কিছুই ভাবেননি৷(দ্র.: ষষ্ঠ অধ্যায়: দ্য লিটারেরি সিচুয়েশন ইন বেঙ্গল; দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক, ইন্ডিয়া-১৯২১-১৯৫২)৷  

মোহিতলাল মজুমদার শনিবারের চিঠি-তে “নিরক্ষর” বলে কবিকে কটাক্ষ করেছিলেন৷ বলেছিলেন, “কাজী সাহেব চেষ্টা করিয়া মার্ক্স, লেলিন প্রভৃতি কম্যুনিস্টদিগকে স্বপক্ষে যুদ্ধে নামাইতে পারিতেন কিন্তু নিজে নিরক্ষর হওয়ায় তাহাদিগকে পাইয়াও সুবিধা করিতে পারিতেন না, ইহা নিশ্চিত৷ নিরক্ষরতাই তাঁহার পরাজয়ের প্রধান কারণ?”

তাকে নিয়ে নানা ধরনের অসাহিত্য রচনা হয়েছে। যা কিনা কবিকে কষ্ট দিয়েছিলো আবার সাহিত্য রচনার প্রেরণাও  দিয়েছিলো। কবি যখন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব অবসানের জন্য লিখলেন -“ ভারতের দুই নয়ন তারা হিন্দু মুসলমান ”অথবা “মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান”
আবার যখন তিনি কৃষ্ণকে নিয়ে লেখেন “এলো নন্দের নন্দন নবঘণ শ্যাম/এলো যশোদা নয়নমনি  নয়নাভিরাম/প্রেম রাধারমন নব বঙ্কিম ঠাম /চির রাখাল গোকুল এলো গোলক ত্যাজি। কৃষ্ণজি কৃষ্ণজি কৃষ্ণজি।” এ ধরনের নানা আদ্যাশক্তির গান, তখন তাকেএকশ্রেনীর কবি সাহিত্যিক ধর্মান্ধব্যক্তিবৃন্দ কবিকে নাস্তিক বলেছেন; আবার কেউ তাকে বলেছেন হিন্দু। অত্র অঞ্চলে হিন্দু আধিক্য বেশি থাকায় মুসলমানগণ তাঁর ক্ষতি না করলেও তাঁকে  বিধর্মী বলে গালাগাল দিয়েছেন । তিনি হিন্দু মুসলমানদের সেই সব গালি হজম করেছেন। সেদিকে আমরা না যাই। শুধু তাঁর সৃষ্টির কথা ভাবি। নজরুল তাঁর একটি ভাষণে বলেছিলেন, “জীবনের পাত্র আমরা আবর্জনা দিয়ে বোঝাই করে রেখেছি৷”  সেসব আবর্জনা পরিষ্কারে পরবর্তীতে নজরুল উঠে পড়ে লেগেছিলেন এবং যেসব কূপমন্ডুক তাঁকে কষ্ট দিয়েছিলো; তাঁকে অন্যধর্মের বলেছিলো,তাঁদের জন্য সঠিক জবাবে লিখেছেন অনেক অনেক ইসলামী সংগীত । যা আমাদের তাঁর সঠিক পরিচয় বলে দেয়-তিনি আসলে কে ছিলেন। যেমনঃ

“আমি আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে,
ফলবে ফসল বেচবো তারে কেয়ামতের হাটে। “

একমাত্র মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ  যার আছে সেই ই লিখতে পারে এমন সুন্দর কালোজয়ী গান । যা লিখেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মনের মাঠে বুনেছিলেন আল্লাহ নামের বীজ। আর এই গানের মধ্যদিয়েই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, অযথাই আমাদের অদৃশ্য প্রেম -আগে মনের মধ্যে প্রদীপ জ্বালতে হবে, মনে থাকতে হবে স্রষ্টার  প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

এই শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও ভক্তির পরিমাণ যতো বাড়বে,তার গ্রহনযোগ্যতা ততো বাড়বে। তিনি এই দুই পঙতির মাধ্যমে এই-ই বুঝাতে চেয়েছেন যে, আল্লাহর কথা মনে প্রোথিত করতে হবে শক্তভাবে- তা হলেই তা মনে আল্লার প্রতি আসক্তি জাগবে-মুসলমানদের বিচার যেদিন হবে এবং তা যে ময়দানে হবে তা হলো হাশরের ময়দান। যেখানে ভেদাভেদহীন ধনীদরিদ্র সবাই একদিন একসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়াবে-যেখানে সকলেই দুনিয়ায় তাদের কৃতকর্মের জন্য “ইয়া নাফসি”,“ ইয়া নাফসি”-বলে পানাহ চাইবে সেই ময়দানকে কবি বলেছেন “কেয়ামতের হাট”।

ধর্মীয়ভাবে যারা ইহজগতে পূণ্য কর্ম করেছেন, মনের থেকে ভালো পূণ্যকাজ করে আল্লাহ তায়ালার খুশি অর্জন করতে পেরেছেন ,তাঁরাই সেদিন বেহেশত যাবার পথ খুঁজে পাবেন। মূলত “ফলবে ফসল” দিয়ে কবি “ভালো কাজ তথা পূণ্যকাজ” করাকে  বুঝিয়েছেন। আবার “বেচবো ” দ্বারা কবি সেদিনের সেই রুক্ষ বিচারে আল্লাহর দয়া পাবার কথা বলেছেন। যা কিনা ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকলেই প্রত্যাশা করে ,আর তা হলো প্রতিপালকের দয়া। কেউ তাকে বলেন ইশ্বর, কেউ ভগবান-তবে যে যাই ই বলুক সকলেই সৃষ্টিকর্তারই অনুগ্রহ কামনা করে। কবি সেই অনুগ্রহেরই কথা ব্যক্ত করেছেন।
আবার কবি লিখেছেনঃ  

“রোজ হাশরে আল্লাহ আমার কোর না বিচার
বিচার চাহি না, তোমার দয়া চাহে এ গুনাহগার।।”

কবি মনের মধ্যে যে বীজ বুনেছেন, তার ফসল ফলায়ে বিক্রির জন্য কেয়ামতের হাটে যাবেন, সেখানে যে রুদ্র কঠিন বিচার হবে, সে বিচারের ভয়ে কবি ভীত সন্ত্রস্ত-এই দুনিয়ায় মনের অজান্তে এমন অন্যায় তিনি করেছেন, যার ক্ষমা নেই। আর তিনি কি করেছেন যা তিনি নিজেই জানেননা।
অজানা ভুলের জন্য সেদিন বিচারের আসনে বসা স্বয়ং আল্লাহ কাকে কি শাস্তি দিবেন জানা নেই। হতে পারে তা অসহনীয় ভয়ংকর। যার জন্য তিনি বলছেন-তিনি সেই হাশরের ময়দানে তার জন্য বিচার চাননা -বিচার চেয়ে হতে চাননা গুনাহগার। দয়া চাহেন কেবলই দয়া। যার দ্বারা কিনা কবির ও আল্লাহর মধ্যকার গভীর প্রেমের তথা কবির আধ্যাত্মিকতা  ফুটে উঠে। প্রচন্ড পরিমাণ ভালোবাসা আর টান না থাকলে এই কথাগুলো বলা প্রায় অসম্ভব। গভীর ভাবসমৃদ্ধ এই কথাগুলো আমাদের ভেতর বাহির নাড়িয়ে দেয়। তিনি আবার লিখেছেনঃ

“আমি জেনে শুনে জীবন ভরে
দোষ করেছি ঘরে পরে
আশা নাই যে যাব তরে বিচারে তোমার।।”

এখানে কবি তার দোষ স্রষ্টার কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন। বলতে চেয়েছেন বিচার করলে তার ক্ষমা হবে না। নির্ঘাৎ তার নরকবাস। তিনি এমনই পাপ করেছেন বিচার হলে তার মুক্তি পাবার আশা নাই। আবার তিনি বলেনঃ

“বিচার যদি করবে কেন রহমান নাম নিলে।
ঐ নামের গুনেই তরে যাব, কেন এ জ্ঞান দিলে!”

স্রষ্টার আরেকনাম হলো রহমান অর্থাৎ ক্ষমাশীল কবির বিশ্বাস যে ঐ নাম মুখে নেবার পরে আর তাকে মুক্তি না দিয়ে পারবেন না আল্লাহ তায়ালা। কবির দৃঢ়তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তিনি যেভাবে কথার মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে বাকবিতন্ডায় মেতেছেন,তা আর কারও পক্ষে সম্ভব কিনা? কতটুকু ভাবের গভীরতায় প্রবেশিলে বলতে পারা যায় কথাগুলো। তা খুবই চিন্তার বিষয়। কবি তার অন্তরাত্মার ভাবগভীরতায় এমনভাবে প্রবেশ করেছেন যে স্রষ্টাকে খুব উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কবির আরোও বিশ্বাস যে তিনি যখন ভিক্ষা চাইবেন আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। তাঁর ভাষায়-

“দীন ভিখারি বলে আমি
ভিক্ষা যখন চাইব স্বামী
শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবে না কো আর।।”

অগণিত ইসলামী সংগীত লিখেছেন তিনি। যে ইসলামী সংগীতকে  সংগীত না বলে ইসলামী আধ্যাত্মিকভাব সঙ্গীত বলাই শ্রেয়।  কবিকে আস্তিক, নাস্তিক, ধর্মী, বিধর্মী যাই বলা হোক -সাধারণ জ্ঞাণে কবির লেখনীর পরিধির বিধান সম্ভব নয়। এটি সামান্যমাত্রই বোধের বিষয় যে স্রষ্টার প্রতি অন্তবিহীন ভালোবাসা না থাকলে এমনসব ইসলামী গজল সঙ্গীত রচনা অসম্ভব। নিচে কয়েকটি গানের উদাহরণ দেয়া গেল শুধুমাত্র ব্যক্তিমনে উপলব্ধি আনয়নের জন্য নজরুলকে কি এত সহজে যাচাই সম্ভব?

১.
“আল্লাহ কে যে পাইতে চায় হযরত কে ভালবেসে
আরশ কুর্সী লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।।
রসুল নামের রশি ধরে
যেতে হবে খোদার ঘরে —–“
২.
” ইয়া রাসুলল্লাহ! মোরে রাহা দেখাও সেই কাবার-
যে কাবা মসজিদে গেলে পাব আল্লার দীদার।।
দ্বীন- দুনিয়া এক হয়ে যায় যে কাবার ফজিলতে,
যে কাবাতে হাজী হলে রাজী হন পরওয়ারদিগার।।”
৩.
আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয়।
আমার নবী মোহাম্মদ যাঁহার তারিফ জগৎময়।।
আমার কিসের শঙ্কা কোরআন আমার ডঙ্কা।
ইসলাম আমার ধর্ম মুসলিম আমার পরিচয়।।

সম্ভবত এক নজরুল অধ্যয়ন এনে দিতে পারে আত্মিক শান্তির সুবাতাস। নজরুল একজন আধ্যাত্মিক সাধু পুরুষ তিনি শ্রমদিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছেন ফসল। আমরা সেই ফসলের চেতনায় সমৃদ্ধি লাভ করে হতে পারি আল্লাহর ক্ষমা পাবার একজন। তাঁর ইসলামী কথাগুলো যদি আত্মস্থ করা যায় তাহলে আল্লাহকে-রাসুলকে চেনা যাবে খুব সহজে । জয় হোক কবি কাজী নজরুল ইসলামের।

তথ্যসহায়তাঃ
১. উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া
২. কবির বিভিন্ন বই
৩.অনলাইনে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধ। 

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply