শনিবার, ২১ Jul ২০১৮, ১২:১১ অপরাহ্ন

English Version


একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল কালাম আজাদ

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবুল কালাম আজাদ



জিয়াউল হক ❑ (‘শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাঁথা’ বইতে যে একশত জন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ দিনের কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে আবুল কারাম আজাদ তাদের মধ্যে একজন)

আমি মোঃ আবুল কালাম আজাদ,পিতা মরহুম সিরাজ উদ্দিন সরদার, মাতা মরহুমা যইরননেছা,এফ,এফ,নম্বর : ৯৫৭৩, স্থায়ী, ঠিকানা: গ্রাম: চরসাধুপাড়া,ডাকঘর: হেমায়েতপুর, থানা ও জেলা পাবনা, বর্তমান ঠিকানা: ঐ।

❑ আমি পাবনা শহরের পাশের চর সাধুপাড়া গ্রামের সন্তান। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বছরে আমি এস,এস,সি পরীক্ষার্থী ছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা না দিয়ে আমাকে দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে হলো। কেন আমাকে পরীক্ষা রেখে যুদ্ধে যেতে হলো সে বিষয়ে দুই একটা কথা বলতে চাই। ২০০ বছর সামরাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন ও শোষণে জর্জরিত হয়ে আমাদের পূর্ব পুরুষগণ অনেক আন্দোলন ও সংগ্রাম করে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি পাকিস্তান নামক এক স্বাধীন দেশ অর্জন করেছিল। পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত ছিল।

একটা পূর্ব পাকিস্তান, অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র এক বছরের মধ্যে পাকিস্তানের জাতীর পিতা জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করলেন উর্দ্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট ভাষা। বাঙ্গালিরা তার এ ঘোষণা না মেনে আন্দোলন শুরু করলেন। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারী সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ভাষার দাবী আদায় করতে সক্ষম হলেন। পশ্চিম পাকিস্তানীরা শাসনের নামে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করা শুরু করল। দেশের উন্নয়ন,সরকারী চাকুরী,ব্যবসা বানিজ্য সব যায়গাতেই বাঙ্গালিরা পিছিয়ে পড়ছিল। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬

সালে বাঙ্গালিদের মুক্তির সনদ ৬ দফ দাবীনামা ঘোষণা করলেন। ৬ দফা দাবীনামার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে খুব শিঘ্রই বাঙ্গালিরা আওয়ামী লীগের পতাকাতলে এক হতে থাকে। তারই ফলস্বরূপ ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বাঙ্গালিরা ভাবল এবার হয়তোবা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে। কিন্তু না।

পাকিস্তানী সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালিদের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি ছিল না। তাই তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহŸান করেও তা স্থগিত করলেন। ইয়াহিয়া খানের মনোভাব জানতে আর বাকী রইল না। তাই ৭ মার্চ শেখ মুজিব সোহরাওয়াদী উদ্যানের ঐতিহাসিক জনসভায় এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে ঘোষণা দিলেন। সারা বাংলাদেশে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। তখন আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। পাবনা শহরে প্রতিদিন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল হতো। জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে আমরা মিছিলে অংশ গ্রহন করতাম।

এরই মধ্যে ২৫ মার্চে রাতে হানাদার খান সেনারা সারা বাংলাদেশের নিরস্ত নিরিহ মানুষের উপর আক্রমণ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করল। গ্রামের পর গ্রাম, শহর বন্দর পুড়িয়ে দিল। এই রাতেই পাক সেনারা পাবনা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই পাবনা পুলিশ লাইন আক্রমন করল। কিন্তু পুলিশ সদস্যগন পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকায় সুবিধা করতে না পেরে ফিরে এসে পাবনা টেলিফোন একচেঞ্জ ও বিসিক শিল্পনগরে ঘাঁটি স্থাপন করল। তারা শহরে কাফ্রু জারী করে এমপিএ এ্যাডঃ আমিন উদ্দিন সহ আরও কয়েক জনকে ধরে এনে নির্মম ভাবে হত্যা করল। এই হত্যার প্রতিবাদে পাবনার সর্বস্তরের ছাত্র জনতা পাকসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করল। আমিও বাটুল নিয়ে এই প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।

২৯ মাচের্র মধ্যে পাবনায় আগত সকল পাকসেনাদের খতম করে পাবনাকে শত্রমুক্ত করা হয়। কিন্তু শত প্রতিরোধ সত্বেও ১০ এপ্রিল পাকসেনারা আরিচা নগরবাড়ি হয়ে এসে পূনরায় পাবনা শহরের দখল গ্রহন করল। এর পর পরাজয়ের প্রতিষোধ নেওয়ার জন্য তারা পাগলা কুকুরের মত আচরণ করতে থাকে। মানুষ হত্যা করে,বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আমি একদিন শহরে আসি। এসেই তিন চারটা পাকসেনা ভর্ত্তি পিক আপ ভ্যানের সামনে পড়ে যাই। বর্তমান মডার্ন ইলেক্ট্রনিক্স দোকানের কাছে এক দোকানে তখন লাইনে বক, ক্যাপস্পেন ও কেটু সিগারেট বিক্রি করা হত।

মিলিটারী দেখে আমি সেই লাইনে ঢুকে পড়লাম। তাতেও রেহাই পেলাম না। পাকসেনারা আমাকে লাইন থেকে বের করে এনে এমন একটা থাপ্পড় মারল যা জীবনে কোন দিন ভুলব না। তার পর তারা আমাকে ভ্যানে উঠায়ে নিচে ফেলে দিয়ে বুকের উপর বুট জুতা দিয়ে সজোরে লাথি ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারা শুরু করল। এর পর আমাকে নগরবাড়ি ঘাটে নিয়ে হাত পা বেঁধে রোদের মধ্যে বালির উপর ফেলে রাখল। তার পর তারা আমাকে পাবনা ওয়াপদাতে নিয়ে আসে। ওয়াপদার উত্তর পাশে দুই কক্ষের একতলা একটা দালান ছিল। তার একটিতে বন্দী ছেলেদের অন্যটিতে মেয়েদের রাখা হত। তারা ভুল করে আমাকে মেয়েদের কক্ষে ঢুকিয়ে দিল। দেখি সেখানে ৮/১০ জন মেয়ে আছে।

সবাই প্রায় উলঙ্গ। এই দৃশ্য দেখে আমি মাটিতে সেজদা দিয়ে দুহাত তুলে আল্লাহকে ডেকে বলি যদি আমি ছাড়া পাই তাহলে এই সব মা বোনের ইজ্জত আর মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আমার জীবন কুরবানী করব। দুই দিন পর পাক সেনাদের অসাবধানতায় আমি ওয়াপদার পিছন দিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হলাম। বাড়ি এসেই আল্লাহর দরবারে আমার প্রার্থনার কথা মনে পড়ল। তাই কয়েকজন বন্ধুসহ রের হলাম ভারতের পথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহনের জন্য।

নৌকায় পদ্মা নদী পার হয়ে কুষ্টিয়া থেকে দুই দিন এক রাত পায়ে হেঁটে কেচুয়াডাঙ্গা যুব শিবিরে পৌছালাম। সেখান থেকে মালদা জেলার গৌড়বাগান হয়ে গেরিরা ট্রেনিং গ্রহনের জন্য শিলিগুড়ির পানিঘাটায় যাই। সেখানে প্রথমে গোরলা ট্রেনিং ও পরে উচ্চতর ট্রেনিং গ্রহণ করে তুফানী ব্যাটেলিয়নে অন্তভুক্ত করে আমাদের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার বালুঘাট সীমান্তের বান্নাপাড়া গ্রামের ডিফেন্সে প্রেরণ করা হয়। ডিফেন্সে আমরা নিয়মিত সৈনিকদের মত ট্রেন্স ও বাঙ্কার কেটে অবস্থান গ্রহণ করি। ডিফেন্স থেকে জীবনে প্রথম আমি রাজশাহী জেলার ফার্সিপাড়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনারাও আমাদের সাথে ছিল। নিয়তি যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় বাহিনীর পাশাপাশি আমরা হিলি, পলাশবাড়ি, গোবিন্দগঞ্জ ও বগুড়া শহরের সন্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
আমার যুদ্ধ দিনের সব চেয়ে স্মরণীয় যুদ্ধ হয় ১৩ ডিসেম্বর। বগুড়া এয়ারপোর্টের কাছে পাক সেনাদের ট্যাংকের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ। আমরা প্রবল যুদ্ধে লিপ্ত। ট্যাংকের গোলার সামনে টিকে থাকা যে কত কঠিন তা বলে বুঝানো যাবে না। আমাদের চারপাশে কামানের গোল এসে পড়ছে। আমরা ট্রেন্সের ভিতরে অবস্থান নিয়েছি।

এরই মধ্যে ভারতীয় আর্টিলারী বাহিনীর গোলার আঘাতে ট্যাংকটি ধ্বংশ হয়ে গেল। এই যুদ্ধে আমার বন্ধু আফসার শহীদ হন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আমরা বগুড়ার সকল মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় মিছিল করে অনেক আনন্দ করেছিলাম। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে আল্লাহর দরবারে দেশের স্বাধীনতা ও মাবোনের ইজ্জত রক্ষার যে অঙ্গীকার করেছিলাম তা পূরণ হওয়ায় তাঁর দরবারে জানাই শত কোটি শুকরিয়া।

অনুলিখন: জিয়াউল হক লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media




ফুটবল স্কোর



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com