সীমান্তে অনিরাপদ বাংলাদেশের মানুষ | Nobobarta
Rudra Amin Books

আজ বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন

সীমান্তে অনিরাপদ বাংলাদেশের মানুষ

সীমান্তে অনিরাপদ বাংলাদেশের মানুষ

জাকারিয়া পলাশ : সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যার প্রসঙ্গটি বরাবরই কম গুরুত্ব পেয়ে আসছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি স্থান পেয়েছে। গার্ডিয়ান, ডয়েচে ভেলে, বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে বিষয়টি। ব্যাপক আলোচনায় আসার পরও জানুয়ারিতে সীমান্তে ১২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

আরো কিছু পরিসংখ্যন এখানে দেয়া প্রয়োজন। বিজিবির ডিরেক্টর জেনারেল মেজর জেনারেল শাফিনুল ইসলাম সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, গত বছর ৩৫ জনকে বিএসএফ হত্যা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০১৮ সালে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪, যেটি ২০১৯ সালে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ৪৩, যার মধ্যে ৩৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

Rudra Amin Books

সংস্থাটির আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সীমান্তে ১৫৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ হিসাবে, গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রতি ১২ দিনে একজন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। তথ্য মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে ৩৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অথচ উভয় দেশের ক্ষমতাসীনরা গত ১১ বছর যাবত পরস্পরকে ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করছে।

২০১১ সালে কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানি খাতুনকে গুলি করে হত্যার পর বিএসএফ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড তারা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে না। গত বছরও ভারতীয় মন্ত্রীরা বড় গলায় বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছিল সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু চলতি বছরই সীমান্তে মানুষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়া প্রমাণ করেছে- এসব ছিল বাগাড়ম্বর।

যৌথ উদ্যোগ কতটা কাজে আসছে?
সীমান্ত হত্যা নিয়ে দু’দেশের সরকারি পর্যায়ে শীর্ষ বৈঠকে এবং বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে বার বার আলোচনা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরেও দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ছয় দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে এ ইস্যু। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন প্রতিশ্রুতি আসে তখন এটা প্রত্যাশিত যে, প্রতিশ্রুতিটা কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, গত প্রায় ২০ বছর ধরে এ জায়গাটাতে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের সামঞ্জস্য নেই।’

সরকার অভিযোগের বাইরে নয়
বিজিবি কিংবা সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিবাদ, উদ্বেগ বা অনুরোধ যে কাজে আসছে না, তা অনেকটাই স্পষ্ট। শুধু তা-ই নয়, সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে সেটি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কূটনীতিক হুমায়ূন কবিরের ভাষায়, ‘দেশের যে কোনো মানুষের সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। এখানে আমাদের কণ্ঠটা একটু সোচ্চার হলে হয়তো ভারতও একটু সক্রিয় হতো।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এ বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিতে পারছে না। সেই সঙ্গে আরো বড় সমালোচনার বিষয় হচ্ছে, মাঝে মাঝেই সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এমন সব কথা বলছেন, যা ভারতীয় বাহিনীর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ ঘাতক সদস্যদের দায়মুক্তির রসদ জোগাচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁ জেলার পোরশা সীমান্তে গত ২২ জানুয়ারি বিএসএফের হাতে তিনজন বাংলাদেশি নিহত হন। এর পর তিনি বলেন, ‘এখানে দোষ বাংলাদেশি নাগরিকদেরই, সুতরাং সরকারের কিছুই করণীয় নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় রেজোলিউশন আছে, বিজিবির রেজোলিউশন আছে, জেলা আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ে রেজোলিউশন আছে। তারপরেও কেউ যদি জোর করে কাঁটাতারের বেড়া কেটে গরু আনতে যায় আর ভারতের মধ্যে গুলি খেয়ে মারা যায়, তার জন্য দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকার নেবে না।’ সমালোচকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের যতটা সরব হওয়া উচিত, ততটা তারা হচ্ছেনা। উল্টো বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিংবা সরকারি কর্মকর্তারা এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যাতে বাংলাদেশিদের দোষ বেশি- এমনটাই তুলে ধরা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তারাও মনে করেন, এমন হত্যা গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি আক্রান্ত ব্যক্তি চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত থাকে।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারের নির্বাহী পদাধিকারী ব্যক্তিরা দায় এড়ালেও কোনো অভিযোগেই সীমান্তে গুলি করা কিংবা নির্যাতনের বৈধতার সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপপরিচালক নীনা গোস্বামী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সীমান্তে কেউ অপরাধ করলেও হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, কোনোভাবেই সীমান্তে গুলি করে হত্যা করার বিষয়টি আইন অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত নয়। দায়িত্বশীল পদে থেকে যদি এ ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়, তখন ধরেই নিতে হয় যে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার দিক রয়েছে।

প্রসঙ্গত, সীমান্তে যে কোনো ধরনের অপরাধের জন্য দুই দেশের রাষ্ট্রীয় আইন রয়েছে, যা প্রয়োগ করার কথা রয়েছে এবং সব দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এ বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত। কিন্তু তারপরও ভারতীয় পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থামছে না। এদিকে, বাংলাদেশের দুর্বল তৎপরতা এবং ভারতের অভ্যন্তরে সুশাসনের অভাবে বিএসএফ জওয়ানরা আন্তর্জাতিক সীমান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তারা মানবতাবিরোধী অপরাধকেও অপরাধ মনে না করে, উল্টো বীরত্ব ও দম্ভ প্রকাশ করছেন।

বিএসএফের প্রধান রামন শ্রিবাস্তব গার্ডিয়ানকে যেমনটা বলেছেন, ‘নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানানোর কিছু নেই। কারণ এসব লোক অবৈধভাবে ভারতের ভূমিতে প্রবেশ করছিল, তাই তারা নিরপরাধ নয়।’ সীমান্তে কোনো প্রকার যুদ্ধাবস্থা নেই। সীমান্ত হাট, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ নানা ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ উদ্যোগ বিদ্যমান রয়েছে দুই দেশের মধ্যে। অথচ সেই সীমান্তেই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে আক্রমণের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ভারতীয় বাহিনীর কর্তারা হাজির করছেন ‘আত্মরক্ষা’ তত্ত্ব।

বিএসএফের অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি সমীর মিত্রের ভাষ্য, ‘আত্মরক্ষার অধিকার তো সবার আছে। আজকে আমি ইউনিফর্মে আছি বলে আমার কোনো অধিকার নেই, মানুষের এমন ধারণা হলে সেটা তো দুর্ভাগ্য। আমি তো বর্ডারে রয়েছি। সেখানে আমি অ্যাকশন না নিলে কালকে আমার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবে আমার প্রশাসন।’ তার এ ভাষ্য থেকেই স্পষ্ট হয়, সীমান্তে চলমান এ হত্যাকাণ্ডগুলো ভারতের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে এবং নীতিগতভাবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে ‘শত্রু’ বলে গণ্য করার ‘উগ্র-সাম্প্রদায়িক ও উগ্র-জাতীয়তাবাদী’ মানসিকতা থেকেই এই প্রক্রিয়া চলছে। দৃশ্যত ভারতের এই অবস্থান আর বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের অপরিণামদর্শী বক্তব্যগুলো একইরকম মনে হয়।

গার্ডিয়ান পত্রিকার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতে সক্রিয় আদালত রয়েছে, তবুও বিএসএফ কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, তারা একই সঙ্গে বিচারক এবং বিচার কার্যকর করার ভূমিকা পালন করতে পারেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ৩০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ভারত দুই হাজার কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে এরই মধ্যে। সহস্রাব্দ যাবত একই সঙ্গে বসবাস করা মানুষ ও সম্প্রদায়গুলোকে দুই পাশে ভাগ করে দিয়েছে এই কাঁটাতারের বেড়া। এই দীর্ঘ সীমান্তব্যাপী অব্যাহত থাকছে যুদ্ধহীন এক গণহত্যা। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়- দেশের মানুষই যখন সীমান্তে নিরাপদ নয়, সেই দেশের সীমান্তকে কি নিরাপদ বলা যায়? গার্ডিয়ানের সাংবাদিক ব্র্যাড অ্যাডামসের কথা দিয়েই শেষ করা যাক- ‘ভালো বেড়া দিলে কি ভালো প্রতিবেশী হওয়া যায়?’


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com