নির্জীব প্রকৃতির বুকে সজীব ‘বসন্ত’ অতঃপর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস | Nobobarta
Rudra Amin Books

আজ বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

নির্জীব প্রকৃতির বুকে সজীব ‘বসন্ত’ অতঃপর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

নির্জীব প্রকৃতির বুকে সজীব ‘বসন্ত’ অতঃপর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

আজ পহেলা ফাল্গুন। বসন্তকে জড়িয়ে ধরেছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে। আজকের দিনে তরুণ-তরুনীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ তার প্রিয়জনকে ফুল দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করবেন। ফুলেল পরিবেশে হবে বসন্ত বরণের নানা অনুষ্ঠান। ভালোবাসা আর বসন্ত মিলে আজ উৎসবে মাতোয়ারা থাকবে পুরো দেশ। কোকিলের কুহুতান নাকি আমের মুকুল— কে নিয়ে আসে বসন্তের আগমনী বার্তা? উত্তর খুঁজতে গেলে কিছুটা দ্বিধায় পড়তে হবে বটে। প্রকৃতি যখন তার দখিন দুয়ার খুলে দেয় তখন মিষ্টি বাতাস বয়ে যায় নিজ ছন্দে আর বলে যায়, ‘বসন্ত এসে গেছে’। ঋতুর কালচক্রে আজ পহেলা ফাল্গুন, বসন্তের প্রথম দিন।

বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ। অবশ্য নিষ্প্রাণ প্রকৃতির বুকে যে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে রাজ উপাধি তো তারই প্রাপ্য। শীতে যে গাছের পাতা ঝরে পড়ে, তাতে আবার নতুন পাতা গজায় এই ঋতুতে। চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে ফুল আর প্রজাপতির কলতানে। মানুষের জীবনে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও পশু-পাখি সর্বোপরি প্রকৃতির জন্য বসন্ত বেশ গুরুত্ব রাখে। এই সময় অনেক পশুপাখি মিলন ঘটায় এবং বাচ্চার জন্ম দেয়। নতুন গাছের জন্ম হয় এই ঋতুতে।

বসন্ত ফুলের ঋতু। এই ঋতুতে বাতাসের মাধ্যমে ফুলের রেণু ছড়িয়ে পড়ে। আর তাই এই ঋতুতে ফুল হয় বেশি। যে ফুল দিয়ে আপন সৌন্দর্যে সাজে প্রকৃতি। ফুলের সঙ্গে বসন্তের প্রেম বেশ গভীর। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় বসন্তের শাশ্বত রূপটি তাই এমন- ‘ফুল ফুটুক, আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’। বসন্তের ফুল বলতেই সবার আগে চলে আসে পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার নাম। এছাড়াও এই ঋতুতে ফোটে অশোক, আকড়কাঁটা, হিমঝুরি, রক্তকাঞ্চন, দেবদারু, নাগেশ্বর, মহুয়া, মাদার, শাল, স্বর্ণশিমুল ইত্যাদি।

Rudra Amin Books

বসন্তে প্রকৃতি হয়ে ওঠে চঞ্চল। শীতের খোলস ছাড়িয়ে নবরূপে জাগ্রত হয় বৃক্ষরাজি। পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে রঙিন হয়ে ওঠে গ্রাম-শহর, বন-বাদার। প্রকৃতিতে যেন রঙের আগুন লাগে। গাঁদা ফুলের বাসন্তি রঙও বসন্তের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়। এমনকি ঘাসের ওপরও এ সময় পা ফেলতে হয় সাবধানে। কারণ সেখানে ফুটে থাকে গুল্ম ফুল। পরিত্যক্ত জলাশয়ের বুকেও কলমি ফুল উঁকি দিয়ে জানান দেয়, প্রকৃতিকে সাজাতে পিছিয়ে নেই তারাও। বসন্ত ঋতুতে সবচেয়ে বেশি পাখির গান শোনা যায়। আর এই গানের দলের নেতৃত্ব দেয় সুরেলা কণ্ঠের কোকিল। উঁচু গাছের মগডালে বসে, নিজেকে আড়াল করে সারাদিন কুহু কুহু রবে গেয়ে যায় সে। কোকিলের সেই গানে বিমোহিত হয় মানুষের মন, বিরহী মন হয়ে ওঠে উতলা।

বসন্তের ফুলের রূপ আর পাখির গান যুগ যুগ ধরে বিমোহিত করে গেছে কবি সাহিত্যিকদের। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বসন্তের রূপে মুগ্ধ হয়েই লিখেছেন- ‘আহা আজি এই বসন্তে, এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।’ বাউল মনকে ছুঁয়ে গেছে বসন্তের বাতাস। তাইতো বাউল কবি গেয়ে ওঠে- ‘বসন্ত বাতাসে সই গো/ বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।’ বসন্ত ভালোবাসার ঋতু, নতুন কবিতা লেখার ঋতু, প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার ঋতু। এই ঋতু শূন্য হৃদয় ভরিয়ে দেয় নানা রঙে। প্রকৃতিকে যারা ভালোবাসেন তাদের পছন্দের ঋতুর তালিকায় তাই বসন্তের অবস্থান একটু আলাদা। ফুলপ্রেমিদের জন্য এই ঋতু বড্ড রঙিন।

অতঃপর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস
ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। আর বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন ছিলো ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের পর একই দিনে পড়ছে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস। শুধু এই দিন নয়, ১৯৭১ সালের কয়েকটি ঐতিহাসিক দিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি। যার ফলে ইংরেজি দিন ঠিক থাকলেও কিছুটা এদিক সেদিক হয়েছে বাংলা মাসের তারিখ। নতুন এই বর্ষপঞ্জিতে জাতীয় দিবসের বাংলা তারিখ এখন থেকে একই থাকবে প্রতিবছর।

ঋতুরাজ বসন্ত প্রকৃতিতে ফিরে আসায় যে আনন্দ, তা পালন করা হয় অনেক দেশেই। মজার বিষয় হলো আমরা রঙিন পোশাকে বসন্ত বরণ করি, পাশের দেশ ভারতে সাদা পোশাকে বসন্ত বরণ হয়। বসন্তের প্রথম আভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলের গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হয় শুভকামনা হিসেবে। হানামি বা চেরি ব্লসম ফেস্টিভ্যাল জাপানের বসন্ত উৎসব। ফুলে ভরে থাকা চেরিগাছের নিচে সবাই জড়ো হয়। ভালোবাসা দিবস কিভাবে এসেছে তা নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। কথিত আছে, ‘ভ্যালেন্টাইন’ নামে এক কিংবদন্তি তৃতীয় শতাব্দীর সময় রোমের একজন যাজক ছিলো। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস সিদ্ধান্ত নেয় যে বিবাহিত পুরুষদের তুলনায় অবিবাহিত পুরুষ, সৈন্য হিসেবে বেশি ভালো। তাই তিনি তরুণ পুরুষদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ করেন।

‘ভ্যালেন্টাইন’ রাজার অবিচার বুঝতে পেরে গোপনে তরুণ প্রেমিক ও প্রেমিকাদের বিয়ে দিতে থাকেন। একপর্যায়ে বিষয়টি রাজা জানতে পারেন এবং ক্ষুদ্ধ হয়ে ভ্যালেন্টাইনকে হত্যার নির্দেশ দেন। তার মৃত্যু কার্যকর হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। আর এরপর থেকে ‘ভ্যালেন্টাইনের’ প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। এদিকে এ বছর ভালোবাসা দিবস ও প্রথম বসন্ত একই দিন। আর তাই ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণে বর্ণিল প্রস্তুতি চলছে রাজধানীজুড়ে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, শুক্রবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্ততি নেয়া হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন নগরীতে। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত ফুল মজুদ করেছে বিক্রেতারা। ফুল আর উপহারের দোকানে বেড়েছে ভিড়ও। বিশেষ এই দিনটিকে ভালোবাসার সম্পর্কগুলোর আরেকটু যত্ন নেবার উপলক্ষ্য হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। আবার কারো কারো মতে ভালোবাসার নেই কোনো সীমানা, নেই বিশেষ কোনো দিন। ফাগুনের নবীন আনন্দ এ ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দিক মানুষ থেকে মানুষ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, জাগুক বিশ্ব মানবতা- এমনটাই প্রত্যাশা সমাজবিদদের।


Leave a Reply



Nobobarta © 2020। about Contact PolicyAdvertisingOur Family DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com