আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা চিঠি : সৈয়দ রনো - Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:২৮ অপরাহ্ন

আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা চিঠি : সৈয়দ রনো

আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা চিঠি : সৈয়দ রনো

আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের দর্শন গ্রন্থ সম্পর্কে লেখা চিঠি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  

প্রিয় হেমন্তিকা,
অগ্নিঝড়া মার্চের উত্তালময় একরাশ সৌরভ নিও। জানি না আজ কাল কেমন কাটছে তোমাদের দিনকাল। শুধু গাণিতিক নির্ভর কিছু সূত্র দিয়ে বুঝতে পারি তুমিও ভালো নেই আগের মতো। আমি মুমূর্ষ ভাড়াক্রান্ত এক ভয়াবহ উত্তাল সময় অতিক্রম করছি। আমার ক্লান্ত সীমানায় প্রতিদিন দেখছি ছোপছোপ রক্তের দাগ। নিয়মনীতি শৃংখলা যার যার ইচ্ছে স্বাধীন। শক্তির দাপটে কিছু পশুকে প্রতিদিন মানুষের পোশাকে দেখি আর মানুষ হয়ে আছে অনাহারী কংঙ্কাল। নীতি, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ দিনদিন বাংলার জমিন থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাষন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একদল পাপিষ্ঠ মহাজন। মোল্লা তন্ত্রের মনগড়া ছবকে ধর্ম নিয়ে চলছে ব্যবসা। ইসলাম ধর্মকে নিঃশ্বেস করার জন্য কোরআন এবং হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে করা হচ্ছে বিপদগামী। ধর্ম নিয়ে চলছে রাজনীতি, যার যার ইচ্ছে স্বাধীন অপব্যাখ্যায় ধর্মকে বিতর্কিত করবার চক্রান্তও দীর্ঘদিনের। এসব দেখেও আমি এক পাথরমানব।

হেমন্তিকা,
আমার ভেতরের অন্তর আত্মা এখন আড়ালে আবডালে সময়ে অসময়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বিভ্রান্তির জটাজালে ঘুরপাক খাওয়া আমি ক্লান্ত মানুষ। অনৈতিক কার্যকলাপ দেখাই যেনো আমার কাজ। প্রতিবাদ করার ভাষা নেই, সামান্য মনোবল তাতেও চিড় ধরেছে অনেক আগেই। কারো যেনো দায় নেই, দ্বায়িত্বও নেই। নিয়মনীতিহীন সমাজই যেনো আমাদের জন্য যথাযোগ্য স্থান। উন্নাশিকতা এখানকার নিত্য দিনের হাহাকার।

এই জনপদের মানুষ শত বিপত্তিতেও মুখে কুলুপ আটকে বসে থাকাই যেনো কাজ। হতাশায় তলিয়ে যাওয়া আমি, মাঝে মাঝে প্রতিবাদী হয়ে উঠি কিন্তু কেউ আমার কথায় কর্ণগোচর করেন না।

হেমন্তিকা,
আমরা জাতিগতভাবে এতো সু-চতুর যে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য দিয়ে গুলিয়ে ফেলে কার্যসিদ্ধির ওস্তাদ। অনেক কিছুর সাথেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছি না বলেই এই পত্র লিখা।
আমার যুথবদ্ধকাঙ্খার সাথে প্রতিনিয়ত বাস্তবতার সাংঘর্ষিক যুদ্ধে ক্লান্ত আমি অবসন্ন আমি। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সরকার, কালাকানন, প্রচলিত নিয়ম, সামাজিক নিয়মনীতি, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, মানবিক মূল্যবোধ, নির্যাতন এবং নির্মমতার সাথে খাপ খাইয়ে চলাটা আমার জন্য দুরূহ হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অঘটনে আমি পবিত্রাপের হা হুতাসে বড্ড ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত।

হেমন্তিকা,
কোন ভাবেই আমার বুঝে আসে না, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কেন এতো বিভাজন? কেন একদল মানুষ অন্য দলকে পথভ্রষ্ঠ বলছে? এক ধর্মের মানুষ অন্যধর্মকে তুচ্ছ ভাবছে? স্ব-স্ব ধর্মাবলম্বীদের নিকট যদি যুক্তি বা কার্যকর দলিল না থাকতো তাহলে কী তারা নিজ ধর্মে বহাল থাকতে পারতেন? কার্যত সবার কাছেই নিজ নিজ ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই আবার বিভিন্ন বিভাজন আমরা দেখতে পাই। যেমন ইসলাম ধর্মে শিয়া, সুন্নীর বিভাজন। চারটি মাজহাবের বিভজনতো আছেই। খৃস্ট্রান ধর্মে রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট। হিন্দু ধর্মে শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মনদের বিভাজন। বৌদ্ধ ধর্মের বিভাজন হচ্ছে মহাযান, বজ্রযান, থেরবাদ।

এতো এতো বিভাজন দেখে আমি শুধু অবাকই নই রীতি মতো হতবাক। বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ যেমন তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস, আচার-আচরণের নিজস্বতা ত্যাগ করতে চায়না। আমার কেনো যেনো মনে হয় তদ্রুপ জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নিজস্ব ধর্মীয় রীতি নীতিও পরিহার করার ক্ষেত্রে ভালো মন্দের বাচ বিচার করেন না। সবাই নিজস্ব চিন্তা চৈতন্যকে প্রাধান্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে চায়। স্রষ্টার সন্তুটি অর্জন কী সব ধর্মের পালনের মধ্যদিয়ে সম্ভব? হাজার হাজার ধর্মীয় মতো বিভেদের কারইে নাস্তিক্যবাদের জন্ম। কারন আস্তিক্যবাদে যদি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ দিক নির্দেশনা থাকে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের তাহলে তো যুক্তি সংগত ভাবেই বলা যায় কেউ না কেউ কোন না কোনো ধর্মের মানুষ বিপথগামী। এক ধর্ম যে জিনিসটাকে হারাম বলছে অন্য ধর্ম সেটা হালাল বলছে, পাশপাশি যে বিষয়টিকে হালাল বলা হচ্ছে সেটি অন্য ধর্ম পাপ বলে গ্রহণ করছে না। এতো বিভাজন বা বৈপরিত্ব নিয়ে মাথা ঘামানো থেকেই নাস্তিক্যবাদের জন্ম। আমার এসব চিন্তা ভাবনাকে কিভাবে দেখছো হেমন্তিকা?

হেমন্তিকা
তোমাকে বলতে আজ দ্বিধা নেই, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ভাবি কিন্তু কিছু লিখবো এমনটি চিন্তা করিনি। পারিপার্শ্বিকতা, সময়ের নির্মমতা, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, আস্তিক্য ও নাস্তিক্যবাদের বিভাজন আমাকে এ বিষয়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন ধর্মের কিছু ধর্মগ্রন্থ হালকা ভাবে পড়েছি, যা পড়ে আমার মনে বেশ কিছু প্রশ্নের উদ্যেগ হয়েছে, সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনো ধর্মগ্রন্থ কখনো দার্শনিক মতোবাদ এমনকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রদত্ত ফর্মূলার দ্বারস্থ হয়েছি, যেখান থেকে অনুপ্রেরণা পেলাম দু’চারটি লাইন লেখার। এখন তোমার কিছু পরামর্শই হবে আমার লেখার অনুপ্রেরণা।

হেমন্তিকা
তোমার আমার জন্মসূত্রে কিংবা পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ধর্ম দু’টি নিয়ে আমরা কখনই তর্ক বিপতর্ক করিনি। তোমার ধর্মে গোমাংস ভক্ষন নিষেধ করলেও তুমি গোমাংস ভক্ষন করছো। আমার ধর্মে গান-বাজনা শোনা নিষেধ করলেও আমি কিন্তু হরিসভা শুনেছি। মোট কথা আমি, তুমি, আমরা ধর্মীয় অনুশাষন শতভাগ পালন করিনি। অধিকাংশ ধর্মের আদেশ নিষেধ এবং পালনীয় বিষয়কে মিথ অভিধায় ভূষিত করা হয়। প্রত্যেকটি ধর্মেরই রয়েছে প্রধানতম প্রাচীন ঐতিহ্য। এই প্রাচীন ঐতিহ্য বিবর্তিত হতে হতে মানুষ তার সুবিধা মতো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করে ফেলেছে। কাজেই প্রায় ধর্মেই রয়েছে বিভিন্ন মতোভেদ। নিজ ধর্মের রীতিনীতির ভিন্নতার সুযোগেই গড়ে উঠছে নাস্তিক্যবাদ। প্রত্যেকটি ধর্মই যদি জীবন পরিচালনার দর্শন হয়ে থাকে সে যুক্তিতে নাস্তিকতাও একটি দর্শন যে আলোকে কিছু মানুষ জীবন পরিচালিত করতে চায়। এখন কথা হলো কোন দর্শনটি মূলত সর্বাধিক যুক্তিগ্রাহ্য এবং মানবিক সে বিষয়ে আমরা নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধ্যমতো তথ্য উপাত্ত এবং যুক্তিসঙ্গত ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। যেহেতু ধর্মীয় বিষয় সেহেতু অধিকাংশ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থের উদ্বৃতির আলোকে যুক্তিসঙ্গত ভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি নাস্তিক্যবাদের দর্শন সম্পর্কেও আমার আলোচনা করতে চাই।

হেমন্তিকা
আমার ভেতরে যে সকল প্রশ্নের উদ্যেগ হওয়ায় এ গ্রন্থ লেখার ধারাপাত সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে তোমার সাথে এ বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। তুমি বলেছো মিথ্যেকে হজম করাও এক ধরনের অপরাধ। সত্যকে যুক্তিসংগত ভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টাই হচ্ছে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ। সত্য এবং মিথ্যাকে চিহ্নিত করন এবং অন্তর আত্মাথেকে উত্থাপিত প্রশ্নের সমাধান খুঁজতেই এ গ্রন্থ লেখার প্রয়াস। যেসব প্রশ্ন প্রতিনিয়ত আমাকে ভাবিয়ে তোলে সেসব প্রশ্ন লিপিবদ্ধ করা হলো:-

১। আমি কোথা হতে এলাম? ২। আমি কোথায় যাবো? ৩। আমার আত্মা পূণ:জ্জীবিত হবে কি না? ৪। ভালো মন্দের বিচার হবে কিনা? ৫। সৃষ্টিকর্তা আমার বিচার করবেন কী না। ৬। সৃষ্টির রহস্য কী? ৭। পৃথিবীর প্রথম মানুষ কে? ৮। মানব সৃষ্টির রহস্য কী? ৯। ধর্মীয় ভেদাভেদের কারন কী? ১০। এতো ধর্মের প্রচলন থাকার পরেও নাস্তিকতার উদ্ভবের কারন কী? ১১। মানুষের অন্তর আত্মা কী? ১২। ধর্মীয় আদ্যপান্ত নিয়ে বিবেধের কারন চিহ্নিত করন। ১৩। ধর্মীয় অনুশাসনের বিজ্ঞান সম্মত মতবাদ। ১৪। ধর্ম দর্শন এবং বিজ্ঞানের সংজ্ঞা। ১৫। নাস্তিক্যবাদ এর আদ্যপ্রান্ত। ১৬। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য। ১৭। ধর্মীয় মতোভেদের কারন চিহ্নিত করন। ১৮। নাস্তিক্যবাদের দালিলিক গ্রহনযোগ্যতা। ১৯। ইসলাম ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের মানবিক মূল্যবোধ। ২০। ধর্মীয় অনুশাষনে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির যৌক্তিকতা। ২১। ধর্মীয় অনুশাষন এবং সমসাময়িক ভাবনা।

আলোচ্য একুশটি প্রশ্নের অধিকাংশ বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সমাধান ধর্মগ্রন্থে রয়েছে জানি এবং মানি কিন্তু এসকল বিষয় নিয়েই মোটা দাগে বিতর্ক করা হয় বলেই টপিক হিসেবে নির্ধারণ করা হলো। শতভাগ নিরপেক্ষতার আদলে ধর্মীয় গ্রন্থের রেফারেন্স এ অত্র গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করবো।

হেমন্তিকা,
অপ্রতিরোধ্য চিন্তাশক্তির অনলে জ্বলে পুড়ে খাক হয় আমার অন্তর আত্মা। বিবেক আর মনের দ্বন্দে বহমান চিন্তারস্রোত। খেয়ালি মনের তান্ডবে উদ্ভাবিত জটিল এবং কঠিন প্রশ্নের সমাধান খুজতেই এই লেখনির সৃষ্টি। আশাবাদী মানুষ হিসেবে, স্পষ্টভাবে আশাবাদ ব্যাক্ত করতে চাই এই গ্রন্থ হোক সু-চিন্তিত মতাদর্শের বহি:প্রকাশ। সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ব্যতিত একটি গ্রন্থ কিন্তু দলিল হতে পারে না, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো। দার্শনিক মতাদর্শ উপস্থাপনের মতো যথেষ্ট প্রজ্ঞা বা ধীশক্তি কিংবা মেধার কিঞ্চিত ঘাটতি থাকলেও মেধাবীদের উক্তিই হোক চলার বা বলার পাথেয়।

হেমন্তিকা,
তুমি বা তোমাদের পরামর্শে আমি বা আমরা এ গ্রন্থ রচনার মধ্যদিয়ে ইহলোক বা পরলৌকিক জীবনাচার সম্পর্কে অনুধাবনের চেষ্টা করি। বাতিল দ্বারা আক্রান্ত না হয়ে সঠিক পথ দর্শনে জীবন হোক মঙ্গলময় সেই ফরিয়াদ রাখছি। মনুষ্য জীবন জাগ্রত হোক।
সাফল্য ও কল্যানে পরিপূর্ণতা পাক আমার তোমার এবং সবার জীবন।

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply