আসছে শীত, সক্রিয় হচ্ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস – Nobobarta

আজ শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:১৫ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
মহিউদ্দিন সভাপতি, আবু বকর সম্পাদক উদয় সমাজ কল্যান সংস্থার ১২ তম ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন ১০ ডিসেম্বর উপাচার্যের দুর্নীতির ক্ষতিয়ান প্রকাশ করবে আন্দোলনকারীরা মার্শাল আর্ট ‘বিচ্ছু’ নিয়ে আসছেন সাঞ্জু জন আজ উদয় সমাজ কল্যান সংস্থা সিলেটের ১২তম ওয়াজ মাহফিল দলীয় কার্যালয় সম্প্রসারণের লক্ষে আগৈলঝাড়া রিপোর্টার্স ইউনিটির প্লট উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে হস্তান্তর যবিপ্রবিতে ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার বাংলাদেশের নতুন কমিটি গঠন আটোয়ারীতে পরিবার কল্যাণ সেবা ও প্রচার সপ্তাহ উপলক্ষে এ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত জবি রোভার দলের হেঁটে ১৫০ কিলোমিটার পরিভ্রমণের উদ্বোধন মারুফ-তানহার ‘দখল’
আসছে শীত, সক্রিয় হচ্ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস

আসছে শীত, সক্রিয় হচ্ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস

হামিম উল কবির : আসছে শীত, সক্রিয় হচ্ছে প্রাণঘাতী কিছু ভাইরাস। এ ভাইরাসগুলো তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম বিপজ্জনক ভাইরাস হলো ‘নিপাহ’। এছাড়া রয়েছে, রোটা ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সাধারণ সর্দি-কাশি (কমন কোল্ড)। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যর হার ৭০ শতাংশ। এর কোনো চিকিৎসা নেই। এর সংস্পর্শে যে আসবে সেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের ফরিদপুর, যশোর, মেহেরপুর, নওগাঁ, জয়পুরহাটের মতো কয়েকটি জেলায় প্রায় প্রতি বছরই নিপাহর সংক্রমণ ঘটে থাকে। প্রধানত কাঁচা খেজুর রস পান করার মাধ্যমে রোগটি শরীরে প্রবেশ করে থাকে। খেজুর রস ফুটিয়ে পান করা হলে এর মধ্যে কোনো বিপদ থাকে না। অতিমাত্রায় বিপজ্জনক নিপাহ ভাইরাসের মূল উৎস বাদুড়। বাদুড়ের মুখে এ ভাইরাসটি বেড়ে ওঠে। কিন্তু বাদুড়ের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। শীতে বাদুড় খেজুর রস খেয়ে আবার সেই রসের মধ্যেই প্রস্রাব করে। প্রস্রাবের মধ্যে থাকা নিপাহ ভাইরাস খেজুর রসে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের মানুষ সকালে খুবই আগ্রহ করে ঠান্ডা খেজুরের রস পান করে থাকে। এটা শত বছরের একটি অভ্যাস। আবার অনেক সময় উৎসব করে কাঁচা খেজুর রস পান করে থাকেন অনেকে। এভাবে বাদুড়ের প্রস্রাব মিশ্রিত রস পানের মাধ্যমে শরীরে নিপাহ ভাইরাসটি প্রবেশ করে। আইসিডিডিআরবির একদল বিজ্ঞানী শক্তিশালী নাইট ভিশন ক্যামেরার মাধ্যমে বাদুড় যে রস খেয়ে সেখানে প্রস্রাব করে, তা নিশ্চিত হন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে জ্বর হয়। এরপর শুরু হয় মাথাব্যথা। মাথাব্যথার পরই শুরু হয় খিঁচুনি। এ সময় মানুষ অসংলগ্ন কথা-বার্তা বলতে শুরু করে এবং এক সময় অজ্ঞান হয়ে যায়। চিকিৎসকরা রোগের লক্ষ্মণ দেখে বলতে পারেন রোগটি নিপাহ কি না।

নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে খেজুরের রস ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, ‘নিপাহ ভাইরাসের মূল উৎস বাদুড় এবং বাদুড় খাওয়া খেজুরের রস। খেজুরের রস গাছের মধ্যে হাঁড়িতে থাকা অবস্থায় বাদুড় ওই রস পান করে এবং পরে রসের মধ্যে প্রস্রাব করে যায়। ওই রস না ফুটিয়ে কাঁচা পান করলে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে উৎসবের মাধ্যমে আয়োজন করে কাঁচা খেজুরের রস পান করার প্রচলন রয়েছে। এতে মরণব্যাধি নিপাহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’

বিগত কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের পর মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষ এবং রক্তনালির অন্তরাবরণীর কোষকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত হলে কোষে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। ফলে রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। নিপাহ ভাইরাস মস্তিষ্কের রক্তনালি ছাড়াও ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ও কিডনির রক্তনালিকে আক্রান্ত করে। মস্তিষ্ক প্রদাহের পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত করে ফুসফুসকে। এ কারণে রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়ে থাকে।

১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় সর্বপ্রথম নিপাহ ও হেন্দ্রা ভাইরাসজনিত মস্তিষ্ক প্রদাহ শনাক্ত হয়। তখন অবশ্য ভাইরাসটির নিপাহ নামকরণ হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে মানুষের মধ্যে মস্তিষ্ক প্রদাহের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ব্যাপকভাবে। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার কয়েকটি এলাকায় শুকরের খামারের কর্মী ও শ্রমিকদের মধ্যে এ রোগটি দেখা দেয়। এ সময় প্রায় তিন শতাধিক মানুষ মস্তিষ্ক প্রদাহে আক্রান্ত হন এবং এর মধ্যে মারা যান ১০৫ জন। ফলে রোগটি নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। বিস্তারিত গবেষণার পর নিপাহ ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, নিপাহ ভাইরাস এক ধরনের প্যারামিক্সো ভাইরাস। এটা আমাদের পরিচিত হাম ভাইরাসের মতো। তবে পরিচিত ভাইরাসের মতো হলেও এটা নতুন ধরনের ভাইরাস এবং এটা প্রাণীদেহ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটিয়ে থাকে। বাদুড়ের মুখগহ্বরে মূলত এই ভাইরাসটির বসবাস। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে এ ভাইরাস মানুষ ও শূকরের মধ্যে সংক্রমণ ঘটিয়েছিল। মানুষ ছাড়াও এ ভাইরাসের দ্বারা বিড়াল, কুকুর, ঘোড়াও আক্রান্ত হতে পারে।

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আইসিডিডিআরবি, আইইডিসিআর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র সিডিসি যৌথভাবে নিপাহ ভাইরাসের গবেষণা করেছে বাংলাদেশে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রথম কৃষ্টিয়া জেলায় নিপাহ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩১৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২১৭ জন। এ ভাইরাসে মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ২০১১ সালে ৪২ জন এবং মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। ২০১১ সালে মৃত্যুর হার ছিল ৮৫.৭১ শতাংশ। আবার ২০১০ সালে ১৮ জনকে সংক্রমিত করে এবং এর মধ্যে মৃত্যু হয় ১৬ জনের। ২০১০ সালে মৃত্যুর হার ছিল ৮৮.৮৯ শতাংশ।

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, নিপাহ ভাইরাসের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতার কারণে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে যথাক্রমে দুই ও তিনজন আক্রান্ত হন এবং ওই দুই বছরে একজন করে রোগী মারা যান। চলতি বছরের প্রথম দিকে দুইজন আক্রান্ত হন এবং মৃত্যু হয় একজনের। ২০০১ সালে মেহেরপুরে ৯ জন মারা যান নিপাহ ভাইরাসে। এর মধ্যে একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যু হয়। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে মে এই ছয় মাস বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয় এবং কাঁচা খেজুরের রস পান করে মানুষের মৃত্যু হয়। এ ভাইরাসে মৃত্যুর হারটা একটু বেশি। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার বেশি।’ অতীতেও বাংলাদেশে এ ধরনের মস্তিষ্ক প্রদাহের সংক্রমণ ঘটেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তখন এ রোগের এত উন্নতমানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না।

নিপাহ ভাইরাস এত মারাত্মক যে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে কেউ আক্রান্তের সংস্পর্শে এলেও সংক্রমিত হতে পারেন। আবার চিকিৎসক, নার্স অথবা সেবা দেওয়ার কাজে যারা থাকেন, তাদেরও বিপজ্জনক এ ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির গোসল করাবেন তাদেরও রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তবে আইইডিসিআরের গাইডলাইন অনুসরণ করে নিপাহ আক্রান্ত রোগীকে সব ধরনের সেবা দেওয়া যাবে, কোনো সমস্যা হবে না। গত ১৮ নভেম্বর আইইডিসিআর কার্যালয়ে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ এবং অন্যান্য মৌসুমি রোগ সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক অবহিতকরণ কর্মশালায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম আলমগীর জানান, এই শীতে নিপাহ ভাইরাস ছাড়াও রোটা ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সাধারণ সর্দি-কাশি (কমন কোল্ড) হতে পারে। এ বিষয়ে জনগণকে এখন থেকেই সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তারা।

ডা. মীরজাদী সেব্রিনা জানান, ‘নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের হার বেশি থাকে। মোট আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশই ঘটে থাকে এই কয়েক মাসে। ছয় থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকে। খাবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে খাবার এবং হাত ধোয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা যায়।’ ড. এস এম আলমগীর জানান, ‘শীতকালে বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় না। মূলত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি। সাধারণ সর্দি-কাশি ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। সাধারণ সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা এক নয়। নিপাহ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয় ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা খুব একটা বেশি না হলেও এতে মৃত্যের সংখ্যা অনেক।’


Leave a Reply