আবরার হত্যাকান্ড ও শিক্ষাব্যবস্থার নীতিহীনতা – Nobobarta

আজ বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০২:১৬ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
কাউখালীতে ৪০ যাত্রীসহ খেয়া ট্রলার ডুবি, পিএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ পাকিস্তান থেকে এলো ৮২ টন পেঁয়াজ রহমতপুর ইউনিয়নে ওয়ার্ড আ’লীগের সম্মেলন, সভাপতি সুলতান, সম্পাদক স্বপন তারেক রহমানের জন্মদিনে জাবি ছাত্রদলের দোয়া ও মিলাদ আগৈলঝাড়ায় পেঁয়াজ, চাউল ও লবণ নিয়ে গুজব, ইউএনও বিপুল চন্দ্র দাসের অভিযান অব্যাহত কাউখালীতে নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ পিইসি পরীক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার কবি সুফিয়া কামালের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ইতিহাসবিদ সিরাজ উদ্দীনের জাবির হল খুলে দেওয়াসহ ৭দফা দাবি শিক্ষার্থীদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুরু হল বুড়ি তিস্তা খনন নলছিটিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ
আবরার হত্যাকান্ড ও শিক্ষাব্যবস্থার নীতিহীনতা

আবরার হত্যাকান্ড ও শিক্ষাব্যবস্থার নীতিহীনতা

ডা.জয়প্রকাশ সরকার : স্বাধীনতার পর হতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ যাবৎ দেড় শতাধিক হত্যাকান্ড হলেও এগুলোর কোনটারই বিচার বা কারণ উদ্ঘাটন হয় নাই। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পড়ুয়াদের (মেধাবী শব্দটি ব্যবহার না করে পড়ুয়া লিখলাম,কারণ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবী বের করা দুস্কর!) প্রতিষ্ঠান বুয়েটে হত্যাকান্ড!

আমি আবরার হত্যাকান্ডকে অন্যদৃষ্টিতে দেখতে চাই। কারণ এই হত্যায় যারা জড়িত তারাও একই রকমের পড়ুয়া ছেলেপুলে। অতীতের অনেক হত্যাকান্ডেই বহিরাগতদের মূখ্য ভূমিকা পাওয়া যেতো। কিন্তু আবরার হত্যাকান্ডে তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরাই জড়িত বলে আপাত তথ্যমতে জানা যাচ্ছে। শুধুমাত্র হত্যাকান্ডের সঠিক বিচার হলেই হবে না,এর নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণও জরুরী। হলফ করেই বলা যায়,এটাই শেষ হত্যা নয়। একজন মেধাবী হত্যায় কতিপয় মেধাবী জড়িত;এটা খুবই ভয়ের কারণ। এর দায় এড়ানোর সুযোগ কারোরই নাই। না সরকারের, না শিক্ষকদের, না ছাত্রদের, না জনগনের। মেধাবীরা কখনই কাউকে খুন করে না। যেখানে খুন আছে, সেখানের মেধা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

সুতরাং আবরার হত্যাকান্ডকে ঠুনকো বা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ভাবার কারণ নাই। এর নেপথ্যে আছে আমাদের ক্ষয়িষ্নু রাজনীতির দোলাচলে দোদুল্যমান নুব্জ শিক্ষাব্যবস্থা।
প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে রোবোটিক শিক্ষার মতো ছেলেমেয়েদের পড়াতে থাকলে ভবিষ্যতে এর চেয়ে আরও ভয়ংকর অপরাধের কথাও শুনলেও অবাকের কিছু থাকবে না। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাসহ মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিকেও আর নৈতিকতার শিক্ষা নেই।

দু’চার বছর পর পর লাখ লাখ সরকারি টাকার জলান্জলী দিয়ে রাঘববোয়াল ‘রা নতুন নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। এখন তো পাশের হার দ্বারা শিক্ষার মানের যাচাই হয়! কতটা বর্বর শিক্ষাব্যবস্থায় এমনটা সম্ভব বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা এক্টের যুগোপযোগী আপডেট জরুরী। আজকের দিনে হলের প্রভোষ্টরা খোঁজই রাখেন না ছেলেপেলেরা কি করছে। একে তো রাজনৈতিক নিয়োগ, তার উপরে লেজুরবৃত্তি মনোভাব তো আছেই।

প্রথম বর্ষে ভর্তির পরে রেগিংয়ের চল তো প্রায় প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও আছে। এক্ষেত্রে প্রভোষ্ট এমনকি ভি.সি ও দেখে না দেখার ভান করেন। আসলে এসব ক্ষেত্রে পদক্ষেপগুলো নিলেই হত্যাকান্ড দূরে থাক,মারামারিও হবে না বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে নয় বরং শিক্ষক ছাত্রদের কলুষমুক্ত রাজনীতির মধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তি বিরাজ করতে পারে। শিক্ষক নামের অতীব সন্মানের পেশাটাকে কলুষমুক্ত করতে পারলেও ভালো ছাত্র উৎপাদিত হবে। সূচনাপর্বেই শিক্ষাব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন বাদ দিয়ে পূর্ববৎ মূলধারার শিক্ষায় প্রত্যাবর্তন করা উচিত। যেগুলো সত্তর কিংবা আশির দশকে ছিলো।

প্রতিটা ক্লাশে নৈতিকতা পাঠ থাকা বান্ছনীয়। শুধু বিজ্ঞান আর একাউন্টিং পড়লেই হবে না,মানুষ হওয়া শেখাটাও আরও জরুরী। আর শিক্ষক নিয়োগের দূর্নীতি কমাতে না পারলে সৎ শিক্ষকও আসবে না। বর্তমান ব্যবস্থার প্যাচে পড়ে প্রায় ৮০ ভাগ শিক্ষক অসততায় জড়িয়ে গেছে। যে কারণে ছাত্রছাত্রীরাও যেমন তাদের ঘৃনা করে, তেমনি সমাজে এরা আগাছার জন্ম দেয়। হত্যাকান্ড কখনই ভিন্ন মতাদর্শ দমনের হাতিয়ার হতে পারে না। একটা বর্বর গোষ্ঠী চিরকাল হত্যাকেই তাদের হাতিয়ার মনে করে। অস্ত্র নয় বরং যুক্তি দিয়েই তা প্রতিহত করতে হয়। বাকস্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে। আজ আবরার হত্যাকান্ডেও যে সবাই মর্মাহত তাও নয়।

ধোঁয়া উঠে গেছে! কে জামাত-শিবির? কে নাস্তিক? আমাদের সমাজব্যবস্থা আজও মানুষকে মানুষ ভাবা শেখায় না! সর্বোপরি কথা এরা সবাই আমার’ই মত মানুষ। সুতরাং আজ আবরারের পিতা-মাতা কাঁদবে,কাল আমি কাঁদবো আমার সন্তানের জন্য। এই খুনের শেষ কোথায়? সমাজ এমন নোংড়া জায়গায় গেছে যে, ছেলে সন্ত্রাসী হলে বাবা মা গর্ব করে বলে “আমার ছেলের অনেক ক্ষমতা”। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে গোল্ডেন এ প্লাস পেলে বলে আমার ছেলে ভালো ছাত্র। ছেলে ড্রাগস ডিলিংস করে অবৈধ ব্যবসা করে টাকা কামালেই গর্ব, বলে -আমার ছেলের প্রচুর টাকা।

তো এই সমাজে মানুষ উৎপাদন কেমনে হবে? যে জাতিসত্বা মানবিকতা অর্জনের চেয়ে রোবোটিক লেজুড়বৃত্তিতে আসক্ত হয় তাদের ভাগ্যে এর চেয়ে বেশী কিছু কেন’ই বা থাকবে! যেকোন সমস্যা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম এবং এক্ষেত্রেও পুরো শিক্ষাব্যবস্থাতেই ঢালাও পরিবর্তন,আইন সংশোধনসহ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন আছে। পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা অর্জনে পরিবারেরও দায় আছে।আজকে যারা আবরার খুনের সাথে জড়িত,তাদের বাবা মায়েদেরও কিন্তু সন্তানের দায় এড়ানোর সুযোগ নাই।

(চিকিৎসক,কবি ও লেখক)ডা.জয়প্রকাশ সরকার


Leave a Reply