আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দাও : বঙ্গবন্ধু - Nobobarta

আজ মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:০১ অপরাহ্ন

আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দাও : বঙ্গবন্ধু

আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দাও : বঙ্গবন্ধু

  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
    3
    Shares

মনজুরুল ইসলাম মেঘ : ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই সোমবার দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় যে সংবাদটি লিড নিউজ হয়েছিলো সেই সংবাদটিই আমার আজকের লেখার অনুপ্রেরণা এবং একই শিরোনামে লেখছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই দেশে নেমে আসে নানা অরাজকতা, লুটপাট ও দুর্নীতি। পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে সারা দেশ যখন খত-বিক্ষত, মানুষের পেটে ভাত নাই, গায়ে জামা নাই, ফসল চাষ করার জন্য বীজ নাই, সার নাই, চারদিকে শুধু আহাকার আর হাহাকার। তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দক্ষতার সাথে সব কিছু সামলিয়ে দেশ পরিচালনা করছিলেন। বিদেশী বন্ধু রাষ্টগুলো যে সামান্য পরিমান সাহায্য সহায়তা প্রদান করেছিলো তা তিনি মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশ বিরোধী কাজে লিপ্ত ছিলো তারা আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করলো লুটপাত। বঙ্গবন্ধু সারাদেশে নোঙ্গরাখানা খুলে দিলেন যাতে এই দেশের গরিব দুঃখী মানুষ দু’বেলা খাবার খেতে পারেন। ত্রানের কাপড় পৌঁছিয়ে দিলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। কিন্তু দেশবিরোধী একটি চক্র বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গোপনে ষযন্ত্র শুরু করলেন। ফলশ্রতিতে দেখা গেলো নোঙ্গরখানা আছে কিন্তু কোন খাবার নাই, ত্রানের কাপড়ের গাড়ী আসতেছে কিন্তু কোন কাপড় গরিব মানুষ পাচ্ছেন না। দেশ বিরোধী চক্র, নব্য আওয়ামী লীগ কিছু নেতা-কর্মী, সুবিধা ভোগী আওয়ামী লীগ নেতারা মিলে অধিকাংশ সরকারী ত্রাণ লুট করে ভারতে পারচার করতো। বঙ্গবন্ধু সবই জানতেন এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে হুকুম জারি করলেও শতভাগ বাস্তবায়ন হতো না কারন তখনো প্রশাসনে পাকিস্থানীপন্থি অনেক অফিসার ও কর্মকর্তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে বহাল তবিয়তে ছিলেন।

স্বাধীন বাংলার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবারো উপলব্ধি করলেন, বাংলার আপামর জনতা ছাড়া, শুধু প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ দিয়ে এই দেশের মানুষের কষ্ট-দারিদ্রতা দূর হবে না, সোনার বাংলা গড়ে উঠবে না, অর্থনৈতিক ভাবে দেশ সমৃদ্ধ হবে না, শিক্ষার উন্নয়ন হবে না, সর্বপরি বাংলার মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। তাই তিনি আবারো সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সারাদেশে ঘুরে বেড়াবেন, বাংলার মানুষকে বুঝাবেন, মা বোনদের সঙ্গে কথা বলে শিখিয়ে দিবেন সন্তানদের আদর্শ সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হবে, নইলে এই দেশে পাকিস্তান সরকার যে চুরি-দুর্নীতি শুরু করেছিলো, তা কোনদিন বন্ধ হবেন না।

ব্রিটিশ শাষন মুক্ত করতে তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিব যেমন ভারত চষিয়ে বেড়িয়েছেন, ব্রিটিশ শাষন থেকে দেশ মুক্ত করে পাকিস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। উর্দু ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে জাতিয় ভাষা করতে তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজির জেল খেটেছেন, বাংলার বিভিন্ন স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তিতা করেছেন, বাংলা ভাষাকে জাতিয় ভাষা করেছেন রক্তর মধ্য দিয়ে। সেই শেখ মুজিবুর রহমান ই বাংলার আপামর জনতার নেতা হয়ে পাকিস্থান থেকে বাংলার স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। যিনি এতকিছু করলেন দেশের জন্য, তার দেশের মানুষ না খেয়ে থাকবে, গায়ে জামা থাকবে না, তিনি তা সহ্য করলেন না। তিনি আবার বের হয়ে পড়লেন জনসমুদ্রে, এক জেলা থেকে আরেক জেলা। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সারাদেশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন এবং অবকাঠামগত উন্নয়নে হাত দিলেন। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর সময়ে যে অবকাঠামগত উন্নয়নের ধারণা করা হয়েছিলো এতদিন পরেও সেই মডেল ই ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্তক কাজ বাস্তবায়ন করায় বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বহুগুন বাড়িয়েছে এবং আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারছি।

১৯৭২ সালের ২ জুলাই রবিবার কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু তার অমর বানীখানি আবার শুনালেন এবং বাংলার মানুষকে কথা দিলেন “জীবন দিয়ে জনগনের দুর্দশা দূর করবো”। তিনি একই সমাবেশে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের লক্ষ্য করে অত্যান্ত দুঃখের সাথে কিন্তু দৃঢ় মনোবলে বলেছিলেন “আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দাও”। বাংলার অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, সহায়-সম্ভবলহীন মানুষ বঙ্গবন্ধুর জন্য সেই দিন আবার একবার আনন্দে কেঁদে ছিলেন, হাত তুলে দোয়া করেছিলেন, মসজিদ মন্দিরে বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রার্থনা করে ছিলেন বাংলার মানুষ, কারণ বাংলার মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন এইবার সত্যি তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে, কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, কারন বঙ্গবন্ধু সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ থেকে কিছু দুর্নীতিবাজ নেতা কর্মীকে বহিষ্কার করলেও, দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে অবস্থান করে থাকে কিছু সুবিধালোভী নেতা কর্মী যার ফলশ্রতিতে বঙ্গবন্ধুকে একদিন সত্যি জীবন দিতে হলো। আর দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে থেকে গেলেন, কেউ কেউ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেন, সেই অর্থে স্বাধীনতা বিরোধীরা দেশে রাজনীতিও শুরু করলো এবং আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অনেক দূরে রাখলো।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলিতে হাত দেন, অধিকাংশ কাজ অসমাপ্ত রেখেই সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। র্দীঘ ৮ বছর পর ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন আওয়ামী লীগ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। দেশের উন্নয়ন করায় জনগনের সমর্থনে টানা তিন মেয়াদে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী গনতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি রের্কোড করেছেন। তিনি বাংলাদেশের ৪ বারের প্রধানমন্ত্রী। এর আগে কোন সরকার প্রধান এত সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকেনি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে সন্তোষজনক, জিডিপি বাড়ছে, বিভিন্ন অপরাধ কমছে, জঙ্গিবাদ নির্মুল হয়েছে, মানুষ সুবিচার পাচ্ছেন, কিন্তু মানুষ একটি জিনিস থেকে এখনো মুক্তিপায়নি সেটি হলো দুর্নীতি। সরকারি বিভিন্ন অফিসে দুর্নীতির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কিছু অসৎ নেতাকমীও দুর্নীতিতে এগিয়ে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষনা করেছেন। সম্প্রতি আমরা দেখতে পাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদের নেতাকে পদত্যাগ করিয়ে প্রমান করিয়েছেন, যতবড় নেতা ই হোক দুর্নীতি করলে তার ক্ষমা নেই। আমরা গনমাধ্যমে আরো দেখতে পাই সম্প্রতি যুবলীগের র্শীষ কয়েকজন নেতা ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িত এবং কালো টাকার কারবারে লিপ্ত থাকায় আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ বা সহযোগি যে কোন দলেই দুর্নীতিবাজের কোন জায়গা নেই এটা সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল, মাদার অফ দ্য হিউম্যানিটি, উন্নয়নে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলার মানুষ ১৯৭২ সালে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষন “আওয়ামী লীগ থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দাও” যেমন বিশ্বাস করেছিলেন তেমনি এইবার শেখ হাসিনার “দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স” নীতিকেও গ্রহণ করেছেন সকল শ্রেণির মানুষ। এই বিশ্বাস ধরে রাখার দায়ভার আওয়ামী লীগের উপরেই বর্তাবে। আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারনে যে উন্নয়ন হয়েছে তা সত্যি যেমন নজিরবিহীন তেমনি এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং জনগনের আস্তাভাষন হয়ে থাকতে চাইলে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান থেকে পিছ পা হওয়ার সুযোগ নেই আওয়ামী লীগের।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যখন যে দল থেকেছে সেই দলের নেতা কর্মীরাই দুর্নীতি করেছে, কালো টাকার পাহাড় গড়েছে। এমনকি এই দুর্নীতি করতে যেয়ে বাংলাদেশ একবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলো। রাষ্ট্রক্ষমতায় টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার সাভাবিক ভাবেই এই দলেও কিছু নেতা কর্মী যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়বেন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবাক তখন হবো যখন আওয়ামী লীগ দুর্নীতি রোধ করতে ব্যার্থ হবে। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার কোন ক্ষেত্রেই ব্যার্থ হয়নি।

আমার এই লেখার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কাছে অনুরোধ জানাই বাংলাদেশে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান ই আছে যেখানে আওয়ামী লীগ নেই, ছাত্রলীগ নেই কিন্তু দুর্নীতি আছে। এই ধরনের দুর্নীতি সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন কোন শিক্ষার্থী দুর্নীতির শিকার হয় পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষার্থীও দুর্নীতি গ্রস্থ হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমাদের দুর্নীতি রোধ করতে চাইলে সবার আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এই বিষয়ে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষা মন্ত্রনায়কে।

সম্প্রতি বগুড়া পলিটেকনিক নিয়ে একটি সংবাদ গনমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদের বরাতে জানা যায় বগুড়া পলিটেকনিকে কোন ছাত্র রাজনীতৈক দল নেই, কিন্তু দুর্নীতি আছে। সেখানে শিক্ষকদের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। একজন শিক্ষক ৬ মাসের সেমিষ্টারে ৫ টি ক্লাস নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফেল করে দেয়ার হুমকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষকের নামে বার বার অর্থ আতœসাধের ঘটনা ঘটেছে। অধ্যক্ষসহ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে উপবৃত্তির টাকা থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে কোন রশিদ ছাড়ায়। আমাকে সবচেয়ে যে অভিযোগটি কষ্ট দিয়েছে সেটি হলো বাধ্যতামূলক ভাবে হিন্দু ছাত্রদের থেকেও উপবৃত্তির টাকা থেকে কোন রশিদ ছাড়ায় মসজিদের নামে কযেক বার চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের উপর প্রশাসনের নানা অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। অভিযোগ আছে শিক্ষক সমিতির নামে অর্থ দুর্নীতির, এছাড়াও হোস্টেল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির কথাও উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি হলে আমি অবাক হই, কিন্তু যখন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হয় তখন আমি স্তব্দ হয়ে যাই।

সমাজে যখন নৈতিকতার স্থলন হয়, মানুষ তখন বিবেক বর্জিত হয়ে উঠে। সামাজিকতার অবক্ষয় হয়, দেখা দেয় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। একটা দেশের প্রশাসন অনেক কিছুই করতে পারে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিা’র কাছে দেশবাসির আশা ভারসা একদিন বাংলাদেশ দুর্নীতি মুক্ত হবে।

লেখক : মনজুরুল ইসলাম মেঘ
সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা
বার্তা সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আলো

লাইক দিন এবং শেয়ার করুন


Leave a Reply