শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১১:২৭ অপরাহ্ন

সেহরী ও ইফতার সময় :
আজ ২৪ মে বুধবার, রমজান- ৭, সেহরী : ৩-৪২ মিনিট, ইফতার : ৬-৪২ মিনিট, ডাউনলোড করে নিতে পারেন পুরো ফিচার- সেহরী ও ইফতার-এর সময়সূচী


‘অদ্ভুত সুন্দর অনুপ্রেরণার গল্প’

‘অদ্ভুত সুন্দর অনুপ্রেরণার গল্প’



গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, উদ্যোক্তা ও বক্তা সাবিরুল ইসলামের অর্জনের খবর পড়ে আরো একবার গর্বিত এবং অনুপ্রাণিত হলাম। সাধারণত আমাদের বাবা-মা তাদের সন্তানদের এবং শিক্ষকরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বিখ্যাত বা মহাপুরুষদের জীবনকাহিনী ও অর্জন শুনিয়ে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু খুব কম মানুষই তাতে অনুপ্রাণিত হয়। কারণ আমরা এটা ভেবেই বসে থাকি যে তারা বিধাতা প্রদত্ত অসাধারণ মেধার অধিকারী হয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তাই তারা বিখ্যাত হয়েছেন। আমি অত মেধাবী নই অতএব আমার দ্বারা তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন আমাদের আশপাশের সাধারণ মানুষটি অসাধারণ কিছু করে বসে তখন তা আমদের অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। আমি নিজে যেমন বিভিন্ন মানুষের অর্জন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি আমার খুব কম সময়ের শিক্ষকতা জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের সেই গল্পগুলো বলে তাদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি। যাদের অর্জনগুলো আমাকে এই অনুপ্রেরণা দিয়েছে সেই গল্পগুলো সাবিরুলের মতো আরো হাজার হাজার অনুপ্রেরণার গল্প তৈরি করবে সেই স্বপ্ন নিয়েই সবার সাথে শেয়ার করছি। প্রথম দুইটি গল্প যাদেরকে নিয়ে লেখা তাদেরকে আমি সরাসরি চিনি না। তাদের খুব কাছের লোকদের থেকে আমি তাদের গল্প শুনেছি। তাই এই দুই জনের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হল। আশা করি, সংবাদকর্মীরা এই দুজনের অনুমতি নিয়ে তাদের এই গল্পসহ বাকি সবার সাফল্যের গল্প আরো অনেক বড় আঙ্গিকে দেশের তরুণ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবেন।

গল্প ১ : মাসুদ করিম, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিশোর বয়সে পড়ালেখার চেয়ে খেলাধূলায় মনোযোগ একটু বেশি ছিল। তাই চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান হয়নি। কিন্তু খেলাধূলায় পারদর্শী হওয়ার কারণে খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয়েছিলেন। একজন ছাত্র যখন খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয় আর যখন সে দেখে তার সহপাঠীরা কেউ মাধ্যমিক অথবা উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড বা স্টার মার্ক্স পেয়ে মেধাতালিকা থেকে ভর্তি হয়েছে তখন তার ভিতরে সেই আত্ববিশ্বাস থাকে না যে সে ক্লাস এ খুব ভাল ফলাফল করতে পারবে। যথারীতি সে ধরেই নেয় যে ভাল ফলাফল তার জন্যে না। কিন্তু চেষ্টা এবং অনুপ্রেরণা থাকলে অনেকেই সাফল্যের চরম শিখরে উঠতে পারে। আমাদের আফসোস যে অনুপ্রেরণা দেওয়ার মানুষ আমাদের নেই তাই আমরা নিজেদের ভেতরের মেধা হয়ত সারাজীবনেও আবিস্কার করতে পারি না। মাসুদ করিম যথারীতি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোটামুটি ফলাফল করেন। তারপর ইংল্যান্ড এর উদ্দেশে পাড়ি জমান মাস্টার্স করতে। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি নিজের মেধা কে আবিস্কার করেন এবং একসময় সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে যান। তার পর আর পিছু ফিরতে হয়নি। পিএইচডি শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাক কুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করে এখন অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি নিশ্চিত মাসুদ করিম কোনদিন নিজেও ভাবেননি যে তিনি এত মেধাবী। আমার ধারণা কোনরকম একটা চাকরি করে জীবন পার করাই একসময় তার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মাসুদ করিম পেরেছেন তার মেধাকে খুঁজে বের করতে। আমরা যারা ক্লাসের মাঝারি মানের ছাত্র তাদের জন্য মাসুদ করিম এক আদর্শ অনুপ্রেরনার প্রতীক।

গল্প ২: আশির দশকের কথা। তখনকার দিনে মেয়েদের পড়াশোনার হার ছিল অনেক কম। তারপরও যারা ভালো ফলাফল করতে পারত না তাদেরকে সাধারণত বাবা-মা বিয়ে দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতেন। নাম তার সাবিহা সুলতানা। এসএসসি এবং এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিলেন। তারপর বরিশালের একটি কলেজে গণিত বিভাগে স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন। এরমধ্যে বাবা-মা ভাল পাত্র দেখে বিয়েও দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছা থেকেই পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে গেলেন। তখন বরিশাল এর সব কলেজ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন তাই তাদের বার্ষিক মৌখিক পরীক্ষা হতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজ থেকে আসা একজন ছাত্রীর গণিতের মেধা দেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চমকে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বছর আবার মৌখিক পরীক্ষায় তার কৃতিত্ব দেখে গণিত বিভাগের সকল শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিল এই মেয়েকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে আর তৃতীয় বর্ষে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও কাউকে ভর্তি করানো সম্ভব না। কিন্তু গণিত বিভাগের শিক্ষকরা উপাচার্যকে মেয়েটির মেধা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পর উপাচার্য আইন পরিবর্তন করে মেয়েটিকে তৃতীয় বর্ষে ভর্তি করালেন। যথারীতি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এসএসসি এবং এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ থাকার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারলেন না। শিক্ষকতা শুরু করলেন খুলনার একটি কলেজে। আর পার্টটাইম ক্লাস নিতেন নতুন প্রতিষ্ঠিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেহেতু তার ২টি দ্বিতীয় বিভাগ ছিল তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে শুরু করলেন সেই কমতি পূরণ করার জন্য। পিএইচডি যখন শেষ পর্যায়ে তখন যোগ দিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। এর পর মালয়েশিয়া গেলেন আবার পিএইচডি করতে এবং সেখানে এত ভাল কাজ করলেন যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষক হিসেবে নি্যোগ দি্লো। এখন তিনি মালয়েশিয়ার আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালে তার অসংখ্য প্রকাশনা রয়েছে। একবার ভাবুনতো এটি একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের গল্প যেখানে একবিংশ শতাব্দীতেও সবার ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। শুধু তাই নয় এটি একটি মেয়ের গল্প যেখানে লক্ষ লক্ষ ছেলেরাই স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না। এটি এমন একটি মেয়ের গল্প যে কী না জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিল, সেই মানুষটির এমন অভাবনীয় সাফল্য কি অনুপ্রেরণার এক অনন্যসাধারণ উদাহরণ না? আমাদের দেশের অসংখ্য ছেলে-মেয়েরা যারা অল্পতেই নিজেদের আত্ববিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো অনুপ্রেরণার গল্প আর কি হতে পারে?

গল্প ৩: সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানার জয়শ্রী গ্রাম। যে গ্রামের অনেক বাড়িতে এই একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। যে গ্রামে তখনো কেউ স্বপ্ন দেখতে আর দেখাতে শেখেনি, যেখানে প্রাথমিকের পর অধিকাংশ শিশু পড়ালেখা ছেড়ে সংসারে হাল ধরতো সেই গ্রামের এক সাধারণ কৃষক বাবার সন্তান সিদ্দিকী। পাঁচ ভাই এক বোনের বিশাল সংসারে থেকে প্রাথমিকের পর তার পড়ালেখাও ছিল অনিশ্চিত। সেই সময়ে লজিং থেকে মাধ্যমিক পার হয়ে সিলেট এর এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। টিউশানি করে নিজের পড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে সহায়তা করতে হত। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে জীবিকার সন্ধানে ঢাকা আসেন। তখনো জানতেন না তার ভবিষ্যতে কি লিখা আছে। বন্ধুরা সবাই যখন বিসিএস অথবা বেসরকারি চাকরির সন্ধানে ব্যস্ত তখনি এক কোরিয়ান অধ্যাপকের অনুপ্রেরণায় সাউথ কোরিয়ার পুসান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে পাড়ি জমান। সেই থেকে তার স্বপ্ন যাত্রা শুরু। একটি অনুপ্রেরণাই পারে একজন মানুষকে তার ভেতরের সত্ত্বাকে খুঁজে পাওয়ার শক্তি জোগাতে। আমরা কি এই দেশের তরুণসমাজকে সেই অনুপ্রেরণাটুকু দিতে পারি না? পিএইচডিতে ভাল গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সাউথ কোরিয়ার পুসান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ব্রেইন কোরিয়া ২১’ নামের শ্রেষ্ঠ গবেষণা পদক অর্জন করার পাশাপাশি ঐ বছর পুসান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রের স্বীকৃতি পান। তারপর পোস্ট-ডক্টরাল রিসার্চ করেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফেলোশিপ নিয়ে গবেষক হিসেবে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলজিতে যোগদান করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য একটি পোর্টেবল ডিভাইস তৈরি করার স্বপ্নকে সত্যি করার প্রয়াস নিয়ে অর্জন করেন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল ফেলোশিপ। ঐ বছর অস্ট্রেলিয়ার সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শ’র অধিক সাবজেক্ট থেকে কয়েক হাজার বিজ্ঞানীর পাঠানো অসাধারণ সব রিসার্চ প্রপোজাল বাছাই করে অ্যানালাইটিক্যাল কেমিস্ট্রি থেকে মাত্র দুজন বিজ্ঞানী প্রায় চার লাখ ডলার এর এই ফেলোশিপ পান যার একজন হলেন ড. সিদ্দিকী। গবেষণায় নিবেদিত থাকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালের ৩১ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড অস্ট্রেলিয়ার সংসদ ভবনে এক নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান অনুদানপ্রাপ্ত কৃতি বিজ্ঞানীদের, সেখানে ছিলেন ড. সিদ্দিকী। ইতিমধ্যেই অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নালে তিনি তার আবিস্কার প্রকাশ করেছেন। তিনি কি কোনদিন ভেবেছিলেন যে সেই অজপাড়াগাঁয়ের সেই ছেলেটি বায়োলজিকাল সায়েন্সে বিশ্বের ২২তম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী) বিজ্ঞানী হতে পারবেন? এই উদাহরণটি কি আমাদের গ্রামের ছেলেটিকেও বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সাহস যোগাতে পারে না?

গল্প ৪। এই গল্পটি বলার আগে বিজ্ঞান জার্নাল সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত দুইটি বিজ্ঞান জার্নাল হলো নেচার এবং সায়েন্স। ছাত্রজীবনের মাস্টার্সের রিসার্চ করার সময় নেচার এবং সায়েন্স জার্নাল এর নাম প্রথম শুনি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এখনো এই নামগুলো অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীরাই জানে রিসার্চ করতে এসে। আমরা কি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এতটুকু জানাতে পারি না যে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত সব আবিস্কারগুলো ছাপা হয় নেচার এবং সায়েন্স জার্নালে। এই জার্নালগু্লোতে নতুন আবিষ্কার ছাপানোর জন্যে বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানীদের মাঝে অসম্ভব প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন থাকে নেচার অথবা সায়েন্স জার্নালে তার উদ্ভাবন প্রকাশ করা। বিশ্বের সকল বিশ্বাবিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং করার সময় কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতটি নেচার/সায়েন্স এ পাবলিকেশন হলো সেটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই সব বিজ্ঞান জার্নাল হল বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার প্রকাশের মাধ্যম এবং এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে।

জগতময় দাস, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র। পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হতে পারেননি কিন্তু রসায়ন বিভাগের কিংবদন্তি শিক্ষক প্রফেসর খলিলুর রহমান তার মেধা সম্পর্কে বুঝতে পেরে তাকে শিক্ষক হিসেবে নি্যোগ দিয়েছিলেন। কিছুদিন পর সাউথ কোরিয়ার পুসান বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পিএইচডি করে পাড়ি জমান বিশ্বের ১৮তম সেরা কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তার আবিষ্কার প্রকাশ করেছেন নেচার কেমিস্ট্রি জার্নালে যেটি রসায়নের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত জার্নাল। রসায়নের অসাধারণ আবিষ্কারগুলোই শুধু এই জার্নালে প্রকাশিত হয়। এটি ছাড়াও তার আরো প্রকাশনা আছে নেচার কমিউনিকেশান এবং আর কয়েকটি বিখ্যাত জার্নালে। যারা ক্লাসে প্রথম হতে পারেন না তারা যে পরবর্তিতে অনেক ভালো কিছু করতে পারবে না এটা কি বলা যায়? সব মেধাবীরাই কি ক্লাস এ প্রথম হয়?

আমার রসায়ন বিভাগের ছোট ভাই খালেদ পারভেজ রানা যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে খুব একটা পড়তে দেখিনি। তাকে কেউ ভালো ছাত্র হিসেবে জানতও না। ফলাফল যে খুব ভালো ছিল তাও না। কিন্তু স্নাতক করেই সাউথ কোরিয়াতে চলে গেল স্নাতকোত্তর করার জন্য। তারপর সেখান থেকে জার্মানির বিখ্যাত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউটে পিএইচডি করা অবস্থায় নেচার কমিনিউকেশান এ দুটি প্রকাশনাসহ আরো বিখ্যাত কয়েকটি জার্নালে তার আবিষ্কার প্রকাশ করেছে। যেটা পৃথিবীর অনেক তরুণ বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন। কিছুদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম মাহমুদ হাসান নামের একজন জেনেভা বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে একই সাথে অক্সফোর্ড এবং স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যা্লয়ে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ পেয়েছেন এবং পরে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যা্লয়ে যোগ দিয়েছেন যেটি কিউএস র‍্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের ৭ নম্বর এবং সাঙহাই র্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের ২ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়। ভাবতেই কত ভালো লাগছে আমাদের দেশের একজন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যা্লয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন কারণ তিনি এর চেয়ে ভা্লো প্রস্তাব পেয়েছেন, যেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যা্লয়ে পড়তে পারাটা সারা বিশ্বের তরুণদের স্বপ্ন। বাংলাদেশের তরুণরা পৃথিবীর বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যা্লয়গুলোতে নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিচ্ছে এটা আমাদের জন্য কত গর্বের এবং অনুপ্রেনরণার বিষয়।

এ রকম আরো অসংখ্য অনুপ্রেরণা আর সাফল্যের গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে চেষ্টা করলেই। প্রতিদিন সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে থাকে দুর্নীতি, খুন, হরতাল, রাজনীতি আর বিজ্ঞাপন যা দেখলেই মনে হয় আমরা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের জনগণ। কিন্তু আসলে কি তাই? এত কিছুর মাঝেও কি এই দেশের মানুষ এই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না? আমি বিশ্বাস করি ১৬ কোটি মানুষের দেশে যদি অসংখ্য সাফল্যের গল্প না থাকত তাহলে বাংলাদেশ এত তাড়াতাড়ি নেক্সট ইলেভেন কান্ট্রি আফটার ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন এবং সাউথ আফ্রিকা) এর তালিকায় আসতে পারত না। যেই তালিকা অনুযায়ী ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোসহ আরো ১১টি দেশের একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সংবাদপত্রগুলো কি পারে না এই অনুপ্রেরণার গল্পগুলো সবার কাছে পৌঁছে দিতে (অবশ্যই প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপে)? এর মাধ্যমে কত বড় পরিবর্তন সম্ভব সেটা ভাবতেই আমি শিহরিত হচ্ছি। যার সাফল্যের কথা সবাই জানবে তিনি আরো অনুপ্রাণিত হয়ে ভবিষ্যতে আরো বড় সাফল্য নিয়ে আসবেন আর যারা তার গল্প পড়বে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। যে তরুণটি আজকে মাদক পাচার, খুন আর চাঁদাবাজি করছে এই অনুপ্রেরণার গল্পই পারে তার ভেতরের সত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলে তাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে। ধীরে ধীরে তরুণদের মনোজগতে হয়ত কোনোদিন এতটাই পরিবর্তন আসবে যেদিন পত্রিকার পাতায় দুর্নীতি, খুন আর চাঁদাবাজির কথা ছাপানোর মত কোনো খবর আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। একটা বিপ্লব কি ঘটে যেতে পারে না? বিজ্ঞানে সাফল্য, খেলাতে সাফল্য, কৃষিতে সাফল্য, ব্যবসায় সাফল্য, শিল্প ও সাহিত্যে সাফল্য। যেদিন পত্রিকার পাতায় এত সাফল্য ছাপানোর মত যথেষ্ট পৃষ্ঠা থাকবে না, সেইদিন ঘুম থেকে উঠে চোখে আনন্দশ্রু নিয়ে পত্রিকা পড়ার অপেক্ষায় বসে আছি আমরা হাজা্রো তরুণ।

লেখক: আবু আলী ইবনে সিনা
পি এইচ ডি অধ্যয়নরত, কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া।
সহকারী অধ্যাপক (বর্তমানে শিক্ষাছুটিতে), বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, বাংলাদেশ
  ।

 

JnU/ Jubi/ 18-11

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media








© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com