,

সংযোগ ।। ম্যারিনা নাসরীন

তিন ফ্লোর জুড়ে বিশাল স্পেস। প্রতিটি ফ্লোরে মেঝে থেকে ছাদ অবধি থরে থরে সাজানো মালসামান। তবুও গিজগিজে মানুষের ভিড়ে সেসব তেমন চোখে পড়ছে না। তুলির জন্য একটা ড্রেস নেব ভেবেছিলাম কিন্তু চার চারটি কাউন্টারে অপেক্ষমান সারির লেজ দেখে সাহস হল না। বেরিয়ে আসছিলাম। তখনই ইমরানের দিকে চোখ পড়ল। ওর চোখ দুটো সাধারণের চেয়ে বড়। চোখের পাতা যেমন ভারী তেমনি পল্লবগুলো ঘন আর মিশমিশে কালো। একদিন বলেছিলাম তোমার চোখের পাতার ওজন বেশি এজন্য বেশিক্ষণ উপরে ধরে রাখতে পারোনা। ঝপ করে নেমে আসে। হুট করে সন্ধ্যা নামার মত। আমার কথা শুনে ও ঘর কাঁপিয়ে হোহো করে হেসে উঠেছিল। সেটাই বোধ হয় আমার সামনে অর প্রথম এবং শেষ হাসি ছিল। কিন্তু ও এই শপিং সেন্টারে কেন?
ইমরানের কাউন্টারে ক্রেতার দীর্ঘ কিউ। প্রত্যেকের ঝুড়িতে নানাপদের জিনিস। সেসব জিনিসের ট্যাগ স্ক্যান করে কম্পিউটারে হিসেব করছে আর প্রিন্টারে রিসিপ্ট কপি বের করে ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। ওর হাত, চোখ আর কম্পিউটারের স্ক্রিন, এই তিনের মধ্যে অসম্ভব দ্রুততার সাথে সংযোগ ঘটছে।
কাউন্টারে ভীড় পাতলা হতে এগিয়ে গিয়ে হেসে বললাম ইমরান, চিনতে পারছ?
ওর চোখ শীতল, উত্তেজনাহীন। মনটা একটু দমে গেল । ভুল করছি না তো? সরি, আমি বোধ হয় ভুল করে ফেলেছি।
ইমরান পাশের সহকর্মীদের দিকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল। দ্বিধান্বিত ভাবে এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, এখানে ফোন নম্বর দিয়ে যান আমি পরে যোগাযোগ করব।
কিন্তু তুমি প্যারিস থেকে কবে এসেছ? এখানে কেন?
ইমরানের চোখের পাতা ওঠানামা শুরু করেছে। ওর বিব্রত ভাব দেখে আমি বেরিয়ে এলাম।
গতবছর এপ্রিলে প্যারিস টেক্স ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে আমাদের কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছিল। অফিস থেকে ডিরেক্টর প্ল্যানিং হামিদ স্যার এবং আমাকে প্যারিসে যাবার জন্য সিলেক্ট করা হল। একজন পুরুষের সাথে আমি একা বিদেশে যাব? মা তো আকাশ থেকে পড়ল। কিন্তু প্যারিস যাবার সুযোগ হাতছাড়া করব?মা শেষ পর্যন্ত মা হার মানলো। তবে শর্ত একটাই,হোটেলে থাকতে পারব না । দূর সম্পর্কের এক খালার বাসায় থাকতে হবে। অর্থাৎ সেখানেও আমার উপর মা একটি চোখ লাগিয়ে রাখতে চায়। মা-ই তাঁকে খুঁজে বের করেছে। যেদিন রওনা হব তার আগের দিন হামিদ স্যার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সুতরাং কোম্পানির প্যাভিলিয়ন সামলাতে আমি একাই গেলাম। খালার বাসা প্যারিস ফিফটিনে। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে পার্মানেন্ট ফেয়ার গ্রাউন্ড।
প্রথমদিন খালা তার গাড়ি করে মেলা প্রাঙ্গনে পৌঁছে দিলেন। কিন্তু ফেরার পথে মেট্রো দিয়ে ফিরতে হবে। কিভাবে ফিরতে হবে বুঝিয়ে বললেল। খুব সহজ মনে হয়েছিল। যখন ফিরব তখন দেখলাম এত সহজ নয়। দুএকজন পথচারীর কাছে মেট্রোর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম তারা আমার ইংরেজী বুঝেন না আমি তাদের ফ্রেঞ্চ ভাষা বুঝিনা। খালার ফোন সুইসড অফ।
উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটছিলাম । তখনই ইমরানকে দেখেছিলাম খোলা চত্তরে ফল বিক্রি করছে। চেহারা দেখে মনে হলো ভারতীয় বা পাকিস্তানী হবে। সাহায্য পাব এই আশায় তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ইংরেজিতে বললাম, আর ইউ ইন্ডিয়ান?
যুবকের বয়স আমার মত বা আমার থেকে সামান্য বেশি হতে পারে। চোখের পল্লব ঝপ করে পড়ছে আর উঠছে। কিন্তু চেহারাটা প্যারিসের আকাশের মতই বিষন্ন। খরখরে গলায় পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমি বংলাদেশী।
খুশিতে কিছুক্ষণের জন্য আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে ছেলেটি আমার অপরিচিত। ওর দু হাত আমার হাতে টেনে এমন কিছু করলাম যে তাতে সে হতচকিত হয়ে গেল। ওর চোখের পল্লব ফেলার গতি বেড়ে গেল। হাত ছেড়ে বলেছিলাম, আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। প্যারিস ফিফটিনে কিভাবে যাব বলতে পারবেন?
একটু অপেক্ষা করেন। এগুলো বিক্রি হলে পৌঁছে দেব। আমিও ওদিকে থাকি।
পাশে দাঁড়িয়ে ওর ফল বিক্রি দেখছিলাম। টুকটাক প্রশ্নে জেনে নিলাম, কুমিল্লার ছেলে। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ভারতীয় একটি হোটেলে কাজ করে। এরপর ফলের ঝুড়ি নিয়ে এখানে বসে।
খুব অদ্ভুত লাগলো। আমি ছেলেটিকে প্রশ্ন করলে খুব অল্প কথায় তার জবাব দিচ্ছে কিন্তু আমাকে সে একবারের জন্য কোন প্রশ্ন করেনি। আমি কে, কোথায় এসেছি, কেন এসেছি কিছুই যেন ওর জানার নেই। শুনেছিলাম বিদেশে যারা থাকে তারা দেশের কাউকে পেলে আনন্দে অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু ইমরান নামের এই যুবকের সাথে সেটা মেলাতে পারছি না।
সব ফল বিক্রি হতে রাত হল। সেদিন ইমরান আর আমি বেশ খানিকটা পথ একসাথে হেঁটে মেট্রো ষ্টেশনের দিকে গিয়েছিলাম। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি জায়গা, মানুষটাও অপরিচিত অথচ আলো ঝলমলে সে পথে হাঁটতে একটুও ভয় বা অস্বস্তি লাগেনি। অস্বস্তি যেটা ছিল সেটা ইমরানের নীরবতা। আজো তার নিরবতা কাটলো না।
ঈদের জ্যামে ঢাকা শহর স্থবির। বাসায় ফিরতে রাত নটা বেজে গেল। মায়ের মুখ গম্ভীর। আলামত খারাপ। নিশ্চয় বাবার সাথে আবার লেগেছে। আমার অনুমান সঠিক নয়। বাবার মামাত বোন সেতারা ফুপু তার মেয়ে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। মায়ের মুড নষ্ট হবার কারণ এটাই। সেতারা ফুপু দরিদ্র। ঈদের আগে আগে তাঁকে আমাদের বাড়ীতে বেশি দেখা যায়। যাকাতের টাকা মূল উদ্দেশ্য । তবে বলেন, ভাইজানকে দেখতে এলাম। মা ব্যবসায়ীর মেয়ে । কোন কালে তার দাদা বা পরদাদা এমএলএ ছিলেন। মায়ের সেই দাপট এখনো শেষ হয়নি। আমার বাবা কৃষকের ছেলে। এই খোঁটা শুনতে শুনতে তাঁর একটা জীবন পার হয়ে যাচ্ছে। বাবার পক্ষের আত্মীয় স্বজন আমাদের বাড়ীতে কোনকালেই সমাদৃত নয়। যদিও মায়ের আত্মীয় স্বজনের জন্য এ বাড়ির দরজা সদা উন্মুক্ত। তুলি মাঝে মাঝে মাকে বলে, আচ্ছা মা, বাবা কৃষকের ছেলে হয়েও সরকারের বড় অফিসার হতে পেরেছে কিন্তু তুমি তো তার গৃহিণীই রয়ে গেলে!
তুই মেয়ে হয়ে এভাবে বলছিস? বলবিই তো, কোন বংশ দেখতে হবে না? নিচু জাত কখনো ভদ্র হতে পারে না।
আমি নিচু জাতেরই থাকতে চাই মা, তোমার মত উঁচু হবার শখ নেই।
তুলিটা বড় ঠোঁট কাটা। কিছুই পরোয়া করে না। মা ক্ষেপে আগুন হয়ে থাকে। কিন্তু সম্ভবত তুলিকে মনে মনে ভয়ও পায়। যত রাগ পড়ে গিয়ে বেচারা বাবার উপর।
মায়ের কারণে আপন চাচা ফুপুরাও আজকাল তেমন কেউ আমাদের বাড়ীতে আসেন না। বিষয়টা বাবাকে খুব পীড়া দেয় কিন্তু বাবাও আমার মত। কিছু বলতে পারে না। তুলি কখনো কখনো বলে,
বাবা কি দেখে মাকে বিয়ে করেছিল বলতো আপু? নিশ্চয় নানার টাকা দেখে । এখন বুঝুক কেমন মজা।
ওর কথা বলার ভঙ্গীতে আমি হেসে ফেলি। কিন্তু কথাটার অর্থ আসলে অনেক গভীর। অসম কোন সম্পর্কই বোধ হয় সুন্দর হয় না।
আমি বারবার মোবাইল চেক করছি। ইমরানের ফোন নম্বর আমার কাছে নেই। কেন যেন মনে হলো আমাকে ও ফোন করবে না। কিন্তু ঠিক এগারোটায় ইমরান ফোন করল। কণ্ঠে সেই দ্বিধা। কি সম্বোধন করবে বুঝতে পারছে না। আমি বললাম, ইমরান তুমি ভুলে গিয়েছ আমরা দুজন দুজনকে তুমি বলতাম এবং আমার নাম রেবতী।
আমার মনে আছে রেবতী।
তাহলে হেজিটেড করছ কেন? আচ্ছা বাদ দাও প্যারিস থেকে কবে এলে, কেনইবা এলে?
সে তো অনেক কথা। আর একদিন বলি?
আচ্ছা চল, তোমার সাথে বরং কোথাও বসি। অথবা আমার অফিসে চলে এস।
অফিসে আসব না। অন্য কোথাও বসা যায়।
শাহবাগ?
উহু, খুব ভিড় থাকে।
আচ্ছা তাহলে ধানমন্ডি ওয়েস্টার্ন গ্রিলে আসতে পারবে?
আচ্ছা।
কাল সময় পাবে?
নাহ, ঈদের পর।
ফোন কেটে দিয়েছে। এই ওর আর একটা রোগ। কোন কিছু না বলেই ফোন কেটে দেয়।
প্যারিসে ওই পাঁচদিনে আমরা বেশ কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। আমরা বলতে আমি । ইমরান বরাবরই নিজেকে একটা অদৃশ্য বৃত্তে বন্দী করে রেখেছিল। সেই বৃত্তের পরিধি আমি কখনো ভাংতে পারিনি। ভোর সাতটায় ও মেট্রো স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। এরপর আমাকে মেলায় পৌঁছে দিয়ে হোটেলে চলে যেত। বললাম কদিনের জন্য আমার গাইড হয়ে যাও। ও মুখে কিছু বলেনি তবে প্রতিদিন মেলা থেকে বেরিয়ে দেখতাম বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর একেকদিন একেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে রাত।
ল্যুভর মিউজিয়ামে বিভিন্ন ভঙ্গিমার নারী-পুরুষের যুগল ছবি, নগ্ন ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে বেশ লজ্জা পেয়েছিলাম। ও পাশে ছিল বলেই হয়ত। ইমরান একজন পাকা কমার্শিয়াল গাইডের মতই সব ছবি ভাস্কর্যের ইতিহাস বলে যাচ্ছিল। খুব অবাক লাগলো এত জানে কিভাবে? জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কতদূর পড়ালেখা করেছ? খুব নিরসভাবে বলল, বেশিদূর নয়। ও কোথায় পড়েছে বা কি পড়েছে সেসব প্রশ্ন করলে সবসময় এড়িয়ে গিয়েছে।
পাঁচদিনে ওর ব্যক্তিগত তেমন কিছুই আমি জানতে পারলাম না । আর আমার বিষয়ে নামটি ছাড়া কিছুই জানত না। জানার আগ্রহও দেখাল না। ওর এই নিতান্ত উদাসীনতাই হয়ত আমাকে ওর দিকে প্রবলভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
দেশে ফেরার আগের রাতে আমরা আইফেল টাওয়ারে গেলাম। প্রচন্ড শীতের সাথে ঠাণ্ডা হাওয়া আমার ওভারকোট ভেদ করে সুচের মত বিঁধছিল। আমরা টিকেটের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম । কি মনে করে ইমরান ওর হাতের মোজা খুলে আমার হাতে পরিয়ে দিল। খুব কাছে ঘেঁষে এসে বলল কাছাকাছি থাকলে শীত কম লাগবে। আমি ওর বুকের মধ্যে সেঁটে গেলাম। ওর বুকের স্পন্দন আমাকে স্পর্শ করে যাচ্ছিল। সামনেই দুই কাপল জড়াজড়ি করে এগোচ্ছিল। একবার ভাবলাম ইমরান ওভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরুক। পরক্ষণে মনে হল ছি!ছি! এসব কি ভাবছি! একটু দূরে সরে এলাম।
আইফেল টাওয়ার থেকে নেমে ও বলল, চল তোমাকে মজার একটা জিনিস দেখাব। শেইন নদীর তীর ধরে হাটতে আমরা একটা অদ্ভুত ব্রিজের ওপর এলাম। রেলিঙ্গে রংবেরঙের লক্ষ লক্ষ তালা ঝুলছে সে ব্রিজে। ইমরান বলল, প্রেমিক প্রেমিকারা এখানে তালা লক করে নদীর বুকে চাবি ছুড়ে ফেলে। ভাবে এতে তাদের ভালবাসা আজীবনের জন্য লক হয়ে গেল।
আমি বললাম তুমি কোন চাবি ফেলেছ?
ও তির্যক ভাবে আমার দিকে তাকালো। আলো ছায়ার মধ্যেও বুঝতে পেরেছিলাম সেই চোখে মুগ্ধতা বলে কিছু নেই।
কুয়াশা মুড়ানো রাত ছিল । স্ত্রিট লাইট আর চাঁদের আলোয় শহরটিকে রহস্যময় লাগছিল। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। ওর কোটের পকেটে দুই হাত। মাথায় ওয়েস্টার্ন ক্যাপ। হাঁটার ভঙ্গীতে ভীষণ অন্যমনস্ক। ও কখনো নিজে থেকে প্রশ্ন করে না। আমি বকর বকর করি। কোন প্রশ্ন থাকলে ও জবাব দেয়। কিন্তু প্রত্যেকটা বিষয় এমনভাবে বুঝায় যেন আমাকে অঙ্কের জটিল সুত্র বুঝাচ্ছে।
দেশে ফিরে ওকে ফোন করেছিলাম। কোনদিন রিসিভ করেনি। কল ব্যাকও করেনি। ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটস এপ কোথাও ও নেই। বলেছিল জরুরি কিছু কাজ ছাড়া ইন্টারনেট ইউজ করে না। আমি হেসে বলেছিলাম যাক, এ যুগে তোমার মত মানুষও তাহলে রয়েছে? খুব অন্যমনস্ক হয়ে বলেছিল। মানুষ? কি জানি।
তবুও প্রায় এই এক বছর প্রায় প্রতিদিনই ফেসবুকে ওর নাম লিখে সার্চ দিয়েছি। কিন্তু ও হতে পারে এমন কোন আইডির সন্ধান পাইনি। কেন ওকে খুঁজেছি সেটা আমি ভেতরে ভেতরে টের পাচ্ছিলাম।
বন্ধুরা বলে বেগুনীতে আমাকে দুর্দান্ত সুন্দরী লাগে। শুধুমাত্র ইমরানের সাথে দেখা হবে তাই বেগুনি রঙের একটা শাড়ি কিনে ফেললাম। তখনো পাঁচটা বাজতে মিনিট পনের বাকী। দরজার দিকে মুখ করে কোণের একটি টেবিলে বসলাম। এত আগে আসার জন্য খুব মেজাজ খারাপ লাগছিল। আর সাজটা মনে হল বেশি বেশি।
ঠিক পাঁচটায় ইমরান এল। মেরুন রঙের হাফ হাতের শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরেছে। ওর দিক থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। প্যারিসে ওকে সবসময় ওভার কোটে দেখেছি। সেদিন শপিং সেন্টারে ওদের নির্দিষ্ট ড্রেসে ছিল। শার্টের উপরের একটা বোতাম খোলা। গলার কাছটিতে কলারটি যেখানে থেমেছে সেই জায়গাটিতে অদ্ভুত পুরুষালী একটা সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একটু ছুঁয়ে দেখি।
দুইঘন্টা একসাথে ছিলাম আর প্রায় পুরো সময়টা আমিই কথা বলেছিলাম। কিন্তু প্যারিস থেকে এসে শো রুমে কাজ নিল কেন কিছু পরিস্কার করে বলল না। শুধু বলল মায়ের শরীর ভাল না।
ইমরানের সাথে কথা বলা আমার জন্য নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভেতরে ভেতরে খুব টেনশনও লাগতো। শো রুমের একজন মামুলী হিসাব রক্ষকের সাথে এভাবে মেলামেশা মোটেই মানায় না। নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি। কেন আমিই শুধু যোগাযোগ করব? তবুও দুর্বার কোন আকর্ষণে আমি সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম জানিনা। অথচ ইমরান তার আগের জায়গায় অটল ছিল।
একদিন লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম,
ইমরান, আমি কেন তোমার সাথে এত কথা বলি, দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে থাকি তুমি কিছু বুঝতে পার না ?
বুঝি ।
তাহলে?
শোনা জরুরি?
ওকে, বলতে হবে না। তোমার সাথে আর কখনই আমি যোগাযোগ করব না।
প্রচন্ড অপমান আর অভিমানে আমার দুচোখ ভেসে যাচ্ছিল। কি পেয়েছে? আমি কম কিছু নই। দোকানের সামান্য কর্মী সে। আর আমি একটা গার্মেন্টস কোম্পানির জুনিয়র অফিসার। আমার সামনে ব্রাইট ফিউচার অপেক্ষা করছে।
ফোন সুইসড অফ করে রাখলাম। পরদিন ভোরে ওপেন করতে ইমরানের মেসেজ, ‘প্লিজ কাম টু কফি ওয়ার্ল্ড এট ফাইভ পিএম টুডে।’
ঠিক করলাম যাবই না। দুপুর পর্যন্ত নিশ্চিত ছিলাম যে, যাচ্ছি না। ওকে একটু বুঝানো দরকার আমার এত দায় নেই। কিন্তু দুপুর ঝুলে যাবার সাথে সাথে আমার মনও ওর দিকেই ঝুলতে শুরু করল। এবং ঠিক বিকেল পাঁচটায় আমি সেখানে হাজির হলাম। ইমরান আমার আগে এসেছে। গম্ভির থাকার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু বুকের মধ্যে অভিমানের বাস্প এমন প্রেসার সৃষ্টি করছিল যে কোন সময় চোখ গলে পানি পড়তে শুরু করল। ওর হাত টেবিলে ফেলে রাখা আমার হাতটি স্পর্শ করল । খুব অসহায়ের মত বলল,
প্লিজ রেবতী কেঁদোনা। আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে। তুমি সবকিছু যত সহজে ভাবতে পার, প্রকাশ করতে পার আমি তত সহজে পারিনা।
ইমরান এভাবে কখনো কথা বলেনি। আমি ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকি। চোখদুটো লাল টকটকে।
রেবতী, তুমি আমাকে যেভাবে ভাব ঠিক একইভাবে আমিও তোমাকে ভাবি। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার যোগ্যতা বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নেই।
কেন নেই?
কারণ আমি আমার মাকে আর কাঁদাতে চাই না।
এরমধ্যে মাকে কাদানোর কথা আসছে কেন?
তুমি জানো? আমি আমার বড় ভাইয়ের খোঁজে প্যারিস গিয়েছিলাম। ওকে একবারের জন্য বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম।
তোমার ভাই প্যারিসে থাকেন? বলনি তো?
আমার কোন কথাই তোমাকে আমি বলিনি। কাউকে বলিনা।
আজ অন্তত বল।
আমরা দুই ভাই। বড় ভাই ঢাকা ভার্সিটি থেকে পাশ করে জিদ ধরল বিদেশে যাবে। এদেশে টাকা নেই। আমাদের যে জমি ছিল তার অর্ধেকের বেশি বিক্রি করে বাবা ভাইকে প্যারিসে পাঠিয়ে দিলেন। সে আট বছর আগের কথা। প্রথম দুই বছর আমাদের সাথে যোগাযোগ ছিল। একবার দেশে এসে ঘুরেও গিয়েছিল কিন্তু পাঁচ বছর ধরে তার কোন খবর পাচ্ছিলামনা। তার চিন্তায় আমার বাবা মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেকদিন পর খোঁজ পেলাম সেদেশের মেয়েকে আমার ভাই বিয়ে করেছে এবং খুব ভাল আছে। অনেক টাকার মালিক। আমি ফোন নম্বর, মেইল এড্রেস জোগাড় করলাম। প্রথম দুই একবার ফোনে খুব তাড়াহুড়ো করে কথা সারল । কিন্তু পরে আর ফোন রিসিভ করেনি। মেইলের পরে মেইল পাঠিয়েছি কোন জবাব নেই।
আমি হতবাক হয়ে ওর কথা শুনছি। কিভাবে সম্ভব?জানো, অামি বাবাকে এসব কোন কথা বলতে পারছিলাম না । ভেতরে ভেতরে খুব জিদ চেপে বসল । বুয়েট থেকে আমি তখন ট্রিপল-ই’তে কেবল পাশ করেছি । রেজাল্ট বরাবরই ভাল ছিল। সবগুলো সেমিস্টার মিলে তৃতীয় হয়েছিলাম । অনেক দৌড় ঝাপ করে একটা স্টুডেন্ট ভিসা জোগাড় করে প্যারিসে গেলাম। তারজন্য ঘরটুকু ছাড়া বাকি জমি বিক্রি করতে হল।
ভাইকে পেয়েছিলে?
হ্যাঁ । পেয়েছিলাম । যার মাধ্যমে আমি প্যারিসে গিয়েছিলাম তিনি একদিন ভাইয়ের অফিসে নিয়ে গেলেন। ভাই,প্রথমে আমাকে চিনতেই পারছিল না। সাত বছরে আমার চেহারায় তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাবা মায়ের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাবা মা-কে তুই দেখিস। আমার পক্ষে আর দেশে ফেরা সম্ভব নয়।
কেন?
আমার স্ত্রীর সাথে সেই শর্তে বিয়ে হয়েছে।
মানে ?
ওর বিয়ের আগে আমাদের এই এগ্রিমেন্ট হয়েছে আমি কখনই দেশে ফিরে যেতে পারব না। ও চায় না দেশের সাথে আমার কোন যোগাযোগ থাকুক।
প্রতিউত্তর করতে ঘৃণা লাগছিল। কিছু না বলে বেরিয়ে এলাম। এরপর প্রায় একবছর থেকে অনেকবার চেষ্টা করেছি। বাবা মায়ের সাথে কথা বলাতে চেয়েছি । কিন্তু সে কথাও বলবে না । তাতে নাকি মায়া বাড়বে । আসলে ও আমাদের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ইমরান । সত্যি এসব ঘটেছে?
তুমি আমাকে বিশ্বাস কর?
হু।
তাহলে বিশ্বাস কর এর একটি বাক্য মিথ্যা নয়। আমাকে কোনদিন ওর বাড়ীতে নেয়নি। গেলে হয়ত তাঁর স্ত্রী জেনে ফেলবে আমাদের সাথে যোগাযোগ আছে । ভেবে দেখ, যে শহরে ভাইয়ের বাড়ি আছে, হোটেলে শেয়ার আছে সেখানে আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফল বিক্রি করেছি।
তুমি দেশে এলে কবে?
ওখানে থাকতে খুব ঘৃণা লাগছিল । তবুও এতদিন ছিলাম যাতে কিছু টাকা রোজগার করে বাবার হারানো সমপদ ফিরিয়ে আনতে পারি। তুমি আসার মাস খানেক পরেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন । দেশে এলাম। আমি আসার পর মাত্র সাতদিন বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর একটাই আক্ষেপ ছিল বড়ছেলেকে দেখে মরতে পারলেন না।
ইমরান মাথা নিচু করে । আমি একটা হাত ওর হাতের উপর রাখি। ও বুভুক্ষের মত সেই হাতটি জড়িয়ে ধরে। ওর মধ্যে যে তীব্র কষ্ট হচ্ছে সেটা ধীরে ধীরে আমার মনে সংক্রামিত হতে থাকে।
সেদিনের পর থেকে ইমরান আমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে এল। কিন্তু যতটা আমি চাচ্ছিলাম ততটা নয়। একদিন ওকে বললাম তুমি তো ইঞ্জিনিয়ার এই চাকরি কেন করছ?
ও সাবলীল ভাবে বলল, কারণ আমি বড় ভাই হতে চাই না।
তুমি ভাল চাকরি করলে, বেশি বেতন পেলেই কি বড় ভাইয়ের মত হয়ে যাবে? আমাদের কোম্পানিতে কথা বলব?
না। আমি বেশ আছি ।
না বেশ নেই। একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তুমি এই চাকরি কেন করতে যাবে? স্যালারিও তো বেশি নয়।
আমার উত্তেজনা দেখে ও বেশ কিছুটা সময় আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর স্পষ্ট করে বলল, রেবতী তুমি কি জান কেন আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি না?
কেন?
কারণ আমি জানি একদিন এই প্রশ্ন আসবেই যে আমি দোকানের কর্মচারি।
বাহ! তুমি তো আসলেই সেটা নও।
আমার মা এখন প্রতিদিন আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে এমন হয়েছে এখন চোখে ঠিকমত দেখে না। আমার মা’কে আমি আমার কাছে রেখেছি। আমি যে আয় করি ছেলে আর মায়ের সুন্দর চলে যায়। এর থেকে আর কিছু বেশি আমার দরকার নেই। আমি কখনই তোমার কর্পোরেটে যাব না।
বিয়ে করবে না?
না।
কিন্তু আমি তো চাই তোমার সাথে আমার বিয়ে হোক।
আমি চাই না।
কেন চাও না?
কারণ তোমার সাথে আমার বিয়ে তোমাদের বাড়ির কেউ মেনে নেবে না। তাছাড়া আমি কোন এগ্রিমেন্টে যেতে চাই না।
মানে তুমি ভাবছ আমিও তোমাকে তোমার মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখব?
না সেটা ভাবছি না। তবে তোমার বাবা মা কিন্তু আমাকে পছন্দ করবেন না।
পছন্দ করবেন কিনা সেটা তো আমি বলব, তাই না?
আমি আমার পুরো সময়টাকে আমার মাকে দিতে চাই।
আর আমার জন্য কোন সময় নেই?
কখন যে দুচোখ ভরে এসেছে আমি টের পাইনি। ইমরান খুব অবাক হয়ে চেয়ে আছে। আমি ওকে রেখে দ্রুত বের হয়ে আসি।
সেদিনের পর আমরা আরও অনেকবার দেখা করেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ আর তুলিনি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ইমরানের মনোভাবের পরিবর্তন হবেই। আমি ভাবছিলাম বাবা মাকে কিভাবে সামলাব?
ওকে অনেকদিন থেকে বাসায় আসতে বলছিলাম কিন্তু কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। আমি একদিন খুব জিদ করে বললাম, আজ তোমাকে আমাদের বাসায় যেতেই হবে।
ও বলল, সত্যি যেতেই হবে?
সত্যি।
ভেবে দেখ, এমন হতে পারে পরে পস্তাবে।
পস্তালে পস্তাব। চল ।
ঠিক আছে যাব। তবে আজ নয়, পরশু সন্ধায় আসব।
ইমরান এসেছিল । তুলিকে আগেই ওর কথা বলেছি। তুলি দেখে ভীষণ খুশি, এই আপু, ইমরান ভাই তো ড্যাম স্মার্ট। ওয়েস্টার্ন ছবিতে নির্দ্বিধায় চালিয়ে দেওয়া যাবে। গুড চয়েস।
ও ইমরানের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করল। মা কয়েকদিন যাবত আমার মধ্যে পরিবর্তন খেয়াল করেছে। দুই একবার জানতেও চেয়েছে, কিরে এত কথা বলিস কার সাথে?
কার সাথে বলব?
দেখ মেয়ে, আমি সব বুঝি। তবে মনে রেখ নিচু শ্রেণীর ছেলে হলে কিন্তু আমি বিয়ে দেব না। আমি চাইনা আমার মত মেয়েও জ্বলে মরুক।
ইমরান যেহেতু ইঞ্জিনিয়ার মাকে সামলাতে পারব হয়ত। এর মধ্যে ইমরানকে নিশ্চয় কোন কোম্পানিতে জয়েন করাতে পারব। কাছের দুই একজন সিনিয়রের সাথে কথা বলেও রেখেছিলাম।
তুলির খুনসুটির মধ্যে ড্রইং রুমে মা এসে হাজির হলো। আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম মা, ও ইমরান । আমার বন্ধু।
ও তাই নাকি? বাহ, খুব ভাল। কি করছ বাবা? চাকরী নাকি বিজনেস?
আমি তড়িঘড়ি করে বললাম ও ইঞ্জিনিয়ার মা।
ইমরান বলল, আমি ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম খালাম্মা কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং করি না। একটা শপিং সেন্টারের একাউন্টেন্ট।
মায়ের মুখে মনে হল কেউ ছাই ফেলে দিয়েছে। আচ্ছা তোমরা বস, আসছি এই জাতীয়কথা বলে মা ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই তার চিতকার ভেসে এল,
তুলি এদিকে এস। ওঘরে এত হাহা হি হি কিসের? এত নিম্ন রুচি তোমাদের? ছি।
আমি ইমরানের দিকে চেয়েছিলাম । ওর মুখের অভিব্যক্তি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বসে ঠোঁটে অদ্ভুত রকমের হাসি টেনে বলল,
রেবতী, তুমি জানতে এমনটি হবে । কিন্তু বুঝলে না। আমাকেও না, নিজেকেও না।
ও ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। আমি কিছুই বললাম না।
ইদানিং অবসর সময়ে আমি একটা কাজই করি। ওর ফোন নম্বরে প্রেস করে মোবাইল ফোন কানে চেপে রাখি। মিষ্টি একটা কন্ঠ এক নাগাড়ে বলতে থাকে, আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না……।
আমি ফোন বন্ধ করি না ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com