,

আমিনুল ইসলাম সেলিম’র একগুচ্ছ কবিতা

রহিমাদের ঈদ

ঊনুনে জ্বলছে হাঁড়ি, চাল নেই, কয়েকটি খুদের কণা
ছেড়ে দিয়ে গাইছে বিষণ্ন গীত রহিমা খাতুন। মেয়েটা
কাঁদছে খুব, ওর নাকি ঈদ আছে, নতুন পোষাক চাই।
পোষাক কি কাপড়েই নাম? রহিমা কাপড় বোঝে শুধু।
অলক্ষী মেয়েটা শুধু ঈদ বোঝে, অভাব বোঝে না ছাই!
স্বামীর মৃত্যুর পরে যতোদিন ধরে এই নদীপাড়ে বাস,
ততোদিন রহিমার ঈদ কোনো বিশেষ আনন্দ নয়। তবু-
ছেলেটা গিয়েছে রোদে পুড়াতে নিজেেই দেহ-নুন। যদি-
কিছুটা বিহিত হয়! কিছুটা উপায় যদি করা যায়, বোনের
চোখের জল যদি মুছে দেয়া যায়? ক্ষয় করে পাঁজরের হাড়!
ছেলেটা ফিরলে মা’র চোখজুড়ে শ্রাবণের বিদীর্ণ আকাশ
নিরুপায় মা কাটে ত্রাণের শাড়ি, দর্জিঘরে মেয়েকে পাঠায়
রহিমার মেয়েটোর ঈদ আসে, পোষাকের রঙিন ঝলকে
অথচ রহিমা রাঁধে খুদজাউ, ছেলেটা টোকাই পথে পথে!

গুপ্তমৃত্যু

কতোদিন নিজের দিকে ফেরা হয় না
হাওয়ার ভেতরে কতোদিন কোনো গুঞ্জন নেই স্বপ্নের
খুচরো দুঃখগুলো মার্বেলের মতো নাড়াচাড়া করা হয় না কতোদিন
নিজের মুখ আমি কতোদিন দেখতে পাইনি ব্যক্তিগত চাঁদের আলোয়
সেই কবে থেকে!
একদিন জোনাকরোদে তোমার চকচকে আয়না-মুখ দেখে
সেই যে মজেছি ভবের চতুরঙ্গ হাটে
সেই থেকে নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়েছি
অথচ ফিরেই দেখি ভেতরে আমার নামে খুদাই-কবর
জ্যান্ত অবয়ব নিয়ে দুঃখগুলো দিচ্ছে পাহারা
আমার মৃত্যুর কথা আমিই জানি না!

পাহাড়-কীর্ত্তন

এক.
অসংখ্য পাহাড় ভাঁজ করে রাখার কথা ছিলো বুকের তবকে
যেনো প্রবল বিপদে মেলে ধরতে পারি ছাতার মতো
সারিবদ্ধভাবে নোঙর করার কথা ছিলো জাহাজের মতো
যেনো নূহের বন্যায়ও আমরা আশ্রয় খুঁজে পাই
অথচ পাহাড় আমাদের শত্রু
তার উচ্চতা আমাদের ঈর্ষান্বিত করে
মানুষকে ডিঙিয়ে কেনো মাটির পাহাড় এতো উঁচু হবে?
আমরা তাই দল বেঁধে পাহাড়ের বুক থেকে মাথা থেকে
সমস্ত শরীর থেকে কেটে ফেলি মাটির জৌলুশ
ফালি করে পাঁজরের হাড়, কুড়ালের কোপে কাটি সমস্ত সবুজ
পাহাড়ের রক্ত-মাংশ বেচে আমরা তুলে আনি জটিল মুনাফা!

দুই.
প্রতিশোধ গ্রহণের কায়দা শিখে গেছো বলে আমরা ভীত নই
আমাদের অস্ত্র আরও ধারালো ও মজবুত হবে
ভাড়া করা দস্যুদল হবে আরও বিপুল সাহসী
তোমার সমস্ত হাড় আর অস্থি-মজ্জা গুঁড়ো করে দেবো
তোমার মাংশ কেটে বিক্রি দেবো দূরে, গোপনীয় হাটে
ঘাড় আর মাথা-মুণ্ডু কোথাও পাবে না কেউ খুঁজে
নিশ্চিহ্ন করে দেবো তোমার সমস্ত বৈভব
মানুষকে মেরে তুমি মাথা উঁচু করো?
পাহাড়, তোমাকে অভিশাপ
পাহাড়, তোমার ক্ষমা নেই
তোমার মৃত্যু হবে মানুষের হাতে!

তিন.
লাশেরও কি দল হয়? গোত্রভেদে ভিন্ন করা খাটে?
সিল মেরে কোনোটা বৈধ আর কোনো অবৈধ করা চলে?
দামের প্রভেদ আসে? খরচের গুঁজামিলে খতিয়ান হয়?
অনেক প্রশ্ন আছে, কে দেবে জবাব?
মুসলমান, হিন্দু নাকি বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান, কার লাশ?
পাহাড়ি না উপজাতি? নাকি আদিবাসী তার নাম?
সাধারণ লোক নাকি নামজাদা? নারী না পুরুষ?
অনেক প্রশ্ন আছে, কে দেবে জবাব?
সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছি ছাড়িয়ে পাহাড়
অথচ এখনো লাশ গোত্রে আর ধর্মে বিভাজিত
রক্তের সনদ নিয়ে লাশগুলো মানুষের নয়?
অনেক প্রশ্ন আছে, কে দেবে জবাব?

শিরোনামহীন

রাত্রির ঘামে ভেসে যায় স্বপ্নেরা
স্বপ্নের খামে লিখিত মৌন চিঠি
চিঠির শরীরে বেদনাগহীন ক্ষত
ক্ষতের শিয়রে কান্নার শ্লেটলিপি
লিপির হরফে বিরহের সোনাদানা
মানুষের এতো কষ্ট কেনো রে মনা?

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com