,

হতচ্ছাড়ার পঞ্চপ্রলাপ

হতচ্ছাড়ার পঞ্চপ্রলাপ ( গল্প )

(ক)

হতচ্ছাড়াটাকে সবাই ভালোবাসতো ,ভালো চাইতো , আজো হয়তো ভালোবাসে , ভালো চায় । কেমন যেনো দূরে চলে যাচ্ছে সবাই । শেষমেশ চলেই গেলো । ঠিক চলেই যায় নি । তাকেই চলে আসতে হয়েছে । চারপাশে সবুজ , মাঝে একটা বাউন্ডারী করা দেয়াল – কত মজার মজার সময়গুলো তাদের সাথে । গান না গাওয়া ছেলেটাও “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে…” গেয়েছিল । পূব দিকের দেয়ালে আর দক্ষিন দিকের দেয়ালে বসা হতো । এমন আরো কতো কী প্রগাঢ়তাময় দারুণ সময় । হতচ্ছাড়াটা নাকি আজ একা !

“কত্তো কষ্ট দিয়েছিস , লজ্জায় ফেলেছিস , আজেবাজে আর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিস…ওরা ওদের জায়গায়-ই আছে , তুই – ই লজ্জায় পালিয়ে এসেছিস । একা হয়ে যা প্লিজ ! আমিও যে অন্ধকার একা ঘরে একা । …নারে , আমার একাকীত্বের যন্ত্রণা আর তোর একাকীত্বের যে কতো পার্থক্য ,জানিস না । তোর একাকীত্বের যন্ত্রণা যদি আগুন হয় , আমার হয় জল । তাই বলছিলাম । কী জানি বাপু , আজো ভিন্ন এক একাকীত্বের জগতে থেকেও কেনো ভালোবাসি !!! ভালো থাকিস , আমাকে তো তুই তোর ভেতর – ই রাখিস , আমি বিশ্বাস করি – আর তাই আমিও তো তোর ছায়ায় থাকি । ” – স্পষ্ট শুনল হতচ্ছাড়া কিন্তু কাউকেই না দেখে নিঃশব্দে আগের দেখা স্বপ্নের দ্বিতীয় পর্ব দেখার আশায় চোখ বুজঁলো ।

হতচ্ছাড়াটা নাকি এখনো একা ! …হতচ্ছাড়া …নাহ , কিছুতেই দ্বিতীয় পর্বে যাচ্ছে না…চোখ খুলে স্থির হয়ে কিছু একটা ভাবতে হচ্ছে …ভাবতে থাক , তোর মতো করে ।

(খ)

আহা !!!! হতচ্ছাড়াটার অনেক বন্ধু ছিলো , আছে , থাকবে ।
হতচ্ছাড়াটা প্রত্যেকটা সময় তাদের স্মৃতিচারণ করতে থাকবে ।
কিন্তু আফসোস !!!! হতচ্ছাড়াটা কারো বন্ধু নয় , কক্ষনো নয় ।

(গ)

কখনো কখনো এমন চেতনা জাগে ভেতরজুড়ে , ভেবে কষ্ট হয় । হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? হতচ্ছাড়াটার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না । তার বাবা যখন সিগারেট খেতো , ধুন্দুমার কাণ্ড বাঁধিয়ে বসতো । পাড়ার পাভেল ভাই যখন নিশুতি রাতে তার জানালা দিয়ে নেশার ট্যাবলেট খেয়ে থপথপ পায়ে হেঁটে যেত , মনে পড়তো আর বড়ো ভাইদের দেয়া নাম ” ট্যাবলেট পাভেল ” – মুখ চেপে হাসতো হতচ্ছাড়াটা । ঘুমিয়ে থাকলে সকালে উঠে ইচ্ছে করেই বোধ হয় মনে করতো । কেনো যেনো পাভেল ভাই কে তার ভালো লাগতো । আরেকটা ভাই কে তার মাঝে মাঝে মনে পড়ে – রিপন ভাই । হ্যাংলা ছিলো ছেলেটা । গাঁজা ( তখন ট্যাবলেট -এর মতোই অজানা ছিলো বস্তুটা ) খেতো বলে গাঞ্জা রিপন বলে ডাকটা শুনতে পেতো । তবে তার ভালো লাগতো রিপন ভাই কে । কেমন সুন্দর করে কথা বলতো রিপন ভাই । হিমু ভাই কে কী তাদের এলাকার কেঊ ভুলতে পারবে ? কি পারতো না হিমু ভাই !!! সুইটি আপুর সাথে হিমু ভাইয়ের খুনসুটি দেখতে কি ই না ভালো লাগতো !!! কোন এক কারনে আজ মানসিক রোগী , রাস্তায় রাস্তায় আজো ঘোরে – পাগল । ওনার বন্ধুদের দেয়া হিমু পাগলা নামটা হতচ্ছাড়াটাকে আজো পীড়া দেয় ।

হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? তার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না । বাসন্তী আপু তার ভালো লাগা পাড়ার আপুদের মাঝে একজন কিন্তু গো – বেচারা বাবুল ভাইয়ের সাথে মিশত বলে পেছনে অনেক বাজে কথা বলতো । তার খারাপ লাগতো । সোলেমান মামা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়ে যেতেন । একটা পা খোঁড়া ছিলো বলে তার হীনমন্যতা তাকে বিষন্ন করতো । পড়ার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলতো যখন একটা ১৪ তম স্ট্যান্ড করা নাসির ভাই – সে আর তার দীর্ঘকালের বন্ধুসহ হাসতো । মিশু কেও ভীষণ মনে পড়ে । তার বাইরের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘকাল জুড়ে ছিল ছেলেটা । এখনো মাঝে মাঝে কথা হয় । মজার একটা ছেলে ।

হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? তার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না ।

সবকিছুই তো তার জানা ছিলো ! এতক্ষণ যাদের কথা মনে করেছে – তাদের তাকে মনেই রাখার কথা না তবে তার মনে রাখার কারন – কতো নামেই না আমায়হতচ্ছাড়াটাকে আড়ালে আড়ালে তার চেনা মানুষেরা ডাকে , মনে করে । তার ভালো লাগে । এমন কারো সাথে তার পরিচয় হয়নি তার বয়ে চলা জীবনে , যাদের তার ভালো লাগতো না । ইদানিং কেনো যেনো অনেক কেই তার ভালো লাগে না । তাতে ওদের কিছুই আসে যায় না । সে- ই ওদেরকে ভালো লাগায় না । ইচ্ছে করেই লাগায় না । তার ঠ্যাকা পড়ছে অগোরে মনে করে , ভেবে কষ্ট পাওয়া !!! হতচ্ছাড়াটা আজ পথভ্রষ্ট বলে এইগুলো তার মনে করেই দূর থেকে ওদের ভেবে ভেবে ভালো থাকে । কাছে থেকে , গিয়ে আত্মা মেশানোর ভয় নিয়ে ভালো থাকার প্রয়োজন অন্যদের মতো আজ হতচ্ছাড়াটারো নেই ।

হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? তার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না । তার শুধু একটা মাত্র স্বপ্ন ছিলো – একটা মাত্র টবে রাখা একটা বনসাইয়ের মতো , শাখার বিস্তারের মতোই তার আর সব শাখা স্বপ্ন ।

হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? তার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না । ধীরে ধীরে শাখা স্বপ্নের মৃত্যু তাকে কুড়ে কুড়ে খায় তার গুঁটিয়ে যাওয়া এই জীবন – জীবন হারানোর ভয়ে আরো গুঁটিয়ে যায় । হতচ্ছাড়াটার সময়গুলো এমন যাওয়ার কথা ছিল ? তার সময়টা এমন হওয়ার কথা ছিল ? ছিল না তো , সত্যি ই ছিল না ।

(ঘ)

হতচ্ছাড়াটা কয়েকশ কাগজের শরীর ব্যবচ্ছেদ করে শেষ পর্যন্ত একটার শরীর ক্ষত বিক্ষত করে তার অবনীর কাছে একটা চিঠি লিখেঃ

সাধনেশ্বরী অবনী,
আবারো বলি, বলেছিলে আমি তোমার আত্মায় সারাক্ষণ থাকি আর সেজন্যেই নাকি তুমি সবসময়ের জন্যে ভাল থাকো আর নিজেকে সুখী মানুষের তালিকার প্রথমেই তুমি তোমাকে খুঁজে পাও । তাই – সেই বিশ্বাস ধারণ করে পরবর্তী লিখা পত্রাবলীতে তোমার কুশলাদী আর কখনো জিগ্যেস করবো না ।

আজ হঠাৎ করেই আমার আর তোমার সাথে ভেদাভেদ নিয়ে শব্দমঞ্জুরির জালে অদ্ভুত ভালের এক অবগাহন অবগায়িত হয়ে মনে মনে সেই সুদৃশ্যপট ভেসে উঠেছে । তাই তোমার অজান্তে এই জাগ্রত অনুভুতি বলতে খুব ইচ্ছে করছে । মনে রেখও কিন্তু, আমি ইচ্ছের কেনো – স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া এবং পার্থিব সকল থেকে প্রাপ্ত কিছুর-ই বিনিময় করি না । তবে কিছু ক্ষেত্র বাদ রেখে । যাক ।

আমি জানতে চাইলাম নিয়ে যাবে যখন স্বপ্নস্বর্গে – খুব বেশি দূর তো নয় ?
তুমি জানাতে কোমল শব্দে মেঘমালার আর্দ্রতায় – নাহ, তেমন দূর নয়তো ?
তেমন দূর-ই নয় ; বড়জোর এক সমুদ্র, আকাশ, মহাবিশ্ব ও বিশাল মরুময় ।

বোকা আমি জিগ্যেস করেই ফেললাম – সেখানে কি খুব তাপ সেই দূরপথে ?
তুমি আদূরে স্বরে নিঃশ্বাসোস্পর্শে বলতে – হয়তো তেমন কখনোই নয়, নাহ !
হয়তো তেমন নয়, শুধু বরফ থেকে লোহা গলে যার সামান্য সহনীয় উত্তাপে ।

রামগরুড়ের ছানার মতো প্রশ্ন করালাম – খুব তো ভালো, তা বেশি কষ্ট নাকি ?
রহস্যের জাল বুনেছিলে উত্তর দিতে গিয়ে – এমনটা হবারই নয় ! ভয় কেনো ?
কখনোই হবার নয় ; বুকে পাহাড়, পাথর চাপার মতো আর কি ! খুব বেশি কি ?

ছ’বছরের মানবছানার মতো ভ্রু’কুঁচকে বলেছিলাম – জল বেশি অনেক তবে ।
জলের আর কতোটুকু বেশি দেখেছো, গভীরতা ? নিশ্চয়ই বেশি তো নয় – ই !
কপোলে আমার হাত বুলিয়ে জানালে, তোমার চোখের গভীরতার মতোই হবে ।

অবনী আমার, বণিতা আমার, আমার জোছনা, টুনিপক্ষী – শেষে শুধু বলেছিলে,
দূরে, দূরপথ, উত্তাপের ভয় আর জলের সাথে এই স্বপ্নস্বর্গের তুলনা করোনা ।
আমি তোমাকে এতোটাই ভালো রাখতে চাই, যতোটা নিজেও যে পারবে না !

কথা সত্য অবনী, আমি এখন তেমনই আছি, থাকি – যেমন রেখে গিয়েছিলে।
এ জীবন আর এলোমেলো ভাবনার ভারে ভারে ঘুরি – ফিরি নানারকম ছলে ।
কতোটা দূর, দূরপথ, উত্তাপ আর জলের বহতা এবং গভীরতা সাজিয়েছিলে ?

আমি সে স্বপ্নে তোমার সাথে যেতে পারিনি তো কি হয়েছে ? নিজে গিয়েছি অনেকবার । তাও তোমাকে নিয়ে । আর আতো ক্ষপার কোন কারন নেই তোমার, তুমি শুধু বলেছিলে তোমাকে ভুলে যেতে – ভাবতে নয় এবং আমার ভাবতে হয় বলেই আমি ভাবি । আমার ইচ্ছে ।

(ঙ)

তবুও হতচ্ছাড়া শেষে এসে উদভ্রান্তের মতো আওড়ায়ঃ

ইদানিং নিজের কাছে নিজেকেই অসহ্য লাগছে – ভীষণ ;
পেটমোটা দীঘল শরীর নিয়ে হাঁটি, তবু লাগে শূণ্যে হাঁটি
দশ দিগন্তের বৈরী বাতাসেও শরীরে ঘামের আমরণ অনশন
বুঝিবা অন্য গ্রহের মানুষ কিংবা মানহুশ, সব্বাই যেন অপরিপাটি ।

আজকাল আমি আর ভালো নেই , সত্যিই ভালো নেই রে !
আমিই কারে বুঝি না বা কেউ আমারে বুঝে না- তাও বুঝি না –
কি করে বাঁচি নিজের ভেতর নিজের দ্বিধা-দ্বন্দের ছন্দেরে ?
আমার নিজের সহজ বিবেচনায় সব মিলিয়ে আমি শুদ্ধ না ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com