,

একটি বক্ষবন্ধনীর গল্প ।। শিল্পী নাজনীন

ষোল শো বর্গফুটের দশতলা ফ্ল্যাটের চিলতে ব্যালকনিতে বসে জীবনকে যতটা বহমান, স্রোতস্বী মনে হওয়া উচিত, তেমনটা কখনই মনে হয় নি আমার। অন্তত এখন তো মোটেই মনে হয় না। ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া দিনটাকে বড় করুণা করতে ইচ্ছে হয়। দিনটা অনেকটা আমারই মতো এখন। মৃতপ্রায়, বিষণ্ন। আমার ভালো লাগে না কিছুই। বাঁচতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে আত্মহত্যার তীব্র ইচ্ছে আমাকে প্রায় পাগল করে তোলে। তখন প্রাণপনে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেই যে, বাছা! রোসো! জীবনের বিষটুকু পুরোপুরি পান করে তবেই পিয়ো তুমি মৃত্যুর অমৃত! নইলে কিসের পুরুষ তুমি! কিসের লেখক! জীবনকে ছুঁয়ে ছেনে না দেখলে কী করে তোমার লেখায় উঠে আসবে জীবন, আঁকা হবে তার মৃত্যুঞ্জয় ছায়া!

নিজেকে নিজে অমনতরো প্রবোধ আমি দেই বটে, কিন্তু ক্ষণপরেই ফাঁকিটুকুও ধরে ফেলি নিমেষেই। ফলে মুহূর্তেই আরও বেশি বিষণ্ন, আরও বেশি তিক্ত হয়ে ওঠে মন। নেতিয়ে পড়ে ধ্বজভঙ্গ রোগীর মতো।


বহুবছর আগের আত্মহত্যা চেষ্টার সেই ক্লিশে, বিষণ্ন, ঘেন্নাধরা স্মৃতি এখনও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।


কী হবে লিখে! আমার এই লেখক পরিচয়, আমার এই লিখতে পারার ক্ষমতা কিংবা অন্যভাবে বললে জীবনকে তৃতীয় চোখে দেখার জন্মগত যে অভ্যাস আমার তা আমাকে সুখী করে নি, তৃপ্ত করে নি। বরং মানুষের সাথে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে সীমাহীন দূরত্ব ও বিরোধ। আমাকে ভুল বুঝেছে তারা, দূরে সরে গেছে। আমি নিঃসঙ্গ হতে হতে ক্রমশ ডুবে গেছি অসীম একাকিত্বে। এমনকি ইদানীং মানুষকে আমি আর আগের মতো ভালোবাসতেও পারি না। আমার ভালোবাসার তালপুকুর ছেয়ে গেছে কয়েক পরত পুরু শ্যাওলায়। এখন আর কেউ তাতে ডুবতে পারে না। নিজেকে নিজেই ঘৃণা করি আমি। বহুবছর আগের আত্মহত্যা চেষ্টার সেই ক্লিশে, বিষণ্ন, ঘেন্নাধরা স্মৃতি এখনও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পুনরায় বেঁচে ওঠার সেই আতঙ্কময়, বিস্ময়কর রকম ভয়াবহ সেই সাথে ক্লান্তিকর স্মৃতি আমাকে বিরত রেখেছে, রাখে, আত্মহত্যা থেকে।

ইদানীং লিখতে পারি না একদম। মন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে আছে। যেন কেউ আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে। লিখতে চেষ্টা করলে মন বিদ্রোহ করে। পড়তে গেলে সে বেঁকে বসে ঘাড় ত্যাড়া ঘোড়ার মতো। অনেকগুলো লেখার তাগাদা মাথায় নিয়ে ঘুরছি, অগ্রিম নিয়ে খরচও করে ফেলেছি ইতোমধ্যেই। কিন্তু লিখতে পারছি না। আমি আসলে লিখতে চাইছিও না। মন আটকে আছে যে সীমাহীন অন্ধকারের আবর্তে, সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার কোনো চেষ্টাই আমার মধ্যে খুঁজে পাই নি আমি, ইচ্ছেও নয়। আমি সেখান থেকে পরিত্রাণ চাই না। লেখক সত্তার যদি মৃত্যু হয় তাতেও আপত্তি নেই আমার। এটা জীবনকে আরেক রকমভাবে খুঁজে পাওয়ার একটা চেষ্টা আমার। হয়তো পাগলামিও।

আজ পয়লা বৈশাখ। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দম বন্ধ লাগে আমার। অস্থির লাগে। দলে দলে মানুষ! রিকশায়, বাসে, ট্রাকে, প্রাইভেটকারে, টেক্সিক্যাবে, সিএনজি চালিত অটোতে, পায়ে হেঁটে সবাই ছুটছে। কেবলই ছুটছে। কোথায় ছুটছে তারা? যাচ্ছে কোথায়? একই গন্তব্য সবার, মৃত্যু। অথচ কেউ তা জানে না। বোকা মানুষগুলো হাসিমুখে, রঙচঙে পোশাক পরে, বহু কষ্টে, বহু টাকা খরচ করে আনন্দ কিনতে চায়, সুখ সওদা করতে চায়। পায় হয়তো খানিকটা। তবু অনিবার্যভাবে থলিতে যা যোগ হয় তার নাম মৃত্যু। এই যে আমি আজ বসে আছি এখানে কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে না গিয়ে, কারও কোনো আহ্বানে সাড়া না দিয়ে, তাতেই বা কি এমন ক্ষতি বা লাভ হলো? কেউই কি দূরে সরিয়ে রাখতে পারলাম অমোঘ মৃত্যুকে? পারলাম না তো। তবে কেন এত আয়োজন? সে তো ঠিক বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এসে টুঁটি টিপে ধরে বলবে, অনেক হয়েছে, চল এবার! তাহলে?

সকাল থেকে কতগুলো সিগারেট খেয়েছি তার হিশেব নেই। রুহী তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেরিয়েছে সেই ভোরে। রমনা বটমূল হয়ে সে এতক্ষণে চলে গেছে গুলশানে, তার মায়ের কাছে। আমি যাই নি। ভিড় আজকাল একদম সহ্য হয় না। এই মুহূর্তে যেমন রাস্তায় অসহ্যরকম জ্যাম, ভিড় আর গাড়ির প্রাণান্তকর শব্দে মাথার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। কফি বা চা খাওয়া দরকার। উঠে গিয়ে বানাতে ইচ্ছে করছে না। কাজের মেয়েটাকে রুহী ছুটি দিয়েছে আজ। আমাকে বলেছে, পয়লা বৈশাখ তাই তাকে ছুটি দেয়া হলো। মনে মনে হেসেছি আমি। বোকা। রুহী কৈফিয়ত দেয়ার মেয়ে নয় বরং কৈফিয়ত নেয় সে। আমাকে যখন সে কৈফিয়ত দিতে তৎপর তখনই বুঝতে হবে কিছু গড়বড় আছে। রুহীর ভাষায় আমার নাকি ছোঁকছোঁক স্বভাব। তাই তার এত বেশি লিবারাল হওয়ার ঝোঁক। বাসায় আমার একা থাকার সম্ভাবনা জাগলেই বুয়ার প্রতি অতিরিক্ত সহমর্মী হয়ে তাকে সে ছুটি দিয়ে দেয়। আমি নিস্পৃহভাবে না বুঝার ভান করি। রুহীর ব্যক্তিত্বের কাছে কেঁচোসদৃশ গুটিয়ে থাকি। জগৎ শক্তের ভক্ত। আমিও।

এককালে কবিতা লিখতাম। ভালোই লিখতাম বোধহয়। অন্তত রুহীর মতো বনেদি পাড়ার সুন্দরী, বুদ্ধিমতী মেয়েকে ঘায়েল করার মতো ভালো লিখতাম যে তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ স্বরূপ রুহী তার তথা আমাদের দু দুটি সন্তান নিয়ে আমার সংসার নামক তামাশায় বিরাজমান। এখন আর কবিতা লিখি না। রুহীরও ঘোর কেটে গেছে। আমার লেখালেখি নিয়ে যারপর নাই ত্যক্ত, বিরক্ত সে। বিশেষত কবিতা তার মোটেই হজম হয় না আজকাল। আমি কবিতা লিখছি দেখলেই সে বদহজমের চোটে যা মুখে আসে উগড়ে দেয়। তখন তার পেটটাকে অতি উত্তমমানের ডাস্টবিন মনে হয়। বেশ কদিন কুঁইকুঁই করে সে কথা রুহীকে বলতে গিয়ে আচ্ছারকম নাস্তানাবুদ হয়ে আমি ক্ষ্যামা দিয়েছি ও চেষ্টায়। বরং কবিতা লেখা বাদ থাক। তাতে রুহীর যদি শান্তি মেলে মন্দ কী!

প্রথম প্রথম রুহীর চোখে অনেক স্বপ্ন ছিল। সে নিজে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে মোটা রোজগারের পথ খোলা ছিল। আমি কবিতা লিখে, সাহিত্যচর্চা করে অচিরেই দেশের কেউকেটা কবি, লেখক হয়ে উঠব, স্বামীগর্বে সে ভীষণ আত্মহারা হয়ে সমাজে মুখ উঁচু করে চলবে, দিকে দিকে জয়ডঙ্কা বাজবে আমার এমনতর সব অলীক স্বপ্নে বিভোর ছিল সে। আমাকে শোকেসে পুরে রুহী সবাইকে তার দারুণ সংগ্রহ দেখিয়ে বিমলানন্দ উপভোগের যে বাসনা করত তা কর্পূরের মতো উবে গেছিল ক দিনেই।

আমি নিভৃতচারী, অলস। ভীষণ দুর্মুখ। কারও মন রেখে কথা বলা আমার ধাতে সয় না। ফলে যা হবার তাই হলো। রুহীর সব স্বপ্ন, আশা বেনোজলে ভাসিয়ে দিয়ে আমি পড়ে রইলাম যে কে সেই হয়ে। তৈলবাজ কবি আর লেখকরা ধেই ধেই করে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বাগিয়ে নিতে থাকল জাতীয়, বিজাতীয় পুরস্কার। বেকার কবি, অচ্ছুত লেখক হিশেবে আমি রুহীর অন্ন ধ্বংস করতে থাকলাম দিনের পর দিন। কিছু মাথামোটা প্রকাশক ঠিক কী কারণে জানি না, আমার কাছে পাণ্ডুলিপির জন্য ঠায় বসে থেকে কয়েকটা কবিতা ও ছোটগল্পের বই, উপন্যাস বের করে ফেলল। শোনা যায় সেগুলো নাকি পাঠকও আজকাল বেশ ‘খায়’। যদিও প্রকাশকগণ প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে আমাকে বরাবরই বলে, আপনার বই চলে না। বিক্রি হয় না। আমাদের লোকসান হয়।

আমি বলি, তাহলে ভাই আপনাদের আর লোকসান দিয়ে কাজ নেই। আমি লেখালেখি বাদ দেই। আপনাদেরও আর পাণ্ডুলিপি নিতে কষ্ট করে আমার কাছে আসতে হবে না।

শুনে তারা হাঁ হাঁ করে ওঠে। বলে, না না! সেকি কথা! আপনি লিখুন! না হয় হলো আমাদের কিছু লোকসান! আমরা থাকতে আপনি কেন লেখা বাদ দেবেন? আমরা তাহলে আছি কী করতে?

অতঃপর, ঘাড় গুঁজে, রুহীর অমৃতবাণী উপেক্ষা করে, আমাদের সন্তানদের তুমুল উচ্চাঙ্গসংগীতকে অগ্রাহ্য করে, আমি লিখি। আর প্রায় বছরই প্রকাশকদের কেউ না কেউ লোকসান দিতে স্বেচ্ছায় আমার (আদতে রুহীর) ষোল শো স্কয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাটে তাদের উচু, পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাজির হয় আর রুহী রাগে গজগজ করতে করতে কাজের মেয়েকে দিয়ে চা নাস্তা পাঠায়।

মাঝে একবার কী এক ভূত চাপল আমার ঘাড়ে। লেখালেখি থেকে যা আয় হয় তা তো সিগারেট ফুঁকে আর বোতলের দাম গুণে দু দিনেই উড়ে যায়। ভাবলাম রুহীর ঘাড়ে বোঝা হয়ে না থেকে বরং নিজে কিছু উপার্জনের ধান্দা দেখি। নিজে তো আর এ জীবনে চাকরি-বাকরি করতে পারলাম না। আসলে মাথার উপরে কারও ছড়ি ঘোরানো মোটে বরদাস্ত করতে পারি না আমি। আমার পৃথিবীতে আমিই ঈশ্বর। নেহাত রুহীর অন্ন ধ্বংস করছি, নইলে কবেই তাকেও ফুৎকারে নস্যাৎ করে দিতাম। অবশ্য রুহী যে কেন নস্যাৎ করছে না এখনও আমাকে সেও কম আশ্চর্য নয়। যা হোক, আমি এক সাহিত্যসন্ধ্যার আয়োজন করি। প্রতি সপ্তায় একদিন বসবে এ সাহিত্যসন্ধ্যা। আমি সেখানে বক্তা। আগ্রহীরা এখানে শ্রোতা হিশেবে যোগদান করতে পারবে। আমাকে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে পারবে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়। যোগদানকারীকে সাহিত্য সংশ্লিষ্ট হতে হবে। সর্বোচ্চ চারমাস এ সাহিত্যসন্ধ্যা চলবে। আমিসহ মোট দশজন এতে একবারে যোগ দিতে পারবে। যারা যোগ দেবে তারা প্রথমেই আমাকে কিছু থোক টাকা প্রদান করবে, সম্মানী হিশেবে। আমার ধারণা ছিল এমন উদ্ভট আহ্বানে কেউ শেষ পর্যন্ত সাড়া দেবে না এবং যদি বা কেউ আগ্রহী হয়ও সেও শেষপর্যন্ত টাকার প্রশ্নে পিছিয়ে যাবে।

কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে প্রথমবারেই প্রায় জনাকুড়ি লোক আমার সাথে যোগাযোগ করে। তারা সবাই এ সাহিত্যসন্ধ্যায় অংশ নিতে চায়। এবং আশ্চর্য এই যে, তাদের অধিকাংশই নারী! আমি অনেক ভেবেচিন্তে, যাচাইবাছাই করে তাদের ভেতর থেকে ছয়জন নারী এবং তিনজন পুরুষকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করি। সাহিত্যসন্ধ্যার প্রথম আসরে, যেহেতু সন্ধ্যা তখন, রুহী চা পানের বিরতির ফাঁকে আমার রিডিংরুমে, আমাদের সাহিত্য আসরে এসে তার তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সবাইকে জরিপ করে যায়। মাপা, মেকি হাসিতে সে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে, দু চারটে কথা বলে চলে যায় নিজের কাজে। উপস্থিত সবাই, আমি বাদে, আমার স্ত্রীভাগ্যের দারুণ প্রশংসা করে, রুহীর রুচি ও সৌন্দর্যের প্রশংসা করে এবং মনে মনে আমিও রুহীর প্রতি বেশ একটু কৃতজ্ঞ, নমনীয় হই আমার প্রতি তথা উপস্থিত অতিথিদের প্রতি তার এহেন ভদ্রোচিত আচরণে।

সন্ধ্যা ফুরিয়ে এলে, সবাই বিদায় নেয় একে একে। ক্লান্ত, বিমর্ষ আমি নিজের রুমে বসে সিগারেট ফুঁকি, দু একটা বইয়ের পাতা উল্টোই, কিংবা এমনিতেই, ফ্যানের বাতাসেই তারা উল্টে যায়, নির্নিমেষ আমি কড়িকাঠে কিছু একটা খুঁজি, অথবা খুঁজি না কিছুই। অর্থহীন তাকিয়ে থাকি। এবং টের পাই থমথমে মুখে, ঝড়ের সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে রুহী প্রবেশ করে আমার রুমে। তার এই রূপে ভয়ানক আতঙ্কিত আমি, যেন কিছুই হয় নি, তার উপস্থিতি খেয়ালই করি নি এমন ভাব করে কড়িকাঠের দিকে অখণ্ড মনোযোগ অক্ষুণ্ন রাখি। সংসার আমাকে মুক্তি দেয় না অত সহজে। ঘরের মধ্যে রুহীর বরফশীতল কণ্ঠ ভীষণ ভারি হয়ে আছড়ে পড়ে। তপ্ত লোহায় যেন ছাঁৎ করে শব্দও বাজে, ঠিক বুঝতে পারি না। আমি কি একটু কেঁপে উঠি রুহীর কণ্ঠস্বরে? কিন্তু আমি প্রাণপণে নিজেকে সংযত রেখে রুহীকে অগ্রাহ্য করতে চেষ্টা করি। তেজি ঘোড়ার মতো রুহী মেঝেতে পা ঠুকে পুনরায় আমাকে প্রশ্ন করে তার সেই বরফশীতল গলায়, এসব কী শুরু করেছ?

খোলস থেকে বের হতে হয় অগত্যা। নির্লিপ্তির মুখোশটা সামান্য উচিয়ে, কী বলছ? কী হয়েছে?

—বলেই মুখোশটা চড়িয়ে নেই মুখে, মুখ ঢেকে ফেলি মুহূর্তেই।


রুহী আমাকে বাতিল পয়সা বলে ফেলে দিলেও মূলত আমার যে এখনও কিছু বিনিময় মূল্য আছে তা আবিষ্কার করে বেশ আত্মপ্রসাদানুভব করি।


এই মুহূর্তের রুহীকে দেখে আমি বিস্মিত হই, অবাক হই। তাকে হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো লাগে। সে নাক মুখ খিঁচিয়ে, নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে, অশ্রাব্য, অশ্লীল ভাষায় খিস্তি করে নাস্তানাবুদ করে তোলে আমাকে। সে আমাকে আঘাত করে, আমাকে আঁচড়ে, কামড়ে অস্থির করে তোলে। তাকে দেখে মালুম করা শক্ত যে সে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, প্রজাতন্ত্রের একজন ডাকসাইটে, ঘুষখোর কর্মকর্তা। বরং তাকে বস্তির রুখু চেহারার, অভাবী, নির্যাতিত নারীর প্রতিনিধি মনে হয় এবং এক্ষেত্রে নির্যাতনকারী হিশেবে নিজেকেই আবিষ্কার করে আমি অপরাধবোধে ভুগতে থাকি। রুহী অভিযোগ তোলে, বেছে বেছে আমি সব সুন্দরী আর আকর্যণীয় নারীদেরকে আমার সান্ধ্য আয়োজনে নির্বাচিত করেছি, আমার জন্মগত ছোঁকছোঁক স্বভাবের কারণেই আমি এসব সাহিত্যসন্ধ্যার ভড়ং করছি। আদতে আমার লক্ষ্য হলো লাম্পট্য, ভোগ।

রুহীর এমন জোড়াল অভিযোগে আমি খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হই। আমার কেন যেন মনে হয় রুহী হয়তো খানিকটা ঠিক বলছে। পরক্ষণেই মনে পড়ে, আরে! আমি তো তিনজন পুরুষকেও উক্ত সাহিত্যসন্ধ্যায় নির্বাচিত করেছি! এবং আর যাই হোক আমি তো গে নই! তাহলে?

কিন্তু রুহীকে আমার সে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। বরং আমার হাতে রুহীর আঁচড়ে তৈরি হওয়া ক্ষতটায় গভীর মনোযোগে চোখ রাখি। সেখানে একটু একটু করে ফুটে ওঠা লাল বিন্দুটা বড় হতে হতে টপ করে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। গোলাপের লাল পাঁপড়ির মতো রক্তের ফোঁটাটি আমার চোখে ফুটে থাকে অপলক। রুহী ক্লান্ত হয়ে, আমাকে মুখোশের আড়াল থেকে বের করতে না পারার সীমাহীন গ্লানি নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে, এলোমেলো কাপড়চোপড় ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে চলে যায় আমার রুম ছেড়ে। এ মুহূর্তের রুহীকে দেখে হঠাৎ মায়া হয় আমার। ইচ্ছে হয় তাকে জড়িয়ে ধরি, অন্তত একটা চুমু খাই তার অভিমানী, ফুলে ওঠা, জলভেজা মুখে। কিন্তু আমি ঠায় বসে থাকি। রুহীকে আর আমি ভালোবাসি না। যাকে ভালোবাসি না তাকে ছুঁই না আমি। এ আমার নিজস্ব দর্শন।

সত্যি কথা বলতে কী পরের সাহিত্যসন্ধ্যার প্রতি আমি মনে মনে খুব আগ্রহ বোধ করতে থাকি। রুহীর অমন হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো আচরণের কারণ খুঁজতে আমি অনুসন্ধিৎসু হই এবং আমার মনে হতে থাকে রুহী নিশ্চয়ই অমূলক সন্দেহ করে নি। নিশ্চয়ই আমার অবচেতন মনে এমন কিছু ছিল যা আমাকে এসব নারীপুরুষদের নির্বাচিত করতে ভূমিকা রেখেছে। পরের সাহিত্যসন্ধ্যাটা বেশ শাদামাটা আর ঘটনাবিহীন শেষ হয়। রুহী এ রুমে আসে না। এবং আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবাইকে দেখি। মূলত রুহী অমনতরো অভিযোগ না তুললে আমি হয়তো এমন মনোযোগে এদেরকে দেখতাম না। আমি সাধারণত কোনো ব্যাপারেই খুব মনোযোগ দেই না। বিশেষত মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য খুবই মূল্যহীন আমার কাছে। কিন্তু রুহীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে সে অমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল এবং সে কারণেই আমি এদের প্রতি খুব কৌতূহল বোধ করতে থাকি। এদের মধ্যে তূর্য আমার মনোযোগ বিশেষভাবে কাড়তে সক্ষম হয়। তূর্য সুন্দরী, আধুনিক, সাহিত্যের প্রতি তার ঝোঁক আছে। কিন্তু আমাকে সে আকর্ষণ করে অন্য কারণে। তার মধ্যে বেশ একটা অগোছালো ভাব আছে। অন্যান্য সুন্দরী নারীদের মতো তার মধ্যে নিজেকে সুন্দরী প্রমাণ করার চাতুর্য নেই। যা আমাকে টানে। তূর্যর মধ্যে, আমি খেয়াল করি, কোনো ভান নেই। যে কোনো ব্যাপারেই যা ভাবছে, ভাবে, অকপটে তা প্রকাশ করার সৎসাহস তার মধ্যে দেখতে পেয়ে আমি মুগ্ধ হই। বোদলেয়ার, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার সবার সম্পর্কেই সে অকপট। ভালো লাগলে বলে ভালো, মন্দ লাগলে মন্দ। আমাদের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে যে স্ববিরোধিতা তা তার মধ্যে অনুপস্থিত। তার প্রতি মুগ্ধতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে আমার এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যে সহজাত আকর্ষণ তা আমাকেও মুক্তি দেয় না। আমি তার প্রতি প্রেমানুভব করতে থাকি। নারীর সহজাত বোধে তূর্যও তা বুঝতে পারে। সেও আমার প্রতি আকৃষ্ট বলেই মনে হতে থাকে।

তূর্য আমাকে তার পাশে বসতে প্রলুব্ধ করে। সচরাচর সাহিত্যসন্ধ্যা আমার রিডিং রুমে বসে। শুধু চা পানের বিরতিতে আমরা ডাইনিং এ গিয়ে বসি। এবং আমি খেয়াল করি সব সময়ই তূর্য আমার পাশটিতে, প্রায় গা ঘেঁষে বসে। বিশেষত ডাইনিং টেবিলে, যেহেতু আটটা চেয়ার ছিল সেখানে, আমি আরও দুটো চেয়ার সে সময়টিতে কাজের মেয়েটিকে সেখানে দিতে বলি এবং সে কারণে বেশ চাপাচাপি করেই সেখানে বসতে হয়। এবং এ সময়, আমি খেয়াল করি, প্রতিবারই তূর্য প্রায় হুড়োহুড়ি করে এসে আমার পাশের চেয়ারটিতে দখল নেয়। মনে মনে আমি খুশি হয়ে উঠি। রুহী আমাকে বাতিল পয়সা বলে ফেলে দিলেও মূলত আমার যে এখনও কিছু বিনিময় মূল্য আছে তা আবিষ্কার করে বেশ আত্মপ্রসাদানুভব করি। সেদিনের চা পানের বিরতির সময় যথারীতি তূর্য আমার পাশটিতে গা ঘেঁষে বসে। তার শরীর থেকে বুনো, জংলী একধরনের গন্ধ ভেসে আসে। জানি না সেটা তারই শরীরের গন্ধ নাকি কোনো দামি, মেকি পারফিউমের গন্ধ। গন্ধটা ভারি ভালো লাগে আমার। দাঁতে শক্ত টোস্ট চিবোতে চিবোতে নাক দিয়ে সবে আমি তূর্যর শরীর থেকে ভেসে আসা গন্ধটা টেনে নিচ্ছি, ঠিক তখন আমি চমকে লক্ষ করি টেবিলের নিচ থেকে একটি পা আমার ডানপাশের পা টিকে জড়িয়ে নিচ্ছে এবং একটি হাত এসে আমার উরুর উপর অস্থির পরশ বুলাচ্ছে। আমি কেঁপে উঠি। জেগেও। তূর্য! আমি চোখের কোণা দিয়ে তাকে লক্ষ করি। সে যেন কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে চায়ে টোস্ট ডুবিয়ে অন্যহাতে দিব্যি হাসি হাসি মুখ করে খায়! আমি প্রাণপণে নিজেকে স্থির, স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করি। তূর্য তার অবাধ্য হাত আমার পেনিসে রাখে। আমি কি করব বুঝে ওঠার আগেই রুহী রুমে প্রবেশ করে। নিয়ন আলোয় সে আমার মুখ দেখে কী বোঝে তা সে আর তার ঈশ্বর জানে। সে মুহূর্তেই কী একটা তুলবার ছলে নিচু হয় এবং আমি আড়চোখে দেখি সে টেবিলের নিচে, আমার আর তূর্যর পায়ের দিকে শ্যেন দৃষ্টি চালায়। তূর্য ততক্ষণে সামলে নিয়েছে নিজেকে। কিন্তু রুহীর যা বুঝার সে ঠিক বুঝে নিয়ে চলে যায় রুম ছেড়ে। আমি বুঝি কপালে ঢের খারাবি আছে এবার। মনে মনে তূর্যকে তার এমন পাগলামির জন্য তীব্র ভর্ৎসনা করি। কোনো মানে হয়! বিড়বিড় করি আমি। কিন্তু সেই সাথে ভালোলাগার একটা চোরাস্রোতও ভাসিয়ে নেয় আমায়, টের পাই।

সে রাতে তুলকালাম কাণ্ড করে রুহী। বলে সাহিত্যসন্ধ্যা বন্ধ করতে, নয়তো তূর্যকে বাদ দিতে। কোনোটাই সম্ভব নয়—গম্ভীরভাবে জানিয়ে দেই আমি।

কেন সম্ভব নয়?—অসম্ভব ঝাঁঝ গলায় ঢেলে বলে ওঠে রুহী।

দেখ—গলা খাঁকারি দিয়ে, খুব ঠান্ডা, নিঃস্পৃহগলায় রুহীকে বুঝানোর চেষ্টা করি, আমি উনাদের থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়েছি, উনাদের সাথে আমার চুক্তি হয়েছে অন্তত চারমাস এ সাহিত্যসন্ধ্যা চলবে, তাহলে এখন কী করে সে চুক্তি ভঙ্গ করতে পারি? আমার সম্পর্কে তাহলে খুব খারাপ ধারণা জন্মাবে উনাদের মনে।

ওহ! তাহলে তুমি মনে করো তোমার সম্পর্কে লোকের মনে এখনও ভালো ধারণা আছে? রুহীর কণ্ঠে ব্যঙ্গ ঝরে। সে বলে, ওসব ধানাইপানাই ছাড়! তোমার সাহিত্যসন্ধ্যা বন্ধ! ও মাগিকে আর এ বাসায় ঢুকতে দেবো না আমি! টেবিলের তলা দিয়ে পাশাপাশি বসে কি করছিলে তোমরা সে আমি দেখি নি ভেবেছ? ধাড়ি বজ্জাত লোক একটা! তোমার লেখালেখির মুখ ভরে মুতি আমি!

রুহীর ভাবসাব দেখে আমার ভয় হয় সে হয়তো রাগে অন্ধ হয়ে সত্যি সত্যিই আমার রিডিংরুম ভিজিয়ে দেবে। যদিও ‍রিডিং রুমটাও আদতে তারই। তার ষোল আনা হক আছে এ বাসার যততত্র মুতার।

রুহী চলে যায়। কী করব বুঝতে পারি না। বরং ঘোড়ার ডিমের সাহিত্যসন্ধ্যা বন্ধই থাক। টাকা যা নেয়া হয়েছে তা রুহীই ফেরত দিয়ে দিতে চাইছে যখন তখন ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই।

তূর্যর সাথে বাইরে দেখা হয় দুবার। নিভৃতে। তূর্য চায়। আমিও চাই না এমন নয়। প্রথমবার দেখাটা বেশ আনন্দদায়ক ছিল। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আমি দাঁড়াতেই তূর্য আসে, অতঃপর আমরা হাঁটি, রিকশায় সারা শহর ঘুরি। তূর্য তার গল্প বলে বিরামহীন। সে যে এত কথা বলতে পারে তা জানা ছিল না আমার। সে কবিতা লেখে, গল্পও লেখে। কেমন লেখে তা অবশ্য জানি না। তার কোনো লেখাই পড়া হয় নি আমার। সেও আমাকে বলে, আমার লেখা হাতে গোনা দু চারটে সে পড়েছে, খুব বেশি পড়া হয় নি তার। এ কথায় আমার আত্মাহংকারে ঘা লাগে বেশ। নিজেকে আমি বড়মাপের লেখকই ভাবি। আমার লেখা দু চারটে পড়েছে এবং সে কথা এই পুঁচকে মেয়ে বুক ফুলিয়ে বলছে দেখে ভারি রাগ হয় আমার।

যা হোক ফেরার পথে আমি অটো ভাড়া করি। তূর্য উঠে বসে আমার পাশটিতে। সে গল্প বলে আমার কাছটিতে বসে। আমি শুনি। সে এক আমলা কবি আর এক উঠতি লেখকের গল্প বলে। আমলা কবি, তূর্যর ভাষায় ‘বুড়ো ভাম’ (আমাকে সে আড়ালে কী ডাকে আল্লাহ মালুম) একবার নাকি তাকে লিফট দেবে বলে গাড়িতে তুলে নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে, উপরে  উঠার সবগুলো সিঁড়ি তাকে দেখিয়ে দেবে এমন বলেছিল এবং তূর্যর কোনো কিছু দরকার হলে যেন অবশ্যই বুড়ো ভামকে জানায় ইত্যাদি কথা ইনিয়ে বিনিয়ে বলে সে তূর্যর হাত নিয়ে রেখেছিল নিজের নেতানো পেনিসে। আর অন্যহাতে তূর্যকে জড়িয়ে ধরে হাত রাখার চেষ্টা করেছিল বুকে। তূর্য বলে, গা ঘিনঘিনে লোকটির পাশে আমি শক্ত হয়ে বসেছিলাম আর দেখতে চাইছিলাম সে আর কতদূর নামার স্পর্ধা দেখায়!

তূর্য অটোতে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে, চুমু খায় আর দ্বীধাহীন এসব গল্প বলে যায়। উঠতি লেখকের গল্পে সে বলে, ছেলেটার সাথে ফেসবুকে কথা হতো তার। প্রথম দেখাতেই সে তূর্যকে জড়িয়ে ধরে, চুমু খায়! এমনকি তূর্যকে কোনোরকম প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই। তূর্য বলে, আমি হাসিমুখে তাকে পুরো সময়টা সহ্য করলাম, সে যখন আমার বুকে হাত দিল তখন আমিও তার পেনিসে হালকা করে হাত রাখলাম। সে তখন বলল, তার খুব আমাকে পেতে ইচ্ছে করছে! উত্তরে আমি প্রায় অস্পষ্টস্বরে একবার হুঁ বলে হাসার চেষ্টা করলাম। সে আমাদের বেশ কটা সেলফি তুলল, তারপর আমাকে প্রশ্ন করল, কবে সে আমাকে পাবে? কবে সে বাসায় আসবে আমার?


আমি ঘেন্না করি রুহীকে, অন্যসব নারীকে! ছিঃ! নিজেকে একটা শরীর ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারো না তোমরা!


ততক্ষণে ছেলেটা তার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। হাসিমুখে আমি তাকে টা টা জানিয়ে বাসায় ফিরে খুব করে স্নান করলাম। আমার মনে হলো তার দুর্গন্ধময় নিঃশ্বাস, আঠালো লালা তখনও আমার নাকে মুখে লেগে আছে!

তূর্য তার গল্প শেষে হাসে। বলে, মানুষের ভেতরের অন্ধকারটাকে বের করতে আমার বেশ লাগে! মানুষ যে কী বিচিত্র হয়! ঈশ্বর!

আমার প্রশ্নটাকে ধরে ফেলে সে মুহূর্তেই! বলে ওঠে—না না! আমি কিন্তু আপনাকে সত্যিই ভালোবাসি খুব! শ্রদ্ধাও করি ভীষণ! আপনার মাঝে কোনো অন্ধকার আছে সে আমি মোটেই বিশ্বাস করি না।

তার এ কথায় কিছুটা কি স্বস্তি পাই আমি? হয়তো! নইলে পরবর্তী দিনেও তার সাথে দেখা কেন করতে যাই! এবার দেখা না হলেই ভালো হতো বোধ হয়। অন্তত তূর্যকে অতটা অসহ্য লাগত না তাহলে। এবার বাইরে নয় তূর্যর এক আত্মীয়ের বাসায় দেখা করি আমরা। অবশ্যই ফাঁকা ছিল বাসা। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করি, কফি খাই, একে অন্যকে জড়িয়ে রাখি। তারপর সেই অমোঘ মুহূর্ত আসে! তূর্যকে নিরাবরণ চাই আমি! কিন্তু তূর্য কিছুতেই রাজি নয়! জিদ চড়ে যায় আমার! শুরু হয় ধস্তাধস্তি! আমি নিজে কখনও চড়াও হই নি, হই না কখনও। কিন্তু তূর্য যেচে এসেছে আমার কাছে, আমাকে নিরাবরণ করেছে সে, তাহলে তার কেন এত লুকোচুরি থাকবে! অসহ্য! এক পর্যায়ে আমি টেনে খুলে ফেলি তূর্যর বক্ষবন্ধনী! তারপর অস্ফুট একটা শব্দ করে বসে পড়ি বিছানায়। তূর্য দু হাতে মুখ ঢেকে ভেঙে পড়ে কান্নায়। আমার ভারি মায়া হয় তাকে। কিন্তু আমি উঠে দাঁড়াই। নিজের পোশাক ঠিক করে নিতে নিতে বলি, শোন মেয়ে, যে নিজেকে সম্মান জানাতে পারে না তার জন্য আমার কাছেও কোনো সম্মান নেই। তুমি অনেক কথা বলেছ আমাকে। এটুকু লুকোলে কেন? অসুখে একটা ব্রেস্ট কাটা পড়েছে তোমার, এতে তোমার তো কোনো দোষ নেই! তবে কেন নিজেকে অপমানিত করলে আমাকে একথা লুকিয়ে? স্পষ্ট কথা বলতে পারো জেনেই তোমাকে ভালোবাসতে চেয়েছি! যদি এই সত্যিটুকু বলতে পারতে আমাকে, হয়তো সত্যিই কোনোদিন তোমাকে ভালোবাসতে পারতাম আমি। কিন্তু এখন, তোমার এই অসততার জন্য তোমাকে ঘেন্না হচ্ছে আমার! খুব ঘেন্না হচ্ছে! যেমন আমি ঘেন্না করি রুহীকে, অন্যসব নারীকে! ছিঃ! নিজেকে একটা শরীর ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারো না তোমরা!

তূর্যর কান্নায় ফুলে ওঠা শরীরটাকে প্রায় মাড়িয়ে বের হয়ে আসি আমি। রাস্তায় তখনও অনেক মানুষের ভিড়, হট্টগোল। এসব আমাকে স্পর্শ করে না। আমার বুকের মধ্যে ভালোবাসার তালপুকুরটাতে ভীষণ টালমাটাল ঢেউ ওঠে। ভীষণ নরম এক টুকরো বোধ কেমন অবোধ অবুঝ স্বরে ডুকরে ওঠে যা রুহী বোঝে না, তূর্য বোঝে না। মানুষের ভেতরের অন্ধকার খুঁজতে খুঁজতে আমি, তূর্য আমরা নিজেরাই ডুবে যেতে থাকি অতল অন্ধকারে। পৃথিবীতে তবু ফোটে রডোডেনড্রন, জারুলের বেগুনি রং তবু ছেয়ে ফেলে পৃথিবীর বাগান। শুধু আমিই হারিয়ে যেতে থাকি অন্ধকারে। মৃত্যু খুঁজে ফিরি জীবনের ছায়ায়।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com