মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮, ০২:১৮ পূর্বাহ্ন

সেহরী ও ইফতার সময় :
আজ ২২ মে রবিবার, রমজান- ৫, সেহরী : ৩-৪৩ মিনিট, ইফতার : ৬-৪১ মিনিট, ডাউনলোড করে নিতে পারেন পুরো ফিচার- সেহরী ও ইফতার-এর সময়সূচী


সাইফুল বাতেন টিটো’র “ভোজনরসিক”

সাইফুল বাতেন টিটো’র “ভোজনরসিক”

ফটোগ্রাফার : হোসাইন আতাহার সূর্য, লেখক: সাইফুল বাতেন টিটো



কাঁটাবন দিয়ে আমি আর শিল্প নির্দেশক জুনায়িদ ভাই (জুনায়িদ মুস্তাফা চৌধুরী) রিকশায় অনিমেষদার (অনিমেষ আইচ, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার) বাসায় যাচ্ছিলাম। আমার বাবা বিষয়ক বকবকানি শুনতে শুনতে জুনায়িদ ভাই বলেছিলেন, ‘তুমি খুব বাবা ভক্ত, তাই না?’
‘জি’ মুচকি হেসে বলেছিলা আমি।
আসলেই তাই। আর হবো-ই বা না কেন? ছোটবেলা থেকেই বাবাই আমার হিরো। এ হিরো হওয়ার পেছনে রয়েছে বাবার বেশ কিছু শারীরিক ও শৈল্পিক গুণ। যেমন বাবা লম্বায় ছয় ফুট এক ইঞ্চি, আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন, ভরাট কণ্ঠ।
বাবা খুব সুন্দর করে আবৃত্তি করেন, রেডিও-টিভির মতো করে সংবাদ পাঠ করেন, বেশ স্মাটর্লি কথা বলেন। এগুলো আবার আমাকে শেখান। আমি এগুলো স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অ্যাপ্লাই করে কয়েকটি পুরস্কারও বাগিয়েছি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে বাবা প্রায়ই মজার মজান ঘটানোয় ওস্তাদ!
তেমনই একটি মজার ঘটানো শোনাবো আজ।
১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা। ক্লাস এইটে পড়ি। বাবার স্কুলেই পড়ি। আমি আর বাবা বাজারের এক প্রান্তে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি আপাতত। কয়েকদিন পর মাকেও নিয়ে আসা হবে।
যেদিনের কথা লিখতে বসেছি সেদিন ছিল শুক্রবার। বাবা প্রতি বৃহস্পতিবার বাড়িতে যান। বাড়ী থেকে টুকটাক শাকসব্জি ফলমূল ইত্যাদি নিয়ে আসেন। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। শনিবার সকালে এসে ক্লাস ধরবেন। আমাদের বাসার লোকেশনটি এ লেখার প্রয়োজনে একটু বর্ণনা করতে চাই।
আমাদের বাসাটি ছিল মসজিদের পেছনে, সম্মিলিত কবরস্থানের কাছেই। বাড়ির ডান পাশে ছিল বেশ কয়েকটি হিন্দুবাড়ি। তাদের চিতাগুলোও আমাদের বাড়ির কাছাকাছি ছিল। বাড়ির পেছন দিকটা ছিল প্রায় জনমানবিহীন। তবে ডান-বামে বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল। তাদের সঙ্গে আমার বেশ সুসম্পর্কও ছিল।
বাবা যেহেতু বাসায় নেই, ভয়ে একা ঘুমাতে পারবো না এ জন্য সহপাঠী এবং দুরসম্পর্কের মামা মাসুদ আমাদের বাসায় থাকে বাবা না থাকলেই।
বইপত্র নিয়ে সন্ধ্যায় আসে, সকালে যায়। আমাদের বাড়িটি নিয়ে এ এলাকায় বেশ কিছু ভীতিকর কথা প্রচলিত ছিল। যেমন কেউ বলেন এ বাড়ি ছিল তিন তলা, মাটির নিচের ভূত-প্রেত তাদের প্রয়োজনে নিচে টেনে নিয়েছে, এখন নাকি তারা দুটি ফ্লোরে তারা থাকে। আবার কেউ একজন বলেছে, বাড়ির ছাদে প্রায়ই বাড়ির মালিকের অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। এ রকম অনেক ভয় ধরানো কথাবার্তা।
যাই হোক। শুক্রবার সন্ধ্যায় ফুটবল খেলা শেষ করে বাসায় ফিরে চাবি বের করে তালা খুলতে গিয়ে চমকে গেলাম। বাসায় তালা নেই! তালা কে খুললো? বুকটা ঢিপ ঢিপ করা শুরু করলো।
উল্লেখ্য; আমি যে বাজারের কথা বলছি সে বাজারে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জেনারেটর চালাতো। তাও একটি বাল্ব জ্বলানোর অনুমতি ছিল। যা রাত এগারোটা পর্যন্ত থাকতো।
আমি যখন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সাত-পাচ ভাবছি, জেনারেটর তখনো চালু হয়নি। চারদিক মোটামুটি অন্ধকার। অনেক সাহস নিয়ে দরজায় নক করলাম। বাবা বেরিয়ে এলেন সহাস্যে। সব ভয় উরে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে যখন পড়তে বসলাম ততোক্ষণে জেনারেটর চালু হয়ে গিয়েছে।
এক সময় টের পেলাম বাবা রান্না চাপিয়ে দিয়েছেন। বলে রাখি, বাবা খুব ভালো রান্না করেন। এর উপর বেশ ভোজনরসিকও ছিলেন। স্টোভে রান্না হচরছিলো। তাই শো শো করে শব্দ হচ্ছে।
-কি রান্না করছ বাবা?
-এই তো কাকরোল, কাঁচকলা, হাবিজাবি।
-মাংসও রান্না করছ নাকি? গন্ধ আসছে যে বেশ…
-আরে না! বেশ মশলা-টশলা দিয়েছি তো, তাই।
-ও..
এক সময় মাংসের গন্ধটা তীব্রতর হলো। আমার কেমন যেন একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। বাবাকে বললাম,
-বাবা, তোমার না আগামীকাল সকালে আসার কথা? আজ এলে যে?
-এই তো এমনি এলাম।
লক্ষ্য করলাম, বাবার চুল দাড়ি মিশমিশে কালো। এ বয়সেই বাবার চুলে কালোর চেয়ে সাদার পরিমাণ বেশি। যুবা সেজে থাকতে হলে তাকে প্রায়ই কলপ দিতে হয়।
হঠাৎ বলে উঠলাম,
-তুমি সত্যি সত্যি বাবা তো? না বাবা সেজে ভূত এসেছ…
বাবা হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। বাবার হাসি শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিল। কেমন যেন একটু ভয়ই পেলাম।
বেশ কিছু সময় পর বাবা একটি বাটিতে খানিক তরকারি এনে টেবিলে রেখে বললেন,
-খেয়ে দেখ তো লবণ হয়েছে নাকি?
তরকারির দিকে তাকিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া। কোথায় কাকরোল, কাচকলা? এ যে মাংস! একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল আমার মেরুদন্ডে। হঠাৎ বেশ জোরে বললাম,
-তুমি না বললে কাকরোল আর কাঁচকলা? এ যে দেখছি মাংস!
বাবা আবার হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। আমার সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার শুরু করলাম, ‘বাঁচাও বাঁচাও, ভূত! বাঁচাও ভূত!
বাবা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলেন। বাবা হয়েতো বুঝে উঠতে পারছেন না তার কি করা উচিত।
-আবু, আমি তোর বাবা, আমি ভূত না।
-না না কাছে আসবি না। তুই বাবা না, ভূত। বাঁচাও!
-আব্বু এই দেখ, আমি তোর বাবা। দেখ, সুরা পড়ছি।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাবা আয়াতুল কুরসি পড়া শুরু করলেন।
কিন্তু কিসের কি? আমি চিৎকার করেই যাচ্ছি। হঠাৎ টের পেলাম কেউ একজন দরজা ধাক্কাচ্ছে!
বাবা গিয়ে দরজা খুললেন।
দেখি পাশের বাসার কাকি। দৌড়ে গিয়ে তার কোলে ঝাঁপ দিলাম। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি, আমার চারপাশে অনেক মানুষ। মসজিদের ইমাম, তার বড় ছেলে হাফেজ শহীদুল কাকা, নবী নানু (মাসুদের বাবা), মাসুদ, উদ্ধারকারী কাকি, কাকাসহ অনেকে।
পরে শুনলাম সবই নাকি বাবার কারসাজি। তিনি দুষ্টুমি করে মাংসকে কাকরোল, কাঁচকলা বলেছিলেন; আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। তবে ব্যাপারটি যে এতো দূর গড়াবে তা তিনি বুঝতে পারেননি।
আজ অনেক বড় হয়েছি। ফিল্মমেকার হওয়ার চেষ্টা করছি। কোনো ভৌতিক সিকোয়েন্স শুট করতে গেলে আজও সেদিনের কথা মনে পড়ে। পারিবারিক আড্ডায় আজও যখন সেদিনের কথা ওঠে তখন হাসির রোল পড়ে যায়।
তবে বাবার জন্য কষ্টে বুকটি ফেটে যায়। কারণ আমার ভোজনরসিক হিরো বাবা অনেক দিন ধরে তেমন খেতে পারেন না। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media








© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com