সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

English Version
অপারেশন (আত্মজীবনী মূলক ছোট গল্প)

অপারেশন (আত্মজীবনী মূলক ছোট গল্প)



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ঘটনাটা ঘটেছিল সুবেহ সাদিকের কিছু পরে। খুব জরুরি কাজ না থাকলে ওই সময় ঢাকা শহরে মানুষ যে বের হয় না তা আশা করি সবারই জানা।
শ্যামলীর আশা ইউনিভার্সিটি সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম আর রিকশা খুজছিলাম। গন্তব্য শংকর, ছায়ানট। দুই আঙুলের মাঝখানে একটা বিষ। কোন ফাঁকা থেকে জানি না দুই ছোকরা এসে আমাকে বললো,
-এই গায়ে ধোঁয়া ছাড়লি কেন?
আমি একটু থতমত খেলাম। ভাবছিলাম কথাটা কি আমাকে বলা হয়েছে? আমাকে তো বলার কথা না। কারণ তাদের অভ্যুদয় হয়েছে আমার পেছন দিক থাকে। আমার বিষের ধোয়া কি আসলেই তাদের গায়ে বা নাকে গিয়ে লেগে? আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
-ভাই আমারে কইতাছেন?
-মনে হয় এহন কিছু জানেন ন?
এর মধ্যে আরো তিন-চার জন এসে আমার চারপাশে দাড়ালো।
লিডার গোছের একজন বলে উঠলো,
-কিরে তগো লগে বেদুবি করছে?
প্রথম দুই ছোকরার একজন আমার বেয়াদবির বৃত্তান্ত দলনেতার কাছে বর্ণনা করলো। ইতিমধ্যে একজন দাড়ি কাটার একটা ছোট ক্ষুর বের করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। দলনেতা আমাকে পরম যত্নে সবার কাছ থেকে একটু দূরে নিয়ে গেল।
-ভাইয়া আপনে কি করছেন? ওরা তো ভয়ংকর পোলাপান। আমি নিজেও ওগোরে ডরাই। আপনি ওগো লগে করছেন বেদুবি। অরা তো এহন আপনেরে ছিইড়া খাইবো।
-ভাই আমার ভুল হইয়া গেছে ভাই, মাফ কইরা দ্যান…
-ভাই সব ভুলের কি মাপ আছে?
এর মধ্যে একজন হাক দিয়ে বললো,
-বড় ভাই খানকির পুতরে আমগো হাতে ছাইড়া দেন। অরে শিখাইয়া দি বেয়াদবির মজা কি…….
আমি শিউরে উঠলাম। শিক্ষার উপকরণ যদি ক্ষুর হয়ে থাকে, এই ভয়ে আমার কলেজে শুকিয়ে গেল।
-শোনেন পোলাপানে কয় কি? ওরা তো বিশাল ক্ষ্যাপা ক্ষেইপ্যা গেছে। ওগো তো ঠান্ডা করতে হইবো, না কি?
-ক্যামনে ঠান্ডা করোন যায় ভাই?
-ওরা তো এহনও সকালের নাশতা করে নাই। আপনে অগোর নাশতার পয়সাডা দিয়া দেন, বাদবাকি আমি দেখতাছি।
ওদিক থেকে আবার হাঁক আসে, বড় ভাই কি এতো কথা অর লগে। আপনে এই গ্যানজামে আইয়েন না। আমগো হাতে ছাইড়া দেন।
আমি কাচুমাচু করে বললাম,
-ভাই কতো দিতে হবে?
-আপনার লগে আছে কতো?
-এই ধরেন শ’দুয়েক….
-এইডা দিয়ে তো অগো ক্ষির (গাজা) খাওনের ট্যাকাও তো হইবো না। দেহি মানি ব্যাগটা দেন তো….
আমার অপেক্ষা না করে আমার রক্ষাকর্তা নিজেই মানিব্যাগ উঠিয়ে নিল। খুলে দেখতেই এক চড় এসে পড়লো আমার চাপায়।
-মিথ্যা কথা কস ক্যা, খানকির পোলা?
আমার হেফাজতকারী আমার মানিব্যাগে থাকা আটশো টাকা পুরোটাই সকালের নাশতার জন্য নিয়ে নিল।
-আর নাই?
-না ভাই।
এরপর সে আমার সারা শরীর বার কয়েক তল্লাশি করে শেষে বলল,
-এই ট্যাকা তো ওগো লাগবো নাশতা করতেই। আর আমি যে আপনারে বাচাঁইলাম আমারে কিছু দিবেন না? -আমার কাছে আর কোনো ট্যাকা পয়সা তো নাই ভাই।
-মোবাইল? মোবাইল নাই?
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে সে মোবাইলটা নিয়ে নিল।
হঠাৎ খেয়াল করলাম সব ছোট ভাইয়েরা আবার আমার চারপাশ ঘিরে আছে।
তারা যখন আমাকে বেশ কয়েকটা কিল, ঘুষি আর চড়-থাপ্পড় দিয়ে বিদায় নিচ্ছিল তখন আমি মাটিতে শুয়ে। এমন সময় একজন পুলিশ ভাইয়া এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,
-কি ভাই মাটিতে শুয়ে আছেন কেন?
আমার কাটা ঠোটের রক্ত আর জমে থাকা থু থু পুলিশ ভাইয়ার চকচকে বুটের কাছে ফেলে বললাম,
-ভাইয়া বেয়াদবির ফল।
সিগারেটের জন্য পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম সকালে নাশতার পরে খাওয়ার জন্য ছোট ভাইয়েরা তাও নিয়ে গেছে।
পুলিশ ভাইয়া বললেন,
-তোরে তো ব্যাটা দেখলেই বেয়াদব মনে হয়। সাইজ করছে ভালোই হইছে।
আমি বললাম,
-হ ঠিকই কইছেন। ভাই আমি আসি?
-ফাজিল কোথাকার, যা ভাগ….!
আমি দ্রুত ভাগলাম। পুলিশ ভাইয়া যদি আবার বলে যে, ‘আমার লগে বেয়াদবি করছস। আমার দুপুরের খাবার টাকা আর একটা ল্যাপটপ দিয়ে যা।’ বলা যায় না ডিজিটাল বাংলাদেশ তো! পুলিশ ভাইয়া পিছিয়ে থাকবে কেন?
পনেরো দিন পরের ঘটনা।
আমি মোবাইলের অভাবে যখন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন তখন একটা স্ক্রিপ্ট এনালিসিসের জন্য গেলাম এক পরিচালকের বাসায়। ওনার নাম আশরাফ শিশির। উনি “আমরা একটা সিনেমা বানাবো” নামে একটা সিনেমা তৈরি করতে যাচ্ছেন। ডিজিটাল ফরম্যাটে। আমি আমন্ত্রণ পেয়েছি সেটায় কাজ করার।
আমাকে দেখে আক্রমণ করে বসলেন,
-এই মিয়া আপনের মোবাইল বন্ধ কেন?
আমি সব খুলে বললাম। সব শুনে তিনি যা বললেন তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
-আরে চলেন আমি আপনের একটা মোবাইল কিনা দিতাছি।
-ভাই আমার কাছে তো এখন এতোগুলা টাকা নাই।
-আমি দিমু।
-বুচ্ছি তো। আপনেরে তো আবার ফেরৎ দিতে হইবো। আমি কিন্তু এক সাথে দিতে পারমু না।
-এক সাথে দেওয়া লাগবে না। আস্তে আস্তে দিয়েন।
আমি তার পেছনে পেছনে দোকানে গেলাম। গিয়ে দেখি সে যে মোবাইল কেনার জন্য দরদাম করছে তা আমার সাধ্যের বাইরে।
-ভাই আমি তো এই মোবাইল কিনতে পারুম না।
-শোনেন। আপনি মিয়া মিডিয়ার লোক। আপনার দরকার একটা মাল্ডিমিডিয়া ফোন। বেশি কথ কইয়েন না। এইডা লন। আস্তে আস্তে আমারে টাকা ফেরৎ দিয়েন। বললেন অাশরাফ শিশির ভাই।
আমি নিলাম। ভাবতে পারছিলাম না আসলেই আমি এরকম একটা ফোনের মালিক যে ফোন দিয়ে গান শুনতে পারবো, ছবি তুলতে পারবো, রেডিও শুনতে পারবো, আরো কতো কি? পারলে তো আমি আনন্দে কেঁদে ফেলি। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল এলো। সারা রাত ধরে কাজ করলাম। পরে শিশির ভাই ফোনটা গিফ্ট হিসেবে দিয়েছিলেন, টাকাটা ফেরৎ নেন নি।
সকালে বাবা ফোন করলেন, তিনি হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন। তার গলরাডারে অপারেশন হবে। আমি আগেই জানতাম। অফিসের ফাঁকে ছুটে গেলাম বাবাকে দেখতে। বাবার চেহারা দেখে আমার চোখে জল এলো। অনেক কথাবার্তা বলে মনে সাহস দিয়ে যখন ফিরবো তখন বাবা হাত ধরে একটা কথা বললেন যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
-কোন দিন তো চাই নাই বাবা। এখন অনেক বিপদে পড়ে চাচ্ছি। আমাকে হাজার দশেক টাকা দে। আমি আর পারছি না।
আমি জানি বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি যে তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে চিকিৎসা চালাচ্ছেন তা আমি জানি।
কিন্তু আমার যে সাধ্য নাই। আর এও সত্য যে বাবা আমার কাছে কোনো দিন টাকা পয়সা চাননি। আমি অনেক আগে থেকেই আয় করি। মাঝে মধ্যে বাবার অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দেখে যখন কিছু টাকা পয়সা দিতে চেয়েছি তখনই এক গাল হাসি দিয়ে বলেছেন,
-লাগবে নারে পাগল, তোর কাছে রাখ। তুই খরচ কর। তোকে তো কখনো তেমন কোনো টাকা পয়সা দিতে পারিনি। মনে কর আমি নিয়ে আবার তোকে দিলাম। তুই খরচ কর। আমার যখন লাগবে আমি চাইবো।
আজ মনে হয় বাবার সেই দিন এসেছে। কিন্তু এই মুহুর্তে আমার যে কি অবস্থা তা আমি কাকে বলবো? কি ভাবে বোঝাবো? আমার মনে হলো আসলেই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। আমি বাবাকে কিছুই বুঝতে দিলাম না। বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
অনেক প্রিয় একজনের কাছে বিষয়টি খুলে বললাম। তিনি আমাকে নববর্ষের দিন দেবেন বলে আশ্ববাস দিলেন। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ প্লাবিত হয়। পহেলা বৈশাখ সারাদিনই বাবার কাছে ছিলাম। এর মধ্যে যে আমাকে টাকা দেবে সে একবার ফোন করে ধানমন্ডির একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বললেন।
তিনি বললেন রাত আটটার দিকে যেতে। আমি ভাবলাম সমস্যাই হলো। আজকে তাহলে আর বাবাকে টাকাটা দেয়া হবে না। সন্ধ্যার দিকে বাবা এক পর্যায়ে বললেন,
-যা বলছিলাম তা কি আনছো? কাল আমার সিটি স্ক্যান হবে কিন্তু।
-কাল কখন লাগবে আব্বু?
-তোর অফিসের পর নিয়ে আসিস। অপারেশনের যে টাকা জমা দিয়েছি সেটা দিয়ে সিটি স্ক্যান করবো। আর তুই টাকাটা দিলে সেটআ আবার অপারেশনের জন্য জমা দেব। অপারেশন তো পরশু।
-আচ্ছা কোনো সমস্যা নেই।
আমি চলে এলাম। ধানমন্ডির নির্দিষ্ট জায়গায় এসে তাকে ফোন দিলাম। সে এসে হাজির। একটু আড়ালে নিয়ে আমার হাতে দশটা এক হাজার টাকার নোট দিয়ে বললেন
-ভাই আমিও তো বৌ বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় থাকি….। তুমি কষ্ট করে হলেও সামনের মাসে পাঁচ আর পরের মাসে পাঁচ দিয়ে দিও।
-ঠিক আছে ভাই। আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমার এই চরম বিপদের সময় যেই উপকারটা করলেন তা কোনো দিনও ভুলবনা ….. ইত্যাদি ইত্যাদি বলে বিদায় নিলাম।
পহেলা বৈশাখ বলে শ্যামলীর কোনো গাড়িই পাওয়া যাচ্ছিল না। ভাবলাম রিকশায় যাই। ধানমন্ডির ল্যাবএইডের সামনে থেকে শ্যামলী ওভার ব্রিজ পর্যন্ত ভাড়া চাচ্ছে ষাট টাকা। এর কমে কেউই যাবে না। বাধ্য হয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ধানমন্ডি থেকে শ্যামলী যাচ্ছি হেঁটে।
এরকম আমি প্রায়ই যাই। আমি হাঁটছি রাস্তার ডানদিকে দিয়ে। নতুন কেনা মোবাইলে কথা বলছি আর হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে যখন আমি শিশুমেলার কাছাকাছি, তখন আমার উল্টো দিক থেকে হেটে আসা এক কিশোর তার সর্বশক্তি দিয়ে আমাকে একটা ধাক্কা মেরে নিজেই মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগলো।
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে আমি কেটে পড়তে চাইলাম। কারণ আমি তাদের চিনতে পেরেছি। কিন্তু ততোক্ষণে সময় শেষ। কোত্থেকে আরো আট থেকে দশ জন এসে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। সবার সঙ্গেই ধারালো চাকু আর ক্ষুর। কেউ কেউ আবার পিস্তলের গল্পও করছে। আমার কিছু করার নেই। ওরা একে একে আমার মোবাইল, বাবার অপারেশনের জন্য ধার করা টাকা সব নিয়ে নিল। আমি পড়ে ছিলাম। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল…..।
আশপাশের রাস্তাঘাট, দোকানপাট সব এক সময় বিলীন হয়ে গেল আমার চোখের সামনে থেকে।
আমার কেবল একটা কথাই মনে পড়ছিল ‘অপারেশনের যে টাকা জমা দিয়েছি সেটা দিয়ে সিটিস্ক্যান করাবো আর তুই টাকাটা দিলে সেটা আবার অপারেশনের জন্য জমা দেব। অপারেশন তো পরশু।’
বাবা তো আর জানেন না আমি নিজেই আরেক ধরনের অপারেশনের শিকার হয়ে গেছি।

লেখকঃ সাইফুল বাতেন টিটো

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com