,

অনন্ত মেঘে হঠাৎ বৃষ্টি

অনন্ত, বৃষ্টি আর এই আমি মেঘ ছিলাম অনুভবের তিন বন্ধু। আমার সাথে অনন্তর পরিচয় বহুদিনের, ভাললাগা টা স্বল্প সময়ের, ভালবাসা টা হাজার বছরের আর বন্ধুত্ব টা জন্ম জন্মান্তরের। এই হলো অনন্তর সাথে আমার বন্ধুত্ব আর ভালবাসার সংমিশ্রনে এক অন্যরকম নিবীড় সম্পর্ক। অনন্ত কে ভীষন ভালবাসতাম। ভালবাসতাস বললে আমার ভালবাসা কে অপমান করা হবে। আসলে আমি ওকে এখনও ভালবাসি। হয়তো জীবনের বাকি টা সময় ও এভাবেই নীরবে ভালবেসে যাবো।

অনন্তর সাথে আমার পরিচয় হয় কলেজ জীবনের প্রথম দিনে। তারপর কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে ওর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ি। তারপর কখন কিভাবে যে ভালবেসে ফেলেছিলাম জানিনা। অনন্তর সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক টা ধীরেধীরে গভীর হতে থাকে। ওর সাথে সবকিছু শেয়ার করতাম, যখন তখন ঘুরে বেড়াতাম। আর সেলফোনে তো ওর সাথে অনেক কথা হতো। দিনগুলো ভালো ই কাটছিলো। কিন্তু একদিন আমি বুঝতে পারলাম-আমার সাথে ওর সম্পর্ক টা শুধুই বন্ধুত্বের, এর চেয়ে বেশি কিছুনা।

আসলে ও আমাকে নয়, বৃষ্টি কে ভালবাসতো। কিন্তু কখনো কাওকে বলেনি, এমনকি আমাকেও না। কিন্তু আমি ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারতাম। ওর চোখ দেখেই বলে দিতে পারতাম, ও কষ্টে আছে কিনা! তাই হয়তো বৃষ্টি কে ভালবাসার ব্যাপার টাও আমার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। কিন্তু আমি অনেক দেরি তে ব্যাপার টা বুঝতে পেরেছিলাম, কিছুটা আগে বুঝতে পারলে হয়তো এখন আর এত কষ্ট পেতে হতোনা। আমার ভালবাসার ফুল টা ফোটার আগে ই ঝরে গেছে। অনন্ত আজো জানেনা, আমি ওকে ভালবাসি। হয়তো জানবেওনা কোনোদিন। আমার আয়ত্তে থাকা সবকিছু দিয়ে আমি ওকে সুখি করতে চেয়েছি। তাই সেদিন বৃষ্টি কেও ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে, অনন্ত আর বৃষ্টি কে এক করে দিয়ে আমি অস্ট্রেলিয়া চলে আসি।

অস্ট্রেলিয়া এসেছি অনেক বছর হলো। কিন্তু সেদিনের পর থেকে অনন্তর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি ই সেদিন এয়ারপোর্ট এ ওর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় বলেছিলাম-ও যেন কোনোদিনো আমার সামনে না আসে, কোনোদিনো যেন আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করে। ও আমার কথা রেখেছে। আমার সাথে আর যোগাযোগ করেনি, আমার সামনেও আসেনি কোনোদিন, হয়তো আসবেওনা কখনো। আসলে ওকে দেখলে, ওর সাথে কথা হলে, ওকে না পাওয়ার কষ্ট টা আরো বেড়ে যেতো। জানিনা অনন্ত এখন কোথায় আছে, কেমন আছে।তবে অনন্ত কে সুখী করতেই ওকে বৃষ্টি উপহার দিয়ে আমি পরবাসী মেঘের মতো অস্ট্রেলিয়া চলে এসেছিলাম।

অনন্ত কে আমি সুখী করতে পেরেছি কিনা জানিনা।তবে এটুকু জানি, জীবনে সেই প্রথম বার আর সেই শেষবারের মতো আমি ওকে পরাজিত করতে পেরেছি। ওর কাছে আমি সবসময় পরাজিত হয়েছি, কিন্তু ওকে বৃষ্টি উপহার দিয়ে সেদিন আমি সত্যিই জিতে গেছি।অনন্ত জানো, তোমার সেই দূরন্ত মেঘ এখন আর আগের মতো নেই। তোমার দেয়া কষ্ট গুলো বরফ হয়ে জমে আছে এই মেঘের বুকে। সেই হাসি খুশি দূরন্ত মেঘ তোমাকে হারানোর পর থেকে নির্জনতা বেছে নিয়েছে। তোমাকে না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে, এই দূর পরবাসে আমি যে কিভাবে বেঁচে আছি, কিভাবে যে আমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে, আমি জানি না।

তবুও শত প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে,তোমাকে না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে,এই মেঘ আজো বেঁচে আছে।জানিনা এভাবে আর কতদিন বেঁচে থাকতে পারবো। অনন্ত, যদি কোনো একদিন আবাবিল পাখির ডাকে আমার বুক চিরে তোমার কষ্ট গুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে টরেন্স নদী তে বা কোনো এক গভীর রাতে অ্যালবাটার্স বা ডাহুক পাখির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে সাদা শাড়ি পড়ে মাস্তুলবিহীন জাহাজে মেঘের মতো ভাসতে ভাসতে তারা’র দিকনির্দেশনা না পেয়ে গভীর গ্লেন্যাপ সাগরের বুকে হারিয়ে যাই, তবে সেদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো-আকাশের তারা হয়ে পরপারে গিয়েও তোমার অপেক্ষায় আছি।

তোমার আমার মাঝে বৃষ্টিবদল হয়েছে অনন্ত। তাই তোমার ভালবাসা আর তোমার দেয়া কষ্ট গুলো কে পৃথিবীর বুকে অস্ট্রেলিয়ার এই নির্জন ছোট এডিলেইড শহরে হয়তো বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবোনা। পারলে ক্ষমা করে দিও।এ জীবনে তোমার আমার হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবেনা।পরপারে দেখা হবে সেই অপেক্ষায় রইলাম। সেদিন তুমি আর আমি রাতের আকাশের বুকে নীল নক্ষত্র হয়ে জ্বলে রবো।আর সেদিন ই বলবো তোমাকে ঘিরে আমার সব স্বপ্নের কথা, যে কথা গুলো পৃথিবীতে থাকতে বলা হবেনা।সেদিন তোমার আমার মাঝে কোনো বৃষ্টি থাকবেনা। বৃষ্টি থাকবে সপ্তর্ষিমণ্ডল এর মাঝে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হয়ে। কারন ও সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবতী ছিলো, পৃথিবীর বুকে তোমাকে পেয়ে।

অনন্ত, আমার স্বপ্নের কথা বলা শেষ হলে তোমাকেও আকাশের আরো একটি উজ্জ্বল তারা করে সপ্তর্ষিমণ্ডল এর মাঝখানে রেখে দিবো বৃষ্টির সাথে।কারন, পৃথিবীতে যেহেতু তুমি বৃষ্টির হয়ে ছিলে , তাই সেদিন আর নতুন করে তোমাকে পেতে চাইবোনা। তাই বৃষ্টির পাশে ই তোমার জায়গা করে দিবো।আর আমি ঝরে পড়া তারার মতো হারিয়ে যাবো, কোথায় হারাবো জানিনা। অনন্ত, তোমাকে সুখী করবো বলে আমার কোনো স্বপ্ন ই আমি পূরণ করিনি।অন্তত আমার এই শেষ স্বপ্ন টা তুমি পূরণ কোরো। অনন্ত, সুুখে থেকো। বৃষ্টির জলে ভেজা এই পরবাসী মেঘ কে মনে রেখো…..

লেখিকা-মোহনা

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com