,

বোধ।। সুমাইয়া সুলতানা রূপা

 টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সমান্তরালে বয়ে চলা রেললাইনের মাঝে এসে দাঁড়ালো মেয়েটি। পৃথিবীর কোন মায়া এখন তাঁকে টানছে না। তাঁর চোখে চারপাশের সবকিছু এখন ধূসর অন্ধকার। ঝাপসা চোখে আরো একবার চারপাশে তাকালো সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখের দু’পাতা বন্ধ করতেই স্মৃতির পৃষ্ঠামালা থেকে যেন সব পরিষ্কার দেখতে পেলো। মন্ত্রমুগ্ধের মত অমন মায়াভরা চোখে তাকিয়ে তাঁর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে রিদোয়ান। হ্যাঁ রিদোয়ান-ই তো! স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। বুকের ভেতরে তিরতির করে রক্তক্ষরণ আরম্ভ হলো। শিহরিত হলো সে। ভালোবেসে গোপনে বিয়ে করেছিল তাঁরা। দু’পরিবারের কেউ-ই এই বিয়ে সম্বন্ধে অবগত নয়। কথা ছিলো সবকিছু গুছিয়ে তারপর দু’পরিবারের সম্মতিতে বউ করে নিয়ে যাবে তাকে। বিয়ের কিছুদিন বাদে রিদোয়ান বাড়িতে গিয়েছিলো সুখবর নিয়ে ফিরে আসবে বলে। কিন্তু তাঁর আর ফিরে আসা হলো না। এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় অকালেই প্রাণ হারালো সে। এদিকে রিদোয়ানের শোকে পাগলপ্রায় মেয়েটি টের পাচ্ছিলো সে একা নয়। তাঁর ভিতরে কেউ একজন নড়াচড়া করছে অবলীলায়। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে সে। এখন সে কি করবে? পরিবার, সমাজ কেউ কি স্বীকৃতি দেবে তাদের ভালোবাসার এই পরিণতির? না। সে আর ভাবতে পারছে না। মাথার ভিতরটা ফাঁকা বেলুনের মত লাগছে। সে সামনে এগুতে লাগলো। দ্রুতবেগে আসা ট্রেনের সাথে তাঁর মুখোমুখি সংঘর্ষ হলেই সব সমস্যায় সমাধান হয়ে যাবে নিমিষেই। আর একটু বাদেই সে রিদোয়ানের অতি নিকটে পৌঁছে যাবে।

আচমকা কার যেন কোমল হাতের স্পর্শ পেলো সে। কেউ যেন তাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠলো। অস্পষ্ট স্বরে একটি শব্দ শুনতে পেলো। ‘মা ‘….। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না মেয়েটি। তারপর আবারো শুনলো। এবার স্পষ্ট – ‘মা ‘। বুকের ভিতরটা অদ্ভুত রকমের শীতলতায় ভরে গেলো এক মুহূর্তেই। তারপর ভালো করে কান পেতে শুনলো সে। কেউ যেন বলছে,- ” মা, আমাকে তুমি মেরে ফেলবে? পৃথিবীতে আসার আগেই মেরে ফেলবে? মা, মাগো, আমি বাঁচতে চাই। আমার কি দোষ বল? তোমরা চেয়েছো বলেই তো আমি এসেছি। আমাকে বাঁচতে দাও মা। আমি বাঁচতে চাই। এই সুন্দর পৃথিবীটাকে আমি তোমার কোলে মাথা রেখে দেখতে চাই। মা, তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? মা, মাগো ….. “।

তারপর যেন অনেক দূরে চলে যাচ্ছে শব্দটা। 

বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আচমকা চোখ মেলে তাকাতেই তাঁর বোধোদয় হলো। এ কি করতে যাচ্ছিলো সে? তাদের দু’জনার  ভুলের দায় কেন এই অনাগত শিশুটি বহন করবে?

ঝাপসা চোখে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো ট্রেন আসছে। এ কি! সে নড়তে পারছে না কেন? তাঁর পা যেন এখন ভারী লোহার থেকেও অনেক গুণ ভারী বস্তুতে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ করে সে অনুভব করলো, তাঁর ভিতর থেকে কেউ যেন তাঁকে প্রাণপণে ঠেলে দেবার চেষ্টা করছে। এবার সে সাহস ফিরে পেলো। শরীরের এবং মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে রেললাইনটি এক লাফে অতিক্রম করলো।

বিকট শব্দ করে ট্রেনটি সন্তর্পনে তাঁর গা ঘেসে চলে গেলো। এখন সমস্ত জায়গা জুড়ে অদ্ভুত এক নিরবতা বিরাজ করছে। তাঁর মনের সমস্ত ঝড় যেন থেমে গেছে। তারপর সে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিলো, তার সন্তান বীরদর্পে পৃথিবীতে আসবে। হোক সেটা পরিবার কিংবা সমাজের বিপরীতে। সে লড়ে যাবে। প্রাণপণে লড়ে যাবে সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। সদ্য উদিত কোমল সূর্যের মত সে জম্ম দিবে আরেকটি কোমল ভবিষ্যতের।

তাঁর অনাগত সন্তানের হাত ধরেই সে বেচেঁ থাকবে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো “তুমি শুনতে পাচ্ছো রিদোয়ান? আমার সন্তান পৃথিবীতে আসবে। তুমি স্বার্থপরের মত আমাদের ফেলে ওই আকাশের বাসিন্দা হয়েছো। কিন্তু আমি বেচেঁ থাকবো। আমার অনাগত সন্তানের জন্য আমি বেচেঁ থাকবো। আমাকে বাঁচতেই হবে। সমস্ত কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে আমার সন্তানকে একটি উজ্জ্বল আলোয়দীপ্ত আগামীর উপহার দেবার জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। তারপর আরো আত্মবিশ্বাসের সাথে মেয়েটি উচ্চারণ করলো, আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসবে রিদোয়ান। তোমার উত্তরাধিকারী হয়ে সে আসবে।”

এতক্ষন ধরে আকাশের বুকে জমে থাকা ঘন কালো মেঘ গুলো আচমকা বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীতে নামলো। এ বৃষ্টি যেন ধরণীর সমস্ত ঝঞ্ঝাট ধুঁয়ে-মুছে দিতে বদ্ধপরিকর। থমথমে আকাশটা এখন ভীষণ পরিষ্কার। চমৎকার নীলাভ আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সেই আভা এসে পড়েছে মেয়েটির শ্রান্ত মুখে। অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁকে এখন। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন এখন লুটিয়ে পড়েছে তাঁর স্নিগ্ধ কোমল অধরে।

বৃষ্টি যেমন পৃথিবীর সমস্ত মলিনতা ঢেকে দেয় নব রূপে ঠিক তেমনি তাঁর মনের সমস্ত জড়তা, দ্বিধা, ভয় কিংবা অসহায়ত্ব এখন দূর হয়ে গেছে এক নব জীবনের আগমনী বার্তায়। তাঁর অনাগত সন্তানের মত তারও এখন পুনঃজম্ম হলো। আবিষ্কার হলো নতুন এক সত্ত্বার। শুধুমাত্র একটি শব্দ দিয়েই এই সত্ত্বার বিশালতার বহিঃপ্রকাশ সম্ভব। আর তা হলো ‘মাতৃত্ব ‘। তাঁর পরিচয় এখন একটি-ই। সে এখন মা। তাঁকে বহুদূর যেতে হবে। তাঁর পথ চেয়ে আছে তাঁর অনাগত সন্তান। হাত বাড়িয়ে তাঁকে ডাকছে। একটি ছোট্ট ধ্বনি তার চোখে মুখে,- ‘ মা’।

পৃথিবীর এক কোণে সবার অগোচরে জম্ম হলো নতুন এক অধ্যায়ের। নতুন এক বোধের জম্ম হলো তাঁর মনে। আর তা হলো, মাতৃত্ব।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com