শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন

সেহরী ও ইফতার সময় :
আজ ২৪ মে বুধবার, রমজান- ৭, সেহরী : ৩-৪২ মিনিট, ইফতার : ৬-৪২ মিনিট, ডাউনলোড করে নিতে পারেন পুরো ফিচার- সেহরী ও ইফতার-এর সময়সূচী


সাইফুল বাতেন টিটো’র প্রেমের গল্প “সমীকরণ”

সাইফুল বাতেন টিটো’র প্রেমের গল্প “সমীকরণ”



হেমায়েত সাহেব ছেলের পরীক্ষার রেজাল্টে আদৌ খুশি নন। খুশি হবেন কি করে? দিন দিন সে রেজাল্ট খারাপ করেই যাচ্ছে। ক্লাস সিক্সে অ্যাডমিশন টেস্টে প্রথম হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন “এটা ধরে রাখতে পারবিতো?”

সেভেনে উঠেছিল তখন রোল হল সাত। আর তার-ই অফিসের ক্লার্ক সিরাজুলের মেয়ের রোল হলো এক। এবার আরো বাজে অবস্থা। সিরজাুলের মেয়ে রাবেয়ার রোল এক ঠিক-ই রইল আর তার ছেলে কিনা নয়! হায়রে অবস্থা! হেমায়েত সাহেব চেয়েছিলেন ছেলেকে বৃত্তি দেওয়াবেন। সে ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পাবে। তার কিনা রোল নয়। না না না এক দম বাজের পর ও বাজে অবস্থা। এভাবে চলতে দিলে তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এসএসসি পাশ করতে পারবে না। অথচ বড় ছেলেটা কত ভাল। বড় ছেলে হাবিব একবার খালি ক্লাস থ্রিতে দ্বিতীয় হয়েছিল আর প্রত্যেক ক্লাসে প্রথম। এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ছে। কত্ত ভদ্র ছেলে। কোন দিন বাবা-মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি। আর মাইনটা হয়েছে বদের হাড্ডি। খালি মুখে মুখে কথা। দিন দিন সে তার লেখা-পড়া গোল্লায় যাচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। সে আছে খালি ক্রিকেট নিয়ে। সকাল নেই সন্ধ্যা নেই নাওয়া নেই খাওয়া নেই লেখা-পড়া তো নেই-ই আছে শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। হেমায়েত সাহেব এ-পাশ থেকে ও-পাশ ফিরলেন। ঘুম আসছে না।

“কি তোমার ঘুম আসছে না?” গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল তাসলিমা।
“না” আবার চিন্তায় ডুবে গেলেন হেমায়েত সাহেব। আজকাল গায়ে পায়ে বেশ বড় হয়েছে মাঈন। গলার স্বর বদলে গেছে বয়স পনেরো। বড় সেনসিটিভ সময়। এ সময় উচ্চ-বাচ্চ কিছু না বলাই ভালো। উচ্চ-বাচ্চ ওর সাথে অবশ্য কখনওই করা হয়নি। সবার ছোটো তো। মাঝখানের মেয়ে বিয়ে দিয়ে মাঈনের প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে গিয়েছে সবার। কি করা যায় ওকে নিয়ে?
শেষ পিরিয়ডের ক্লাস করেনি মাঈন। বইপত্র নিয়ে চলে এসেছে। এসে বসে আছে তোফাজ্জেলের চায়ের দোকানে। দোকানের পিছনে লুকিয়ে সে এর মধ্যেই দুইটা সিগারেট খেয়ে ফেলেছে। অবশ্য সাথে কবিরও আছে। কবির ওদের ক্লাসেই পড়ে তবে এবছর নিয়ে সে এইটে তিন বছর। কাল রাত ১২টা পর্যন্ত জেগে মাঈন একটা চিঠি লিখেছে। স্কুলে এসেই চিঠিটা কবির কে দেখিয়েছে। কবির বলেছে “ভাল হইছে”। কবির কে সে সিগারেটের সাথে চা-বিস্কুটও খাইয়েছে । বিনিময়ে কবির চিঠিটা আফরোজাকে দিবে।

আফরোজা ওদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। মাঈনের খুব পছন্দ আফরোজাকে। কিন্তু সে আফরোজাকে মুখে কিছুই বলেনি। তার লজ্জা করে। কবির মাঈনের চেয়ে বছর তিনেকর বড় হলেও মাঈন কবির কে তুই করে-ই বলে।
“তুই কি বলিস দোস্ত, আফরোজা রাজি হবে?” বেশ জ্ঞানী ভঙ্গিতে কবির বলল “আরে ভাই রাজি করানোর চিন্তা আমার। তুই এতো চিন্তা করিস না। মাইয়া রাজি তো হইবোই, আরো কতো কিছু হইবো চিন্তা করিস না তুই। আর একটা সিগারেট খাওয়া। মাঈন আরো একটি সিগারেট কিনে কবিরকে দেয়। কবির বড়দের মত ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে
-বাদলে আবার হ্যার পিছে ঘুরে। বাদলরে একটা ঠ্যাংগানি দেওন লাগবো। “কোন বাদল?” আরে টেনের বাদ এক রোল। বয়রাতলা বাসা”
– ও আচ্ছা। কি করা যায় দোস্ত?
কইলাম না, একটা ঠ্যাংগানি দিতে হইবো। ঠ্যাংগানি দিলে পিছু ছাইরা ভাগবো।
দোস্ত মারামারি করলে আব্বু বাসায় উঠতে দিবো না।
তাইলে বাদ দে। প্রেম করন লাগবো না তোর। তুই এমনিতেই পিচ্চি পোলা। বাদল কত্ত বড়। লম্বা চওড়া, জোয়ান মর্দ। তোর মতো পুইচকা না। বাদল আর দুই-চাইর দিন ঘুরলে ওর লগেই মইজ্যা যাইবো আফরোজা। তোরে আর পাত্তাও দিবো না।
মাঈন পুচকে একথা মিথ্যে না। কিন্তু সে বড় হওয়ার জন্য কি কম করছে। নিয়মিত ব্যায়াম করে চলেছে, ছোলা খাচ্ছে, খেতে ইচ্ছা না করলেও খাচ্ছে, রিং এ ঝুলছে, লুকিয়ে লুকিয়ে শেভও করেছে দুই তিন বার। হঠাৎ মাঈন কবিরের হাত চেপে ধরল। –
-না না দোস্ত। তুই বল কি করন লাগবো।
কি লাগবো? বাদলরে একটা কঠিন ঠ্যাংগানি দিবি আর কইয়া দিবি যেন আফরোজার পিছে না ঘুরে।
ঠিক আছে।
-ঠিক আছে কইলে কাম অইবো না। একশো টাকা দে পোলাপান ঠিক করি বিকালে মাইর দেই।
এর মধ্যে স্কুল ছুটি দিয়ে দিলো। কবির আর মাঈন গাছটার গোড়ায় দাড়াল আফরোজা ওদের কাছাকাছি আসতেই কবির গিয়ে চিঠিটা আফরোজাকে দিল। মঈন দেখলে চিঠিটা আফরোজা চটকরে বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে নিল। বেশ খুশি মাঈন। তার পর দুজনে গেল আবার তোফাজ্জল মিয়ার দোকানে গিয়ে দারুচিনি, এলাচ খেয়ে মুখের গন্ধ মেরে কবির কে ১০০ টাকা দিয়ে চলে এল বাসায়। বাসায় ফিরেই ভাবল সিনেমার ছোট নায়ক নায়িকারা কিভাবে প্রেম করে। মাঈন যে ভাবে নায়কের যায়গায় নিজেকে আর নায়িকার যায় গায় আফরোজাকে চিন্তা করতে লাগল। নাহ্ কেমন যেন মিলছে না। আফরোজা এখন-ই অনেকটা বড়। কি করে যে এত বড় হয়ে গেল। মাঈন ও তো বড় হওয়ার জন্য কম চেষ্টা করছে না। অবশ্য লম্বা হয়েছে ও অনেকটা। মা তো সেদিন বলেছে
মাঈনের এক গলা একদম পাইল্টা গ্যাছে। এক্কেবারে হাবিবের মতন হইছে। বাবা বলছে
হাবিবের মত গলা হইলেই কি হয়? লেহা পড়ায় তো হাবিবের পায়েরও যোগ্য না।

মাঈন আফরোজাকেই বিয়ে করবে। দাদাটা বিয়ে করলেই হয়। সিনামার মত মাঈনরা গরীব না। মাঈনের বাবা ব্যাংকের ম্যানেজার আর আফরোজারা কি করে? ওর বাবাও অবশ্য গরীব না। বাজারে দুইটা দোকান আছে। তাতে কি? মাঈন গোসল করে খেয়ে পড়তে বসল। রেজাল্ট বেশ খারাপ হয়েছে। ভাল করে পড়াশুনা করতে হবে। পরদিন স্কুল বন্ধ। মাঈন গেল স্কুল মাঠে খেলতে। কবির এসে জানাল
দোস্ত বাদল গেছে আফরোজাগো পাড়ায় চল মাইর দিয়া আহি।
মাঈন ও বেশ চঞ্চল হয়ে ব্যাট ফেলে কবিরের সাথে চলল। আফরোজাদের পাড়ায় গিয়ে দেখে বাদল সাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। কবির ইসারায় বাদলকে কাছে ডাকল। বাদল কাছে এসে বলল
কিরে কোবরা তুই এইহানে কি চাস? বাদল খানিকটা টিটকারীর সুরে বলল।
কবির কিছু বলছে না দেখে একটু সাহস পেয়ে যায় বাদল। কবিরকে আবার বলে
শোন আমরে এহন আর তুই তুই করবিনা, আপনে কইরা কবি আমি তোর দুই ক্লাস সিনিয়র।
তুই কইরা কমুনা আপনে কইরা কমু নাহ্ তুই গোলামের পুত আমারে কোকারা কইলি ক্যান?
বাদল আচমকা কবিরের কলার চেপে ধরে বলল ‘‘ঐ গালি দিলি ক্যান? গালি দিলি ক্যান?’’ কবির ধুম করে বাদল কে এক ঘুশি মেরে মাটিতে ফেলে দিল। মাঈন এতক্ষণ সব দাড়িয়ে দেখছিল। বাদল মাটিতে পরে থেকেই মাঈন এসে বাদল কে ঘুষি মারতে শুরু করল আর বলতে ও লাগল
তুই আর আফরোজার পিছে ঘুরবিনা হারামজাদা তাইলে জানে খতম কইরা দিমু।

কবির বাদলকে ক্রমাগত ঘুষি মেরেই চলছে। নিচে শুয়ে বাদল ছটফট করছে। বাদলের নাক ফেটে বক্ত বের হাতেই কবির আর মাঈন পালিয়ে গেল। পর পর তির দিন মাঈন স্কুলে গেল না। ভয়ে ভয়ে ছিল কখন বাসায় নালিস আসে। অসুস্থতার ভান করে ঘরে বসে রইল। তিনদিন পর আজ স্কুলে গেল মাঈন। বাদলও নাকি তিন দিন ধরে স্কুলে আসেনি। খবর দিয়েছে মাঈন। বেশ ভাল ভবেই ক্লাস করল। কোথাও কোন গন্ডগোল নেই। তবে কবির আসেনি। স্কুল ছুটির পর মাঈন আফরোজার একটু পিছে হাটা শুরু করল। স্কুলের ব্রীজটা পর হওয়ার পর আফরোজা ব্যাপারী বাড়ীর রাস্তা ধরল। ডাক বাংলার কাছাকাছি আসতেই ওর গা কেমন ছম ছম করে উঠল। কেউ নেই কোথাও যায়গাটা বেশ নিরব। তাই দিনের বেলাও ভয় লাগে মাঈনের। হঠাৎ একটা গাছের আড়াল থেকে বাদল আর একটা ছেলে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। একটা শীতল ¯্রােত ওর মেরুদন্ড বেয়ে নিচে নেমে গেল। বাদল বলল
কেমন আছ চান্দু?

অন্য ছেলেটা খপ করে ওর কলার ধরে ওর নাক বরাবর একটা ঘুষি মারল। ভয়ে আর ব্যাথায় মাঈন জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
যখন ওর জ্ঞান ফিরল প্রথমে বুঝতে পারল না ও কোথায় আছে। পাশ ফিরতে গিয়ে টের পেল ওর শরীরের অনেকাংশেই প্রচন্ড ব্যাথা। ঘাড় ঘুরাতে গিয়েও বেশ ব্যাথা পেল। ঘার ঘুরিয়ে দেখল ওর চার পাশে আরো অনেকেই ওর মত সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে আছে। বুঝল এটা হাসপাতাল। একে একে সব মনে পরল।
মাঈন, বাবা তোর জ্ঞান ফিরেছে? মায়ের ডাকে স্মৃতি ফিরে পেল মাঈন। মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল
তোকে কারা মেরছে বাবা? মাঈন কোন কথা বলে না।
বল বাবা তোকে কারা এমন মেরেছে? কি করেছিলি তুই? মাঈন এবারও কোন কথা বলে না।
কথা বল বাবা। কারা মেরেছ তোকে?
আমি চিনি না।
কেমন কথা চিনিসনা। তুই দেখিসনি?
না হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে এসে মারতে শুরু করেছে।
তুই কাউকে চিনিসনি?
এখন কথা বল না মা আমার খুব মাথা ব্যাথ্যা করছে।
আচ্ছা ঠিক আসে।
মাঈন মার খেয়ে বেহুস হয়ে পরে ছিরো। পথে যাওয়ার সময় দু’জন মাঈনকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের লোকজন স্কুল ড্রেস দেখে ওর হেডমাষ্টারকে খবর দেয়। তার খবর দেয় মাঈনের বাসায়। বেশ মাথা ফেটেছে ভেঙেছে নাকের হাড়। আর তেমন কোন সমস্যা হয়নি। পরের দিন কবির এসে এক ভয়াবহ খবরদিল।
দোস আফরোজার তো বিয়া ঠিক হইছে।
কি কইলি তুই?
আফরোজার বিয়া ঠিক হইছে।
ফাইজলামি করতাছোস ব্যাটা?
না দোস আল্লাহর কসম। আইজ সন্ধ্যায় বিয়া।
কি করুম দোস?
আমি চিন্তা কইরা দেখছি কিছু করার নাই।
আমি তো ওরে ছাড়া মইরা যামু।
মাঈন একটা কথা চিন্তা কর তোর লগে কি ওর বিয়া হওয়া সম্ভব?
কেন সম্ভব না।
তুই এহনও কত্ত ছোড আর তোর বড় ভাইর-ই বিয়া হয় নাই।
তাতে কি হইছে? সে যদি আমারে ভালবাসে তাইলে আমার জন্য অপেক্ষা করব।

দোস এইডা সিনেমা না। হ্যায় তো তোরে ভালবাসে না। তুই এহনও ছোড়। আর মাইয়া বড় হইয়া গেছে। হের বাপতো হ্যারে বিয়া দিবই। আর মাইয়ারা আগে বড় হইয়া যায়, এইডাই নিয়ম। কষ্ট পাইস না দোস। তোর লয়ে যায় বিয়া হইব দেখ হে এহনও হ্যার মায়ের প্যাডে। আর আফরোজা ও অত ভাল মাইয়া না। আমার জানামতে হে আরো তিন জনের লগে ভাব করে। তুই অনেক বেরেনি পোলা। বড় হইয়া আফরোজার চাইয়া কয়েকশগুন ভাল মাইয়া বিয়া করতে পারবি।
মাঈন কোন কথা বলে না। তার দুচোখ বেয়ে পানি পরতে থাকে। আফরোজার বিয়ে ঠিক হয়েছে এ-কথা সত্যি। আজ সন্ধায় বিয়ে। ছেলে ঢাকায় ব্যবসা করে। বেশ পয়সা ওয়ালা। তিনচার দিন পর মাঈন বাড়ীতে এলো। মাথায় ছয়টা সেলাই দিয়েছিল। যা এখন প্রায় শুকিয়ে এসেছে। কিন্তু মনের ঘা শুকায়নি। তার কিশোর মনে দগ দগ করছে এক বিরাট ঘা। সে বছরে মাঈন আর ঘা শুকিয়ে উঠতে পারল না। নিয়মিত সিগারেট খাওয়া শুরু করল। বই পত্র ছুয়েও দেখছে না। ২য় সাময়িক পরীক্ষায় তিন সাব্জেক্টে ফেল করল। বাবা মা মাঈনের চিন্তায় প্রায় নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। হাবিব ঢাকা থেকে বার বার চিঠি লিখছে মাঈন কে ঢাকায় পাঠাচ্ছে জন্য। মাঈন ও যেতে ইচ্ছুক। অবশেষে সকলের সম্মতিতে ফাইনাল পরীক্ষার দুই মাস আরো মাঈনকে ঢাকায় নিয়ে গেল হাবিব। নিয়ে একটা কোচিং-এ ভর্তি করিয়ে দিল। মাঈন বেশ মন দিয়ে পড়াশুনা শুরু করলো। আর ঢাকার নামকরা স্কুল বিএএফ শাহীন স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়ে গেল সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাঈন। দু’বছর পর শাহীন স্কুল থেকে ঢাকা বোর্ডে চতুর্থ হল। আর যেদিন রেজাল্ট দিল সেদিন-ই কবিরের এর চিঠি পেল। চিঠির সব শেষে লিখেছে আফরোজার একটা বাচ্চা হয়েছে। পুরান কথা মনে করে মাঈন দুঃখ করার বদলে একা একা হাসল। কি বোকাই না ছিল তখন। এখন ভাবলেই বেশ হাসি পায়। খুব সহজেই মাঈন নটরডেম কলেজে চান্স পেয়ে গেল। আর সেখানে এসএসসি’র চেয়েও ভাল রেজাল্ট করল। মাঈন ঢাকায় এসে জানতে পারে হাবিব একটা হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছে। বাবা মা কেউ মেনে নেবেনা এই ভয়ে কাউকে জানায় নি। মেয়েটা বেশ সুন্দর। আগে নামছিল অঞ্জলি। হাবিবের সাথে বিয়ে করার পর নাম ধারণ করেছে খাদিজা। হাবিব খাদিজা দু’জনেই এখন ইন্টার্নি করছে। যে টাকা পাচ্ছে তাদিয়ে ভাল করেই তিন জনে সংসার চলে যাচ্ছে। খাদিজা মা হবে। মাঈন ভাবীর প্রেরনায় বেশ ভাল করে লেখা পা শুরু করল।

আজ মাঈনের ফ্ল্যাইট। সে স্টুডেন্ট ভিসায় লন্ডন যাচ্ছে। কিন্তু বার বার দু’চোখ ভিজে উঠছে। সবার কথা মনে পরছে। সবার কথা বিশেষ করে হাবিবের মেয়েটার কথা। সে বারবার বলছে-
কাকা তুমি কবে অসবা?
এইতো মা কয়েকদিন পরেই।
অবশ্যই ১২ই জুনের আগে অসবা। আমার জন্ম দিনে তুমি না থাকে আমি থেকেই কাটবনা।
সামনের ১২ই জুন ওর ও শেষ হয়ে চার শুরু হবে। মাঈন সবাইকে কাঁদিয়ে অর নিজে কেদে চলে গেল। লন্ডনে গিয়ে দেখে সেখানকার জীবনকে যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজ না। দিন রাত শুধু পরিশ্রম করতে হয়। তবে এরা শ্রমের বেশ মূল্য দেয়। সরকার স্বীকৃত সে কোন প্রতিষ্ঠানে ১ ঘন্টা কাজ করলেই সর্বনি¤œ সাড়ে পাঁচ পাউন্ড পাওয়া যায়। আর সর্বোচ্চের সীমা নেই। পাউন্ডে ওর ২দিন চলে। কিন্তু ও প্রতি দিনকাজ করার জন্য পায় চার ঘণ্টা টাকা পয়সা বেশ ভালই যাচ্ছে দিনগুলো। একদিনদেশ থেকে বাবার চিঠি এলো। চিঠির সার সংক্ষে এরম যে,
মাঈনের বাবা মাঈনের উপর প্রচন্ড রাগ করেছে কারণ মাঈন জানতো যে হাবিব এক হিন্দুমেয়েকে বিয়ে করেছে তার পরও কেন সে, বাবাকে জানায়নি। মাঈনের বাবা হাবিবের সাথে সকল সম্পর্ক ছেদ করেছে। লোকে কি বলবে এই জন্য সে বড় ছেলেকে কাগজে কলজে ত্যাজ্যপুত্র করেনি। কিন্তু মনে প্রানেঠিক-ই করেছে। সে আর জীবনে ছেলের মুখ দেখতে চায় না। মাঈন যদি ওরকম কিছু করে তবে সে মাঈনের মুখ দেখতে চায় না।
মাঈন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে আর জীবনে বাংলাদেশে যাবে না।

১৫ বছর পর………..
মাঈন গাড়ী নিয়ে হিট্রো এয়ার পোর্টে অপেক্ষায় করছে। বাংলাদেশ থেকে হাবিব আসবে দু’ই মেয়ে আর বৌকে নিয়ে। কলেজে আজ তার দুটি ক্লাস ছিল। মাঈন এখনে একটা কলেজে পড়ায়। প্রায় পনের মিনিট হয়ে গেল ও এয়ার পোর্টে এসেছে। কিন্তু এখনও বিমান আসেনি। ল্যান্ড করার কথা আরো ১০ মিনিট আগে। এ রকম তো কখনও হয় না। আবহাওয়াতো খারাপ না। হঠাৎ করে পিছন থেকে কেউ একজন ওর চোখ চেপে ধরল হাতটা নরম। নিশ্চ-ই মেয়ে। কে হাতে পারে?
বল তো কে? এক দম পরিষ্কার বাংলা। ও কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারল এটা আর কেউ না চন্দ্রিমা।
তোরা এসে গেছিস?
চন্দ্রিমা হাবিবের বড় মেয়ে। এই ১৬ বছরে এক দিনও এই মেয়ে মাঈনের সাথে কথা না বলে ঘুমায় নি। তাই কণ্ঠ শুনে চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি।
কোথায় সবাইকে দেখে মাঈন আনন্দ করবে তার বদলে মড়া কান্না জুড়ে দিল। অবশ্য ও একা না সবাই কাঁদল। বাসায় গিয়ে খাদিজার চোখ ছানা বড়
তুই তো একদম সংসার পেতে বেশ সুখেই আছিস?
কেন তুমি কি ভেবেছিলে?
না তোর ভাই স্টুডেন্ট অবস্থায় সে ভাবে থাকতো আমি সে রকমই ভেবেছিলাম।
মাঈন মেয়ে দু’টাকে দেখে একদম স্থীর হয়ে গেল। কি সুন্দর হয়েছে। বড়টা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসিটিক্যাল-এ সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। ছোট টা ভিকারুন্নেছা থেকে এস এস সি পাশ করল। আর বাবা মা দু’জনেই বেশ বড় ডাক্তার। বেশ সুখের সংসার শুধু এই সুখে নেই বাবা মায়ের স্বীকৃতি বাবা মা এই দীর্ঘ ১৬ বছরে প্রায় ১৬০০০ চিঠি লিখেছে। তার মধ্যে ১৬ লাখ করে বেশী লিখেছে মাঈনকে বাংলাদেশে যেতে। মাঈনের ঐ একই কথা। বাংলাদেশে সেদিন-ই যাবে যে দিন দুই ভাই সম্মানের সহিত স্বীকৃতি পাবে। রাতে খেয়ে দেয়ে সবাই বসেছে স্যাটেলাইটের সুবাদে সবাই মিলে বাংলাদেশের একটা চ্যানেল দেখছে। হঠাৎ চন্দ্রিমা বলে উঠল।
চাচ্চু তোমার জন্য মেয়ে দেখে রেখেছি। এবার বাংলাদেশে গিয়ে তোমাকে বিয়ে করাবো।
আচ্ছা মা। বিয়ে করব। কিন্তু আমি কি দেশে যেতে পারব না।
কেন?
তোর বাবা কে জিজ্ঞেস কর।
ফাইজলামি বাদ দাও যাবে তুমি বাবা কি জানে? বাবা তুমি কি জান?
মাঈন এবার চল। কারণ মা অসুস্থ। হাবিব বেশ মিনতি করে বলল।
ঠিক আছ যাব। কিন্তু বাবা তোমার কোন অ-সম্মান করলে তো আমি সহ্য করতে পারব না।
তোরা দু’ই ভাই যা না জানিস তার চেয়েও বেশী বোঝার চেষ্টা করিস এই জন্য খারাপ লাকে। তোকে কে বলেছে অসম্মান করবে? বেশ রোষের সাথে বলল খাদিজা ।

বেশী কথা না বলে পরশু চল। মাঈন অবাক হবে বলল।
পরশু মানে? তোমরা কি পরশু যাওয়ার প্লান করেছ নাকি?
কিছু করার নেই সোনা। চন্দ্রিমার ভার্সিটি খোলা। যুথির কোচিং চলছে, আমাদের দু’জনের কথা না হয় বাদ দিলাম।
বাংলাদেশে ফিরে মাঈনে একদম বোকা বনে গেলে। কি বড় বড় বিল্ডিং উঠেছে। রাস্তাঘাট অনেক উন্নত হয়েছে ঠিকই কিন্তু জ্যাম কমেনি।
এয়ারপোর্টের কাছাকাছি থাকার কারণে মাঈনের বাসায় আসতে তেমন দেরী হলনা। বাসায় যে এত বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তা মাঈন কোন দিন কল্পনাও করতে পারেনি। বাসার দরজা খুলে দিয়ে মাঈন কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলেন মাঈনের মা তাছলিমা বেগম। এরকম একটি ঘটনার জন্য মাঈন কোনক্রমেই প্রস্তুত ছিলনা।
কেমন আছিস বাবা? কত্ত বড় হয়েছিস!
এই তো ভাল, তুমিও তো এদম বুড় হয়ে গিয়েছ। বাবা কোথায়? কেমন আছে বাবা?
ভাল আছে সবাই-ই আছে তুই আয়। ভিতরে আয়। ছেলের হাত ধরে ভিতরে নিতে নিতে তাছলিমা বলল কিরে হাবিব তোর মুখটা এমন শুকনা লাগছে কেন?
শোন মা যত বারই তার ছেলেকে দেখে তত বারই মনে হয় ছেলে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, নয়তো মুখটা শুননা লাগছে।
তোর অত পাকা পাকা কথা বলার দরকার নেই। চল তোর বাবার কাছে যাই।

মাঈনের বিস্ময় ক্রমশ বাড়ছে। এত বড় বাড়ি। বাড়ি সাজ সরঞ্জাম দেখে বোঝা যাচ্চে, এরা চার হাতে টাকা কামায়। ঢাকার অভিজাত এলাকায় প্রকা- এক দোতলা বাড়ি। সদর দরজা ২৪ ঘন্টা পাহাড়ায় থাকে উর্দি প্রহরী। উপর তলা আর নীচ তলা মিলিয়ে ১৬/১৭ খানা ঘর। বিশ^বিদ্যালয় আর কলেজ পড়–য়া দুই নাতনিকে নিয়ে হেমায়েত সাহেব আর তাসলিমা উপর তলায় ৩ খানা ঘর জুড়ে থাকেন। খাওয়া দাওয়া করতে তিন বেলাই ছেলে আর ছেলের বউ উপরে যায়। বৃদ্ধ দম্পত্তি কালে ভদ্রে নিচে নামেন। হাবিব খাদিজা ড্রাইভার কাজের লোক নিচতলায় আর গ্যারেজে থাকে। মাঈনের বিস্ময়ের প্রধান করেন সে জানত না যে বাবা-মা ভাইয়া-ভাবীর সাথে থাকেন। বাবা মায়ের থাকার আর ভঙ্গি দেখে মনে হয় না যে মাঈনকে বলে বাবা মাকে পারমানেন্টলি থাকতে বালতে হবে, মনে হয় দীর্ঘদিন ধরেই তারা আছে। হাবিবের স্ত্রী সন্তান ও পাকা অভিনেত্রী তা স্বচক্ষে না দেখেলে সে বুঝতই বা কি করে? পিতা পুত্রের মানসিক মিলন হয়েছে তাও বছর গড়িয়েছে। আর এই মিলন ঘটিয়েছে হাবিবের কন্যা দ্বয়। কিন্তু এর মধ্যেও কম করে হলেও ৫০০ বার মাঈনের সাথে দু’পক্ষেরই কিন্তু কেউ-ই কিছু বলেনি। মাঝারী সাইজের রুমের ভেজানো দরজা ঠেলে মাঈন ভিতের চোখ রেখে বিস্ময় বিহব্বল হয়ে গেল। পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে আধ শোওয়া হয়ে যিনি আছেন তার সাথে মাঈনের দেখা ১৬/১৭ বছর আগের বাবার সুহশ্রী ছাড়া আর তেমন কোন মিল নেই। এক মুখ দাড়ি আর আধ মাথা চুলের সবই পাকা। আর পেটটি অস্বাভাবিক রকমের বড়। ভূড়ির সাথে শরীরের অন্যান্ন অংশের চর্বিও বৃদ্ধি পেয়েছে বেশ। আর পরও মুখের দাড়ী, মাথার টাক, ভুড়ি আর পরি ১৭ বছরের দূরত্ব, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান সবই পিতৃত্যের কাছে পরাজিত হল। মাঈন গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। প্রতি উত্তরে বাবাও যেন তৃষিত চাতএকর পরিবর্তে আষ্টেনৃষ্টে বুকে জড়িয়ে উভয়েই বেশ কিছুক্ষণ অশ্রুপাত করলেন।
তোমার পায়ে একি হয়েছে বাবা?
আরে তেমন কিছু না সিড়ি দিয়ে পড়ে মচকে গিয়েছে।
মুখে তেমন কিছু না বললেও পঙ্গু হাসাপাতালের অর্থপেডিক ডাক্তার যার কিনা ভাঙাচুড়া জোড়া লাগানোর সুনাম সমীনা পেরিয়েছে, তার কাছ থেকে ঠিকই জেনেছে যে হেমায়েত সাহেবের টিবিয়া দুইভাগ হয়েছে তার ফিবুলায় চিড় ধরেছে। আর সেই জোড়া লাগানোর ডাক্তার যখন নিজের সন্তান অবশ্যই সে বাবাকে বাড়িয়ে তো বলেইনি বরং হেমায়েত সাহেবের ধারণা পারলে খানিকটা কমিয়ে বলেছে।
মাঈনের দিন পনের চলে গেল ঢাকায় ওদেও নানা আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে করতে । দুই ভাতিজিকে নিয়ে সন্ধ্যা ঢাকা শহর টই টই করতে করতে। প্রায় সপ্তাহ দেড়েক পরে বসল পরিবারিক আলোচনা সভা যার মধ্য মনি বা প্রধান অতিথি যাই বলিনা কেন সে আমাদের বিলেত ফেরৎ মাঈন আর আলোচনা বিষয় বস্তু তার বিয়ে। লন্ডনে যাওয়ার পরে নাঈমের সাথে পরিচয় ঘটে সোফিয়া নামের এক আরবী যুবতীর সাথে। দুইজনার ধর্ম, অধ্যায়নের বিষয় এক আর আবাস স্থল কাছাকাছি হওয়া তাদের বন্ধুত্ব হয় দ্রুত। আর এই বন্ধত্বই এক সময় দুইজনকে ভিন্ন স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখায় সারা জীবন দু’জনে পাশাপাশি থাকার, একজনের সুখে অন্যে সুখি হবার কিংবা দু’খে দুখি হবার। চলছিলও বেশ ভালো। কোন এক রাত্রি কালিন আহারের আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে মাঈন নারী জাতির আরেক রূপ দেখে সত্যি সত্যি প্রেম ভালবাসা চিরদিনের জন্য বিদায় দিয়ে দিয়েছে। হাজার পাউন্ড বেতনের কথা চিন্তা করে পড়া লেখায় আবার মন দেয় মাঈন। কারণ সেদিন ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের প্রধান অতিথি মাঈন নয়, ছিল আসাদুল্লাহ নামের এক আরবী তৈল কুপের মালিক। আছিয়া পরে নিজ মুখের স্বীকার করেছে যে লন্ডনওে এই কাঠখোট্টা যান্ত্রিক জীবনে খানিক সময় ভিন্ন রকম কাটানোর উদ্দেশ্যেই সে মাঈন কে বেছে নিয়েছিল। বাল্যকালের প্রেমের অপমৃত্যু আর যুবক বয়সের প্রেমের পরিহাসের কারণে মাঈন মনে মনে ঠিক করে ছিল বাকি জীবনটা নারী ছাড়াই কাটাবো। কিন্তু বাবা মা, যা বললেন তাতে মাঈন সিন্ধান্ত পরিবর্তনের সিন্ধান্তই নিল। বাবা মার কথাটা ছিল এরকম। অর্থের দৈন্যতার কারণে মেয়েটার বিয়েতে ধুমধাম করে দিতে পারেনি। বড় ছেরে বিয়ের খবর তো বাবা মায়ের চেয়ে মাঈন-ই ভাল জানে। এখন শেষ পর্যন্ত ইচ্ছা তারা মারা যাওয়ার আরো মাঈনের বিয়েটা ঠিক ঠাক মতো দেয়া। আর এতে যদি মাঈনের কোন প্রকার অনিহা থাকে তবে বুড়ো বুড়ি দু’জনেরই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার আগেই নিজের ইচ্ছায় ইহধাম ত্যাগ করবে। অর্থাৎ আত্মহত্যার হুমকি!
ঠিক আছে তোমরা মেয়ে দেখ।
সবার মধ্যে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। চন্দ্রিমা সবার আগে বলল
মেয়ে দেখতে হবে না। আমরা মেয়ে দেখে রেখেছি।
কোথায়?
ঢাকাতেই। চশমাটা মুছতে মুছতে বলেলেন হেমায়েত সাহেব।
মেয়ে আমরা সবাই দেখেছি। দেখলে তোমারও পছন্দ হবে। আর তুমি এটা ভেবনা যে তোমার জন্য একটা বদসুরৎ মেয়ে এনে সারা জীবন কথা শুনব। বলে একটু মুচকি হাসল খাদিজা।
‘চন্দ্রিমার পছন্দ আছে বটে।’’ এরকম আরো বিবিধ মন্তব্যে বিয়ের আলোচনা এগিয়ে চলল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল একমাত্র মেয়ে নওশিন কুমিল্লা থেকে কাল আসলেই সবাই মিলে মেয়ে দেখতে যাবে। আর সেই দিন মেয়ের বাড়িতেই বিয়ের দিন ধার্য হবে।
পরের দিন দুপুর বারটায় নওশীন তার চুয়েটে পড়–য়া ছেলে জামিম আর স্বামী লেঃ কর্নেল বাসেদ কে নিয়ে হাজির। এসেই কান্নাকাটির রোল। পরেরদিন সকাল ৯ টায় সবাই রওনা দিল মেয়ে দেখতে। কিন্তু বাধ সাধল মাঈন। সে মেয়ে দেখতে যাবে না যাবে না তো যাবেইনা।
তোমরাই যাও। আমি আবার গিয়ে কি করব?
তুই বিয়ে করবি আর তুই মেয়ে দেখবিনা এটা কেমন কথা? নওশিনের কণ্ঠে রাগ ও বিস্ময় দু’টই প্রকাশ পেল।
এক সময় চন্দ্রিমও অনুরোধ করতে এল।
চল চাচ্চু প্লীজ। আর তুমি না গেলে আমিও যাব না।
তোর যাওয়ার দরকার আছে বলে তো আমি মনে করি না। তুই-ই নাকি সবার আগে মেয়েকে দেখেছিস। তো তুই আবার না দেখলেও পারিস।
আচ্ছা ঠিক আছে যাবনা।
শেষ পর্যন্ত জামিল বলল সেও যাবে না। উপায়অন্ত না দেখে পা ব্যথার কারণে হেমায়েত সাহেব আর গোয়ার্তুমির কারণে বিয়ের পাত্র, ঘটক চন্দ্রিমা, ও ভাগনে জামিল বাদে সবাই ২টি গাড়ীতে পাত্রীর বাড়ীতে রওনা দিল। সবাই চলে যাওয়ার পর মাঈন হঠাৎ চন্দ্রিমার চুল ধরে বলল
কি ব্যাপার হ্যা? কাল জামিল আসার পর এত খুশি কেন? তুই যাবিনা ওমনি জামিল ও যাবে না। বলি, ব্যাপারখানা কি হ্যা?
কই চাচ্চু? কিছু না তো। তুমি আবার কিসের মধ্যে কি খুজছ? চন্দ্রিমার কণ্ঠে কৃত্রিম বিস্ময়।
আমার সাথে মামদোবাজি না? সত্যি কথা বল।

আরো জোড়ে চুলে টান দিল, মাঈন। তিন জন মিলে এরকম খুনশুটিতে কটিয়ে দিল সারা দিন। আসরের কিছু আগে সবাই হাজির। ভাব ভঙ্গিতে বোঝা যচ্ছে সবাই বেশ খুশি। সবার-ই মেয়ে পছন্দ হয়েছে। এখন মাঈন জানে বায়ে নয় উপর নিচ হলেই কেবল বিয়ের তারিখ দেয়া সম্ভব।
মাঈন তুই যদি মেয়ে দেখতে চাস তো দেখতে পারিস। আর না হলে এবার সবাই মিলে তারিখ দিয়ে দেই। বললেন কর্নেল। তবে একটু তারাতারি করলে খুশি হব। কারণ আমি থাকতে খুবই আগ্রহী। কিন্তু আমি সরকারী চাকুরী জীবি । হাতে কোন ছুটি নেই।
আমিআর কি বলব। আপনাবাই বলে দিন দেখে ঠিক করুন।
সবার মধ্যে আনন্দের বন্যা পুনঃরায় প্রবাহিত হলো ঠিকই কিন্তু নওশিন শুরু থেকেই খুত খুত করে যাচ্ছে। সন্ধার কিছু পর চা খেতে খেতে নওশিন বলল
মেয়ের বয়স তো খুবই কম। চন্দ্রিমার সাথে পড়ে। মাঈনের অর্ধেক। মানতে পারবে ওরা শেষ পর্যন্ত?
আরে ধুর এটা একটা বিষয়? আজকাল কেউ ভাবে নাকি এসব যায়? বললেন তাসলিমা বেগম।
এমনিতেই রাজি হয় না তুই আবার একটা ফআও ইস্যু তুলসিস না নওশিন।
ঠিক আছে তোমরা যা ভাল মনে কর।

রাতে খাওয়ার টেবিলে সিদ্ধান্ত হল পরশু অর্থাৎ শুক্রবার বিয়ে। সারা বাড়িতে উৎসবের আমেজ। সবাই এদিক সেদিক ফোন করে যাকে দরকার দাওয়াত দিচ্ছে সেই রাত্রেই নওশিন, কর্ণেল আর খাদিজা গেল কার্ড ছাপাতে। মাঈনের ভাতিজি ভাগ্নী যে যেভাবে পারছে ঘর দোর সাজাচ্ছে। হাবিব ফোন করে উত্তরার একটা অভিজাত চাইনিজ রেস্তোরা ঠিক করলো। শুক্রবার সকালে গায়ে গায়ে হলুদ হয়ে গেল। জুম্মার পরে সবাই গেল মেয়ে বাড়ীতে। সেখানেও আর এক উৎসব। যে যেভাবে পারছে আনন্দ ফুর্তি করছে। চন্দ্রিমা গেল মুক্তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল ‘‘কিরে দোস্ত বলছিলাম না তোরে আমার চাচি বানাবো। কি এবার হল তো?’’ মুক্তা কেঁদে ফেলল।
আরে কাঁদছিস কেন? বিস্মিত হল চন্দ্রিমা।
আমার মা কোথায় চন্দ্রি?
নিজ বান্ধবী ও চাচীকে কিভাবে চন্দ্রিমা সান্তনা দিবে বুঝে উঠতে পারছে না। মুক্তার মা ৩ বছর হল ওকে ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছে। যা আজও মুক্তাকেই শুধু না নিকট স্বজন সবাইকে কাঁদায়। মরার বছর দু’য়েক আগে ব্লাড ক্যান্সার ধরা পরে। প্রথম থেকেই চিকিৎসার কোন একটি হয়নি। শেষ পর্যন্ত মাদ্রাজে মারা গেলেন। এত অল্প বয়সে প্রস্থান কেউ-ই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনি। বিয়ে বাড়িরর উৎসবে হঠাৎ যেন একটি শোকের ঢেউ উঠল।

সেদিন সন্ধায় এক আলোক স্বজ্জাত মনোরম পরিবেশে বিয়ে সম্পন্ন হল। বিয়ের এক পর্যায়ে যখন আয়নায় একে অপরের মুখ দেখাদেখির পালা তখন মাঈন চন্দ্রিমার কানে কানে বলল সে বাসর ঘরে ছাড়া তার বউ দেখতে চায় না। তথাস্তুত। রাত ২টায় পুস্প সজ্জিত মোটরজানে নতুন বৌ নিয়ে মাঈন বাড়ী ফিরল। বাসর ঘরের সব ধরনের রশিকতা ও ফরর্মালিটিজ শেষ করে যখন মাঈনের বাসর ঘরে প্রবেশের সুযোগ ঘটল তখন রাত্র তিনটার কাছাকাছি। এবার সে বৌ দেখবে। সেই বহু প্রতিক্ষিত মূহূর্ত এখন। সেই মূহুর্তেই জন্য হয়তো সকল পুরুষই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে। মাঈন বাসর ঘরে প্রবেশ করতেই মুক্তা এসে মাঈনের পা ছুয়ে সালাম করে আবার গুটি সুটি মেরে বসে পরল। মাঈন কিছু বুঝে উঠতে পারল না। মনে মনে ভাবল বাসর রাতে মনে হয় এটাই নিয়ম। মাঈনেরও উচিৎ মুক্তাকে সালাম করা? মাথার পাগরীটা ওয়াড্রবের উপরে রেখে পাশে গিয়ে বসল।
কেমন আছ তুমি?
আছি ভাল আছি। আপনি ভাল আছেন।
হ্যা।
এর পর মাঈনে কি বলা উচিৎ বুঝতে পারছেনা। সে যতদুর জানে তার স্ত্রী তার ভাতিজির বান্ধবী। অর্থাৎ মাঈনের কাছে নিতান্তই বালিকা। মাঈন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে বলল
তুমি কি তোমার ঘোমটা একটু সরাবে?
মুক্তা কোন কোথা বলল না। মাঈন আরো কাছে গিয়ে নিজেই ঘোমটা সরাল। এর পর হাত দিয়ে মুখটা তুলতেই একটা ৩৩০০ ভোল্টেজের শক খাওয়ার মত ছিটকে সরে এল। মুক্তাও হতভম্ব হয়ে গেল। মাঈন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কিভাবে সম্ভব? মাঈন আবার ফিরে তাকাল, নতুন বৌয়ের দিকে। নাহ্ ঐ একই মুখোই। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? মাঈনের নতুন বৌয়ের আসনে বসে আছে তার কিশোর বয়সের প্রেম, যার জন্য ঐ সময়ে সব কিছু করতে পারত। মনে মনে ভেবেছিল যে তাকে বিয়ে করতে পারলে হয়তো বাঁচবেনা। কিন্তু ও এখানে এলো কি করে? আর ভুল ও তো হওয়া সম্ভবনা। মাঈনের বিস্ময়ের ঘোর কাটছেনা কিছুতেই। সেই নাক, সেই চোখ, সেই ঠোঁট, সেই চাহনি……
আবার তাকিয়ে দেখল মাঈন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসর ঘরেও মাঈন ঘামতে শুরু করল। নাহ আফরোজাই বসে আছে ওর বৌয়ের আসনে।
আচ্ছা তোমাদের দেশের বাড়ী কোথায়?
ময়মনসিংহ ফুলপুর।
তোমার বাবার নাম কি আনিসুজ্জামান জোয়ারদার?
কি বলছেন আপনি? উনি তো আমার নানা হন।
ওহ মাই গড। তোমার মায়ের নাম কি? আফরোজা ইসলাম?
হ্যা কেন?
না এমনি। মাঈন হঠাৎ আনমনা হয়েগেল। বারান্দায় গিয়ে নিজেকে ইজি চেয়ারের সপে গিয়ে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করতে লাগল।
হঠাৎ আজানের শব্দে ও স্বম্বিৎ ফিরে পেল মাঈন। কিছু সময় পর একটা হাতে স্পর্শে ও চমকে উঠল।
আজকাল শেষ রাতে ঠান্ডা বাড়তে শুরু করেছে, চলুন ভিতরে চলুন।
মাঈন বাধা ছেলের মত মুক্তার পিছনে পিছনে পুনরায় বাসর ঘরে প্রবেশ করল।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media








© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com