,

আসমা অধরা’র এক বাণ্ডিল লেখনী

পৃথিবী ও আভ্যন্তরীণ মানচিত্র

কুল মেনথল,
ঠান্ডা চামড়ার গুইসাপ
সুখ আর মৌসুমী বায়ু
ঠোঁট কাটা কথার সদৃশ্য রোদে
আর ভাঁপা চিংড়ি লবন যেন
পাঁচতারার আকাশেও মেঘ আছে,
তবুও ঐখানে রান্না মাংসে
মসলা ঢোকে না।
এই ভীষন শহরে সহজ কথা কেবল,
“বেলাজ বসের মুখ আর বইতে লেখা থাকে,
বাকীরা জ্বলে যায় উনুনে। “– তা ভেবে থাকলে ভুল।

এখানে এখন আর আংশিক ভোরে
শরত্‍ শিশির ঝরা চোখ নেই
এ পৃথিবীতে এখন আর রোদ্দুর মাখায় না
দোয়েলের তীব্র কন্ঠশীষ।

সোডিয়াম আলোয় মাকড়ের বসতি,
হলুদ গুপ্তচরী আঁধারে
আকাশমনির ডাল; বিষশ্বাস
রতিলীলা।
এ বড় বিষাক্ততা,
কড়া নাড়া জোনাকরাত
অভিযোজিত করে ঘুমঘোর;
মাঝরাত্তিরে, ছোবল দ্যায় আয়না,
নিস্তরঙ্গ আলোড়নে
স্বরূপে আবর্তিত কঠিন বলয় রেখা ।

[ বিলবোর্ডের মেয়ে ছেলেগুলার মতন দাঁত কেলিয়ে ক্যামনে হাসেন? নির্লজ্জ ঐসব দেখলেও রাগে গা জ্বলে যায়। আমি ছেড়ে কথা কইতে পারি না দাদা, শুনলে আপনার কান, লাল শাক দিয়ে মাখা ভাতের মতো ম্যাজেন্টা হয়ে যায় ক্যানো? সেইটা দেখলেও মায়া লাগে না কিন্তু!]

স্থবির নির্ঘণ্ট

অভিযোজিত আর্দ্রতায় ইট কাঠ পাথরের শহর,
গুমোট ভ্যাপসা গরমে টুপ টাপ ঝরায় নিঃশব্দ ঘামের ফোঁটা, সূর্য উঁকি না দিলে যে পৃথিবী শংকিত হয়- সেই প্রচন্ড ব্যস্ত নগরীও যেন
আজকাল মাঝ রাতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচে ওঠে,
হুস করে ছেড়ে দ্যায় আটকে থাকা বুকের গুমোট শ্বাস।
আধপোড়া পেট্রল বা ডিজেল এর দমবন্ধ অস্তিত্বকে
মুক্তি দেয়া মৃদু হাওয়া আঙুল বুলিয়ে দেয় উত্তপ্ত দেয়ালের পাঁজরে; জুড়িয়ে যায় ধিকধিক ভাটার আগুনে জ্বলে যাওয়া ইমারতের শরীর।

আকাশের ক্যানভাসে যে অপূর্ব পেইন্টিং; তা
কেবল চাঁদ ভরাট হবার পুর্বরাত,
মেঘের ছায়া অবয়ব-
মাঝরাতের ধুসর আকাশে ফেলে রাখে শিথিল শরীর। সে বাতাসে গাল পেতে দিলে
চোখের ভাঁজে আলপনা আঁকে ঝিরিঝিরি ছাইরঙা নারকোল পাতা, তোলে বিস্তর সিম্ফোনি;
আর তার ফাঁক ফোকর গলে ইতিউতি উঁকি দেয় গোল এলুমিনিয়াম ফয়েলের মতো জ্বলজ্বলে হ্যালুসিনেশন চাঁদ!

অকৃপন উপচে পড়া ফ্যাকাশে অথচ
দৃষ্টিগোচর আলো- ভেসে যায় কাঠখোট্টা শহর, উদ্ভিন্ন বাতাসে উলটে যায় ফেইরী টেল এর পাতা, আর…
পুরু কাঁচের চশমা পরা সদ্য কিশোর ঝড় তোলে গীটারে। ঘষা কাঁচের ভেতর থেকে গলে গলে
পড়ে মায়া, চিকচিক করে ওঠে ঘনপল্লব।
আর যে যুবকের চোখে জন্মকাজল মাখানো, সেও এই চাঁদকে ভালোবেসে কুলটা বলেই
মৃদু হেসে আঙুল চালায় চুলে,
পা ঘষটে বাড়ীর পথ ধরে ঈষৎ খুঁড়িয়ে।

সে জানে, চাঁদটাকে তার হটাত্‍ মনে হয়েছিল
সেই প্রেয়সীর মুখ !
সারাটা আকাশ আর পৃথিবী আলোয় ভাসিয়ে যে
হাসছে আধপোড়া সেই বিবর্ণ হৃদয়ে, যার রঙ
একদিন ছিল টাটকা গোলাপি;
আজকাল যার শ্বাসনালী জুড়ে আটকে থাকে জমাট ট্যালকম পাউডার…

হায় পূর্নিমার চাঁদ!
শেষ পর্যন্ত তুমিও খুঁড়ে খুঁড়ে সেই ব্যথাই তোলো,
বিধবা আলোয় তরতাজা করে দাও প্রায়
শুকিয়ে আসা গাঢ় খয়েরী ক্ষত;
বিগত পক্ষকালব্যাপী যেখানে
নিশ্চুপ ছিল তুমুল নির্বাণ।

প্রণয় তন্তুবায়

ওই যে মুহূর্তে চেপে ধরলাম সাইকেলের ব্রেক, হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেলাম লজ্জাবতী ঝোপের ওপর। আর যাবতীয় লজ্জা ভুলে তখন কেবল কাঁটাই বিঁধতে ব্যাস্ত সে। আচ্ছা সাইকেলের কথা থাক, সুতোর কথা বলি- হাতখানেক লম্বা, কিসের হতে পারে–
ঘুড়ি কাটা সুতো,
নাকি সেলাই মেশিন!
ইজের নাকি শার্ট,
চুড়িদার নাকি এমব্রয়ডারি
নতুন সুতো না পুরনো সুতো,
দাঁতে কাটা না কাঁচিতে কাটা!

ভাবতে ভাবতে এই সামান্য সুতোই রয়ে গেল হাতে, বেশীটুকু যেখানে- সেটা মাধ্যমের কাহিনী।

শাড়ীর নয়, জামার নয়, বোতাম খোলা প্যাচের নয়…সোজাসাপ্টা এক নমনীয় নীল উপাখ্যান।

সুতোটুকু নিয়ে উঠি, পরমাশ্চর্যের মতো সে যে গন্ধটুকু বয়ে বেড়াচ্ছে, তার সাথে মনে পড়ে যায় কেবলমাত্র প্রেমের কথা। সেই যখন চিঠি চালাচালি সময়ে টুপ করে এক ফোঁটা সুবাস ঢেলে দিতো প্রাচীন প্রেমিকা। অথবা নিঝুম হয়ে থাকবার পরের ক্ষনেই বাতাসের সাথে ভেসে আসা রতি খানেক ইভনিং?

মুঠোর ভেতর দুরন্ত উল্লাসের মতো সুতো নিয়ে ঘুরি- যেমনি দূরাগত ট্রেনের হুইসেল শুনলে রক্তের মধ্যে ঝনঝন টের পেতাম, পায়ের তালু থেকে বুকের দিকে রওনা হতো শ’পাঁচেক দুরন্ত খরগোশ। সুতো, সুতো- ফিজিক্সের মতানুযায়ী হাতের মুঠোতে কিছুটা যায়গা দখল করে আছে, কেমিস্ট্রির মতন নিউরনে বুদবুদ তুলছে, মনের ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জোনাকির আলোর কনভয় সাজিয়ে আর্য জনপদের দিকে।

আহ সুতো!
আটঘাট বেঁধে স্থাপন করে দিচ্ছে
দৃশ্য থেকে অদৃশ্য;
বাস্তব থেকে কল্পনা;
বিরহ থেকে প্রেম।
মকবুল ফিদা হুসেনের মতো,
রঙ করছে চটুল চিন্তা;
অলিভের পাতা জুড়ে জুলিয়েটের ঐতিহাসিক প্রণতি,
দৃশ্যমান সুখ- অদৃশ্য ক্ষত,
লকলকে জলপ্রপাতীয় আগুন,
কেবল একবার প্রিয়মুখ
দেখার আকাঙ্ক্ষায় মরে যাবার সাধ;

সব, সব ঐ এক
নামগোত্রহীন সুতোর কৃচ্ছতা।

বিচ্ছিন্ন তর্জনী ও নিমধ্যমা কাহিনী

রাতপ্রহরীর শীষ;
চমকে ওঠে কুন্ডলাকৃতি কুকুর- শুঁকে
দ্যাখে না দেখা বাতাস,
নি:শ্বাসের দরোজা দিয়ে
বিস্ফোরকে ছিন্নভিন্ন
কল্পিত মানবীরুপ
কয়লা শ্রমিকের গন্ধ ভেসে আসে।

যদিও, অনুল্লেখ্য শতকোটি সত্যের মতোই
পৃথিবীও জানতো; তাঁর- সুরমা রঙা চামড়া আর কালচে ক্ষয়ে যাওয়া নখে, কখনো- কখনোই চর্চিত কোনো সেবার ছোঁয়া ছিলনা।

এসো, এখানে অনুচ্চারিত এক প্রশ্ন লিখে দিই!
বাঁচার আকুতি শেষ হবার পর-
ধরিত্রীর কোথাও মুখ লুকোনোই যদি ছিল যুবকের উদ্দেশ্য অথবা বিধেয়, সে’ই; পৃথিবীর নির্জন কোনো একটি
কোণে বসে থাকা-
তাবৎ অবিশ্বাসে বোঝাই
প্রশান্ত সাবমেরিনের মতন
জলজ মৃৎ- মানবী এক;
যে তখনো ছিল কবির বরুণার মতোই নির্মল,
ছিল বাবুই পাখীর বুকের ন্যায় কোমল;
কদাচিৎ তার কাজল দেয়া চোখ তুলে চাইলে- প্রলয় না ঘটলেও কিঞ্চিত টলে উঠতেন অদৃশ্য সেই বিধাতা-
সেই, সেই, সেই তরুণীর তদাবধী গাঢ় গোলাপী অথচ নিয়মমাফিক
কিছু বীট মিস করা
হৃদপিণ্ডেই ক্যানো ঢেলে দেয়া হয়েছিল
সুচতুর, সুকৌশলিক ও সুনির্বাচিত চারু ও কারু সর্বনাশের মুল অভিধান?

ছিন্নভিন্ন সেই মন ভাল রাখার জন্য;
যে তরুণী কখনো ভালবাসার উল্লিখিত সেই দাবী নিয়ে,
অথবা বলা যায় করুণা করে হলেও
অযুত ও নিযুতের কোটা পার হয়ে যাওয়া
শত শত নিশ্চুপ প্রশ্নের ভারে নুয়ে
পড়ে–
তোলেনি সেই চোখ বরাবর একটিও আঙুল!
যে হাতের তর্জনীর অগ্রভাগ-
সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে,
দিবসের মতো উদ্ভাসিত,
ও সত্যের মতো প্রদাহ সৃষ্টিতে সক্ষম অবলীলায়।

অথচ এখনো,
ঐ সমস্ত বিনাশকালীন দিন ও রাত ফিরে আসে,
ঐ একই চাঁদ নির্মোহ বৈধব্যের মতো ফ্যাকাশে আলো বিলোয়,
ঐ সব রহস্যঘন রাত্রির শুভ- অশুভ প্রহরেও জোনাকীরা নিরুত্তাপ নৈশ দিপ্তী ছড়ায়,
ঐ সব জামের বন ভেসে যায় জারুলের মতো রঙ- মুকুল মাতাল ঘ্রাণে।

হৃদয়ের বেশী কাছে এলে, যতো বেশী খুলে দেখাবে নিজেকে,
নিমগ্ন হবে- হতে চাইবে নির্ভার উড়াল সেতু এক;
ঠিক ওইখানেই প্রি প্রোগ্রামড রোবটের মতন,আদিপিতার ক্রোমোজোম গুঞ্জন করে উঠবে অট্টহাস্যে-
ভ্রুকুঞ্চিত হবে, ললাটব্যাপ্ত- সন্দেহের মিছিলে নষ্ট ও ঘৃণ্য প্রশ্নের শ্লোগান থামানো যাবে না।

তারচে এই ভালো কোন একদিন পাতলা; অথচ তীক্ষ্ণ কোন
বেলচার ঘায়ে উঠে আসবে
সেই হাত,
সেই করতল-
সেই আঙুল তথা তর্জনী-

একদিন নিজের ওপর বিশ্বাস ও ভারসাম্য হারানো কোন যুবক নিপুণ অভিনয়ে ভালবাসা খেলায়, ভালোবাসি বলে ছুঁয়েছিল যাকে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com