বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

English Version
মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা”

মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা”

মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা”



যে সকল পাঠক গত পর্ব পড়তে পারেনি তাদের জন্য লিঙ্ক দেয়া হলোঃ পর্ব-১ , পর্ব-২ পর্ব-৩
০৮.
মারুফের দোকানে বসাটাই এখন উদ্দেশ্যে যোগ হলো,মেয়েটিকে দেখা। টাঙানো চিপসের ঝুপড়ির আড়াল থেকে নয়তো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে দেখে নেয়,খানিকটা লুকোচুরির মতো। কেননা এলাকায় মান-সম্মানের ব্যাপার একটা ছিল। তদোপুরি সে স্কুলে সিয়াম পড়েছে,তার বড়জনরাও পড়েছে শুধুও নয় ছোটজনরাও পড়ছে। আর স্কুলটিতো সিয়ামের পাড়ার মধ্যে বলতে। ইমরান পরেরদিন দোকানে ঢুকতেই বললো- কি রে দোস্ত, ফোন করলো…?
– করেনি। তবে অবশ্যই করবে এটা আমার মন বলছে। কাগজটি হাতে নিয়েছে মানে আজ বা কয়েকদিনের মধ্যেই করবে।
ঠিক পরেরদিন সন্ধ্যার আগে আগে ফোন এলো অপরিচিত নাম্বার থেকে। কেননা স্কুল আসার পরে দুইবার মারুফের দোকানের পাশেরটাতে আসলো।উঁকিঝুঁকির বা দুষ্টু হাসি,চোখাচোখি ছিল অপরিমিত। তাই ফোনটি পেয়ে বুঝে নেওয়ার বাকি ছিল না। উচ্ছ্বাসে ফোনটি রিসিভ করে বলে – হ্যালো
ঐদিক সামান্য ইতস্তত হয়ে বললো- আসসালামু আলায়কুম। আপনি কে…?
সিয়াম ভড়কে না গিয়ে উত্তর দিলো- আপনি তো জানেন,আমি কে…?
– তো,আপনি আপনি করছেন কেন…? অন্তত বয়সে ছোট হতে পারি
– শুধুও বয়সের অনুপাতের জন্য তুমি বলা…? আর কিছুর জন্য না…?
মেয়েটি কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলল- আচ্ছা, আপনার নাম কি…?
– সিয়াম,তোমার…?
– ফারজানা ইয়াছমিন (মরজিনা)
সিয়াম প্রসঙ্গ পাল্টালো চমৎকারভাবে – আমি জানতাম,তুমি ফোন করবে…?
– কেমন…?
– মনের কথা বলা নেই না…?
– হুম,আপনি কবির মতো ঢঙ করে কথা বলছেন
– ঠিক তো ধরলে,আমি এখনো কবি হতে না পারলেও অন্তত কবিতা লিখি
ফোনের ওপাশে ছলাকলাময় হাসি দিল মেয়েটি।হঠাৎ বলে উঠল – মা আসছে,বাবা ফোনটা একটু রেখে বাইরে গেল আর আমি সুযোগটা নিলাম।
– আগে বলবে না,এদিক থেকে করতাম।
– সমস্যা নেই
– কী বলো! ব্যালেন্স না থাকলে সন্দেহ করবে না…?
– সন্দেহ অন্তত আমাকে করবে না
– কেন…?
– আর কোনোদিন আমি ফোনটি ধরিনি আর কল করবো কেউ ভাবতেও পারবে না
– আচ্ছা, আগামী থেকে মিস দিও
– আচ্ছা, যাই। মা পুকুর থেকে আসছে
– দাঁড়াও, দাঁড়াও একটা কথা
– আমি তোমাকে ভালোবাসি,তুমি…?
– বুঝে নেন
– মুখে বলো…?
– পরে,মা আসছে রাখছি। ভালো থাকবেন। যাচ্ছি…
হুট করে ফোন কাটলে নিজের মধ্যে নিজের অস্তিত্বহীনতায় ভুগে খানিক। মানে আরো কিছুক্ষণ কথা বলা যেতো,আচ্ছা তারপরেও তো ফোনের লাইন কাটতে হবে তাই না…? তবুও প্রেমিক প্রেমিকার এ এক আকুতি..
সারারাত জেগে থেকে চিঠি লিখলো,এই প্রথম নিজের জন্য নিজে। মানে জীবনে এর আগে অনেক চিঠি লিখেছে কারণে অকারণে বন্ধুদের প্রেমিকাদের মন গলানোর জন্য। এ এক অদ্ভূত জার্নি। অর্থাৎ বন্ধুর মতো দেহ প্রাণে এক হয়ে দারুণ সব কারিশমায় প্রতিটি চিঠি লেখা। সিয়ামের এক গর্ব হয় যে, তার লেখা চিঠিতে অনেকের প্রেম হয়েছে, হচ্ছে ও হবে এবং চলছে। কেননা সিয়াম বন্ধুমহলে খুব উৎসাহ বা উৎফুল্লতার এক নাম,তারচেয়ে সে কবি,ইতোমধ্যে কবিতার বইও বেরিয়েছে। কিন্তু নিজের জন্য চিঠি লিখতে একটু আনমনা হতে হলো ক্ষণিকের জন্য…!
চিঠি লিখতে ভোর রাত হয়ে গেল,তাই সকালে দোকানে আসলো লাল চোখে। তবুও নিজেকে খুব সামলালো। ফারজানার সর্বক্ষণের বান্ধবীটি দোকানের পাশ দিয়ে যেতে, সিয়াম আগ বাড়িয়ে দাঁড় করাল- এ আপু,একটু দাঁড়ান
মেয়েটি কপাল কুঁচলে বললো- কি…?
সিয়াম নিজেকে সামলে চিঠিটা মেয়েটির সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললো – চিঠিটা ফারজানাকে দিবেন…
– না,আমি পারবো না
– প্লিজ
মেয়েটি সিয়ামের অনুনয়ের ফ্যাকাশে,ঋজু মুখটার দিকে একবার তাকিয়ে বলল- আচ্ছা, দেন
সিয়াম খুব নিষ্পাপীর মুখে দুইতলার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটি চিঠিটা ফারজানার হাতে দিতে খুব করুণ মুখে একবার তাকালো সিয়ামের দিকে। বুঝতে পারা যায় সহজে এ এক গুপ্ত সংযোগ। একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে ফারজানা একটি রাতের পুরোটা অন্ধকারকে কয়েকটি মোমবাতির আলোয় লেখা তেইশ পৃষ্ঠার সে চিঠি বান্ধবীদের ঝাঁকের মধ্যে হাতে নিতেই সব বান্ধবী চেপে ধরলো ভিমরুলের মতো। “এই কি লিখেছে,এই কি লিখেছে পড়ে দেখি” কলকলানি। ফারজানা আর না পেরে সবাইকে বুঝিয়ে বলল- আচ্ছা, ক্লাসে ঢুকি…?
ক্লাসে ঢুকে হয়তো আধঘন্টারও অধিক লাগলো চিঠিটার অর্ধেক পড়তে,বাকিটা টিফিনে পড়লো জমিয়ে। চিঠিটার মধ্যে সিয়াম ফারজানাকে মৌমিতা নামেই ডেকেছে,বললো- তোমাকে আজ থেকে আমি মৌমিতা নামেই ডাকবো,এটা আমার ভালোবাসার নাম। এ নামটাই গ্রহণ করো। হয়তো এ নামে অন্য কেউ চিনবে না আর চিঠিগুলো কারো হাতে পড়লেও সমস্যায় ভুগবে না। মৌমিতা,সত্যি ভালোবাসি তোমাকে…

০৯.

ভালোবেসে সবাই ঘর বাঁধতে চায় সত্যি সত্যিই; পূর্ণিমা রাতে তারায় তারায় যখন জলসা, তখন একজনের কোলে আরেকজন মাথা রাখবে। আর অন্যজন কাশফুল ছোঁয়ার মতো মাথার চুলে হাত বোলাবে। নাক টেনে দিবে,কপালে একটা চুমো বসিয়ে দিবে হুট করে। হয়তো এমনও চাওয়া হতে পারে যে,রান্না ঘরে পায়ের আঙ্গুল টিপে টিপে খুব নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে প্রেমিকাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরবে। নয়তো অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি প্রেমিকের গলার টাই টেনে নিচু করবে একটু,তারপর কয়েকটা চুমো,চুমো…
এমনসব কল্পনা কোন প্রেমিক প্রেমিকার আসেনি বলতে পারবে…? তবে সবাইকে দিয়ে সব হয় না,স্বপ্ন চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে ফারাক থাকে। সিয়াম ছোটোকাল থেকে লেখালেখির সাথে আছে বললে হবে না,কেমন জানি লেখালেখি তাকে পেয়ে বসেছে। লেখালেখি কেবল ওর ভাবের বমি। মানে সামান্য সময়ের জন্য স্বস্তি। তারপর আবার ভাবের ঘুরপাক সারা শরীরে ও অদৃশ্য মনে।
একদিন স্কুল মাঠের সাথে লাগানো টঙ চায়ের দোকানে বসে দৈনিক পত্রিকা পড়ার সময় এখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দিকে অসতর্কতাবশতও চোখ যায় আর সিয়াম চোখও বুলায়। কেননা ভয় ছিলো- মৌমিতা অসম্ভব সুন্দরী,ছোটো হোক তবে ওর পরিবারের সবার কাছে সে মেয়ে হয়ে গেছে! সে পর্যায়ের মানে মেয়েদের আসল ঘর স্বামীর ঘর। আর মৌমিতার বাবা অন্যের মুরগী ফার্মে মাসিক বেতনে থাকে। অর্থাৎ এমন খেটেখাওয়া ঘরে কেমন করে এমন চাঁদ এলো সবাই যেন ভাবতে বাধ্য। মানে সুবিধে মতো কেউ কিছু না চেয়ে নিয়ে যেতে চায়লে এক পায়ে খাঁড়িয়ে দিয়ে দিবে বিয়ে নিশ্চিত একরকম। এমন কথাবার্তাও সিয়ামের সামনের চুলগুলোকে ভাবে ভাবেতে ওড়ায়। তাই এমন এক পড়ন্ত বিকেলে চায়ের দোকানটিতে পত্রিকা দেখতে চোখে পড়লো- নতুন গীতিকার, নায়কের চান্স। লেখাটির নিচে যোগাযোগের ঠিকানা। মনের মধ্যে আচানক গায়েবি জোর পেল সিয়াম। ভাবলো- এই তো সুযোগ! ঘরে তাড়াতাড়ি এসে সে রাতে লিখলো চিঠি,জানালো-কবিতা,গান,গল্পও লিখে। সাথে ফোন নাম্বার, সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজের দু’খান ছবি।
এর কিছুদিন পর ফোন। ওপাশ থেকে-আপনি কি সিয়াম বলছেন ?
-জ্বি
-আপনি নির্বাচিত হয়েছেন। ঢাকায় আসার সময় পাঁচ হাজার টাকা আনবেন। সব ডকুমেন্ট ও ফরম পূরণ বাবদ।
চিন্তায় পড়লো খুব গভীরে,সকাল বেলা মাঝেমাঝে অনেক কষ্টে দশ টাকা পায়,তা তো মৌমিতার সাথে মোবাইলে কথা বলতেও থাকে না। তবে এই তো একটু ছাড় যে – মৌমিতার নিজস্ব মোবাইল নেই, চুরি বলা যায় তেমন বাবার মোবাইল নিয়ে আড়ালে এসে টুক করে একটা মিসড্ দেয়,তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মোবাইলের লাল বাটনে,তড়িঘড়ি টিপ দেয়। কিন্তু কল আসলে সিয়ামের ওদিক থেকে, একটু নিজেকে শান্ত সুস্থির করে,নিজের কাপড়চোপড়ও গোছিয়ে একটু,হয়তো এসব সিয়াম দেখছেনা তবুও। সবুজ বাটন টিপে বলে – কেমন আছো জান…?
এমন পরিস্থিতি যখন,চিন্তা কেমন হতে পারে ভাবনার অবকাশ নেই। আহা, কার টাকা তার পকেটে আসবে এসব। পরিবারে এসব বলা যাবে না,বললেও কিছুও হবে না,কেননা এসব গানবাজনা পরিবারে বলা হারাম। তাই শখের ব্যাট,হাতের গ্লাভস্,হেলমেট বেচে আর এক আংকেলের হাতে-পায়ে পড়ে ধার করে সব মিলে চার হাজার পাঁচশ টাকা। অর্থাৎ,পাঁচশ টাকা কম আর গাড়ী ভাড়া কই ? তাছাড়া সময়ও যাচ্ছে বয়ে…
এগুলো নিয়ে ট্রেনে করে সকাল সকাল টংগী পৌছে। খিদেও লাগে চরম অথচ টাকা কমে যাওয়ার কী এক ছোবলখোরী। বাটা গেইটের সামনে উক্ত অফিস। ঢুকতে বিনয়ী সালাম সিয়ামের, বড় একটা চেয়ারে বসা কালো চশমা পড়া মানুষটি ঠিকানা পেয়ে বলল-ও কবি,আমাদের গীতিকার। চট্টগ্রাম থেকে আসছনা?
-জ্বি
-বসো। একটা গান করো।
কানগুলো চাপিয়ে গান শুনে বলল- সুন্দর গলা যেমন,তেমনি লেখা। বাহ্।
পাশের জনকে ইশারায় বলল- জিনিয়াস।
সিয়াম খুব আনন্দিত। এমন সরাসরি প্রশংসা পাওয়া জোড় কপালের বিষয়।
মানুষটি বলল – আমি ফিল্মটির পরিচালক,জাকির হোসেন। টাকা এনেছ ?
-জ্বি। কিছু কম(চোখে জল আসবে আসবে এমন)
– কত আছে?
– চার হাজার
– দাও
-পাঁচশ লাগবে। ভাড়ার জন্য।
-আচ্ছা। দাও।
টাকা দিয়ে বের হয়ে,ফিরতি ট্রেনে উঠলো। লক্কর ঝক্কর মার্কা লোকাল ট্রেন। কতদূর এসে থামতেই কলা,কমলা,আমড়া,আপেল আর শনপাপড়ি ছাড়াও অনেক রকমের জিনিস বিক্রেতা ট্রেনে উঠেছিলো। তন্মধ্যে কয়েকটি কলা কিনে খেয়ে পেটে মোচড়ামোচড়ি শুরু হলো। আর হবেও না কেন…? প্রায় দু’দিনের কাছাকাছি, শরীরকে অনেক মানিয়েছে। অথচ এখন মানবেও না,কপালে জল দিয়ে গেছে ফুটো ফুটো। বামরুমের আয়নায় চোখ দুটোতে নিজেকে চেনাও যাচ্ছে না। হয়তো মানুষের নিশ্বাসপ্রশ্বাসে কেমন ঝাপসা-ঝাপসা। অথচ বাথরুমও হচ্ছে না,বাথরুমটা কি সাংঘাতিক নড়ছে,শরীরও ঝাঁকাচ্ছে। এ এক সত্যি সত্যি যুদ্ধ,সাঁ সাঁ,শোঁ শোঁ বিকট আওয়াজ। অনেক কষ্টে যা পারলো করে বেরিয়ে আসলো। প্রায় সবাই ঘুমে ঢুলাঢুলি। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময়ও নেই। ট্রেন যেন জীবন্ত লাশগুলো টেনে টেনে নিচ্ছে।

বাড়ীতে ফিরে দু’দিন পর ফোন করলে ফোনে উল্টো জবাব দেয়- আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না…
এরপর হারামী কষ্টটা সিয়ামের জীবনে বৃত্ত ভরাট করে গেল কষ্টের, শখের জিনিস আর পেলো কই ?

[বিঃদ্রঃ মাহমুদ নোমান এর উপন্যাস “তামাশা” প্রকাশিত হবে প্রতি বৃহস্প্রতিবার সন্ধ্যে ছয়টা। নববার্তা.কম এর পাঠকদের অনুরোধ করছি উপন্যাসটি পড়ুন এবং মন্তব্য করুন]

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com