সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নেতাকর্মীর বাড়ছে কদর

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের প্রার্থী ‘বড়’ নেতাদের কাছে তাদের নিজ দলের সাধারণ নেতাকর্মীর কদর বাড়ছে। নেতারা যোগাযোগ বাড়িয়েছেন কর্মীর সাথে। ফোন দিচ্ছেন। কোথায়ও দেখা হলে হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। ব্যক্তিগত এই যোগাযোগের পাশাপাশি দলীয় ব্যানারে সভা করে নেতাকর্মীর মতামত-পরামর্শ নিচ্ছেন, সমর্থন-সহযোগিতা চাচ্ছেন। এ সবকিছুই কর্মীর সাথে নিজের দুরত্ব ঘুচানোর, সম্পর্ককে ঝালিয়ে নেয়ার চেষ্টা, খাতির বাড়ানো। সময়ের সাথে তাল রেখে এটা আরো বাড়বে।

অবশ্য নির্বাচন এলে বরাবরই কর্মীর জন্য ভালোবাসার দুয়ার খুলেন নেতারা। তবে ভোট শেষে সেই দুয়ার দিয়ে আর সবাই ঢুকতে পারেন না। নেতা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ‘হাজারো কাজে’। অবশ্য নেতাদেরও আছে পাল্টা অভিযোগ। তাদের ভাষ্য- তদবিরের যন্ত্রণা আর অসংখ্য দাবি-দাওয়া পূরণের সীমাবদ্ধতা থেকেই অনেক নেতা কিছুটা এড়িয়ে চলার কৌশল গ্রহণে বাধ্য হন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের নতুন আইন হয়েছে। ফলে সিলেট সিটি করপোরেশনের এবারের নির্বাচনে মেয়র পদের প্রার্থীরা প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে নামবেন। অবশ্য মেয়রপদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগও রয়েছে।

দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন হওয়ায় এবার মেয়র পদপ্রার্থীদের কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। আগের নির্বাচনগুলোতে মেয়র পদপ্রার্থীরা নিজের দলীয় পরিচয়কে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার আদলে একটু ঢেকে রাখতেন। দলের উর্ধ্বে ‘সকল নাগরিকের নেতা’ এমন পরিচয়কে সামনে ধরে ভোটের লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার একটা চেষ্টা দেখা যেতো। ভোটে জয়লাভের এটি একটি কৌশল ছিল বলে মনে করেন অনেকেই। কিন্তু এবার এই কৌশল কোন কাজে লাগবে না। দলীয় প্রতীকই সব খোলাসা করে দেবে। সেটা মাথায় রেখেই মেয়রপ্রার্থীদের নির্বাচনী কর্মতৎরতা শুরু হয়েছে। সিলেটের নেতাকর্মীর কাছে দলের ‘আপনজন’ হয়ে উঠার পাশাপাশি কেন্দ্রের সাথে লবিং বাড়িয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করা- এখন তাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

দলীয় মনোনয়নে মেয়রপদে প্রার্থী হতে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মহানগর শাখার পাঁচজন শীর্ষ নেতা মাঠে নেমেছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক দুই বারের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে তৎপর। তবে তাকে ছাড় দিতে রাজি নন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। তিনিও মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনা-প্রচারণায় আছেন। ‘আসাদ ভাইকে মেয়র পদে দেখতে চাই’ এমন শ্লোগান লিখা ব্যানার-বিলবোর্ড নগরীর বিভিন্ন সড়কে চোখে পড়ে। দলীয়সূত্র জানায়, কামরান ও আসাদ দুই প্রার্থীকে ঘিরে দলেও একটি বিভাজন রেখা ফুটে উঠছে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথায় দলের ভেতরে উত্তেজনার আঁচ মিলছে।

কামরানের সমর্থকরা বলছেন, মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দীয় জন্য তার বিকল্প নেই। বিএনপির কাছ থেকে মেয়র পদ উদ্ধার করতে হলে কামরানকেই প্রার্থী দিতে হবে বলে তারা দাবি করছেন।

অন্যদিকে খোদ আসাদ উদ্দিনসহ তার সমর্থকরা বলছেন, গত নির্বাচনে মেয়র পদ আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হওয়ার অন্যতম কারণ বারবার বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে মনোনয়ন দেওয়া। তাদের মতে, মানুষ নতুনত্ব চায়। গত নির্বাচনে এটারই প্রতিফলন ঘটেছিল। তাই এবার মেয়র পদ উদ্ধার করতে হলে প্রার্থী বদল করতে হবে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, দলীয় সভানেত্রী, সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশে তিনি মেয়র পদে নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কাজ করে যাচ্ছেন। আর কাজ করতে গিয়েই নগরবাসীর কাছ থেকে অনেক পরামর্শ পাচ্ছেন, আফসোসের কথা শুনছেন। অনেকেই গত নির্বাচনে মেয়র পদে সঠিক জায়গায় ভোট পড়েনি বলে মত দিচ্ছেন। কামরান বলেন, নেতৃত্ব ও কাজের ক্ষেত্রে নতুন-পুরনো বড় কথা নয়। যাকে দিয়ে কাজ হবে, তাকেই সবাই চায়।

আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, দলের নেতাকর্মীদের আকাঙ্খা-চাপ এবং নগরবাসীর সমর্থন পাওয়ায় তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। দলের নেতাকর্মীর সাথে মতবিনিময় করে পরামর্শ নিচ্ছেন। ভোটারেরও ভালো সাড়া পাচ্ছেন। মনোনয়ন পেলে মেয়র পদ পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী।

সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিতে এক ধরণের প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। অনেক দিন ধরে ঝিমিয়েপড়া রাজনৈতিক কর্মকান্ড ফের কিছুটা চাঙ্গা হচ্ছে। মূল দল ও অঙ্গ সংগঠনের সভা-সমাবেশ শুরু হয়েছে। গত বুধবার শ্রমিক দলের সাথে সভা করেছেন মেয়র পদে আবার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার বিশবিদ্যালয় ও কলেজের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় করেছেন আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী বদরুজ্জামান সেলিম। দলীয়সূত্র জানায়, মেয়র পদে দলের তিনজন শীর্ষ নেতা প্রার্থী হতে তৎপর হওয়ায় দলে কোন্দলও মাথাচাঁড়া দিচ্ছে।

মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি, বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আসন্ন নির্বাচনে আবার প্রার্থী হতে চান। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দলীয় মনোনয়নে মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। তিন সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীরাও আবর্তিত হচ্ছেন।

আরিফুল হকের সমর্থকরা বলছেন, মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে তিনি পরিকল্পনামতো কাজ করতে পারেননি। কারাগারেই কেটেছে তার বেশিরভাগ সময়। নগরবাসী এটা দেখেছেন। তাই তাকে আবার প্রার্থী করলে জয় পাওয়া সহজ হবে।

অন্যদিকে নাসিম হোসাইন ও বদরুজ্জামান সেলিমের সমর্থকরা তাদের নিজ নিজ পছন্দের নেতাকে দলের সেরা প্রার্থী আখ্যায়িত করে আরিফুল হকের সাথে বর্তমানে দলের ও নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, আরিফুল হক চৌধুরীকে অনেকদিন ধরে দলীয় কর্মসূচীতেও দেখা যায় না।

নির্বাচন প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মামলার চাপ ও কারাবন্দি থেকেই আমার মেয়াদকালের তিন ভাগের দুই ভাগ সময় কেটেছে। দল আবার মনোয়ন দিলে আশা করি নগরবাসীও আমাকে কাজ করার সুযোগ দেবেন। দলের সাথে তার দুরত্ব রয়েছে- নিজ দলের প্রতিদ্ব›িদ্বদের এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, সারাজীবন দলের জন্য কাজ করেছি। নেতাকর্মীরাই সেটা মূল্যায়ন করবে। কোন ব্যক্তিবিশেষের কথায় আসে-যায় না।

নাসিম হোসাইন বলেন, মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য কাজ করছি। নেতাকর্মীও তাকে সমর্থন করছেন। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

বর্তমান মেয়রকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইতিমধ্যে নিজের প্রার্থীতা ঘোষণাকারী বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের নেতাকর্মী-সমর্থকরা তাকে প্রার্থী হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন, অনুরোধ করছেন। তিনি নিজেও দলকে গুছিয়ে এনে এখন মেয়র পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এমএ হককে পরাজিত করে মেয়র পদে জয়ী হন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনে কারাবন্দি থেকেও বিপুল ভোটে পুণরায় বিজয়ী হন কামরান। তবে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যান কামরান।

আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের চতুর্থ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ




টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com