,

সিলেটে বিদ্যুতের খেলাপি বিল প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা

সিলেটে সরকারি-বেসরকারি গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া বিল পাওনা প্রায় একশ’ পঞ্চান্ন কোটি টাকা। সরকারি খাতে ২২ কোটি ৯১ লাখ ৩২ হাজার ১শ’ ২০ টাকা এবং বেসরকারি খাতে ১৩১ কোটি ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ৮শ’ ৯৮ টাকা। এ হিসাব মার্চ ২০১৬ ইং পর্যন্ত, চলতি মাসেই এর পরিমান দুশ’ কোটির ঘর ছুঁয়ে যাবে বলে আশংকা কর্তৃপক্ষের।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোন জানিয়েছে, সরকারি এমন কোন মন্ত্রণালয় নেই যার কাছে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। তালিকায় আছেন বেসরকারি গ্রাহকরাও।

বিদ্যুৎ বিল খেলাপি গ্রাহকদের তালিকার শীর্ষে আছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন, মৌলভীবাজার পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সিলেট। ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এ তালিকায়। বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোনের দাবি- বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছে পড়ে থাকায় উপযুক্ত সেবা দিতে পারছেন না তারা।

চলতি মাসে একনেকের ২৯ তম সভায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সিলেট বিভাগ ও বিশেষ করে নগরীর বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৮৯১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ মে ২০১৬ হইতে মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোন যোগান দিতে হবে ১৫২ কোটি টাকা।

প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা খেলাপি থাকায় অনুমোদন হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট টাকা যোগান দেওয়া নিয়ে হতাশায় আছে বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোন। এ টাকা যোগান দিতে না পারলে প্রকল্পটিও ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোনের।

খেলাপি গ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষভাগে থাকা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ছয় কোটি টাকারও বেশি পাওনা রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের। এ খবর জানেনই না বলে দাবি করেছেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী এনামুল হাবীব। তিনি বলেন, অফিসে বসে শুধু বললে তো হবে না, সিটি করপোরেশনের কাছে অফিসিয়ালি যোগাযোগ করতে হবে।

৪ কোটি টাকা খেলাপি থাকা মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান বলেন, চলতি বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। আর বকেয়া বিলের ব্যপারে মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কমিটি দু’একদিনের মধ্যে বৈঠক বসে প্রকৃত বিল নির্ধারণ করা পরিশোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৫টি অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা খেলাপি রয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সরকারের কাছ থেকে টাকা পেলে খেলাপি বিল পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদিন।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে মসজিদ, মন্দিরসহ ধর্মীয় উপাসনালয়সমূহে বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া সবচেয়ে বেশী। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্তাদের ধারনা ধর্মীয় উপাসনালয়ের কোন বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় না।

পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে সক্রিয় হলে এত টাকা খেলাপি বিল হত না। সম্ভবত এরশাদ সরকারের আমলে মসজিদ-মন্দিরের বিল মওকুফ করা হয়েছি, এরপর থেকে অনেকদিন মসজিদ-মন্দির বিল পরিশোধ করেনি। আমার জানা মতে এখন সিলেট মহানগরের সব মন্দির বিল দিচ্ছে, তবে ঐসময়ের বকেয়া থাকলে হয়তো থাকতে পারে।

নগরীর বন্দরবাজারস্থ কুদরত উল্লাহ মসজিদের মোতাওয়াল্লী বদরুল ইসলাম বলেন, এরশাদ সরকারের আমলে মওকুফ করে দেওয়া হয়েছি, এসময় থেকে অনেক মসজিদ-মন্দিরও বিল দিচ্ছে না। যেসব মসজিদ-মন্দিরের বিল বেশি তাদের মওকুফ করে দিয়ে বিল দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, একটি ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে অধিকাংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছেন না। এতে সেবা প্রদান কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত মসজিদ-মন্দিরের ১শ’ ইউনিট পর্যন্ত বিল মওকুফ করে দেওয়া হবে যদি সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থা সচল থাকে। বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোনের প্রধান প্রকৌশলী রতন কুমার বিশ্বাস উত্তরপূর্বকে বলেন- খেলাপী বিলের ঝামেলা এড়াতে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে প্রিপেইড মিটারিং পদ্ধতি চালু করার সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত বিউবো’র বিতরণ অঞ্চল সিলেট জোনের হিসাব অনুযায়ী ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭শ’ ৩১ টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৭৬ লাখ ৬৬ হাজার ৭শ’ ৭১ টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৪শ’ ৩৭ টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৫৮ লাখ ১৬ হাজার ৯শ’ ৮৬ টাকা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৬২ হাজার ৯শ’ ৯৭ টাকা, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার ১শ’ ৭৪ টাকা, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ২২ লাখ ৮০ হাজার ৫শ’ ১২ টাকা, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯শ’ ৮৮ টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৩৭ হাজার ৩শ’ ৮২ টাকা, বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩২ টাকা, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ১শ’ ১৯ টাকা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩শ’ ৯৩ টাকা, মৎস ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৯ লাখ ২৬ হাজার ৫শ’ ৬২ টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়ে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬শ’ ১০ টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ ২০ টাকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ৮শ’ ২৫ টাকা, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৬৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪শ’ ৩২ টাকা, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ৯ লাখ ১৪ হাজার ২শ’ ৯২ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৭ লাখ ১ হাজার ৯শ’ ৪৫ টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয়ে ১০ লাখ ১৭ হাজার ৪শ’ ৫৯ টাকা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫শ’ ৫১ টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ২শ’ ২৬ টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ১৫ হাজার ৬শ’ ৫ টাকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৩ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ১ কোটি ৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩শ’ ৭৩ টাকা, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ৯ হাজার ৫শ’ ৫২ টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৯ লাখ ২৪ হাজার ৪শ’ ৪৩ টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার ৫শ’ ১৭ টাকা, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে ৪৩ হাজার ৩শ’ ১০ টাকা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৫শ’ ২৮ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৬ হাজার ১শ’ ৯৯ টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ৩৬ হাজার ১শ’ ৯৫ টাকা, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে ২৮ লাখ ৭৫ হাজার ৭শ’ ৯৮ টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ৩৩ লাখ ৯৩ হাজার ২শ’ ৩২ টাকা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com