,

আগৈলঝাড়ার প্রত্যন্ত এলাকার শুটকি এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত

অপূর্ব লাল সরকার, আগৈলঝাড়া (বরিশাল) # স্বাদু পানির দেশী প্রজাতির মৎস্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত রাজাপুর-রামশীল শুটকিপল্লীতে চলছে ভরা মৌসুম। প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মত এই শুটকীপল্লীর মাছের চাহিদা রয়েছে বিদেশেও। তবে দেশী প্রজাতির মাছের স্বল্পতার কারণে হতাশায় ভুগছেন শুটকীপল্লীর সাথে সংযুক্ত জীবিকা নির্বাহ করা মৎস্যজীবি পরিবারগুলো।

উপজেলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী বাকাল ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের শুটকি ব্যবসায়ী অবণী রায় জানান, এ অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক পরিবার শুটকি মাছের ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। বিশেষ করে একপাশে নদী অন্যপাশে কোটালীপাড়ার বিল এলাকার মধ্যবর্তী উপজেলার পয়সারহাট-ত্রিমুখী-রাজাপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শুটকিপল্লী। বিলাঞ্চলের স্বাদু ও মিঠা পানির নানা প্রজাতির মাছ শুটকি বানিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানী করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চল ও ভারতের আগরতলা পর্যন্ত এখানকার শুটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আগের তুলনায় পুঁটি, দেশী সরপুঁটি, পাবদা, কৈ, শৌল, রয়না, খলশা, মাছসহ দেশী প্রজাতির অনেক মাছ এখন হ্রাস পেয়েছে। দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে অন্য প্রজাতির দেশী মাছ। শুটকিপল্লীর সাথে জড়িত পরিবারগুলো মৌসুমী ব্যবসায় লাভের আশায় বছরের আশ্বিন মাসের প্রথম থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ছয়মাস এই পেশায় নিয়োজিত থাকেন। এই শুটকির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় চাহিদা রয়েছে সিধঁল শুটকির। যার প্রধান চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বাজারে। অনেক সৌখিন ক্রেতা এই শুটকিপল্লী থেকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শুটকি ক্রয় করে থাকেন। দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এসে এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে যায়। আবার ঢাকার কারওয়ান বাজার মোকামে গিয়েও পাইকারী বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরাই মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যমে চড়াসুদে ঋণ নিয়ে শুটকির ব্যবসা করলেও মৌসুম শেষে ওই দাদন ও ঋণের টাকা পরিশোধ করে তাদের হাতে আর তেমন কোন সম্বল থাকেনা। ফলে মৌসুম শেষে তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা।

স্থানীয়রা জানান, একযুগ আগে ভৌগলিক পরিবেশের কারণে বানিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা পয়সারহাট-রাজাপুর-ত্রিমুখী শুটকিপল্লীতে দেশী প্রজাতির বিভিন্ন প্রকার মাছের মধ্যে পুঁটি, শৌল, টেংরা, খলিশা, পাবদা, কৈ, শিং, মাগুর, ভেটকি, ফলি, বজুরী, বাইন মাছ অন্যতম। এ শুটকিপল্লীতে দেশী প্রজাতির মাছগুলো কেটে পানিতে পরিস্কার করে প্রাকৃতিক উপায়ে রোদে শুকিয়ে তা বিক্রির জন্য মজুদ করা হয়। এখানে ফরমালিন ও ডিডিটি পাউডারের মত বিষাক্ত কোন রাসায়নিক দ্রব্য মাছে মেশানো হয়না। অবনী রায় আরো জানান, চাহিদার মধ্যে ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ থাকে পুঁটি মাছের ওপর। প্রতি মন পুঁটি মাছ পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা, প্রতি মন বাইন মাছের দাম আট থেকে দশ হাজার টাকা, বজুরী মাছ চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দরে সাইজ ভেদে তাদের কিনতে হচ্ছে।

অপর ব্যবসায়ী মন্মথ রায়, অশোক রায়, জয়নাল চৌকিদার, মঙ্গল অধিকারী, নরেশ তালুকদার জানান, বাজার থেকে এক মন কাঁচা মাছ কিনে শুকালে তাতে ১৫-২০ কেজি শুটকি মাছ পাওয়া যায়। গড়ে প্রায় তিন মন কাঁচা মাছ শুকালে এক মন শুটকি হয়। শুটকিপল্লীর মাছ কাটায় নিয়োজিত রাজাপুর গ্রামের সন্ধ্যা অধিকারী, আয়না বেগম, পপি অধিকারী, শোভা রানী জানান, বছরে ছয়মাস মাছ কাটার সাথে নিয়োজিত থাকলেও বাকি ছয়মাস তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে। তারা আরও জানান, ছেলেমেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া করছে। মাছ কেটে যা পাই তা দিয়ে বহু কষ্টে জীবনযাপন করি। বর্তমানে শুকনা মৌসুমের শুরুতে মাছ বেশী পাওয়া গেলেও কার্তিক মাসের পর বিলে মাছ কম থাকায় তাদের দু:খ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাজাপুরের শুটকি ব্যবসায়ী অবণী রায় বলেন, সরকারীভাবে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় প্রতিবছরই তারা ঋণগ্রস্থ হয়ে পরছেন। তাই শুটকিপল্লীর সাথে জড়িত মৎস্যজীবিরা বছরের পর বছর সরকারের কাছে এ ব্যবসার জন্য সহজশর্তে ঋণ দাবি করলেও তা এখন পর্যন্ত উপেক্ষিত হয়ে আছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com