শনিবার, ২১ Jul ২০১৮, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন

English Version


স্বাধীনতা প্রেমী পুলিশ, থানা মিনি জাদুঘর

স্বাধীনতা প্রেমী পুলিশ, থানা মিনি জাদুঘর

এম নজরুল ইসলাম



এম নজরুল ইসলাম # মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত আলোকচিত্র ও লিখনী প্রদর্শনী ইতিহাস তুলে ধরেন প্রকৃত স্বাধীনতা প্রেমীরাই। বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তি, বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা, ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের ২৬ মার্চ।

যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ, দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের দিন ২৬ মার্চ। ভয়াল ‘কালরাত্রি’র পোড়া কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল এই দিনে। সারিসারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান তুলে ট্যাঙ্কের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক।

এমনি এক ভোররাতে পাক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। ঘোরতর ওই অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য। বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছিল একাত্তরের এই দিনে। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করি ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন, জাতীয় চার নেতাকে। স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী সকল বীর সন্তানদের গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।

ভাষা অন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্বাধীনতা প্রেমীরা তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাষা অন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা দেখতে ও জানতে পারবে নতুন প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে দেশের বিভিন্ন থানায় আলোকচিত্র চোখে পড়ারমত। পুলিশের এই কার্যক্রম সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। থানায় প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন কারণে থানায় আসেন। আর থানায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের আলোকচিত্র- লিখনী। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরায় বাংলাদেশ পুলিশের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

মোঃ হাসান শামীম ইকবাল উত্তরাঞ্চলে পুলিশ বিভাগে একজন স্বাধীনতা প্রেমী পুলিশ কর্মকর্তা হিসাবে বিশেষ পরিচিত। তিনি ১৯৮৮ সালে সরাসরি সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে পুলিশ বিভাগে যোগদান করে বিভিন্ন থানায় কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি এ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসাবে কর্মরত থাকাকালে প্রত্যেকটি থানায় দৃশ্যমান স্থানে ৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধের আলোকচিত্র এবং লিখনী প্রদর্শনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগনের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং প্রশংসা অর্জন করেছেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার জ্ঞানাঙ্কুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মাতা পিতার সাথে ভেড়ামারা উপজেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামে অবস্থান করে ছদ্মবেশে টোকাই সেজে পাক সেনাদের আগমনের সংবাদ মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছে দিয়ে ব্যাপক সহায়তা করেছেন।

আলাপকালে তিনি জানান, কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধের দুষ্প্রাপ্য অনেক আলোকচিত্র এবং লিখনী সংগ্রহ করে একাধিক বোর্ডে সন্নিবেশিত করে থানায় দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করেছেন। অনেকের মতে এসব থানা মিনি জাদুঘরে রুপ নিয়েছে। থানায় আগত জনগনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগরিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত হচ্ছেন। পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দরভাবে সাজানো আলোকচিত্রগুলি থানায় আগত প্রত্যেকের দৃষ্টি আকৃষ্ট করছে। দিনাজপুর কোতয়ালী থানা এবং রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানা ঘুরে দেখা গেছে স্কুল কলেজ ছুটির পর শিক্ষকদের অনুপ্রেরনায় অনেক ছাত্র ছাত্রী থানায় ভীড় করে এসব আলোকচিত্র দেখে নিজেদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করছে। এসব কর্মকান্ডের জন্য তিনি পুলিশ বিভাগে উর্দ্ধতন কর্তাদের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন তবে কোন পুরস্কৃত হননি। স্বাধীনতা প্রেমী এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তিনি তার এসব কাজের জন্য কখনও কোথাও পুরস্কারে জন্য নিজেকে উপস্থাপন করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক থানায় তার সৃজনশীল এ কাজ গুলো যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এগুলোর সংস্কার এবং সংরক্ষন বিশেষ প্রয়োজন। “স্মৃতিতে অম্লান স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭১” এবং “৫২’র ভাষা আন্দোলন”- নামের সুদৃশ্য বোর্ডগুলো আজও এই স্বাধীনতা প্রেমী পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতি বহন করে চলেছে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানায় এবং বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম থানায় কর্মরত ছিলেন এমন কিছু পুলিশ সদস্য জানান, ওসি হিসাবে মোঃ হাসান শামীম ইকবাল ছিলেন অনেক পরিচ্ছন্ন সদালাপী প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ ব্যক্তি। দিনাজপুর কোতয়ালী এলাকার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, ওসি ইকবালের দায়িত্বকালীন সময়ে বিজয় এবং স্বাধীনতার মাসে থানায় মৃদু সুরে দেশাত্ববোধক গান বাজতে শুনেছেন। যা তাদের এক পরিচিত হাজতীকে হাজতের ভেতরেও উৎফুল্ল দেখেছেন। তারা আরো জানান, তিনি দীর্ঘ প্রায় চার বৎসর দিনাজপুর কোতয়ালী থানায় ওসি হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

আজও তিনি দিনাজপুর শহরের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের একজন। তাঁর বিভিন্ন থানায় কর্মকালে থানাতে আগত ব্যক্তিরা তার বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। যা পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ থানায় এসে তার সম্পর্কে পরিদর্শন বহিতে চমৎকার মন্তব্য করতেন। এই কর্মকর্তা মনে করেন বাংলাদেশের সকল থানায় ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর এমন কিছু করা গেলে সাধারণ মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে স্বাধীনতা প্রেম তথা দেশ প্রেম জাগ্রত হবে। তিনি ২১ আগষ্ট ২০০৪ সালের ভয়াল গ্রেনেড হামলার পরবর্তী সময়ে বেশ কিছুদিন তৎকালীন বিরোধীয় নেত্রী বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করেছেন বলে জানা যায়। মোঃ হাসান শামীম ইকবাল বর্তমানে সহকারী পুলিশ সুপার হিসাবে বগুড়া সিআইডিতে কর্মরত থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি করে প্রশংসিত হয়েছেন। তার প্রিয় গান মোরা একটি ফুলকে বাচাবো বলে যুদ্ধ করি। তিনি তার ছাত্রজীবনে “দি বাংলাদেশ অবজারভার” “ডেইলী নিউজ” এবং “সাপ্তাহিক খবর পত্রিকা”য় সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা।

লেখক : সাংবাদিক।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সাংবাদিক ফাউন্ডেশন, কেন্দ্রীয় কমিটি।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media




ফুটবল স্কোর



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com