স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ।। রুদ্র আমিন

একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই নয় মাসের লড়াই ও ত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন একটি দেশের জন্ম হলো বাংলাদেশ। আমরা স্বাধীন হয়েছি। একটি পতাকা, সার্বভৌমত্ব, একখন্ড স্বাধীন ভূমি পেয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার আজ  ৪৬ বছর পর এসে একটা কথা শুধু, প্রকৃত যে স্বাধীনতা তা আজও পাইনি! লাখ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, যে দেশের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন করেছে তা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

এর কারণ কী? কেন আমরা বারবার পিছিয়ে পড়েছি? আজ  পদে পদে কেন দুর্নীতি? মানুষের অধিকার বলতে কিছুই নেই, আজও  কেন আমার বোন ধর্ষিত হচ্ছে? আজও  কেন মানুষ রাস্তার পাশে ঘুমায়? দু’বেলা খাবার পায় না। প্রতিদিন কেন মানুষের লাশ পড়ছে? সমাজের ভালো মানুষদের কেন এত হেনস্থা করা হচ্ছে? কেন শাসক শ্রেণীর এত ঔদ্ধত্য? সংবাদপত্রের অধিকার কেন হরণ করা হচ্ছে? এরই নাম কি স্বাধীনতার চেতনা? ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশের সংবিধান  থেকে কেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে? কেন ওরা আমার ধর্মকে কেড়ে নিতে চাচ্ছে? আজ  কিছু ভন্ড লোক স্বাধীনতার চেতনা বলে চিৎকার করছে। অথচ নিজেরাই আড়ালে নানাভাবে দেশের সঙ্গে বেঈমানি করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে জাতির সামনে নিজেদের খুব দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করছে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে এসে আজও  দেশীও আবিস্কারকে মূল্যায়ন করি না, সোফিয়ার মতো রোবট ভাড়া করতে আনতে হয়, কিন্তু সোফিয়ার মতোই রোবট বানিয়েছিলো শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, প্রযুক্তির উন্নয়নের কথায় ভাসছে দেশ, চারপাশ শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন তবুও ক্যানো সোফিয়া আসে বাংলাদেশে? ক্যানো আমরা আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পরিচর্যা করছি না? ক্যানো দেশের মেধাবীরা নিজের দেশের জন্য কিছু করতে পারছে না? অতঃপর কূলহারা হয়ে এক সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশে গিয়ে নিজের মেধার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে আর আমরা তখন বাংলাদেশী, বাংলাদেশী বলে চিৎকার করে যাচ্ছি, কিন্তু এমনটি ক্যানো? পরকে আলোকিত করতে আমরা নিজেদের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি দিন দিন!

স্বাধীনতার ৪৬ বৎসর বয়সে পা দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের দৃশ্যপট বলুন আর চিত্রই বলুন, কেউ ব্যঙ্গ করে আবার কেউ কেউ মুচকি হাসে। কারণ একটাই। বাংলাদেশ আসলেই সোনার বাংলা কিন্তু সোনার বাংলার আদমগুলোর অবস্থা কিংবা অবস্থান কতটুকু, এমন প্রশ্ন সবার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে প্রায়ই।বাবা দিবস যেমন তেমনি মা দিবস। দিবসি মানুষ্যত্ব নিয়ে আমরা বেড়ে উঠছি দিনের পর দিন। দেখা বাবা-মা দিবসে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে, টিভি মিডিয়াগুলোতে কাতর স্বরে শ্বাসনালী বন্ধ করে ফেলি। কিন্তু বাস্তবতা, বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমে ধুঁকে ধুঁকে মানবেতর জীবন যাপন করে চলেছে দিনের পর দিন। ঠিক তেমন দেশপ্রেম আমাদের মাঝে সজাগ।

ডিসেম্বর মাস এলেই মনের ভেতর দেশ স্বাধীন কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি হৃদয় গলে যায়। ন্যাকামি কান্নায় লোনাজলে বুক ভেসে যায়। ডিসেম্বর মাস গত হলেই ভুলে যাই জন্মের কথা। তাই তো এখন স্বাধীনতা দিবসেই বাংলাদেশের জনগন উল্লাসিত হয়ে স্মরণ করে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বিজয়ের কথা। আসলে আমাদের স্বাধীনতা হলেও আমরা আজও স্বাধীন হতে পারিনি। আমাদের গণতান্ত্রিক কোন কাজ হয় না, বৈষম্য আর বৈষম্য। আইন সেটাও অন্ধকারে নিমজ্জিত। রাজনৈতিক দল গুলোও মানছে না তাদের দলীয় নীতিমালা । ঘরের নীতিমালাই যদি মানতে না পারি তাহলে কেমন করে দেশের নীতিমালা মানব? যদি এই হয় স্বাধীন বাংলার পরিস্থিতি তাহলে তো আগেই ভাল ছিল। এখনও অকারনে গণধোলাই খেতে হয়,  মিথ্যে অপরাধে ফাঁসি হয়। ধর্ষণকারী ধর্ষণ করেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় বুক ফুলিয়ে। ৭১ পূর্ববর্তীতেও হয়তো এমনটিই ছিল। এখনো তাই রয়েছে। তার মানে কি মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের সুবিধার জন্য এতোগুলো নিরিহ মানুষের প্রাণ দিতে হলো? গুণে গুণে ত্রিশ লক্ষ আর দুই লক্ষ মায়ের সম্ভ্রম হারিয়ে কী উপকার হয়েছে?

যদি যা হবার হয়েছে মনে মনে ভেবে নিই আর বলি যা হয়েছে মঙ্গলের জন্যেই হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পর ইতিহাসের এ কেমন লীলাখেলা? বিশ্বের কোথায় কোন দেশে  স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিকৃত হয়, আমার জানা নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কথা বলা মানেই রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধ করা। যেটা হয়েছে সেটা সেইভাবেই অক্ষত আছে আজও। আর আমাদের সোনার বাংলায় বাবা আর স্বামীর ভাগাভাগিতে ইতিহাস পেঁয়াজ পঁচার মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

আমাদের এই স্বাধীনতার ইতিহাসেও নানা রকম লীলাখেলা, যত দিন গড়াচ্ছে ততই উল্টাপাল্টা হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাসের লিপিমালা। তবে কেন? আমাদের রাজনৈতিক দল কি চায়? তারা কি ইতিহাস বিকৃত করতে চায় নাকি ইতিহাস রক্ষা করতে চায়? সেই প্রথমে বাম-রা যেভাবে চাইছে আজও সেভাবেই চলছে। বাম-রা কখনই সুস্থ্য রাষ্ট্র চায় না। তাদের প্রধান কাজই হলো আজব লীলাখেলা। কিভাবে অশান্তি সৃষ্টি করে নিজদের ক্ষমতা জাহিল করা যায় সেটা। বাম-দের কারনেই দেশে এতো হট্টগোল।

৫ই জানুয়ারী নির্বাচন নিয়ে অনেকে অনেক মত পোষন করেন। আমি এটা নিয়ে কিছুই বলতে চাই না। যেটা হয়ে গেছে সেটা আপনি আমি কিছুই করতে পারব না। বহিঃবিশ্ব এখন সেটা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন যদি তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেন তাহলে দেশে ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা শুরু হয়ে যাবে এটা আমি নিশ্চিত। বাম-রা চায় এমনটি হোক দেশ রসাতলে চলে যাক। যে যার মতো ক্ষমতার বলে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাক।

বিজয়ের ৪৬ বছর পর আজ এদেশের মানুষ এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যখন সবার মাঝেই নতুন করে প্রশ্ন জাগছে কী ছিলো জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন আর কী ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য! পাকিস্তানিরা শাসন করেছিল দুই দশক আর স্বাধীনতার পর স্বজাতিরা এদেশ শাসন করছে চার দশক ধরে। পাকিস্তানি জালিম শাসকগোষ্ঠী আর স্বজাতির কাঙ্খিত শাসকশ্রেণির মধ্যে মৌলিক তফাৎটা কোথায়? দুঃখজনক হলেও তা আজ দেশবাসী খুঁজে পাচ্ছে না। পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি নাগরিকদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে বিগত ৪৬ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও নাগরিক সমাজের সঙ্গে তাদের চেয়ে উন্নত কোনো আচরণ করেনি।পৃথিবীর বহু দেশ রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সে সকল দেশের স্বাধীনতা ও বিপ্লবের ইতিহাস নিয়ে পক্ষ -বিপক্ষ কারো মধ্যেই সাধারণত কোনো দ্বিমত দেখা যায়নি। কারণ, বাস্তবে যা ঘটেছে, মানুষ যা ঘটতে দেখেছে, সেটাই হয়েছে তাদের ইতিহাসের অন্তর্গত। কিন্তু, ব্যতিক্রম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস। স্বাধীনতার প্রায় ৪৬ বছর পরও এদেশের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য ইতিহাস রচনা করা সম্ভবপর হয়নি। তার কারণ,বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় নিরপেক্ষতা বজায় থাকেনি। বরং- বিভিন্ন কারণে প্রকৃত ইতিহাসের সত্য প্রায় সম্পূর্ণরূপে চাপা পড়ে যায়। ইতিহাস বিকৃতির কারণগুলো হলো:

১. মুক্তিযুদ্ধকালীন দুর্বলতা সমূহকে ঢাকার চেষ্টা
২. মুক্তিযুদ্ধের সকল কৃতিত্ব কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা
৩. গোষ্ঠী স্বার্থে দলীয় ও দলীয় নেতার কাল্পনিক মাহাত্ম্য প্রচার করা
৪. ক্ষমতা ও গোষ্ঠী স্বার্থকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা ইত্যাদি।

ইতিহাস বিকৃতির সেই ভূমিকা আজও  অব্যাহত আছে এবং বর্তমান প্রজন্মের কিছু অংশ হলেও এ অপতৎপরতার ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছে।এই ইতিহাস বিকৃতিকারীরা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেনি, অথচ মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত কৃতিত্ব এককভাবে আত্মসাৎ করতে উদ্যত হয়েছে।বাংলাদেশের বিশেষ এক বা একাধিক গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে সত্যিকার ইতিহাস হলো সেটিই- যেটা তাদের স্বার্থ, গোঁয়ার্তুমি ও অহংকারের অনুকূলে; তা আদৌ বাস্তব কি অবাস্তব তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।ইতিহাসকে বিকৃত করতে সচেষ্ট এই গোষ্ঠীগুলো যেটাকে ইতিহাস বলে চালাতে চাইছেন, দেশের অনেক মানুষের দৃষ্টিতে তা নিতান্তই উদ্দেশ্যমূলক গল্প। তাই প্রকৃত ইতিহাস আর উদ্দেশ্যমূলক গল্পের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হওয়া জরুরি।

১.স্বাধীন বাংলাদেশের চিন্তা প্রথম কারা করেন?
২.তাদের কি আমরা স্মরণ করি?
৩.আসলেই কি তারা আমাদের জন্য কিছু করে গেছেন?
৪.কেন বারবার ভুলে যাই আমাদের আদি কথাগুলো?

১৯৬৩-৬৪ সালের দিকে যিনি সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের চিন্তা-ভাবনা করেন, তাঁর নাম বিচারপতি ইবরাহীম (১৯৬২ তে আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী সংবিধানে আইনমন্ত্রী হিসেবে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে বরখাস্তকৃত)। এরপর সশস্ত্র উপায়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার প্রথম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন পাকিস্তান নেভীর কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন এবং তার দুঃসাহসী সহযোদ্ধারা। রাজনীতির মঞ্চ থেকে স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। কিন্তু এসব উদ্যোগকে স্বীকার করলে স্বাধীন বাংলাদেশ এর কৃতিত্বের সিংহভাগই বিচারপতি ইব্রাহীম, কমান্ডার মোয়াজ্জেম, মাওলানা ভাসানী প্রমুখকে দিতে হয় বিধায় বর্তমান আওয়ামীলীগপন্থীরা এ ব্যাপারে কোনোদিনই উচ্চবাচ্য করেননি, আজও করেন না।

আমার সবচেয়ে দুঃখ হয় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্য, যিনি এতো কিছু করেও কোন না নেই। নেই কোনো তার কৃতিত্ব। এখনো অবহেলা পড়ে থাকে ভাসানীর কর্মকাণ্ড। সত্যি কি তার কোন অবদান নেই দেশের জন্য? এমনটি আমাদের জাতীয় কবি’র ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবিকে নিয়ে তেমন কোন আয়োজন হয় না। কিন্তু রবী ঠাকুরকে নিয়ে মাস ব্যাপী কর্মকাণ্ড হয়। আমরা কিভাবে দেশকে ভালবাসি? আমরা তো আমাদের জন্য আমাদের দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করবো এটা নৈতিকতা। যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন তারা তো দেশের জন্য, আগামি প্রজন্মের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।আমাদের সোনালী আঁশ অর্থ্যাৎ পাট তখন পাকিস্তানের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল। পাট্ট রফতানী করে পাকিস্তান প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। আর ও বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা হতো পশ্চিম পাস্তিানের উন্নয়নে।চাকুরী বাকরির ক্ষেত্রে ও বিশাল বৈষম্য ছিল। আমাদের বাঙ্গালীরা পেত নিম্নস্থরে চাকুরী, সকল উচ্চস্থরের চাকুরী পেত পশ্চিম পাকিস্তানীরা। এভাবে বাঙ্গালী তথা পূর্বক পাকিস্তানীদের অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে ফেলা হয়। তা থেকে শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

এই যে পরিসংখ্যান আমাদের স্বাধীন বাংলা কি সেই বৈষম্য সৃষ্টি করছে না। যাদের অর্থ আছে তাদের আরও অর্থ চাই, যাদের নেই তারা যেন মরে যায়। দূর্নীতি আর দূর্নীতি। সামান্য সৈনিকে এখন চাকরির জন্য গুণতে হয় ৭ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা। একটি ছেলে চাকরি পাবার পর দূর্নীতি ছাড়া কি করবে? গ্রামের ফসলের জমি বিক্রি করে কিংবা সুদে নিয়ে এই অবৈধ অর্থের জোগান দিয়েছে। এই বিপদ থেকে ঐ ছেলেটির বেঁচে উঠতে হবে। পরের মাইর খাওয়া যায় কিন্তু আপন মানুষটি যদি ভুল বুঝে মাইর দেয় সেটা সহ্য হয় না।আজ আমাদের দেশ স্বাধীনতার খেতাব নিয়ে আছে ৪৬ বছর। কিন্তু কেন এখনও এমন হবে? দেশকে উন্নত কে না দেখতে চায়। বাঙালি জাতিসত্তা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের বিদেশনীতি হওয়া উচিত নিজেদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। ভয়েস অব আমেরিকার এককালের সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর বলেছেন- বঙ্গবন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথে বৈঠকের সময় স্বভাব সিদ্ধভাবে পায়ের উপর পা তুলে তামাকের পাইপ হাতে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে কথা বলেন। তার মতে, এটা একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব। কারণ তিনি আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে। আমাদের নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ, আপনারা ঘরের সমস্যা নিয়ে বিদেশিদের দ্বারস্থ হবেন না। ঘরের সমস্যা নিজেরা ঘরে বসে সমাধান করুন।

বছর যতই যায়, ততই আমাদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।যে লক্ষ্য নিয়ে আমাদের বাবা, চাচারা স্বাধীনতা সংগ্রাম করে ছিল। আমরা আদৌ সে লক্ষে পৌঁছতে পেরেছি কি? আজকে যখন আমরা স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছি তখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতরা হানাহানি-মারামারি সর্বোপরি পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা আমাদের ঘাড়ে বসে হুংকার দিচ্ছে। দ্রব্য মূল্যের সংকট, দূনীতির সংকট, জাতি হিসেবে আমাদের ইমেজ হারাবার সংকট।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে এক হয়ে যায়। কারণ স্বাধীনতার চেয়ে বড় কিছু আর নেই। কিন্তু আমরা একত্রিত না হয়ে দ্বিধা বিভক্তি হয়ে যাই এমনকি দ্বিধা বিভত্তির রাজনীতি শুরু করি। স্বাধীনতাকে সু-সংহত করার জন্য অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে যে রাজনীতিক মতৈক্যের দরকার ছিল, সেই মতৈক্যে আমরা পৌছতে পারিনি। এটা শুধু মুক্তি যুদ্ধ, স্বাধীনতা ও জাতির জন্য চরম দুঃখের বিষয়। ভবিষ্যতে প্রজন্মের কথা চিন্তা করে এই জাতীয় ঐক্য একদিন অবশ্যই আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে যে কোন মূল্যই হোক না কেন।আজ গোটা বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেছে সে তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। সস্ত্রাস দূর্নীতি অনাচার অবিচার অসত্যতা ক্ষমতার লিপ্সা হিংস্যা বিদ্বেষ আমাদের নিত্য সাথী। যদি উল্লেখিত বিষয় গুলো থেকে অব্যহতি না পাই, তাহলে স্বাধীনতা শুধু কাগজে কলমে থেকে যাবে, বাঙ্গলী জাতী স্বাধীনতার স্বাধ উপভোগ করতে পারবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের হয়তো স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন দেশ যেখানে থাকবে, গণতন্ত্রের চর্চা, আইনের শাসন, মানুষের খেয়ে দেয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, যেখানে থাকবে না দূর্নীতি অত্যাচার ও ধনী গরীবের বৈষম্য।

কিন্তু আমরা কেন আজ  ৪৬ বছর পর এমন দেশ গড়তে পারলাম না? সেই প্রশ্ন আজ  আমাদের রাজনৈতিক, নেতা, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। কোন শক্তির বলে আজ  মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারীরা বীর দর্পে দেশে চষে বেড়াচ্ছে? আমি ব্যাক্তিগতভাবে একটা ধারনা পোষণ করি- তরুণ সমাজ যারা আজ স্কুল-কলেজে অধ্যায়ন করছে তারা প্রত্যকেই যদি মনে করে যে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বস্তা পচা প্রতিশ্রুতি বা তাদের ছত্রছায়ায় কিছু সুবধিায় গা না ভাসিয়ে স্কুল-কলেজে অধ্যায়ন করার পাশাপাশি সৃজনশীল কিছুর সাথে জড়িত থাকি তাহলে ব্যক্তিগত এবং সামগ্রকিভাবে সবাই উপকৃত হবো এমন কি এর প্রভাব বিস্তার করবে দেশের অগ্রগতিতে।এই দেশটা আমাদের, আমাদের জন্ম এই দেশে এই দেশের ভালোমন্দ সব কিছুই আমাদের উপর নির্ভর করছে। সবকিছুর ভাগিদার আমরা। যদি আমি আশা করি বাইরে থেকে কেউ এসে এ দেশটাকে স্বয়ংসম্পূর্ন করে দেবে এটা কোনভাবেই সম্ভব নয় এটা একমাত্র ভ্রান্ত এবং স্বপ্ন দেখা ।একটা অপ্রিয় সত্যকথা হল: দেশের বাইরের যে কেউ আমাদের শুভাকাঙ্খী হউক না কেন, তাদের একটাই লক্ষ্য ব্যবসা এর বেশী কিছু নয়। সুতরাং যা করার আমাদেরকেই করতে হবে।

১.ভবিষ্যতের জেনারেশনের জন্য আপনি কি কিছু করেছেন?
২.আপনার কি কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই?

অনেকে অনেক রকমভাবে বিস্তর কথা বলে এটার উত্তর দিতে পারেন, কিন্তু আমি এক কথায় বলবো, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির অশুভ লুপটা বন্ধ করার জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। এরশাদ আমলের দীর্ঘ একদশকের শাসনের পর মানুষ গণতন্ত্রের জন্য হাঁসফাসঁ করেছিলো, তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি কোন দল জয় লাভ করে সেটা নিয়ে মাথাব্যথা ছিলো না, ছিলো শুধু গণমানুষের মূল দাবি এরশাদের পতন এবং জাতীয় নির্বাচন করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে কোন একটা দল ক্ষমতায় গিয়ে কোনমতে একটা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পত্তন করা।

তারপর ৯১ এর নিবার্চনে বিএনপি ক্ষমতায় আসলো আর সেই যে লুপের শুরু হলো, (আওয়ামীলিগ-বিএনপি-আবার আওয়ামীলিগ-আবার বিএনপি) তা এখনো চলছে! আমরা চাই ভাসানী-ফজলুল হক অথবা সোহরাওয়ার্দী বা বঙ্গবন্ধুর মতো অবিসংবাদিত নেতা। মেজর জিয়াউর রহমান যে দেশের জন্য কিছু করেননি সেটা কেউ বলতে পারবে না। যারা এমন কথা বলবে আমি বলবো তারা এদেশের কোনো নাগরিক নয়। তারা শুধুই হিংসার দেশের জনতা।

যিনি দল বা ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থ ভুলে দেশের জন্য কাজ করবেন। জনগণের চাহিদা পূরণ করবেন। যার কর্মপন্থা এবং ভাষণ হবে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, শিক্ষনীয় এবং অনুকরণীয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ছিলো না। ছিলো মূলতঃ স্বৈরতন্ত্র ও পরিবার তন্ত্রের রাজনীতি। জিয়া ও এরশাদের সুদীর্ঘ এক নায়ক শাসনতন্ত্রের পর শুরু হলো গণতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্র। এরপর গণমানুষের দাবীতে গড়ে ওঠা আওয়ামীলিগের হাল ধরলেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। সেখানেও একই পরিবারতন্ত্র ছাড়া আমি কিছুই দেখছি না।পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে উপকৃত হয় পরিবার আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ আর গণতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল-শেখ জামালের অরাজকতা, খালেদাপুত্র তারেক-কোকোর সীমাহীন লুটতরাজ এসব পরিবারতন্ত্রের প্রশয়ের ফল। এর প্রভাব পড়ে দেশের প্রসাশনেও, সরকারের সব রন্ধ্রে দলীয়করণ ও স্বজন প্রীতির দুর্নীতি মহামারীকারে ছড়িয়ে পড়ে।তাছাড়া, আমাদের সংবিধানেও রয়েছে, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত কোন বিলে সরকার দলীয় সংসদদের কোন বিপক্ষ মত দেয়া যাবে না। এই যদি হয় গণতন্ত্রের অবস্থা, তাহলে স্বৈরতন্ত্রের সাথে তার তফাৎ কতটুকু? আর এখান থেকে নতুন নেতৃত্বই বা কি করে গজিয়ে উঠবে? এভাবে চলতে থাকলে দেশ দিনে দিনে রসাতলে ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার কোন উপায় থাকবে না।

গণতান্ত্রণিক দেশের গণতন্ত্রই যদি সুস্থ্য না থাকে তাহলে কিসের উপর ভর করে দেশ চলবে। মারো কাটো খাও যার যত বল তারই সকল। বর্তমানে রাজনীতির কথা শুনলে প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকরা আতঙ্কে থাকেন, সন্তানদের এই রাজনীতি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকতে বলেন, এটা কেন বলেন সেই উত্তর কি জানা আছে আমাদের দেশের প্রতিটি জনপ্রতিনিধিদের?

বর্তমানে আমাদের দেশে অবকাঠামো গত উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। দেশকে অর্থনীতি উন্নয়নে এগিয়ে নিতে হলে সড়ক, বিদ্যুৎ গ্যাস, বন্দর প্রভূতির চাহিদা মত সুবিধা দিতে হবে। আরেকটি গুরুত্ব পূর্ণ কথা হল মাদকমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, স্বাধীনতার মূল স্বপ্ন ছিল, আদর্শ উন্নত সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসাবে আমাদের যুব সামজকে গড়ে তোলা। সেই দায়িত্ব কতটুকু পালন হচ্ছে এ ব্যাপারে বিরাট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সমাজে আজ  মাদক, ধুমাপন, অসামাজিক কর্মকান্ড তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষার কথা আর কি বলবো, শিক্ষার এমন করুণ অবস্থা দেখে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় এ জাতি ধবংসের পথে এগুচ্ছে। ভুলে ভরা পাঠ্য-পুস্তক আর প্রকৃত শিক্ষার অবমূল্যায়ন।

ছোট ছোট স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা পর্যন্ত আজ  মাদক আসক্ত কলেজ বিশ্ব বিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম। মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে না পারলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য বিষময় হয়ে উঠবে। আজ  স্বাধীনতার মাসে এই দিনে জাতি কি আশা করছে। গ্যাস বিদ্যুৎ জ্বালানী সমস্যা তো রয়েই গেছে। সন্ত্রাস দূর্নীতিতো সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে ঢুকে গেছে। ইভটিজিং ঘুষ, পেশী শক্তির প্রয়োগ নিক্ত নৈমিত্তিক ব্যাপারে, দূর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার বেড়েই চলেছে। অযোগ্যদের যোগ্যতার আসনে অধিষ্ঠিত করা!

স্বাধীনতা আমাদের গৌরবের এই স্বাধীনতা আমাদের বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। স্বাধীনতা আমাদের জীবন যুদ্ধের বাহন। তাই এই স্বাধীনতাকে, অর্থবহ করতে হবে। আর সেই অর্থবহ স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে অর্থনৈতিক মুক্তি। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হবে। সৎ ও দেশ প্রেমে উজ্জিবিত হয়ে আগামী দিন গুলোতে যে কোন মূল্যে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেবার শপথ নিতে হবে। স্বাধীনতার শত্রু, স্বদেশীচর মুনাফা খোর চোরাচালনকারী ঘুষখোর দূর্নীতিবাজদের থেকে সর্তকও থাকতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে। তা হলেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা হবে অর্থবহ।

আমার মাতৃভূমি থাকবে বিশ্বের মানচিত্রে একটি উন্নত ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে। এবং এটিই হবে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের পবিত্র রক্ত ও আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনকে অর্থবহ করতেই হবে যে কোন মূল্যে। সর্বোপরি বর্তমানে দেশের শুধুই সড়ক পথের উন্নতিই চোখে পড়ার মতো। ভেঙে পড়েছে আইন প্রশাসন, বিচার বিভাগ গুলোর মতো শক্ত ঘাঁটি। শুধু একজন সরকার দেশের সার্বিক উন্নতি করতে পারে না। একটি দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য চাই সেই দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের দেশ প্রেমবোধ। দেশপ্রেম যদি না থাকে তবে সেই দেশ কোনোদিনই উন্নতি করতে পরে না।

আমরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাই, প্রতিহিংসা নয়। ক্ষমতা সব সময় ধরে রাখার বস্তু নয়। স্থান কাল পাত্রভেদে ক্ষমতার পালা বদল হয়। তবে কেন এত হানাহানি, এত খুনোখুনি? কেন সীমান্তের কাটাতারে আমার বোন ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকবে? কেন সীমান্তে আমার দেশের নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হবে? ওরা যদি অবৈধভাবে অন্য দেশে প্রবেশ করে তাহলে আইন আছে। গুলি করে হত্যা করতে হবে কেন? এটা কি কোন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি তাচ্ছিল্য আচরণ নয়? বিজয়ের ৪৬ বছরে আমরা স্বাধীনতার একটু সুফল চাই। আমরা বাঁচতে চাই। বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকা উড়াতে চাই। বিজয়ের দিবসের এই দিনে জাতির সূর্য সন্তান মহান মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাৎ বরণকারী সকল শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। বাংলা মায়ের দামাল ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা।

পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে চাই-

এদেশের জন্য যদি করতেই হয়
আমার এ জীবন দান,
তবু দেবনা দেবনা লুঠাতে ধুলোয়
আমার দেশের সম্মান।


রুদ্র আমিন
কবি, গল্পকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rudraamin71@gamil.com
01833001001

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ




টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com