,

ইসমত পারভীন রুনু

পাবলিক সার্ভিস কমিশন, পাল্টে দিচ্ছে পজিশন

বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের একমাত্র পেশাই হচ্ছে চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা। তারমধ্যে বিসিএস পরীক্ষা অন্যতম। দেশব্যাপী তরুণদের কাছে এ পরীক্ষা ততোধিক জনপ্রিয়ও বটে। ধরা যাক মোট পদ ২০২৪টি। এতো অল্প সংখ্যক পদের বিপরীতে চাকরি প্রার্থী ৩-৪ লক্ষাধিক। এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)-এর সাধ থাকলেও সাধ্য থাকেনা বিসিএস উত্তীর্ণ সবাইকে চাকরির জন্য সুপারিশ করার।

তাছাড়া পজিশনের কারণেই অন্যধারা থেকেও তরুণরা বিসিএস পরীক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। কারণ ‘বিসিএস ক্যাডার’ হয়ে নিজেকে মেধাবী থেকে অতি মেধাবীতে (!) পরিণত করার এ এক সুবর্ণ সুযোগ। প্রাপ্তির বিচারে রীতিমত রাজ্যসহ রাজকন্যা পাওয়ার অবস্থা! আজকাল অভিভাবকবৃন্দও বিয়ের বাজারে চিকিৎসক-প্রকৌশলীর চেয়ে ‘বিসিএস ক্যাডার’কেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।

৩৬তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর থেকে সারাদেশ বিসিএস জ্বরে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতি বেশিদিন চলতে থাকলে সোশ্যাল ইনভেস্টিগেটর শেখ ফরিদের লেখা শিরোনাম- ‘এতো ডিপার্টমেন্ট না খুলে ডিপার্টমেন্ট অব বিসিএস’ খুললেই হয়, এই শিরোনামটিকেই স্বাগত জানাতে হয়। জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা, পদোন্নতি, বেতন স্কেল, দক্ষতা সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে বিসিএস ক্যাডারের পজিশন অনেকটাই স্বস্তির, নিরাপত্তার, সর্বোপরি মর্যাদার।

আসলে আমাদের মনে রাখা দরকার, বিসিএস পরীক্ষা মূলত ক্যাডার সার্ভিসের একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। যেহেতু জনগণের টাকায়ই একজন ‘বিসিএস ক্যাডার’ বেতন পান, তাই জনগণের প্রাপ্য অধিকার অনুযায়ী যথাযথ সেবা প্রদান করাই তাঁর কাজ। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডার নিজেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, এটা খুবই দুঃখজনক।

বিসিএস পরীক্ষা নিঃসন্দেহে প্রতিযোগিতামূলক একটি পরীক্ষা। তবে এ পরীক্ষায় মোট কোটা ৫৬% হওয়ায় আগের ধরা ২০২৪ পদের বিপরীতে সাধারণ কোটাবিহীন প্রার্থীদের জন্য পদ আছে মাত্র ৮৯০টি। সব ধরনের কোটাধারী প্রার্থীরা চাকরির আবেদনের সময় স্বাছন্দ্যবোধ করলেও পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত হলে কোটার সুবিধা স্বীকার করতে রীতিমত বিব্রত। এমনকি ইদানিং চূড়ান্ত ফলেও কোটায় সুপারিশপ্রাপ্ত কারা তার কোনো উল্লেখ থাকে না। অতীতে শুধু কোটাধারীদের জন্যেও পিএসসি বিশেষ বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করেছে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যাংকসহ সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেই কেবলমাত্র কোটাধারীদের জন্য কিছু কিছু পদের নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন সীমাবদ্ধ বা সংরক্ষিত থাকে। সেইসব পদে অন্যান্য প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ থাকে না। ফলে সাধারণ মেধাবীরা বঞ্চিত হয় সবখানেই। অনেকক্ষেত্রে কোটাধারীদের দিয়ে শূন্যপদ পূরণও হয় না। সে পদগুলোকে শূন্যই রেখে দেয়া হয়। আবার একজন প্রার্থী একটি ক্যাডারে বিসিএস এর মাধ্যমে সুপারিশ প্রাপ্ত হলেও, আবারও পছন্দের ক্যাডারের জন্য বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এ কারণেও অনেক প্রার্থীই বঞ্চিত হয়।

কোটা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক প্রফেসর ডক্টর মুনতাসীর মামুন স্যার বলেন, ‘দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় বিদ্যমান কোটা কমানো প্রয়োজন’। তিনি আরও বলেন, ‘যোগ্যতার ভিত্তিতে যারা এগিয়ে আছে, তাদের প্রতি অবিচার করার হচ্ছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটারও নানারকম অপব্যবহার হচ্ছে। তবে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু কোটা থাকতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তিতেও কোটা থাকা উচিৎ নয়’। এভাবে কোটার সুবিধা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও অনেক কোটাই অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। যেমন- এক সন্তান কোটা, পুরুষ কোটা, বিসিএস কর্মকর্তাদের পোষ্যকোটা ইত্যাদি।

কোটার ব্যবস্থার কারণে বিসিএস পরীক্ষায় নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত সাধারণ প্রার্থীদের সংখ্যা দিন দিনই বেড়ে চলেছে। ৪-৫ বার নন-ক্যাডার পেয়ে অবশেষে কেউ কেউ হয়তো ১ম শ্রেণি বা ২য় শ্রেণির নন-ক্যাডারের চাকরিতে গেজেটভূক্ত হচ্ছেন। অনেক প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত চাকরির বয়স সীমার কাছে পরাজিত হন। বিসিএস ক্যাডার সম্পর্কে অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবার এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে যে, একজন সাধারণ মানুষ বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হলে অসাধারণ হয়ে ওঠেন তাদের দৃষ্টিতে। অথচ খোদ ইকোনোমিক ক্যাডারের এক তরুণ কর্মকর্তাই কয়েকদিন আগে প্রকাশিত এক লেখায় নিজে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের গবেষণার প্রতি মনোযোগী হতে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দয়া করে কোচিং সেন্টারের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না’। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের, কিন্তু গবেষক সারাবিশ্বের’। ধন্যবাদ সেই কর্মকর্তাকে এই দুঃসময়ে এমন উচ্চারণের জন্য। আরও একজন শ্রদ্ধেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কয়েকদিন আগে বলেছেন, ‘শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠনে শিক্ষা ও গবেষণার বিকল্প নেই। বাংলাদেশের মাহমুদা নাসার সেরা উদ্ভাবক। তাঁর এ গবেষণা ও সেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার, মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতির আমরাও সমান অংশীদার। কারণ আমরা বাঙালি, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব শুধুই গৌরবের, অহংকারের’।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডক্টর মোহাম্মদ মাসুদ রানা মাত্র কিছুদিন আগেই চায়ের অ্যারোমা (সুগন্ধি) নিয়ে দুটি গবেষণা কার্যক্রম সফলভাবে সমাপ্ত করেন। বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি চা গাছে জিন প্রতিস্থাপনে সক্ষম হন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি সম্প্রতি চীনের অ্যানহুই এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে চা বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এ সাফল্য নিঃসন্দেহে তরুণ গবেষকদেরকে এ বিষয়ে আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত করবে। তাছাড়া ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম মানব ফুসফুস উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী আয়েশা আরেফিন। হেপাটাইটিস-বি চিকিৎসার ঔষধ উদ্ভাবন করেছেন দুই বাংলাদেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের যুগান্তকারী উদ্ভাবনা আমাদেরকে আশাবাদী করে তুলছে। যেমন- শ্যাম্পুর বোতলে তৈরি বাবল সিপিএপি পদ্ধতি নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে পারে হাজারও শিশুর প্রাণ। কৃষিতে গম, ধান ইত্যাদির নতুন জাত উদ্ভাবনে, আধুনিক কৃষি উপকরণ তৈরিতে বিজ্ঞানীরা গবেষণার স্বাক্ষর রাখছেন প্রতিনিয়ত। বেসরকারি খাতে আমাদের ঈর্ষণীয় অবদান রয়েছে। দেশের উন্নয়নে সব খাতেই মেধাবীদের প্রয়োজন। কাজ ছোট নয়, দক্ষতা আর আন্তরিকতা থাকলে সব সাফল্য গাঁথায় অবদান রাখা সম্ভব। উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান হওয়া তরুণদের অধিকার। সুতরাং উচ্চশিক্ষার সার্বিক ব্যবস্থাপনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিষয়গত মানোন্নয়নসহ মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান  নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবতে হবে এখনই।

ইসমত পারভীন রুনু
লেখিকা: সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com