শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন

English Version
স্ববিরোধী কলম ও সমালোচনার বোরখা

স্ববিরোধী কলম ও সমালোচনার বোরখা



রহিমা আক্তার মৌ # গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ বিকাল ৩টা। আমার ১৮ বছর বয়সী বড় কন্যা সন্তান কল করে বলে- “মা আজ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা পড়েছ।” কেন কি জন্য জিজ্ঞাস করায় সে বলে সম্পাদকীয় বিভাগে তসলিমা নাসরিন-এর একটা খোলা কলাম আছে দেখ। ও তখন সাভারে আমার মায়ের বাসায়। পর দিন যাব বলে পত্রিকাটা কিনিনি। বলেছি- “তুমি রাখ আমি এসে পড়ব। এর পর জানতে পারে ঐ দিন প্রথমে কলামটি পড়ে আমার মেয়ে। ও পড়াতে বাধ্য করে আমার বাবা, মা, বড় বোন ও বাসার গৃহ কর্মরত মেয়েটাকে অবশ্য গৃহকর্মী বললে ভুল হবে। ও আমাদের পরিবারের একজন। কলামটি পড়ে বিরাট সমলোচনা চলতে থাকে। কেউ এপাশ কেউ ওইপাশ। তবে তসলিমা নাসরিন এর পক্ষে কিছুটা অবস্থান থাকে আমার বাবার। মেয়েটা যুক্তি দিয়ে আবার বাবাকে জবাব দিতে পারে। এই জন্য তাকে ধন্যবাদ, পরদিন আমি গেলে প্রথমেই ও পত্রিকাটি আমার হাতে দেয়। আমি শিরোনাম দেখে বোরখার পজেটিভ ও নেগেটিভ কিছু কথা বলি। এর পর কলামটি পড়ি।

আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প কবিতা ফিচার প্রবন্ধ কলাম নিবন্ধ এবং নারী বিষয়ক লেখালেখি করি বিগত ২০০৯ সাল থেকে। লেখার জগতে খুব অল্প সময় হলেও অনেক পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেয়েছি লিখেছি। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ রোজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় তসলিমা নাসরিন “বাঙালির বোরখা” নামে একটা কলাম লিখেন- কলামের প্রথম থেকে ধারাবাহিক কিছু কথা বলছি, তবে এটাকে সমালোচনাও বলা যেতে পারে। ‘বাঙালির বোরখা’ নামের জায়গায় হওয়া দরকার দিল ‘মুসলিম বাঙালির বোরখা’। কারণ মুসলিম বাঙালি নারীরাই পর্দা হিসেবে বোরখা ব্যবহার করে। মুসলিম ছাড়াও এখন কেউ কেউ বোরখা পরে তাদের আলোচনা আজ নয়।

ষাট দশকের শেষ থেকে সত্তর দশকের শেষ পর্যন্ত বোরখা কিভাবে ব্যবহার হয়েছে তার কথা তসলিমা নাসরিন বলেছেন, তবে শুধু তার অঞ্চলের কথা বলেছেন, বাংলাদেশের একটি অঞ্চলকে দিয়ে পুরো অঞ্চলকে বিবেচনা করা ঠিক নয়। ৯১ সালের আগে আমি নোয়াখালীতে বসবাস করি। হাতেগোনা ৪/৫ জনকে দেখেছি বোরখা পরতে। ওই মফস্বলে নারীরা তেমন বের হতো না। মাকে রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে যেতে দেখেছি। চুপেচাপে যেত কাজ সেরে কখন বাড়ি ফিরবে তাই ভাবত। আজ ২০১৪ সাল আমার সেই গ্রামের বাড়ির চাচী-ভাবীরা যখন তখন ঘর থেকে বের হচ্ছে। গ্রামের অনেকে বিভিন্ন চাকরি করছে। হাটবাজার, হাসপাতালে যাচ্ছে। কেউ কারো দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। নিজের কাজ নিজে করে। আমাদের বড় ভাই ছিল না। তখন মা বাজার করতে হাটে যেতে পারেনি। হাটের দিন বাড়ির অন্যদের দিয়ে হাটের বাজার খরচ করতে। এর পর আমরা দুই বোন বাজারে যাই। বাজার করি।

এখন যারা বের হয় অনেকে বোরখা পরে বের হয়। এখানে বাঙালি নয়। মুসলিম পর্দা প্রথাই চালু হচ্ছে। মেয়েদের হেজাব পরা বোরখা পরা এমনকি ছেলেদের কপালে নামাযের দাগ হাঁটুর ঘোড়ালিতে কালোদাগ পড়া নিয়ে কিছু কথা সেই কলামে পড়েছি। ৮০/৯০ দশকের দিনের সাথে কি ২০১৪ সালকে মেলালে চলবে, তখন খবরগুলো কিভাবে আসত। আর এখন সেই খবরগুলো কিভাবে পত্রিকার পাতায় এসেছে তা নিশ্চয়ই লেখিকা তসলিমা নাসরিনসহ প্রিয় পাঠক ভক্ত পত্রিকার মালিক সম্পাদকরা জানেন। তাহলে ওই লেখায় কেন অতীতের সাথে বর্তমানের তুলনা হলো। ৭০/৮০ কিংবা ৯০ দশকে যারা এক রাকাত নামায পড়েনি তারা এমন দাঁড়ি রাখছে নামায পড়ে কপালে দাগ করছে যে সব মেয়েরা তখন হাওয়ায় উড়ছে দোপাট্টা উড়িয়ে তারা এমন হেজাব ও বোরখা পড়ছে দেখে নাকি অবাক লাগছে। এখানে অবাক লাগার কি আছে বুঝি না। নামায পড়িনি বলে পড়বো না। পর্দা করিনি বলে পর্দা করব না এমনি কোন নিয়ম আছে কিনা আমার জানা নেই।

বিশ্ব জুড়ে যখন নারী আন্দোলন নারীর স্বাধীনতা ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে তখন নারীর বা বাঙালী মুসলিম নারীদের পর্দা নিয়ে এমন কথাগুলো কি আসলে নারীর পক্ষে নারীর স্বাধীনতা নারীর ক্ষমতার পক্ষে যাবে। নাকি সমালোচনায় ফেলবে তা কি বিবেচনার বিষয় নয়। নারী শিক্ষা ৮০/৯০ দশকেও ছিল আজও আছে। ৮০/৯০ এর মত কি আছে নাকি কমছে বা বেড়েছে তা হয়তো চোখ থাকতেও তসিলমা নাসরিন দেখছেন না। যে কোন কাজে নারীকে নির্ভর করতে হয়েছে পুরুষের উপর এখন সে সব পাল্টাচ্ছে। নারীরা অফিস-আদালতে যাচ্ছে। অনেক পরিবার এখনও নারীকে বের হতে দিচ্ছে না। তখন নারীরা নিজের হেফাজত হয়ে থাকার কথা বলে পর্দায় থাকার কথা বলে বাইরে বের হচ্ছে। কাজের সুযোগ পাচ্ছে। একটা গোটা আপেল বা কমলার উপর মাছি বসতে পারে কিন্তু আপেল কমলা খেতে পারে না। আপেল কমলাকে কেটে চামড়া সরিয়ে দিলে মশা মাছি কেন পিপড়াও যেতে পারবে। তা নিশ্চয়ই সবার জানা। আর বাঘ মহিষএর সামনে আপেল রাখা আর কাঁঠাল রাখা একই কথা। ২০১০/১১ সালের দিকে বাংলাদেশে ইভটিজিংয়ের হার বেড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ করে তখন শপিংমলগুলোতে বোরখা বিক্রি বেড়ে গেল। ইভটিজিংয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে অনেক অভিভাবক কন্যাকে বোরখা ধরিয়ে দেন। অনেকে মেয়ের চলাফেরায় বাধা দে। তখন মেয়েরা নিজেরাই বোরখা পরা শুরু করেন।

তাহলে বোরখা আমাদের কী সুবিধা দিল। বোরখা পথের বাধা দূর করে দিল। সৃষ্টির আদিকাল থেকে নারী আর পুরুষের বাহ্যিক দিক আলাদা। নারীকে পর্দার কথা বললেও নারী-পুরুষের উভয়েরই পর্দার কিছু কথা থেকে যায়। একজন ডাক্তার দিনরাত সেবা করছেন। তিনি যদি পর্দায় থেকে সেবা দেন তাতে কি রোগীর কোনো সমস্যা হয়। হয় না। তাহলে কেন বলা হচ্ছে লেখাপড়া করে তাদের মাঝে পর্দার বদ হাওয়া লাগছে। বোরখা পড়লেই কয়েদী হয়ে যাবে এমন মন্তব্য কি আসলে আমাদের সমাজে প্রভাব ফেলবে না।

বাঙালি পরিবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, যারা ভালো অবস্থানে আছে তারা যেমন তাদের কর্মের গুণে আসতে পেরেছেন, তেমনি তাদের আদর্শগত কারণেই তারা সম্মানিত স্থান অর্জন করেছেন। সত্যের পথ চিরকালই সত্য। নারীরা বোরখা পরছে এজন্য নাকি পুরুষদের লজ্জা পাওয়া উচিত। এমন কথার মানে কী? নারীরা কি পুরুষদের বলেছে, আমরা তো ডাবল কাপড় পরেছি এবার তোমরা খুলে ফেলতে পারো। তাহলে কেন নারী আর পুরুষ হলো। পুরুষের পাঁজরের হাড় দিয়ে নারীকে তৈরি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। এখানেই হয়তো তার লীলাখেলা। পুরুষের হাড় বলতে গেলেন কেন। আর তা দিয়ে নারীকে তৈরি করলেন কেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে কি হাড়ের অভাব ছিল। হযরত আদম (আ.)কে যখন বেহেশতে রাখা হয়, তখন কিন্তু হাওয়া (আ.) ছিলেন না। একাকীত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তা হাওয়াকে পাঠালেন বেহেশতে। নারী ছাড়া পুরুষ যেমন অসহায়, তেমনি পুরুষ ছাড়া নারীও। নারীর যেমন পর্দার প্রয়োজন আছে, তেমনি আছে পুরুষের জন্যও। পুরুষ যদি ধর্ষণ করে তার ফল তাকে পেতে হবে। অবশ্য আইনের ফাঁক আর দুর্নীতি সেই ফলগুলোকে আপেল-কমলা বানিয়ে এখন পানি দিয়ে গিলে খাচ্ছে। পুরুষ ধর্ষণ করে নারীকে। আবার সেই অপবাদ আসে নারীর কাঁধেই।

‘যে পুরুষগুলো বলে বোরখা খুব ভালো পোশাক, সুন্দর পোশাক চমৎকার পোশাক। ওই পুরুষগুলো কেন বোরখা পরছে না কেউ জিজ্ঞেস করেছে? কেউ কেন ওদের জিজ্ঞেস করছে না। বোরখা যদি অত ভালো পোশাক, তাহলে তোরা বোরখা পরছিস না কেন? দুইদিন অত ভালো পোশাকটা পরে দেখ না কেমন ভালো লাগে’। (ওই কলামের শেষ প্যারা থেকে)। পুরুষ বোরখা পরবে কেন। তাহলে মা আর বাবা, পুরুষ আর নারী আলদা মানে লিঙ্গ পরিবর্তন হলো কেন। পুরুষ বোরখা পরবে না পুরুষ নিজেকে সংযত রাখবে। নারীরও সংযত হওয়ার প্রয়োজন আছে।

পুরুষকে যদি বোরখাই পরতে হবে তাহলে কেন আদম (আ.)কে দিয়ে পৃথিবীর বংশ বৃদ্ধি করা গেল না। এটাই হলো নিয়ম। নারীকে অধিকার দিতে গিয়ে অপদস্ত করা হচ্ছে কিছু বাক্যে। প্রথম নারী মেয়র হয়েছে, প্রথম নারী স্পিকার হয়েছে- এটা বলার মানে আগে কেউ হয়নি। তাই বলে তো ঘটা করে বলা নয় যে, নারী হয়েছে নারী হয়েছে। প্রতিযোগিতা হবে কর্মে, গুণে সাফল্যে। প্রতিযোগিতা কেন হচ্ছে নারী আর পুরুষে। কই আমরা তো দেখিনি প্রতিযোগিতায় নারী হয়েছে বলে তাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তবে যে কোনো লাইনে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নারীর জন্য আলাদা লাইন এটা নারীকে আলাদা করা নয়। নারীকে সম্মান জানানো।

আজ অনেক ক্ষেত্রেই দেখছি, নারীকে পণ্যের সাথে পণ্য বানাচ্ছে। কই এইগুলো নিয়ে তো ওনাদের সমালোচনা করতে দেখছি না। বিনোদনের ক্ষেত্রে একই জায়গায় নারী-পুরুষ নারীর গায়ে চিকন ফিতা শর্টকাট পোশাক আর পুরুষের গায়ে ডাবল ডাবল। এসব নিয়ে তো প্রতিবাদ করছেন না। নারী কেন বোরখা পরছে এই নিয়ে ওনাদের (ওনার) যত মাথাব্যথা। বুঝা যাচ্ছে, ওনার একটা মাথা আছে। ১০ বছর আগে যা হয়নি তা এখন হবে সময় পাল্টাচ্ছে। মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে ভালোটা বুঝছে বলে বোরখা পরছে।

আর বোরখা পরে যদি সে সব কাজ করতে পারে তাহলে সমস্যা কোথায়। এজন্য কি পুরুষকে বোরখা পরতে বলা হবে। তিনি বলেছেন, বোরখা আরব সংস্কৃতি। এটা কেন বাংলাদেশী মেয়েরা পরে। আসলে বোরখা আরব সংস্কৃতি নয়, এটা মুসলিম সংস্কৃতি। মুসলিম বাঙালি নারী হিসেবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে আমরা বোরখা পরতেই পারি। বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি নারীদের নিয়ে তসলিমা নাসরিনের এতই যখন ভাবনা তাহলে পাশ্চাত্যের পোশাক ছাড়ার কথা কেন তিনি বলেন না। ওইসব বাদ দিয়ে শান্তির কথা বলা উচিত নয় কি?

somsrahima@yahoo.com
সাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com