শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

English Version
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

Rabindranath Tagore-Nobobarta
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী আজ



আজ পঁচিশে বৈশাখ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য পুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের (১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) পঁচিশে বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে কবির জন্ম। বরাবরের মতোই আজ সারা দেশে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে কবির জন্মদিনের উৎসব।

রবীন্দ্রনাথের রচনা সম্ভার বিপুল, বৈচিত্র্যময়। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়ই ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিস্ময়কর সৃজনী প্রতিভা দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, সংগীত, শিশুতোষ রচনা, পত্রসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অমর সংযোজন। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেলে বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষা পায় গৌরবময় সম্মান। স্বকীয় নান্দনিক ভাবনায় তিনি সমৃদ্ধ করেছেন চিত্রকলাকেও। তার লেখা গান আমাদের জাতীয় সংগীত। বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান জুগিয়েছে প্রেরণা।

কীর্তিময় জীবনে সাহিত্য-সংস্কৃতির বাইরেও তার গতিময় জীবনের দেখা পাওয়া যায়। সাংগঠনিক কাজ ও সামাজিক উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অগ্রণী। কৃষক ও পল্লী উন্নয়নের কথা ভেবে তিনি চালু করেছিলেন কৃষিঋণ-ব্যবস্থা। শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
পাকিস্তান আমলে সরকারিভাবে রবীন্দ্রনাথকে বেতারে ও টিভিতে নিষিদ্ধ করা হলেও বাঙালির মননে ও চেতনে তিনি প্রবল প্রতাপেই রাজত্ব করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণাস্বরূপ। বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ এবং অন্যান্য গদ্যসংকলন তার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলিতে তার সাহিত্যকর্ম সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিসমূহ সাহিত্যমূল্যে অনবদ্য। এগুলো বাংলা পত্রসাহিত্যের সম্পদ। এগুলো আলাদাভাবে গ্রন্থভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি নিজের লেখা অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। অভিনেতা হিসেবেও তিনি প্রশংসা পেয়েছেন। তিনি একজন সুগায়কও ছিলেন। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি এ উপাধি ত্যাগ করেন। ১৯০১ সালে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন ১৯২১ সালে। যদিও এর অনেক আগেই শিলাইদহের জমিদারিতে তিনি কৃষকের উন্নয়নের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তিনি প্রায় সারাবিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে মানবতার বাণী প্রচার করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার রচনাবলি অনূদিত হয়েছে।

বাঙালি এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখেছেন, ‘পঁচিশে বৈশাখ চলেছে/জন্মদিনের ধারাকে বহন করে/মৃত্যুদিনের দিকে।/সেই চলতি আসনের উপর বসে/কোন্ কারিগর গাঁথছে/ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়/নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।’
রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের কর্মের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি যেমন সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে তার অতুলনীয় প্রতিভার স্পর্শে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক বিকাশেও অমূল্য অবদান রেখেছেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণীঃ রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি বলেন রাষ্ট্রপতি। বাণীতে রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি। জীবনের আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, সংকট-সাফল্যে, উৎসব-পার্বণে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির পরম আশ্রয়।

প্রধানমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বলেন- রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের উজ্জ্বল বাতিঘর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের উজ্জ্বল বাতিঘর। শেখ হাসিনা তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাও জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ও বাঙালির অহংকার। বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) বিস্তৃত করেছেন বাংলা সাহিত্যের পরিসর। কালজয়ী এই কবি জীবন ও জগৎকে দেখেছেন অত্যন্ত গভীরভাবে, যা তার কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, গীতিনাট্য, প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনী, সংগীত ও চিত্রকলায় উৎসারিত হয়েছে। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চার মাধ্যমের প্রতিটি শাখায় তার অনন্য ও অনায়াস বিচরণ সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বকবির সমস্ত সৃষ্টির মূলে নিহিত মানবতাবাদ তাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের সাধক।

চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে রবীন্দ্র মেলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আইয়ের চেতনা চত্বরে আয়োজন করা হয়েছে ‘রবীন্দ্র মেলা’। অনুষ্ঠান শুরু হবে বেলা তিনটায়। চলবে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। এ আয়োজনে ড. আতিউর রহমানের হাতে আজীবন সম্মাননার ৫০ হাজার টাকার চেক, ক্রেস্ট আর উত্তরীয় তুলে দেওয়া হবে।

ঢাবিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উদ্যোগে আজ বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি মিলনায়তনে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জন্মজয়ন্তী উদযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মে শিলাইদহের প্রভাব’। অনুষ্ঠানে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সভাপতিত্ব করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

পতিসরে নানা কর্মসূচি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসর কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী নানা উৎসব চলবে। প্রতিবছরই পতিসরে নামে রবীন্দ্রভক্তের ঢল। পরিণত হয় মানুষের মহামিলন মেলায়। সরকারিভাবে একদিনের কর্মসূচি নিলেও এ মিলনমেলা চলে প্রায় সপ্তাহজুড়ে। দূরদূরান্ত থেকে কবিভক্তরা ছুটে আসেন তাদের প্রিয় কবির পতিসর কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গণে। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণে লিপ্ত হন কবিভক্তরা। প্রতি বছরের মতো এবারেও এখানে আসার কথা রয়েছে সরকারের মন্ত্রী, এমপি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ দেশবরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও রবীন্দ্রভক্তরা। নাচ, গান আর কবির রচিত কবিতা আবৃত্তি করে উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে বিশ্বকবির জন্মোৎসব।

সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। আর উদ্বোধন করবেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দীন প্রামানিক। আলোচক থাকবেন বরীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক, নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুর ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি থাকবেন জাতীয় সংসদের হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক, সাধারণ সম্পাদক সাধন চন্দ্র মজুমদার, ইসরাফিল আলম এমপি, ছলিম উদ্দীন তরফদার এমপি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ কে এম ফজলে রাব্বী বকু, পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান। এরপর আলোচনা সভা চলবে। আর বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।

শাহজাদপুরে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কুঠিবাড়িতে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। কবির পদধূলির কুঠিবাড়িতে হাজার-হাজার মানুষের ঢল নামবে। মঙ্গলবার সকালে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাসিবুর রহমান স্বপন। বুধবার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুল হোসাইন সাদ জানান, দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় থাকছে শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কন, নৃত্যানুষ্ঠান, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, কবিগুরুর বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা, গান, গীতিনৃত্যনাট্য এবং নাটকের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী। এসব অনুষ্ঠানে সিরাজগঞ্জ, শাহজাদপুর উল্লাপাড়া ও ঢাকার শিল্পীরা অংশগ্রহণ করবেন। শাহজাদপুরের রবীন্দ্র্র গবেষক ড. চপল মালিথা জানান, কবির স্মৃতিবিজড়িত সাহিত্য রচনাগুলোকে মিউজিয়াম সংরক্ষণে সচেষ্ট থাকলেও দর্শনার্থীদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। কবির স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ির ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com