,

শামসুর রাহমানের দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কাব্যকৃতি ।। মুস্তাক মুহাম্মদ

আধুনিক কাব্য নির্মাণে কিংবদন্তী কাব্যশ্রমিক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) রবীন্দ্র-নজরুল বলয় থেকে বের হয়ে আসা ত্রিশোত্তর পঞ্চপা-বের ধ্যান-ধারণা, কবিতার আঙ্গিক গঠন অনুসরণ করে তিনি কবিতা কাননে সাবলীল পদচারণা করেছেন। প্রকৃতি নির্ভর হলেও শহুরে শব্দ ব্যবহারে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। তিনি দু’চোখ ভরে যা অবলোকন করেছেন তা শব্দের মজবুত গাঁথুনি দিয়ে প্রকাশ করেছেন। উপমা ও চিত্রকল্পে তিনি প্রকৃতি নির্ভর কিন্তু বিষয় ও উপাদানে শহর কেন্দ্রিক। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে তিনি যা দেখেছেন সে বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতায় তখনকার আর্থ সামাজিক অবস্থার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য তিনি অসংখ্য জ্বালাময়ী-প্রতিবাদী-শক্তিশালী কবিতা লিখেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সব কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, স্বাধীনতার প্রকাশ লক্ষণীয়। দেশ প্রেমের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মনে প্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি। দেশপ্রেম তাঁর কবিতার অন্যতম উপাদান। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের চাওয়া-পাওয়া, মান-অভিমান, সংগ্রামের কথা বার বার এসেছে তাঁর কবিতায়। তবে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম তার কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে এবং যে ক্ষেত্রে তিনি বেশ পটু ও নৈপূণ্যতা প্রদর্শন করেছেন।

    সমাজবিজ্ঞানী জ্যা-জ্যাক রুশো বলেছেন, “গধহ নড়ৎহং ভৎবব নঁঃ বাবৎু যিবৎব যব রং পযধরহ.” কিন্তু মানুষ শৃঙ্খিত হয়ে থাকতে পছন্দ করে না। মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম স্বাধীনভাবে বসবাস করা। কিন্তু স্বার্থবাদীরা সহজে কাউকে স্বাধীনতা দিতে চায় না। তারা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু মানুষ শৃঙ্খল মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর- দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ ও দুই লক্ষ মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময় অর্জিত হয় স্বাধীনতা। শামসুর রাহমান স্বাধীনতাকে কবি নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের এলোমেলো দোলার সাথে তুলনা করেছেন। স্বাধীনতাকে রবি ঠাকুরের অমর গানের সুরের সাথে তুলনা করেছেন। কবির কাছে স্বাধীনতা যেনো কোকিলের গান, বয়সী বটগাছের ঝিলমিল পাতা। স্বাধীনতা কবির কাছে কবির লেখা খাতার মত। যেখানে কবির মনে যা চায় তাই নির্দ্বিধায় লিখতে পারে। কবি স্বাধীনতার চিত্র এঁকেছেন এভাবে- “স্বাধীনতা তুমি/রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান/ স্বাধীনতা তুমি/কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো/মহান পুরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা-/…………./স্বাধীনতা তুমি/বাগানের ঘর, কোকিলের গান,/বয়েসী বটের ঝিলমিলি পাতা,/যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।” (স্বাধীনতা তুমি ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    স্বাধীনতা পেতে হলে অনেক ত্যাগ-সংগ্রাম করতে হয়। স্বার্থান্বেষী মহল সহজে কাউকে স্বাধীনতা দিতে চায় না। দেশ প্রেমিকেরা সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করে তবেই স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনে। যেমন এদেশ দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ঘাতক-শোষকদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে বাঙালিদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক প্রচেষ্টায় অর্জন হয়নি। জাতি-বর্ণ বিভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সম্মিলিত চেষ্টা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা এসেছে। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায়, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফসল স্বাধীনতা। বাংলাদেশকে মুক্ত করতে কত হরিদাসী বিধবা হয়েছেন- কত সখিনা স্বামী-সন্তান হারায়েছেন, কত বোন ভাই হারা হয়েছেন। কত নারী বীরাঙ্গনা হয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই। রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। শামসুর রহমান তাই লিখেছেন- “তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,/ সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,/সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর/…………/তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা/অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের উপর।” (তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    একাত্তরে পাকিস্তানী হায়েনারা সব কিছুর দখল নেয়। মানুষ বন্দি হয় পড়ে। গৃহবন্দী মানুষ সব সময় আতঙ্কে থাকে। কখন কার ঘর পুড়ে যায়; কখন কে প্রাণ হারায় তার নিশ্চয়তা নেই। এমতবস্থায় মানুষ জীবন বাঁচানো ভয়ে পৈত্রিক ভিটা মাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। কিন্তু কবি শামসুর রাহমান দেশ ত্যাগ করতে রাজী নন। তিনি দেশকে অরক্ষিত রেখে কোথাও যেতে চান না। যারা ক্ষতিগ্রস্থ দুর্দশাপীড়িত তাদের পাশে থাকতে চান। প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত যিনি। কিন্তু স্বদেশকে ছেড়ে কোথাও যেতে চান না তিনি। এখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এখানেই মৃত্যুবরণ করে স্বদেশের মাটিতে সমাহিত হতে চান। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঙ্তি স্মরতব্য। তিনি লিখেছিলেন- “সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে/…………../এই আলোতে নয়ন রেখে মুদবো নয়ন শেষে।” (সার্থক জনম আমার) যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অনেকে বিদেশ-ভূঁইয়ে উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দেশে লাশের স্তুপ। পঁচা-গলা-খসা লাশের গন্ধে বাতাস ভারী। তবু খাঁটি দেশ প্রেমিক কবি মৃত্যুজ্ঞানকে তুচ্ছ করে দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে নারাজ। সে কথাই শামসুর রাহমান লিখেছেন- “তবু আমি যাবো না কখনো/অন্য কোনো খানে/থাকব তাদের সঙ্গে এখানেই, বাজেয়াপ্ত হয়েছে যাদের/দিনরাত্রি, যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে সকল সময় সারিবদ্ধ/মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা যাদের নিয়তি।’ (না, আমি যাব না ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    একাত্তরে সমস্ত বাংলাদেশ জুড়ে পাক-সেনারা জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। চারদিক গুলির শব্দ, লাশের স্তুপ, শুকনো রক্তের গন্ধ। ভয়ার্ত মানুষ এমনকি পশু-পাখি। বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করাই পাক-সেনাদের লক্ষ্য। তাদের সামনে যা পড়ছে তাই ধ্বংস করছে। পবিত্র গ্রন্থ, প্রার্থনালয়, বই, দোকানপাট তথা সমগ্র বাংলাদেশকে ধ্বংস করে পাকিস্তানী শোষন-শাসন কায়েম রাখতে চায়। কিন্তু এই শত্রুদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য দেশ প্রেমিকেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য বদ্ধ পরিকর। জীবন বাজি রেখে তাই যুদ্ধ করে। তারা শুধু চায় দেশ মাতৃকার মুক্তি। আবার মায়ের আঁচলের ¯েœহ ছাঁয়ায় গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে চায় তারা। শামসুর রাহমান তাৎপর্যময় সাহসী উচ্চারণ করেছেন এভাবে- “অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গি জিপ। আর্ত/শব্দ সবখানে। আমাদের দুজনের/মুখে আগুনের খরতাপ। আলিঙ্গনে থরথর/…………../দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।” (তুমি বলেছিলে ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    দেশ-মাতার দুর্দিনে কোনো খাঁটি দেশ প্রেমিক স্থির থাকে না। অবস্থা উত্তরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কোনো দেশ প্রেমিকের সামনে দেশের ক্ষতি হলে তাঁরা প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি জীবনও দিতে হয় তাতেও তারা প্রস্তুত। আর যারা দেশের জন্য প্রাণ দেয় তারা শহীদ। শহীদেরা কখনো মরে না। শহীদদের কপালে থাকে যৌবনের রাজটিকা। যতদিন দেশ তথা পৃথিবীর আলোবাতাস আছে ততোদিন তারা বেঁচে আছেন। এ বিষয়ে শামসুর রাহমানের পঙ্তি হল- “গুলির ধমকে হাত ভূলণ্ঠিত পতাকা যেন বা,/জানু-দেহচ্যুত নিমেষেই, ঝাঁঝরা বুক।/মাটিতে গড়ায় ছিন্ন মাথা/মুকুটের মতো,/অথচ ললাট থেকে কিছুতেই নক্ষত্র খসে না।” (ললাটে নক্ষত্র ছিল যার ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    বিদেশী বেনিয়ার কোনো জাতিকে সহজে স্বাধীনতা দিতে চায় না। স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়। আর শক্তিশালী শোষকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে গেলে রক্ত ঝরাতে হয়। ক্ষতিগ্রস্থ হয় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার। ধ্বংস, রক্তের সাগর পেরিয়ে স্বাধীনতা আসলেও তা শান্তির। অর্জিত স্বাধীনতা নতুন প্রাণের সৃষ্টি করে। এনে দেয় স্বর্গীয় সুখ। তাই স্বাধীনতা আমাদের চির কাম্য। কবি শামসুর রাহমান স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ রূপ অঙ্কন করেছেন এভাবে- “যখনই প্রবল আমি আসি,/আমার দু-চোখ জ্বল জ্বল/ধ্বংস আর সৃষ্টি/কাঁপে পাশাপাশি; আমি স্বাধীনতা।” (যে- পথে আমার পদধ্বনি ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    বাংলাদেশ প্রাচীন কাল থেকে ধন-সম্পদ, মণি-মানিক্যে ভরা। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে এদেশে আসত। দেশে সুখ-শান্তি ছিল। শ্যামল প্রকৃতি ছিল। শান্তি প্রিয় বাঙালি সহজ সরল জীবন-যাপন করতো। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাত্রি পাকিস্তানী বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির উপর। শুরু হয় হত্যা যজ্ঞ। তারপর যুদ্ধ শুরু হয় স্বাধীন একটি দেশ পাওয়ার জন্য। কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন- “আমার মগজে ছিল একটি বাগান, দৃশ্যাবলিময়।/কখনো তরুণ রৌদ্রে কখনো বা ষোড়শীর যৌবনের মতো/জ্যোৎস্নায় উঠত ভিজে। জ্যোৎস্নাভুক পাখি/গাইত সু-স্নিগ্ধ গান, আমার মগজে ছিল একটি বাগান।/এখন আমার কবিতার/প্রতিটি অক্ষরে বনবাদড়ের গন্ধ, গেরিলার নিঃশ্বাস এবং/চরাচরব্যাপী পতাকার আন্দোলন।” (প্রতিটি অক্ষরেঃ বন্দি শিবির থেকে)

    একাত্তরে যুদ্ধের সময় চারদিক প্রকম্পিত মর্টার, শেলের শব্দে। সমগ্র দেশ দখল করেছে পাকিস্তানী মিলিটারিরা। বাঙালিরা প্রাণের ভয়ে দেশ ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। যারা শহরে আছেন তারাও ভয়ে বাইরে বের হয় না। চারদিকে শুধু পাকিস্তানী মিলিটারী আর মিলিটারী। কেউ যদি অপারগ হয়ে নিতান্ত প্রয়োজনেও বের হয় তবে খুব সাবধানে মাথা-চোখ-ঘাড় নিচু করে। নিজ দেশে পরবাসী হয়ে যায়। তারা তাদের সব অধিকার হারায়ে ফেলে। শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই দৃশ্য কবিতায় তুলে ধরেছেন এভাবে- “বস্তুত বিষণœ এ শহরে হত্যাময় এ শহরে/স্বদেশীর চেয়ে বিদেশীর সংখ্যা বেশি। নাগরিক/অধিকারহীন পথ হাঁটি, ঘাড় নিচ, ঘাড়ে মাথা/আছে কি বা নেই বোঝা দায়। এই মাথার ওপর/আততায়ী; শাসক সবার/আছে পাকাপোক্ত অধিকার। কেবল আমারই নেই।” (উদ্বাস্তুঃ বন্দি শিবির থেকে)

    বাঙালি স্বাধীনভাবে সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানী হানাদারেরা। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। তারা পুনরুদ্ধার করতে চায় ষোড়শীরা কলস নিয়ে পুকুর ঘাটে পানি আনতে নির্বাধে যাওয়া; ছোট ভাই আনন্দে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে পারে। বৃদ্ধ বাবা যেন গুড়গুড় শব্দ করে হুঁকো টানতে পারে। বাঙালি যেনো মনের সুখে জীবন যাপন করতে পারে নিজাবাসে। সে জন্য বাঙলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে, যুদ্ধ করেছে। এই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমান লিখেছেন- “যাকে ভালোবাসি সে যেন পুকুর ঘাটে ঘড়া রোজ/নিঃশঙ্ক ভাসাতে পারে, যেন এই দুরন্ত ফিরোজ,/আমার সোদর, যেতে পারে হাটে হাওয়ায় হাওয়ায়,/বাজান টানতে পারে হুঁকো খুব নিশ্চিন্তে দাওয়ায়,/তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এই এঁদো-গ-গ্রামে/ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম কী দুর্বার সশস্ত্র সংগ্রামে।” (গ্রামীণ ঃ বন্দি শিবির থেকে)

    বহু আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময় আমাদের বাঙলা ভাষা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙলা বর্ণমালা। নিজস্ব ভাষা বাঙলায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে স্বর্গীয় সুখ লাভ করছি কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী শাসকেরা আবার আমাদের কাছ থেকে ভাষা-দেশ কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র-যুদ্ধ করে। নিজস্ব ভাষা না থাকলে কোনো জাতির অস্তিত্ব থাকে না। তাই ভাষা-দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশ পায়। কিন্তু বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির কারণে বিকৃতভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। প্রাণের ভাষা বাঙলা। অনেকে বাঙলা বলতে লজ্জাবোধ করে। নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা করে বিজাতীয় ভাষা চর্চা করে। এর মত দুঃখ-বেদনা আর হতে পারে না। আমাদের বাঙলা তথা মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা ও উন্নয়নকল্পে সচেষ্ট হতে হবে। কবি শামসুর রাহমান খেদোক্তি করেছেন- “তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?/ঊনিশ শো, বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।/……………./তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো/বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।” (বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা)

    যে আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তা স্বাধীনতার পা আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বিভিন্ন কুচক্রীমহল উঠে পড়ে লেগেছিল অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন করতে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দেশ চলতে থাকে টালমাটাল অবস্থায়। স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পীড়িত হচ্ছিল বাঙলা দেশ। দেশ চলতে থাকে স্বৈরশাসকের ইচ্ছায়। যেখানে নেই কোনো নিয়ম-কানুন, সংবিধান। অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন হতে দেখে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের আর্তনাদ কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় এসেছে- “উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ/হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।/এর চেয়ে মর্মন্তদ বৃত্তায়ন কাহিনী আর কী হতে পারে।” (আসাদের শার্ট)

    যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন সেই স্বপ্নর বাস্তবায়ন স্বাধীন দেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে ভাষার জন্য জীবন দিল সালাম-বরকতেরা সেই ভাষার শুদ্ধ চর্চার আজ আকাল। যে স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মিছিল ও মিটিং সেই স্বাধীনতা আজও আমরা পাইনি। যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারিনি জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীন একটি দেশ পেয়েছি আমরা। সেই বীর সন্তানদের যথাযোগ্য মর্যাদা দান করে জাতি হিসেবে আমরা কৃতজ্ঞ হব। “ফেব্রুয়ারী; ১৯৬৯” কবিতায় কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন- “স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেমখচিত গণচেতনা ও গণ-আন্দোলন/দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই।/জনসাধারণ/দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো/ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা/আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে এখনও বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে/ফোঁটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্ত্বরে।”

    স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম শামসুর রাহমানের কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর কবিতা পাঠ করলে পাঠক হৃদয়ে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। পাকিস্তানীদের বিভৎস্য নির্যাতন, অত্যাচারের বাস্তব চিত্র এই কবিতাগুলো। আজ ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধেও ইতিহাসও। নতুন প্রজন্মকে ঠিক ইতিহাস জানাতে দেশপ্রেমিক যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে কবি শামসুর রাহমানের অমর কবিতাগুলো বারবার পড়তে হবে।

যোগাযোগঃ
মুস্তাক মুহাম্মদ
কারুকাজ,
কেশবলাল রোড, যশোর-৭৪০০।
 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com