,

কবি হাফিজ রহমানের কাব্য ‘কবিতার কাছে যাবো’ : জীবনঘনিষ্ঠ উত্তাপ ।। আবুল কাইয়ুম

অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৬ উপলক্ষ্যে ঢাকার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মানুষজন প্রকাশ করেছে কবি হাফিজ রহমানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতার কাছে যাবো’। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে আসি প্রতিদিন’। তিনি আশির দশকের কবি হলেও কর্মজীবনের ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে দূরে ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ ‘এবং মানুষ’-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমে তিনি নিয়মিতভাবে লিখে আসছেন।

শিল্পী প্রদীপ ঘোষের আঁকা নান্দনিক প্রচ্ছদ, সুশোভন বাঁধাই ও সুন্দর কাগজে ঝকঝকে ছাপা নিয়ে প্রকাশিত এই চেৌষট্টি পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থে মোট বাহান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যটির ভূমিকায় বিশিষ্ট কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক আনোয়ার কামাল লিখেছেন, “কবি হাফিজ রহমান তাঁর কবিতা নির্মাণে যে পট নির্বাচন করেছেন, তা আমাদের যাপিত জীবনের নানামাত্রিক বৈষয়িক আবরণ, চিন্তার গতিধারা, লোকায়ত চিত্র, সহজিয়া গানের সুরধ্বনি, ছন্দের নৃত্য, শব্দের পরিমিত ব্যবহার, বর্ণনাকেৌশল যে কোন সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করে। —-সহজিয়া চারণ কবির কবিতার আস্বাদন খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁর এ কবিতাগ্রন্থে। পাঠক তাঁর এ কবিতা পাঠে হোঁচট খাবেন না এ কথা বলে দেয়া যায়।” কাব্যটি সম্পর্কে এই মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।

‘কবিতার কাছে যাবো’ নিছক কবিতার কাছে যাত্রার ঘোষণা নয়, কবির এই যাত্রা আত্মনিবিষ্ট প্রেমের কাছে, স্বদেশ ও নিসর্গের কাছে এবং আলোকিত মানবতার কাছে। তিনি নিসর্গের পরতে পরতে কবিতাকে দেখেন, প্রকৃতির সকল সুষমা তাঁর কাছে কবিতা হয়ে ধরা দেয়। তিনি কবিতা দেখেন প্রেমের মাঝে, ষোড়ষীর লাজনম্র হাসি আর তার গুনগুন গানের সুরের মাঝে। বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য, লোকজ জীবন ও সংস্কৃতির প্রাণময়তা তার হৃদয়ে কবিতা হয়ে ধরা দেয়। তার সাথে কবির মননে বয়ে যায় স্বদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনার নির্যাসধারা। বাংলার কৃষকের দুর্বিষহ জীবনকে তিনি উপস্থাপন করেছেন দারুণ সহমর্মিতায়। যুদ্ধ, ধ্বংশলীলা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিশ্বশান্তির জন্যও উন্মুখ হয়েছেন। ইতিবাচক জীবনবোধে উজ্জীবিত এই কবি মানবতার লাঞ্ছনা ও বিপন্নতায় বিচলিত হয়েছেন এবং তাঁর কণ্ঠে উচ্চকিত হয়েছে দ্রোহাত্মক ভাষা। তিনি সকল দুর্দশা ও অপঘাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে মানবঐক্য কামনা করেন। দেশের স্বাধীনতায় জাতির জনকের মহান অবদানের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা ও তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডে গভীর দ্রোহের প্রকাশও লক্ষ্য করা গেছে তাঁর কবিতায়।

কবির প্রেমের কবিতাগুলোতেও রয়েছে তাঁর ইতিবাচক চেতনার স্ফূরণ। রূপসী নিসর্গের মাঝে তিনি দয়িতাকে নিয়ে প্রেমের প্রাসাদ গড়তে চান। বাংলার ষড় ঋতু কবির অন্তরকে প্রেমের্ নানা বোধে জাগরিত রাখে। প্রিয়াকে নিয়ে অনাবিল সুখে অনন্তকাল প্রেমের খেয়ায় ভেসে অজানার যাত্রি তিনি। কখনো মনে হয়, কবির দয়িতা মান-অভিমান, মিলন-বিরহ ও হাসিকান্না নিয়ে সাংসারিক আবর্তে বাঁধা এক রক্তমাংশের মানুষ। আবার দেখি, তাঁর কাব্যপ্রিয়া কায়াহীন সেৌন্দর্য নিয়ে কবির সর্বময় অস্তিত্বে বিরাজমান এক অনিবার্য রমণী, যে শুধু কবিতার আগমন কালে ধরা দেয় এবং কবির সাথে মিলিত হয় অনপনেয় স্বর্গীয় অনুভূতি জাগিয়ে।

প্রকৃতিই যেন কবি হাফিজের পাঠশালা। বাংলার প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ যেন তাঁর কবিতার বর্ণমালা। কাব্যটির প্রেম ও জীবনঘনিষ্ঠতা –এ উভয় প্রান্তের প্রতিটি কবিতাতেই পেলব আস্তর এই নিসর্গাশ্রয়ী ভাষার। এ কারণেই আমার বিশ্বাস, তাঁর কবিতার চিত্রকল্পগুলো পাঠকদের প্রাণ ছুঁয়ে যাবে এবং তাদের প্রাণে অনির্বচনীয় উজ্জীবন এনে দেবে। সুচয়িত শব্দাবলীতে গঠিত সাবলীল ও আবেগময় ভাষায় তাঁর কবিতা ছড়িয়েছে জীবনঘনিষ্ঠ উত্তাপ।

আমি কাব্যটির বহুল প্রচার ও পাঠ কামনা করি।

গ্রন্থ পরিচিতি : ‘কবিতার কাছে যাবো’(কাব্য)। লেখক : হাফিজ রহমান। প্রকাশক : মানুষজন, বেজমেন্ট রুম ২৭, কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা-১২০৫। প্রচ্ছদ শিল্পী : প্রদীপ ঘোষ। মূল্য : ১৪০ টাকা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com