,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : চরম বৈষম্যের শিকার মেয়ে শিক্ষার্থীরা

জি.এ.মিল্টন, রাবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বর্তমানে প্রায় ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তাদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধেক। তবে ক্যাম্পাসে ছেলেদের যেমন সুযোগ সুবিধা রয়েছে মেয়েদের অর্ধেকই নেই। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আবাসিক ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে চরমভাবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছেন এসব সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করা যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রী হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের নিরাপত্তার অনেক ঘাটতি রয়েছে আমাদের রাত আটটার মধ্যে হলে ফিরতে হয়। ছেলেদের তো তা করতে হয়না। একটু দেরী হলেই হলে স্বাক্ষর করে এমনকি হল প্রাধ্যক্ষের সাথে কথা বলে কিংবা ওই ছাত্রীর বাসায় ফোন দিয়ে তারপর হলে ঢুকতে হয়। আমাদের হলে ডাইনিংয়ে পর্যাপ্ত খাবার রান্না করা হয়না। যে কয়জন ডাইনিংয়ে রান্না করতে বলে শুধু তাদের জন্যই খাবার রান্না করা হয়। আবার রান্না করার জন্য পর্যাপ্ত হিটারের ব্যবস্থা নেই। যেখানে ছেলেদের প্রতিটি হলেই প্রতিটি রুমে হিটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ছাত্রী আবাসিক হলে একই চিত্র। তাদের হলে কোন ধরনের গেস্ট বা অতিথি থাকার সুযোগ নেই। সে হোক মা কিংবা বোন। অন্যদিকে রয়েছে সান্ধ্য আইন। বেগম খালেদা জিয়া হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা এবং বাকি পাঁটটি হলে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে হলে প্রবেশ করতে হবে। একটু দেরী হলে তাদের স্বাক্ষর করে বা তাদের পিতামাতাকে ফোন করে তারপর হলে প্রবেশ করতে হয়। হলের গার্ড দ্বারা তাদের চরমভাবে বকাঝকা করা হয়। একটি হিটার দিয়ে প্রায় ১০-১২জনকে রান্না করতে হয়। রান্না করার জন্য তাদের সিরিয়াল দিতে হয়। তারা অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই থাকে গণরুমে।

মেয়েদের নিরাপত্তার চরম অভাব রয়েছে এই ক্যাম্পাসে। সম্প্রতি মেয়েদের এক হলে দারোয়ান ও সহকারী রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের পোশাক ও শরীর নিযে অশালীন মন্তব্য ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা অবাধে প্রবেশ করতে পারে। এতে মেয়েদের বেশি নিরপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। কিছুদিন আগে এক ছাত্রীকে সাদা মাইক্রোবাসে করে ওঠে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে শিক্ষর্থীরা সাতটি দাবি করেছিলেন। তবে তাদের ৬টি দাবি প্রশাসন এখনও পূরণ করতে পারেনি। ক্যাম্পাসে রাতে গাঁজার আড্ডা বসলেও তাতে প্রশাসন কিছু করতে পারে না। কিন্তু দুই-একজন মেয়ে রাতে নিরাপত্তার জন্য রিকশা করে হলে ফিরলেও তাদের রিকশা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে হয়রানি করা হয়।

অন্যদিকে ছেলেদের হলে দেখা যায় এর বিপরীত চিত্র। তাদের সান্ধ্য আইন তো দুরের কথা। রাতে যেকোন সময় হলে প্রবেশ করতে পারে। প্রশাসন থেকে তাদের কোন বাধা দেয়া হয়না। হলে ফেরার সময় তাদের স্বাক্ষর করতে হয়না; বকাঝকা তো দুরের কথা। তারা রাতে ক্যাম্পাসে অবাধে চলাফেরা করতে পারে। প্রত্যেক হলেই ছেলেরা তাদের অতিথিকে (ভাই, বাবা কিংবা নিজের আত্মীয়-স্বজন) রাখতে পারে। তাদের সব হলেই রান্নার জন্য (প্রতিরুমে) হিটারের ব্যবস্থা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া হলের এক আবাসিক শিক্ষাথী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করে বলেন, মেয়েদের হলেই সুযোগ-সুযোগ অনেক কম। আমাদের মা কিংবা বোন কেউ আসলেও আমরা আমাদের কাছে রাখতে পারিনা। এর চেয়ে দু:খের আর কি হতে পারে। আবার আামদের এখানে রান্না করার জন্য হিটারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। রান্নার জন্য আমাদের দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কখন বড় আপুদের রান্না শেষ হবে আর আমরা রান্না করবো।

রহমতুন্নেসা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, মেয়ে হয়েছি বলেই আমাদের বড় সমস্যা। ছেলেদের জন্য তো কোন বাধা নেই। আমাদের অনেক আবাসিক শিক্ষাথী গরীব। তাদের প্রাইভেট-টিউশনি থাকে। তাদেরকে দেরী করে হলে ফিরতে হয়। কিন্তু প্রশাসনের এমন নিয়মেই আমরা আর তা পারিনা। রাতে প্রাইভেট পেলে তা বাদ দিয়ে দিতে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছাদিক বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি মতামত দিতে চাচ্ছিনা। প্রক্টর মহাদয় উনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন। তবে মিটিং-এ বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করার জন্য প্রশাসন থেকে পুলিশ সদস্য বাড়ানো হয়েছে। রাতে টহল পুলিশ বাড়ানো হয়েছে। আর তাদের সান্ধ্য আইনের ব্যাপারে আমরা তাদেরকে (শিক্ষার্থীদের) বলেছি তোমরা আগে ভাবো, তোমাদের অভিভাবক কি বলে সব কিছু বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মেয়েদের প্রতিরুমে হিটার আছে কিনা এটা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান প্রক্টর।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার ভিতরে হলে প্রবেশের যে নিয়ম রয়েছে, তা ছাত্রীদের ভালোর জন্যই বলবত থাকবে। এটা পরিবর্তন করা হবে না। তবে যাদের একান্তই প্রয়োজন হবে তারা হল প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বাহিরে থাকতে পারবে।
ক্যাম্পাসে বহিরাগত যানবহন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এত বড় ক্যাম্পাসে হুট করে সবকিছু বন্ধ করা সম্ভব নয়। বহিরাগত মোটরসাইকেল ও প্রাাইভেট কার প্রবেশ এবং বেপরোয়া চলাচল বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে। পরবর্তীতে বহিরাগত যানবাহনগুলোকে গেট দিয়ে প্রবেশের প্রহরীর কাছে রক্ষিত নিবন্ধন খাতায় এন্ট্রি করে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে নিয়ম তৈরি করা হতে পারে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com