শনিবার, ২১ Jul ২০১৮, ১২:০৪ অপরাহ্ন

English Version


সিলেটনামা



জায়গাটার নাম তালতলা। আশে পাশে দুই একটা খাবার হোটেল। সামনে একটা পুরনো ছাল উঠা সিনেমা হল। নাম; নন্দিতা। তার একটু সামনেই দেশের দীর্ঘতম সুরমা নদীর ঘাট আর তার উপর স্থাপিত বিরাশি বছরের পুরনো কিন ব্রিজ। সেই তালতলায় আশি ও নব্বই দশকে সিলেটের একটি অন্যতম প্রধাণ হোটেলের অবস্থান। সেই হোটেলটির নাম ‘হিল টাউন’। ১৯৯৭ সালের আশ্বিনের এক শুভ্র সকালে আমি ‘হিল টাউন’ এ এসে উপস্থিত হই। তাড়াহুড়ো করে কোন রকমে শাওয়ার নিয়ে একটি স্কুটারে করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে যাই। উপলক্ষ নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন। সে ছিল মাত্র একদিনের অবস্থান। তারপর হেমন্তের এক ঘোরলাগা বিকেলে আবারো ‘হিল টাউন’। এবার লম্বা সময়ের জন্য। সেই শুরু। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় তখন গাছপালাহীন এক বিরানভূমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে কয়েকটা অপরিসর দালান কোঠা। দু একটা মুদির দোকান। ১৯৯৭ সালের নভেম্বরের ২৯ তারিখ আমি নৃবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেই। একাডেমিক বিল্ডিং ‘সি’-এর চার তলায় মাত্র দুইটা রুম নিয়ে তখন নৃবিজ্ঞান বিভাগ কাজ শুরু করেছিল।

(দুই)-বৃষ্টির দিন, হেনরি ওয়ার্ডসওর্থ লংফেলো একবার বলেছিলেন, ‘ Into each life, some rain must fall’. সিলেটে থাকলে আপনি চান আর না চান, বৃষ্টি আপনাকে দেখতেই হবে। আমি বিভাগে যোগদান করার পর সিলেটে ছাতা নিয়ে আসি নি শুনে আমার এক সহকর্মী যেই দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন যেন আমি মানুষ খুন করার মতো অপরাধ করে এসেছি। লোকে বলে সিলেট হলো লন্ডনের মতো। সিলেটকে তাই অনেকেই ‘সেকেন্ড লন্ডন’ বলে ডাকতে পছন্দ করে। আবহাওয়া, ‘পাউন্ড ফ্যাক্টর’ আর ‘ব্যাক হোম ইফেক্ট’-সব মিলিয়ে সিলেট হয়ে উঠেছে ‘সেকেন্ড লন্ডন’। একদিন হয়ত লন্ডনকেও ‘সেকেন্ড সিলেট’ বলা হবে। কে জানে? অক্সফোর্ডের বিখ্যাত বাঙ্গালী ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরীর আদি নিবাস বরিশাল। তপন রায়কে কে যেন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনাদের বরিশালকে তো প্রাচ্যের ভ্যানিস বলা হয়।” তিনি নাকি উত্তরে বলেছিলেন, “আপনি বরিশাল দেখেছেন,মশায়? ভেনিসকে বরং ইউরোপের বরিশাল বলা যায়।” রায় চৌধুরী’র মতো সিলেটের লোকজনও তাদের পিতৃ-মাতৃ ভূমি নিয়ে বুকের ভিতর সাগরসমান মমতা লালন করেন এবং সে তিনি যেই হোন না কেন ফজলে হাসান আবেদ কিংবা জামিলুর রেজা চৌধুরী; ঠিকই দেখা হলে নিজেদের মধ্যে সিলেটি মাত্ মাততে কখনো ভুল করেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর কিছুদিন হোটেল ‘হিল টাউন’, কিছুদিন অতিথি ভবন (এটা তখন ছিল শিক্ষকদের ক্লাবের উপর তলায়) করে শেষ মেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটের উল্টো দিকে ‘সাইফুন হাউজিং’ এর তিন তলায় একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা হল। সন্ধ্যা হলেই তখন শেয়ালের ডাকা ডাকি, ঝি ঝি পোকার আর্ত চিৎকার, জোনাকির নির্মিলিত আলো, জোৎস্নায় চাঁদের বাসর-সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে এক ঐন্দ্রজালিক আধি ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করতো। ‘সাইফুন’ এ আমাদের অর্থনীতির সহকর্মী মোহম্মদ মহসিন প্রায়ই নিজের রুম অন্ধকার করে জ্বিন নামাতেন। সেই জ্বীনের নাম ছিল কফিল। কফিলের দেশের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ। সে যাই হোক। বলছিলাম বৃষ্টির কথা। মার্চ মাস থেকেই বৃষ্টি শুরু হত। চলত অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত। বৃষ্টি! সেকি বৃষ্টি! আমি টানা ৬ দিনের উপর্যুপরি বৃষ্টি দেখেছি। আমার কাছে তখন নিউ মার্কেট থেকে সদ্য কেনা গেব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড’। কিছুতেই দাঁত বসাতে পারছিলাম না। এত বিরাট সাইজ। সেই ৬ দিনের টানা বৃষ্টিই আমাকে নিয়ে গেল কলম্বিয়ার সেই ‘মেকন্ডো’ শহরের বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের এক শ্বাসরুদ্ধকর জীবনোপাখ্যানে। বৃষ্টি, ডিম ভাজি, খিচুরি, বেগুন ভাজা, গরুর মাংস আর যুসে বুয়েন্দিয়া, উরসেলা, অরেলিয়ানো।‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড’ এক টানে শেষ করা আমার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই বৃষ্টি না হলে এই অসাধারণ যাদু-বাস্তবতার জগতে আমার কোন দিন প্রবেশ করা হতো কিনা জানি না।

(তিন) – বৃষ্টির দিন, মৌলভীবাজারকে বলা হয় চায়ের রাজধানী। কোন কিছু পেলেই তাকে রাজধানী বানানোর বাসনা বাঙ্গালীর এক চিরন্তন প্রবনতা।সেই হিসেবে সিলেট বিভাগে আছে আরো দুই রাজধানী।সিলেট-দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী; সুনামগঞ্জ- হাওরের রাজধানী। এই তিন রাজধানীতেই আমি বৃষ্টি দেখেছি।মৌলভীবাজারের ভারাউরা, ফিনলে, লংলা, মাথিউরা চা বাগানে, সার্কিট হাউসে, সিলেটের সাইফুন, উপশহর আর তপোবনের বাসায়, সুনামগঞ্জের ষোলঘর কলোনির উল্টোদিকে গাউসিয়া আবাসিক এলাকার বাসায়। দিবসে এবং রাতে আমি বৃষ্টি দেখেছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি। রবীন্দ্রনাথ কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মত বৃষ্টিবিলাস না হলেও বৃষ্টিকে কাছ থেকে দূর থেকে দেখেছি। জানলায় দাঁড়িয়ে, দূরে হাওরের জলে বৃষ্টির বাড়াবাড়ি দেখেছি। বহু বছর আগে আমাদের কলেজের এক অগ্রজ ভ্রাতা কাজ করতেন শ্রীমঙ্গলের এক বিখ্যাত চা বাগানে। সেখানে বেড়াতে গিয়েছি। সারা রাত গল্প করে ভোর রাতে ঘুমাতে যাব এমন সময় শুরু হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। বাংলোর পাশে টিনের চালের একটা কটেজে বৃষ্টির শব্দ, চায়ের পাতার উপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, আর বড়ো বড়ো ছায়া বৃক্ষের উপর বৃষ্টির শন শন আওয়াজ- এই তিনে মিলে কি এক বিষন্ন, বিপন্ন বৈভব। কি এক আকুল আকুতি। কি যে এক প্রেমাঙ্গলী! এইসব এক একটা দিন রাত্রি আজও কেমন শিহরন জাগায়।বিভাগের ১০০৫ নম্বর রুমে বসে সারা রাত জেগে সিলেবাস টাইপ করেছি। সকালে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। বাসায় আর যাওয়া হয় না। কিছুক্ষন পর শুরু হল সিলেবাস কমিটির সভা। রাতজাগা আমি সারাদিন খেটে-খুটে রাতে ঘুমোতে গেছি। শুরু হলো সেই অমোঘ বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে কম্বলমুড়ি দিয়ে সে কি সাধের বৃষ্টি-ঘুম! সাইফুনের পিছনে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পুকুর ছিল। ডোবা বলাই ভালো। বৃষ্টি এলে সেখানে শুরু হত ব্যাঙীয় কোরাস। সেই সব একাকী বৃষ্টির দিনগুলোর অমোঘ মায়া আজও লেগে আছে। এখন যখন লিখছি তখনো এই ঢাকা শহরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।আজকাল বৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সব মোহময় বৃষ্টিমাখা আবেশ আর হয় না।
“Here comes the rain again
Falling on my head like a memory
Falling on my head like a new emotion
Here it comes again
I want to walk in the open wind
I want to talk like the lovers do
I want to dive in the ocean
Is it raining with you?”
(চলমান)

লেখক, এ.কে.এম. মাজহার মোশাররফ
বিভাগীয় প্রধান, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media




ফুটবল স্কোর



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com