মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৪ অপরাহ্ন

English Version
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলোতে প্রেম

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলোতে প্রেম



সাস্টের চারতলা বিশিষ্ট কোন এক ভবনের চারতলায়, দূর্ধর্ষ চেহারার তরূণ ও এক ছিপছিপে গড়নের কিশোরীকে দেখা যেতো গোধূলি কিংবা কুয়াশার মোড়ানো মাঘ ফাল্গুনের সন্ধ্যায় যখন নিজেকে কাশ্মিরী শালে জড়িয়ে রাখতো ঠিকানা বিহীন বাউণ্ডুলে যুবক।
আর কিশোরী তার বাবা শিক্ষক বাবার কাছে অভিমানী আবদারের বায়নায় নেয়া আদিবাসী শালের মাঝে লুকিয়ে রাখতো নিজেকে। ছিপছিপে গড়নের কিশোরীর কাঁধব্যাগে ঝুলন্ত ল্যামোনেটিং ছোট পুতুল বাচ্চাটি যেন প্রতিবার আঁধারের স্বাক্ষী হত । সে’বার শীত পাড় হলে শ্রাবণ সন্ধ্যায় তীর্থের কাকভেজা বৃষ্টিতে ভিজে, দুটো মুখের হাসির চিলেকোঠায়, একটা ছোট কবিতার মত আড্ডায় আটকে যায় যুগল প্রেমিক।

কিশোরীর হাতে গাঁঢ়ো পাহাড়ের আরঙ থেকে কেনা লাল রঙের কাঁচের চুড়ি থাকতো অহঃরহ। তরূণ প্রায়-ই তার সে পছন্দের কিশোরীকে মাথার ভেতর লুকিয়ে থাকা অসামান্য সেলুলয়েড কবিতা বের করে শোনাতো। মেয়েটিও তার অসাধারণ গলায় গান গেয়ে সময়ের জেলখানায় আটকে রাখতো যুবককে। তাদের এসব কর্ম দেখে নিচ তলার প্রৌড় গার্ড ভ্রু-কুঁচকে তার মুখ চেপে বসে থাকতো অথবা তাদের এই রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখে ফিরে যেতো তার লাঠিম ঘুরানো শৈশবে।

তাদের প্রেমিক বলা যায় না, কিশোর-কিশোরী যুগল প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি শুধুই বন্ধু এ নিয়ে তার সহপাঠিরা প্রায়ই আড্ডা বসাতো চায়ের টঙে কিংবা সুযোগ পেলে ছাপ ছেড়ে দিত শতসিঁড়ির শহীদ মিনারে। তবে ক্লাসের অন্যরা ভাবতো ওরা আসলেই প্রেমের সমাধিতে সমার্পিত করেছে দুজনকে।

কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে মূল বিষয় এইযে, ওরা কখনোই নিজেদের যুগল প্রেমিকের সিংহাসনে বসাতে পারে নি। তবে তাদের মাঝে কেউ হয়তো চা-বাগানের ঘুরতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে চঁকচকে রোদে মাটিতে জেগে উঠা ঈষৎ হলুদ বালু বৈরাগ্য হয়ে ভর করেছিলো একে অন্যের উপর। হয়তো সে ভাললাগার পরক্ষণে একসাথে ছবি তুলে তাকে বন্ধি করেছে সোনালী ফ্রেমে!

ক্যাম্পাসের প্রথম দিনগুলোতে তারা একসাথে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটাতো। টঙে এককাপ দুজনে ভাগাভাগি আবার কখনো একটা আবার কখনো তীব্র গরমে এক বোতলের পানি ভাগাভাগি করে খেতো। কোনদিন সন্ধ্যায় তারা বিষন্ন মনে একটা রিক্সা ভাড়া করে ঘুরতে যেতো পশ্চিমে টুকের বাজার।

কিন্তু এর মাঝে কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের মাঝে বিচ্ছেদের করূণ সুর দাঁড়িয়ে পড়ে বেঁকে যাওয়া সরলরেখায়। যুবক তার পছন্দেরর সে কিশোরীকে জম্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে বলে চাবাগানে তোলা তাদের মিলন মোহনার সোনালী ছবিটা প্রিন্ট করে গিপ্টবক্স সাজায় সাত রঙের সংমিশ্রণে। কিন্তু সেখানেও অভিমানের তীব্র অভিলাষ এসে ভিড় করায় যুবতিকে আর সে উপহার দেয়া হয়নি তরূণের। এর পর তাদের মাঝে দূরূত্ব বাড়তে থাকে। প্রথমে ক্লাসে পাশপাশি সিট থেকে তারপর আগ পেছনে কিংবা ভিন্ন দিকে দুজন দু চেহারায় তাকিয়ে থাকতো। যুবক তাদের সে ছবিটা বেশ যত্ম করে রেখে দিয়েছিল। একবার সে লাইব্রেরী থেকে বই এনে পড়ার ফাঁকে আনমনে সে ছবিটা বইয়ের মধ্যে রেখে দেয়। তারপর যখন ছবিটা খোজাখোঁজি শুরূ করে তখন আর তার মনে থাকে না যে, সে ছবিটা বইয়ের পাতার মধ্যেই ছিল। তারপর দিন শেষে বইটা লাইব্রেরীতে জমা দেয় কিন্তু সে ছবি আর কোথায় রেখেছে সেটা তার মনে আসে না। একদিন লাইব্রেরীয়ান তাকে ডেকে বললো , “আমরা বই সাজাতে গিয়ে বইয়ের ফাঁকে একটা ছবি পেয়েছি আর সেটাতে আপনার মত কেউ একজন আছে, একটু দেখবেন কি সে ছবিটা আপনার নাকি?”
যুবক বেশ কৌতহলে সে ছবিটা হাতে নিয়ে আবার সেই বিকেলে ফিরে যায় আর চোখে নিচে স্মৃতির চিহ্ন একে নিজেকে নিয়ে ভাবে, একদিন এমন সোনালী বিকেলে তারা একই রিক্সার চাপা হুডের নিচে বসে ঘুরে বেড়াতো আর আজ দুজনের মাঝখানে ব্যাপক ব্যবধান এসে মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তখন মোমবাতির আলোর কাছে দাঁড়ালে চোখের সামনে থাকে শুধু অন্ধকার। আর অযত্নে পড়ে থাকা একটি ধূসর কবিতা।

আবার একদিন মাতাল হয়ে হেঁটে বেড়াবো পৃথিবীর পথে
চোখের নিচে মারজুয়ানা;আর
অকস্মাৎ হাতের আঙুলের ফাঁকে নেশারস্তুপ।
বিশ্বাসঘাতক বরূণারা কথা রাখবেনা জেনেই –
ভুল করে হেমা-সেনের চুলের ঘোর অন্ধকারে ডুব দিবো অমাবস্যার মাঝরাতে।
তারপর,
বাড়ি ফেরার ঠিকানা ভুলে গেছি; তাই
শহর ডিঁঙ্গিয়ে মাঝরাতে
বাড়ি ফিরতেই ভুলে যাবো
হয়তো কুড়ি বছরের পর
ছেঁড়া টি-শার্টের বাম পকেটে গুঁজে রাখবো নিকোটিনে দগ্ধ জীবনানন্দ।

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com