শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন

English Version
মালয় নেতৃত্বে আবার মাহাথির

মালয় নেতৃত্বে আবার মাহাথির



জি. কে. সাদিক # গত ৯ মে মালয়েশিয়ার ১৪তম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের ২২২টি আসনে এবং ১৩ রাজ্যের মধ্যে ১২ রাজ্যের ৫০৫টি আসনে ২ হাজার ৩৩৩ জন প্রার্থী নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দেড় কোটি ভোটারের মধ্যে ৭৬ শতাংশ ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে টানা ৬০ বছর ক্ষমতায় থাকা বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) পার্টিকে হারিয়ে ক্ষমতার মসনদ দখল করে নিলেন পাতাকান হারপান দল।

২০১৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে বিনিয়োগ তহবিলের ৭০ কোটি ডলার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক শিষ্য রাজাকের বিরোধী পার্টি পাতাকান হারপানে যোগ দেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদ। বিএন পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নাজিব রাজাক ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বারিসান ন্যাশনাল পার্টির অধীনে। তখন থেকেই নাজিব রাজাক ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদের খুব ঘনিষ্ঠ। সম্পর্কটা ছিল গুরু-শিষ্যের মতো। তথাপি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক পতন ও নাজিবের ওপর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ যোগ দেন বিরোধী শিবিরে আর তখন থেকেই মালয়েশিয়াতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে নাজিব কিছু কৌশল নিলেও মজবুত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত মালয় গণতন্ত্রের সামনে সে কৌশল টিকেনি। সারা দেশে একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোথাও কোনো ধরনের নির্বাচনবিধি ভঙ্গ হয়েছে এমন অভিযোগ শোনা যায়নি, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি নজির। বিশেষ করে যেসব দেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে স্বীকৃত তাদের জন্য। কারণ ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মালয়েশিয়াও ছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশ। আজ আর তাদের আগের অবস্থান নেই। আজকের যে মালয়েশিয়া তা আগে ছিল না। এ অবস্থানে এসেছিল নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের হাত ধরেই। আবার তিনি ক্ষমতায় এলেন।

তিনটি সালতানাত ও ১৩টি রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩ লাখ ২৯ হাজার ৮৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া। বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ। মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কাঠামোতে পরিচালিত। রাজা হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারপ্রধান। ১৯৫৭ সালে মালয় ফেডারেশনের সময় ইসলামী দলগুলোর সম্মিলিত ফোরাম জয়লাভ করলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এবং সে সময় থেকেই মালয়েশিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ। আর তখন থেকেই মালয়েশিয়ার সরকার ও রাজনীতিতে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। বর্তমান মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রধর্মও হচ্ছে ইসলাম। মালয়েশিয়ার অর্থনীতি হচ্ছে মুক্তবাজার অর্থনীতি তথাপি এটা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের স্বার্থই মালয়েশিয়ার অর্থনীতির মূলমন্ত্র। মালয়েশিয়ার সরকারি ভাষা হচ্ছে মালয়। এ ছাড়া মালয়েশিয়াতে ১৩০টি ভাষা (চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা, বুগিনিয়, দায়াক, জাভানী এবং দক্ষিণ ভারতের তামিল ভাষা প্রধান) প্রচলিত আছে। মালয়েশিয়াতে ভাষা ও অঞ্চলকেন্দ্রিক অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বসবাস করে। এখানে মালয় ৫০.১ শতাংশ, চায়নিজ ২২.৫ শতাংশ, আদিবাসী ১১.৮ শতাংশ, ভারতীয় ৬.৭ শতাংশ এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ৮.৮ শতাংশ মানুষ বাস করে। তথাপি মালয়েশিয়াতে ধর্ম ও সম্প্রদায়গত দূরত্ব নেই। নেই কোনো ধরনের ধর্মীয় বিবাদ। মালয়েশিয়াতে দুই ধরনের বিচারব্যবস্থা বিদ্যমান। শরিয়া আইনের পাশাপাশি সিভিল কোর্টও রয়েছে। সাধারণত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য শরিয়া আইনের প্রচলন। যদি কেউ চায় সাধারণ আইনের আশ্রয়ও নিতে পারে। ১৯৬২ সালে মালয় অঞ্চলের ছোট সালতানাতগুলো যে কনফেডারেশন করেছে, তার প্রত্যেকটি রাজ্যের সুলতান তাদের প্রধান ধর্ম হিসেবে ইসলামকে বিছে নিয়েছিল। তখন থেকেই মালয় ফেডারেশনের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে মালয়েশিয়া সাংবিধানিকভাবে প্রত্যেক ধর্মের সম-অধিকার নিশ্চিত করেছে। তাই জাতীয়ভাবে সরকার নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করতে চাইলে ইসলামী গবেষকরা এ ব্যাপারে সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। ২০১৬ সালের ৮ মে চীনা বংশদ্ভূত এক মালয় নারী ধর্মান্তরিত (ইসলাম থেকে বৌদ্ধ হতে চায়, সে মহিলা আগে বৌদ্ধ ছিল, প্রেমের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করলেও পরে আবার বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে) হতে চাইলে ইসলামী আদালত তা অনুমোদন করে। যদিও ইসলামী আইনে এটা নিষিদ্ধ, তবু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে রিলিজিয়াস কাউন্সিল এটা অনুমোদন করেছিল। তবে এ মামলার চূড়ান্ত রায় এসেছিল হাইকোর্ট (সিভিল) থেকে। মালয়েশিয়ায় ধর্ম অনুসারীর মধ্যে মুসলিম ৬১.৩ শতাংশ, খ্রিস্টান ৯.২ শতাংশ, বৌদ্ধ ১৯.৮ শতাংশ, হিন্দু ৬.৩ শতাংশ, কনফুসিয়াস ১.৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারী ১.২ শতাংশ। তাই ধর্মবৈচিত্র দেশে সম্পূর্ণভাবে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই মালয়েশিয়া নানা রকম চড়াই-উতরাই পার করে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। যার পেছনে মূল ভূমিকায় ছিলেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৬৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মালয়েশিয়ার উন্নয়নের মধ্যমণি হতে থাকেন। ১৯৬৯ সালের ৩০ মে কুয়ালালামপুরে চীন-মালয় দাঙ্গার সময় মাহাথির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমানকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে চিঠি লেখার জন্য দল থেকে বহিষ্কার হন। ১৯৭২ সালে সে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে আবার সদস্য হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়। ১৯৭৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করলে তাকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আর পাল্টাতে থাকে মালয়েশিয়ার চিত্র। তিনি ১৯৭১ সালে প্রণীত নিউ ইকোনমিক পলিসির (এনইপি) সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালয় জাতির ভাগ্যে জাদুকরী উন্নয়নের পরশ এনে দেন। ১৯৯০ সালে মালয়েশিয়ার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০ বছর মেয়াদি এনইপি শেষ হওয়ার পর নতুন চমক হিসেবে তিনি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি (এনডিপি) হাতে নেন। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যাংকের কোনো ধরনের সাহায্য গ্রহণ না করে তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশ কীভাবে নিজের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছাতে পারে সে ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। যে মালয়েশিয়া আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সারা বিশ্বের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। তবে ২০১৩ সালে নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর সে উন্নয়নে কিছুটা ভাটা লাগে। তাই দেশের জন্য অবসর ভেঙে আবারও রাজনীতিতে আসেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন গত ১০ মে। তবে এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চুক্তি অনুযায়ী দুই বছর ক্ষমতায় থাকবেন। এরপর তিনি সমকামিতার দায়ে কারাবন্দি বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের মুক্তির ব্যবস্থা করে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।

মালয়েশিয়াতে নির্বাচন হলো কিন্তু কোনো রক্তপাত হলো না। সিলমারা, ভোট কারচুপি, ব্যালটবক্স ছিনতাই, কেন্দ্র দখল বা বিরোধীদলীয় প্রার্থীকে বের করে দেওয়ার মতো কোনো ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশ কীভাবে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বিশ্বের কাছে রোল মডেলে পরিণত হলো। রাজনৈতিক অঙ্গনে এতটা স্থিতিশীলতা কীভাবে এলো তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটা দেশের জন্য। কারণ মালয়েশিয়া বাংলাদেশের কিছুকাল আগে স্বাধীনতা লাভ করেছে। ধর্ম ভাষা ও জাতিগতভাবে বাংলাদেশের চেয়েও বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ একটা দেশ। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ইসলামী আইনও আছে। তথাপি শিক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সব দিক থেকেই উন্নত অবস্থানে রয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম থাকার পরও তাতে ধর্ম বিদ্বেষ নেই। বিশেষ করে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম থাকার পরও। একসময় মালয়েশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য। আজ তার উল্টো হচ্ছে। ১৯৫৭ সালে মালয় ফেডারেশন গঠনের পরে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসার কল্পে টুঙ্কু আবদুর রহমান সে দেশের ছাত্রদের জন্য সামার স্কুল নামে ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল সদ্য-স্বাধীন মালয় ফেডারেশনকে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করে পুনর্গঠন করা। মালয় জাতি গঠিত হয়েছে, তারা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিচক্ষণ মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, ‘আমাকে দশজন যুবক দেওয়া হলে আমি মালয়ীদের সঙ্গে নিয়ে এই বিশ্বটা জয় করে ফেলব।’ জয় করেছিলেনও বটে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। শিক্ষা নিতে পারে এবং জাতীয় জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক কল্যাণে ব্রত হতে। আর এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com