সোমবার, ২১ মে ২০১৮, ০১:১৩ পূর্বাহ্ন

আজকের সেহরী ও ইফতার :
আজ ২০ মে রবিবার, রমজান- ৩, সেহরী : ৩-৪৪ মিনিট, ইফতার : ৬-৪০ মিনিট, ডাউনলোড করে নিতে পারেন পুরো ফিচার- ডাউনলোড


বেকার সমস্যা সমাধানে কিছু কথা : জি. কে. সাদিক

বেকার সমস্যা সমাধানে কিছু কথা : জি. কে. সাদিক

জি. কে. সাদিক
জি. কে. সাদিক



বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মধ্যে বেকারত্বের হার নিয়ে এক ধরণের টানাটানি চলছে। আমি সে ঝামেলায় না জড়িয়ে বেকার সমস্যার সমাধানকল্পে কিছু করণীয় নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথম কথা হলো বেকার সমস্যা সৃষ্টি ও ক্রমে প্রকট হচ্ছে কেনো সে কারগুলো দিকে দৃষ্টি দিয়ে এর সমাধান কল্পে কাজ করা। আর একটা অপ্রিয় সত্য বিষয় আমাদের মেনে নিতে হবে। সেটা হলো বর্তমান বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে নানা বিধ কারণে বেকার সমস্যা বাড়ছে। জার্মানি ও রাশিয়ার মতো উন্নত দেশেও বেকার সমস্যা ক্রমবর্ধমান। আমেরিকা, সৌদি আরব, ভারতের মতো দেশও বেকার সমস্যার ভুক্তভোগী। কিন্তু এ সমস্যা থেকে তাদের উত্তরণ প্রচেষ্টা ও সফলতা আমাদের চাইতে ভালো। আমাদের দেশে বেকার সমস্যার সমাধানকল্পে সরকার নানাবিধ প্রদক্ষেপ নিচ্ছে বটে, তবে বেশ কিছু কারণে তেমন ফলপ্রসু হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এ প্রচেষ্টা অপাত্রে কন্যা দানের মতো হচ্ছে। যাক সে বিষয়ে আলোকপাত আজকের লেখার বিষয় না। তাই মূলে ফিরে আসি।

২.
গত ৩১ মার্চ বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্কিলস ফর টুমোরো’স জবস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশের কলেজগুলো থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ৭০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এবং প্রতিবছর ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছে ৫ লাখের কিছু বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রির্সাচ কর্তৃক প্রকাশিত “কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা ২০১৭” শীর্ষক সমীক্ষা মতে দেশে উচ্চশিক্ষিতদের (অনার্স-মাস্টার্স) মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কেনো বেকারত্বের হার বাড়ছে? যদিও এ আলোচনা চর্বিতচর্বণ হবে তবুও করছি। অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বাজার চাহিদার আলোকে প্রণয়ন হয়নি। যার কারণে শিক্ষিতজনদের শিক্ষা গোদামজাত হয়ে আছে।

কিছু দেশ আছে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। আর কিছু দেশ আছে মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও যদি মানবসম্পদে উন্নতি করতে না পারে তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদের ফল ভোগ করতে পারে না। যেমন নাইজেরিয়া তেল সমৃদ্ধ দেশ হয়েও মানবসম্পদের উন্নতি করতে না পারায় প্রাকৃতিক সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার করতে পারছে না। আফ্রিকার কঙ্গো, সুদান, লাতিন আমেরিকা ব্রাজিল মানবসম্পদে উন্নত না হওয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উন্নতি করতে পারেনি। এদিকে সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ের মতো দেশগুলো মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে উন্নতি সাধন করছে। অন্যদিকে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। যে দেশগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন নেই কিন্তু মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে উন্নতি করেছে। মেইজি সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে জাপানের অবস্থান বাংলাদেশের মতোই ছিলো। ১৮৭৭ সালে জাপানের টৌকিওতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হয়। ১৮৮০ সাল থেকে গ্র্যাজুয়েট বের হতে থাকে। এ গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৯০ শতাংশ ছিলো ফিজিকস, কেমিস্ট্রি ও ইনঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের। কারণ সে সময় জাপানে এ শাখায় জনবলের চাহিদা ছিলো। তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় চাহিদার আলোকে প্রস্তুত করেছিলো। তাই প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল না হয়েও জাপান উন্নত দেশে পরিনত হয়েছে। তাই শিক্ষার হারা বাড়ালেই হবে না। জানতে হবে কি ধরণের শিক্ষা প্রয়োজন।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরণের ফারাক আছে চাহিদা বিধির। বর্তমানে দেশের ৩০ দশমিক ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী কলা ও মানবিক শাখায় অধ্যয়নরত। তবে এ শাখার বাজার চাহিদা ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। তাহলে বাড়তি ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার সমস্যার কারণ হবে। অন্যদিকে ব্যবসা শিক্ষা শাখায় চাহিদা ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ থাকলেও এ খাতে উৎপাদন ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজ্ঞান শাখায় চাহিদা ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, কিন্তু যোগান মাত্র ৮ শতাংশ। চিকিৎসা বিজ্ঞান শাখায় চাহিদা ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে যোগান শূণ্য দশমিক ২ শতাংশ। যোগান ও চাহিদা বিধির এমন অসামঞ্জস্যতা বেকার সমস্যাকে আরও চাউর করছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও ব্যবসা শাখায় জনবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা আমাদের দেশে অনেকটাই অবহেলিত। যদিও সরকার অন্তরিকতা দেখাচ্ছে তথাপি সেটা অপ্রতুল। আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েট লেভেলে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার মাত্র ৩ শতাংশ, অবশ্য সরকার বলছে ১০ শতাংশ, কিন্তু এটি ভারতে ২৭ শতাংশ, নেপালে ২৩ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৪০ শতাংশ এবং উন্নত দেশে ৬০ শতাংশের বেশি। চীনের ৫১ শতাংশ মানুষ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত। আর দেশেও যেমন এ শিক্ষার চাহিদা তেমনি দেশের বাহিরেও অনেক বেশি। ইরাক, চীন, জাপান, ফিলিপাইন, সিঙ্গপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসহ ইউরোপেও কারিগরি শিক্ষায় জনবলের চাহিদা রয়েছে। দেশে ভিতরেও কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা ক্রমে বাড়ছে। সুতরাং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন আনতে হবে তেমিন জোর দিতে হবে কারিগরি শিক্ষাখাতে।

৩.
দেশে একটি সম্ভবনাময় শিল্প হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র হালকা ও মাঝারি আকারের শিল্প-কারখানা। বাংলাদেশ ইনঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি (বাইশিমাস) এর তথ্য মতে সারা দেশে ৮৭ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র হালকা ও মাঝারি শিল্প-কারখানা রয়েছে। ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে এ শিল্পে প্রতি বছর টার্নওভার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ২৫০ কোটি টাকারও বেশি। মোট জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। এ খাতে ৩৫ লাখ কর্মীসহ দেড় কোটি মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। অভ্যন্তরীন চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের তৈরি প্লাস্টিকের খেলনা পৃথিবীর ৩৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে। যার রফতানি আয় ১২৬ কোটি টাকা। অপার সম্ভবনাময় এ খাতের ৯০ শতাংশই রুগ্ন ভাবে চলছে। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, চলতি মূলধন সংকটসহ প্রশাসনে নানা উৎপীড়নের এ খাত সুজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। ৮৬ হাজার ৪১২টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মধ্যে ৭২ হাজার ৩’শ প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে আছে। বছরের অর্ধেকটা সময় বন্ধ থাকছে কারখানাগুলো। ৪ হাজার ১১২টি কারখানা চলছে ধুঁকে ধুঁকে। স্বল্পপুঁজি দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া, একই সাথে স্বল্প পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যেমন বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব। তেমনি দেশের রফতানি আয় বৃদ্ধিও হবে। তাই এ খাতের উন্নয়নের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাসহ সরকারি ভাবে সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

৪.
আমি প্রথমে শিক্ষাব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতার চিত্র তুলে ধরেছি এবং কারিগরি শিক্ষার চাহিদার কথা আলোকপাত করেছি। কারিগরি শিক্ষায় উন্নতি করা সম্ভব হলে দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ব্যবহার যেমন নিশ্চিত করা যাবে, তেমিন চাহিদার আলোকে দেশে ও বিদেশে দক্ষ মানবসম্পদের যোগান দিয়ে বেকার সমস্যা সমাধান সম্ভব। অন্যদিকে দেশে ও বিদেশে ক্ষুদ্র হালকা ও মাঝারি শিল্পের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে সে আলোকে এ খাতে উন্নয়ন করতে পারলে কর্মসংস্থানের অভাব পুরন হবে, একই সাথে সরকারের ঘাড়ে চাকরি ব্যবস্থা করার যে খড়গ আছে সে চাপও কমবে। এবং ব্যক্তিগতভাবে উদ্দ্যোগতা হতে উৎসাহিত করবে। এছাড়াও বেকার সমস্যার সমাধান করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেটা শুধু প্রধান শহরগুলো কেন্দ্রিক না করে বিকেন্দ্রীকরণ করে করলে অধিক ফলপ্রসু হবে। তা না হলে আয় বৈষম্য আরও চরমে উঠবে, বাড়বে বেকার সমস্যা।

জি. কে. সাদিক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

Please Share This Post in Your Social Media








© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com