যতই বলি টেকনিক্যালি এই সরকার দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এগিয়ে আছে; কিন্তু, সম্ভবত সর্বোচ্চ অবস্থানের মানুষটি না থাকলে আওয়ামী লীগ আর বিএনপির দল কিংবা সরকার পরিচালনায় খুব বেশি পার্থক্য করা যাবে না!

লেখকঃ মোহাম্মদ আফজাল হোসেন
সহকারী অধ্যাপক, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টি টেকনোলোজি বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।


কোটা নিয়ে কথা বলার সময় সবাই একবাক্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়েই কথা বলেন। আর এই সুযোগ করে দিয়েছে বিদ্যমান কোটা বন্টন ব্যাবস্থাই! দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটা আন্দোলনের পরেও বলতে গেলে এই ইস্যুতে ন্যূনতম কর্নপাত করেনি সরকার! সম্ভাব্য কারনসমূহ হতে পারেঃ
১। এখানে সব ইস্যুতে একজন প্রধানমন্ত্রীকেই সমাধান দিতে হবে, যতক্ষন উনি সেটি নিয়ে কথা না বলবেন ততক্ষণ তাঁর সরকারের অন্য কারো নিকট সেটিকে কোন রকম সমস্যাই মনে হয় না!
২। প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে থাকা বলয়ের মধ্য দিয়ে সঠিক তথ্য উনার কাছে খুব কম পৌঁছায় বলেই মনে হয়! দলকানা আর তৈলাক্ত বলয় নিশ্চয় উনাকে এটি বুঝাতেই ব্যাস্ত থাকেন যে, এটি জামাত-শিবির-যুদ্ধাপরাধীদের চক্রান্ত! এদের পাত্তা দেবার কাজ নেই!
৩। সরকারের ধারনা, এই মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে আনলে সেই সুযোগে সরকারবিরোধী ছেলেমেয়ে সরকারের অংশ হিসেবে প্রশাসনে ঢুকে পড়বে!
এর পরিপ্রেক্ষিতে ফলাফল হিসেবে আমরা কি পাচ্ছি?
—সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে গৌরবের মূক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কটূক্তি করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।
—আমাদের গৌরবের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে একটি পক্ষকে! মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা যেখানে এই দেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে চলার কথা, সেখানে তাদের মুক্তিযোদ্ধা কোটা আছে, জনসম্মুখে এই সত্যটি স্বীকার করতেও তারা এখন বিব্রত হচ্ছেন।
—এই সুযোগে, এটিকে ইস্যু বানিয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়া হয়েছে।সরকার যেখানে এই ইস্যু থেকে সাধারন ছাত্রদের বিশাল একটি অংশের সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করতে পারতো সেখানে নিজেরাই বিপদ ডেকে আনছে। নির্বাচনের বছরে এই দায় নিশ্চয়ই সরকারের নিজের!
‘৭১ এর পর আর কোন সময়ে ছাত্রলীগ, হ্যাঁ “ছাত্র” লীগ ‘বৃহত্তর’ ছাত্রসমাজের কল্যাণে কোন পদক্ষেপ নিয়েছিলো কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু সাধারন ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে তারা বরাবরই উদাসীনই নয় শুধু, শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত ছাত্রসংগঠনটির সুযোগ ছিলো সাধারন ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ত্রাতার ভূমিকায় আন্দোলনের গতিকে বেগবান করার! উল্টো সাধারন শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করাসহ হুমকি-ধামকি দিয়ে তারা শাসকগোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ ছাড়া আর কিছুই না সেটি প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২০০৯ এর নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের দায়িত্ব ছেড়েছিলেন; আমি নিশ্চিত, বেঁচে থাকলে এই ছাত্রলীগ দেখে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও লজ্জা পেতেন!
সাধারন শিক্ষার্থীদের উপর শাহবাগের সশস্ত্র পুলিশি হামলা যেমন নিন্দনীয় তেমনই নিন্দনীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনসহ তাঁর পরিবারের উপর শিক্ষার্থীদের হামলা! আর এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি এবং সেটিকে সামাল দিতে না পারার দায়ও সরকার এড়াতে পারেনা! তারপরেও এ প্রেক্ষিতে ঢাবি ভিসির বক্তব্য শুনে উনি শিক্ষক নাকি মাঠ পর্যায়ের কোন সরকারদলীয় কর্মী সেটির মধ্যে পার্থক্য করা দায়!
এতকিছুর পরেও ছাত্রলীগের অনেকের বক্তব্য আশার সঞ্চার করে! বিদ্যমান কোটা ব্যাবস্থায় তাদের অসন্তুষ্টি এবং সচেতনতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। রাজনীতি করতে হলে যে শুধু দলকানা হওয়াই মূল যোগ্যতা নয়, বরং সত্য কথা বলার সৎসাহস থাকা লাগে এই উপলব্ধির জন্য লাল সালাম! অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরও এই আন্দোলনে যুক্ত হতে দেখেছি যা সতিকারের সাধুবাদ পাবার যোগ্য। তাদের মতো আমরাও চাই, মুক্তিযোদ্ধাদেরসম্মানিত করুন তাদের অপরিসীম সাহস আর অপরিমেয় দেশপ্রেমের জন্য! কিন্তু, সেটিতে যাতে কোনভাবেই করুণা প্রকাশ না পায় কিংবা কেউ যাতে সেটিকে কাজে লাগিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিয়ে কটুক্তি করার সুযোগ না পান।
সবশেষে, বিদ্যমান কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কার চাই! সাধারন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলন সফল হোক। দেশের বৃহত্তর ছাত্র সমাজের জন্য উন্মুক্ত হোক সরকারি চাকরির সুযোগ। মেধাই হোক যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি! জয় বাংলা!

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ




টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com