,

চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নির্দশন সমূহ

মহিউদ্দিন শ্রাবণ # শত শত বছর আগ থেকে হিমালয়ের বিশাল পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে আর দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে নেমে আসছে অসংখ্য নদ-নদী। ফলে হিমালয় থেকে কোটি কোটি টন বালি মাটি নেমে আসছে প্রতি বছর নিম্ন এলাকায়। এমনিভাবে সৃষ্টি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের বিশাল পলিমাটি এলাকা-এই পলল সমভূমি। এক কথায় সমতল ভূমির সৃষ্টি। সর্বশেষ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের পলিমাটি অঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের বয়স সবচেয়ে কম। এই পলিমাটি অঞ্চল এখনো বেড়েই চলেছে। আমাদের চাঁদপুর জেলার বেশিরভাগ অংশ সৃষ্টি হয়েছে কয়েক শত বছর আগে।

মধ্য ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকায় ছিলো অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের বাস। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনায় পলিমাটি এলাকা যতই ভরাট হয়ে বিস্তৃত হতে থাকে এই অঞ্চলের মানুষ ততোই দক্ষিণ দিকে নূতন পলিমাটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

বাংলাদেশের পলিমাটি এলাকা গড়ে ওঠার বহু পূর্বেই এদেশের পাহাড়ী এলাকায় গড়ে উঠেছিলো মানুষের বসবাস। তাই এসব এলাকাতেই পাওয়া গেছে প্রাচীন সব প্রত্নসম্পদ। চাঁদপুর জেলার প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহের নির্মাণকাল হাজার বছর অতিক্রম করেনি। সুলতানী আমলের খুব বেশি প্রত্নকীর্তির নিদর্শনও এ জেলায় নেই। তবে হাজীগঞ্জ থানার ফিরোজ শাহ মসজিদ ও ‘হদ্দিনের হথ’ এ জেলার সুলতানী আমলের প্রত্নকীর্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শের শাহের আমলে নির্মিত ‘জাঙ্গাল’ এ জেলার পাঠান আমলের কীর্তি। শুজা মসজিদ, আলমগিরী মসজিদ মোঘল আমলের আরও অনেক মসজিদ এ জেলায় দেখা যায়। মুসলমান আমলের এসব কীর্তি এ জেলায় মুসলমান অধিকারের সুস্পষ্ট চিহ্ন বহন করে।

মেঘনা কন্যা চাঁদপুরকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কেউ বলেন, ‘রূপসী চাঁদপুর’, কেউ বলেন ‘ইলিশের দেশ চাঁদপুর’। আবার কেউ চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকরের পালতোলা জাহাজের নোঙর খুঁজে বেড়ান চাঁদপুর জনপদে। এভাবেই নানাজনের নানা ভাবনায় সুদীর্ঘ সময়ের পথ পরিক্রমায় ঐতিহ্য আর আদর্শের নীরব সাক্ষী চাঁদপুর। মেঘনা-ডাকাতিয়া আর ধনাগোদা নদীর জলধারায় বিধৌত দেশের অন্যতম বাণিজ্য বসতির জনপদ এই শ্যামলী চাঁদপুর। এই জেলার সদর দপ্তরও চাঁদপুর নামক শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর এই শহরটিকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে। চাঁদপুর নামে জনপদ হাজার বছরের পথচলায় প্রত্যক্ষ করেছে প্রকৃতির নানা লীলাখেলা।

ভূমিকম্প, বন্যা আর নদীর ভাঙ্গনে বারে বারে বিপর্যস্ত হয়েছে কিন্তু কোনো শক্তির দাপটের কাছে হার মানেনি চাঁদপুর, সে মানুষই হোক কিংবা প্রকৃতি। ঐতিহ্যবাহী এক সময়ের মহকুমা শহর, ‘‘Gate way of Eastern India” আজকের জেলা চাঁদপুর। শত নয়, হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ এই চাঁদপুর। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সময় থেকে প্রাচীন বাংলার এক সমৃদ্ধ নগরী চাঁদপুর। বিশিষ্ট চাঁদ ফকির, জমিদার চাঁদ রায় ও ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগরের নামে এ ত্রয়ীযুগলবন্দীতে নামাঙ্কিত চাঁদপুর। এ যুগলবন্দীর নামের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে প্রথমেই দৃষ্টিগোচর হয় পুরন্দপুর গ্রাম ও চাঁদ ফকিরের স্মৃতি। কোড়ালিয়া ও পুরন্দপুর গ্রামে চাঁদ ফকির এলমে তাসাউফের বায়াত দিতেন। একদা কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর বাস ছিলো। চাঁদপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার প্রত্নসম্পদ।

হাজীগঞ্জ উপজেলার কালোচোঁ উত্তর ইউনিয়নের ফিরোজপুর গ্রামে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটিই হচ্ছে সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৩৪৪ সালে অর্থাৎ হিজরী ৭৪৫ সনে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে ফৌজদার দেওয়ান ফিরোজ খান লস্কর তিন গম্বুজ বিশিষ্ট অনুপম সুন্দর মসজিদ ও একটি বিশালাকার দিঘি খনন করেন। ফিরোজ খান লস্করের দাঁড়া নামে একটি নৌপথ তৈরি করেন।

মেহের কালীবাড়ি

বিখ্যাত হিন্দু সাধক সর্বানন্দ ঠাকুর শাহরাস্তি উপজেলার মেহের শ্রীপুর অঞ্চলে সিদ্ধিলাভ করছিলেন। সিদ্ধিলাভের স্থানটিতে গড়ে উঠেছে মেহের কালীবাড়ি। প্রতি বছর এই মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মেলা বসে।

যতদূর জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৮ শ’ বছর পূর্বে এটি স্থাপিত হয়। বাংলা সন হিসেবে ৬০৯ অব্দ আনুমানিক। জানা যায় যে, ভারতের বর্ধমানস্থ পূর্বস্থলী গ্রামের অধিবাসী বাসুদেব গঙ্গা তীরে তপস্যা করার সময় অলৌকিক আদেশ পান যে, ‘‘এই স্থানে তুমি আমার সাক্ষাৎ পাবে না। তুমি মেহেরপুর গ্রামে মা তারা আশ্রমে গিয়ে তপস্যা কর। সেখানে তুমি আমার সাক্ষাৎ পাবে’’ আদেশ পেয়ে বাসুদেব শাহরাস্তির মেহেরপুর গ্রামে এসে তপস্যায় রত হন। সে সময়ে শিবানন্দ নামে প্রভাবশালী জমিদার বসবাস করতেন মেহেরপুরে। তিনি বাসুদেবকে আশ্রয় করে দিলেন। তিনি পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর গ্রামে বাসুদেবের জন্যে বাড়ি তৈরি করে দিলেন। বাসুদেবের আপনজনেরা তাকে খুঁজে হয়রান হলো। তারা মেহোরপুর গ্রামে এসে তার দেখা পেলো। কিন্তু তারা তাকে ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হলো।

শিবানন্দ তাকে খুব শ্রদ্ধা করতো। বাসুদেব মদ্যপান করতেন। শিবানন্দ এই খবর পেয়ে তাকে দেখতে গেলে বাসুদেব তাকে এই কথা বলে অভিশাপ দেন যে, জমিদারের শিরচ্ছেদ হবে। শুনে শিবানন্দের মন খারাপ হয়ে যায়। তিনি বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরে যান। এদিকে খবর আসে যে, দিঘি খননের সময় দু’দল শ্রমিকের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধেছে। শুনে শিবানন্দ দেখতে গেলেন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে শিবানন্দের শিরচ্ছেদ ঘটে গেলো। খবর পেয়ে রাণী নিজে ছুটে গেলেন দেখতে। রাণী বাসুদেবের কাছে তার বংশ রক্ষা করার জন্যে প্রার্থনা জানালেন। বাসুদেব রাণীকে সান্ত্বনা দিলেন। বাসুদেবের আশীর্বাদে রাণীর এক পুত্র সন্তান জন্ম নিলো। তার মাথায় জট ছিলো। তাই তার নাম রাখা হলো জটাধারী। বাসুদেবের প্রধান শিষ্যের নাম হলো পূর্ণানন্দ। প্রধান শিষ্য পূর্ণানন্দকে সাথে নিয়ে বাসুদেব অনেক তীর্থ ভ্রমণ করেন।

অবশেষে এলেন কামাখ্যায়। সেখানে তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে, স্বর্গীয় দেবতা তাকে আদেশ করে বলছেন যে, তুমি পরজন্মে স্বীয় পৌত্ররূপে জন্ম নিবে এবং তুমি তখন পূর্ণ সিদ্ধিলাভ করবে। তারপর বাসুদেব সেখানে দেহ ত্যাগ করেন। কথিত আছে যে, মেহেরপুর গ্রামে তার পুত্রবধূর ঘরে বাসুদেব সর্বানন্দ নামে পূর্নজন্ম লাভ করেন। সর্বানন্দ ছিলেন অত্যন্ত অবোধ ও অশিক্ষিত। ফলে সর্বমহলেই সে ছিলো অবহেলিত। কিন্তু তিনি ছিলেন গুরু বংশের লোক। একদিন জমিদার সর্বানন্দকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আজ কোন্ তিথি? সর্বানন্দ বললেন, পূর্ণিমা। কিন্তু সেদিন ছিলো অমাবস্যা। কথা শুনে সবাই হাসাহাসি শুরু করলো এবং নানা রকম বিদ্রূপ করলো। রাজা চিরদিনের জন্যে তার প্রাসাদ সর্বানন্দের জন্যে নিষিদ্ধ করলেন। শিষ্যদের এই হেন উপহাসে সর্বানন্দ মনে নিদারুণ কষ্ট পেলেন।

তিনি মনের কষ্টে গৃহত্যাগ করলেন। অনেক তীর্থ পরিভ্রমণের পর পৌষ সংক্রান্তির রাতে কালীমাতা তাকে দেখা দিলেন। দেবীর দয়ায় সর্বানন্দের সিদ্ধিলাভ হলো। সেদিন ছিলো পৌষ সংক্রান্তি। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত এইখানে পৌষ সংক্রান্তিতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। কালীপূজা উপলক্ষে মেলা বসে প্রতি বছর। কালীমাতা স্বয়ং এখানে উপস্থিত হয়েছেন বলে এখানে কোনো কালীমূর্তি স্থাপন করা হয় না। প্রতি বছর কার্তিক মাসে কালীপূজা হয়, পূজা উপলক্ষে মেলা বসে। দেশ-বিদেশ থেকে আসে অসংখ্য পুণ্যার্থী, মায়ের পায়ে প্রণতি জানান, মনের বাসনা পূরণের জন্যে প্রার্থনা করেন। কালীগাছের চতুর্দিকে ঘুরে ঘরে ভক্তরা সংগীত পরিবেশন করেন। ঢাকের বাদ্যে মুখরিত হয় চারদিক। ভক্তরা সারারাত ধরে নাচে-গানে আনন্দে মাতোয়ারা হন। এ সময় মানত করে ভক্তরা পাঠা বলি দেন। এত সব ঘটনাবহুল ইতিহাস নিয়ে মেহের কালীবাড়ি আজো দাঁড়িয়ে আছে তার আপন ঐতিহ্যে সমুজ্জ্বল হয়ে। পূরণ করেছে জাতি, ধর্ম, গোত্র, ধনী, নির্ধন, উঁচু, নিচু, ছোট-বড় সকল মানুষের মনস্কামনা। ধর্মীয় ভাবধারা রেখেছে সমুন্নত।

হযরত শাহ রাস্তি ও তাঁর দরগা

চাঁদপুর জেলার শাহ্রাস্তি উপজেলাধীন শ্রীপুর গ্রামে হযরত রাস্তি শাহ্ (রঃ)-এর মাজার শরীফ অবস্থিত। এই মহান ইসলাম প্রচারক রাস্তি শাহ্ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তাঁর জন্ম ইরাকের বাগদাদ শহরে। তিনি ছিলেন হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রঃ)-এর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন বড়পীর সাহেবের ভাগ্নে। মাজারে রক্ষিত একটি বোর্ড থেকে জানা গেছে, তাঁর জন্ম ১২৩৮ খ্রিঃ সালে এবং তিনি এদেশে আগমন করন ১৩৫১ সালে। বহু অলৌকিক ঘটনা এলাকাবাসীকে প্রত্যক্ষ করিয়ে তিনি ১৩৮৮ সালে ইন্তেকাল করেন।

হযরত শাহজালালের সাথে যে ১২ জন আউলিয়া এদেশে আসেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি যখন এদেশে আসেন তখন দিল্লীর সুলতান ছিলেন ফিরোজ শাহ্ এবং বাংলার সুবেদার ছিলেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ। রাস্তি শাহের অন্যতম সহচর ছিলেন সৈয়দ আহমেদ তানভী। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথম ইয়েমেন আসেন ৭৩৮ বঙ্গাব্দে। ইয়েমেন থেকে স্বপ্নাদেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ইসলাম প্রচারে এদেশে আসেন। ইয়েমেন হতে এদেশে আসেন বলে অনেকে তাঁকে ইয়েমেন বংশোদ্ভূত বলেও থাকেন। এদেশে আসার সময় তাঁর অন্যতম সহচর ছিলেন তাঁরই কনিষ্ঠ ভ্রাতা শাহ্ মাহবুব।

হযরত রাস্তি শাহ্ ছিলেন অকৃতদার। তাঁর ছোট ভাই শাহ্ মাহবুব বিয়ে করেন আশ্রাফপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে। আশ্রাফপুর বর্তমানে কচুয়া উপজেলায় অবস্থিত। সেখানেও রয়েছে একটি অতি প্রাচীন তিন গম্বুজ মসজিদ। রাস্তি শাহের মৃত্যুর সাড়ে তিনশ’ বছর পর সুবেদার শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবির আদেশে কাজী গোলাম রসুল একটি তিন গম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন।

মাজারের উত্তর দিকে যে দিঘিটি অবস্থিত, তার খননকার্য নিয়েও নানা কথা এলাকায় প্রচলিত। রাস্তি শাহ্র বংশধর বলে দাবিদার শ্রীপুর মিয়াবাড়ির লোকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, এক সময় বহু সংখ্যক লোক রাস্তি শাহের মুরিদ হতে এলে, এলাকায় তীব্র পানি সঙ্কট দেখা দেয়। এই পানি সমস্যার সমাধান করতে রাস্তি সাহেব একটি দিঘি খননের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং এক রাতেই জ্বীন দ্বারা ২৮ একর সম্পত্তিতে দিঘিটি খনন করতে শুরু করেন। ভোর হলেই জ্বীনরা চলে যাবে। তখনো দিঘিটির উত্তর পাড় বাঁধানো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এমনি সময়েই শোনা গেলো ফজর নামাজের আজানের সুর। এক এক করে জ্বীন সব চলে গেলো। উত্তর পাড় আর বাঁধানো হয়নি। আজো সেই অবস্থাতেই রয়েছে।

অথচ এই দিঘি খনন সম্পর্কে এলাকায় একটি কথা কিংবদন্তীর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। হয়তো বক্তব্যটি নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠতে পারে। আমরা শুধুমাত্র ঘটনাপ্রবাহের কারণেই দিঘি খনন সম্পর্কিত উক্ত বক্তব্যটি বক্ষ্যমান প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করলাম। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সে বক্তব্যটি হলোঃ কালীদেবীর সাথে রাসতি শাহ্ (রঃ) তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মতোই উক্ত দিঘি খননে প্রয়াসী হন। কালীদেবী নাকি বলেছিলেন, এক রাতে এতো বড়ো দিঘি খনন করা সম্ভব হবে না। এতে নাকি জেদ ধরে রাসতি শাহ্ (রঃ) আধ্যাত্মিক সাধনা বলে জ্বীন আনয়ন করে এই দিঘি খনন করতে থাকেন। দিঘি খননের অগ্রগতি দেখে কালী বিস্মিত হয়ে যান এবং সন্দিহান হয়ে পড়েন যে, রাস্তি শাহ্ (রঃ) শেষ পর্যন্ত কামিয়াবি হতে যাচ্ছেন? তৎক্ষণাৎ তিনি মোরগের ছদ্মবেশ ধারণ করলেন।

তখন উক্ত দিঘির শুধুমাত্র উত্তর পাড়টুকু বাঁধানো বাকি। মোরগের ছদ্মবেশে তিনি ভোর হবার ইঙ্গিত করলেন এবং ভোর হয়েছে মনে করে জ্বীনগুলো খননকার্য সমাপ্ত না করেই ফিরে যায়। সেই থেকে অদ্যাবধিও উত্তর পাড় আর বাঁধানো হয়নি। সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে (১৩৫১-১৩৮৮) রাস্তি শাহের খানকা শরীফের ব্যয় নির্বাহ করার জন্য সরকার ৬৪ একর সম্পত্তি লাখেরাজ দান করেন।

দীর্ঘদিন পরও এই শ্রীপুরেই তার বংশধরগণ বংশ পরম্পরায় মাজারসহ ৬৪ একর সম্পত্তি দেখাশুনা করে আসছেন। শ্রীপুর মিয়াবাড়ি নামের বাড়িতে রাস্তি সাহেবের বংশধর বাস করে আসছেন। বর্তমানে তারা আলাদাভাবে ৫টি বাড়ি করেছেন। পাঁচ বাড়ির পাঁচজন কর্ণধার হচ্ছেন সর্বজনাব আব্দুল ওহাব মিয়া, মৌলভী আবিদুর রহমান মিয়া, মোঃ বদিউল আলম মিয়া, মজিবুল হক মিয়া এবং মফিজুল হক মিয়া।

এই মাজার রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্যে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বার্ষিক দু’শ’ দশ টাকা হারে অনুদান (ভাতা) দিতো। মাঝখানে হেনরী মেডকাফ যখন কুমিল্লার ডিএম (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট) ছিলেন, তখন হযরত রাস্তি শাহের উত্তরসুরি হযরত গোলাম রেজার সাথে ঘাপলা দেখা দিলে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য ঝামেলা চুকে যায়। আজো তার বংশধরগণ সেই দু’শ’ দশ টাকা হারে বার্ষিক ভাতা পাচ্ছেন। প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে বার্ষিক ওর’স অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রচুর লোক সমাগম হয়ে থাকে।

পঞ্চদশ শতকের পর্তুগীজ দুর্গ সাহেবগঞ্জ

পর্তুগীজ সেনাপতি এন্টেনিও ডি সিলভা মেনজিস ১৫৪০-৪৬-এর মধ্যে এ দুর্গটি নির্মাণ করেন। পর্তুগীজরা এ অঞ্চলে জলদস্যুতা করতো। শের শাহের আমলে পাঠান সেনাপতি খিজির খানের সাথে এখানে পর্তুগীজদের যুদ্ধ হয়েছিলো। খিজির খান জলদস্যুদের বিতাড়িত করেছিলেন। তাদেরই (পর্তুগীজ) বংশধরদের বংশধর এখনও এখানে বসবাস করছে।

চাঁদপুর জেলা সদর থেকে ডাকাতিয়া নদী পার হয়ে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে ষোল কি. মি. দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গেলেই ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদর। উপজেলার সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়ন ১৬ নং রূপসা। এই রূপসা ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদের নাম সাহেবগঞ্জ। অন্যসব গ্রামের চেয়ে এই গ্রামের স্বকীয়তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক ঐতিহাসিক বিশিষ্টতা। এখানে রয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত এক পর্তুগীজ দুর্গ। এই দুর্গটি পাঁচ শতাধিক বছর পূর্বে স্থাপন করেছিলেন পর্তুগীজ এক দুর্ধর্ষ সেনানায়ক এন্টেনিও ডি সিলভা (মেনজিস)। ১৫৪০ থেকে ১৫৪৬ সালের মধ্যে সিলভা এটি নির্মাণ করেন। তখন সুবে বাংলা পাঠান সম্রাট শের শাহের শাসনাধীনে ছিলো। জনশ্রুতি আছে, পর্তুগীজদের দমনকালে শের শাহের সেনাপতি খিজির সম্রাটের আসল নাম অর্থাৎ ফরিদ এই নামানুসারেই এক নয়াবসতি স্থাপন করেন। এর নাম ফরিদগঞ্জ।

তখন ফরিদগঞ্জের অবস্থান ছিলো সমুদ্র তীরবর্তী। পর্তুগীজ সেনা তথা লুটেরাদের তাড়া করতে করতে নৌ-বহর নিয়ে খিজির খান এখানে আসেন। খিজির খান চলে যাওয়ার পর বাংলার অপর পাঠান শাসক, মাহমুদ শাহের সেনাপতি হামজা খানের সহায়তায় পর্তুগীজরা সমুদ্রোপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্য কুঠির আড়ালে কিছু সংখ্যক দুর্গ স্থাপন করে। সাহেবগঞ্জ তেমনি একটি দুর্গ। এই দুর্গটি স্থাপনের প্রায় তিনশ’ বছর পরে কিছুদিন নীলকুঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাই স্থানীয় জনগণ এটিকে সাহেবগঞ্জ নীলকুঠি হিসেবেই জানে। ইতিহাসের একটি অধ্যায় ঢাকা পড়ে যায় নীলকুঠির আবরণে। ঢাকা পড়ে যায় পর্তুগীজদের নির্মম অত্যাচার আর অসহায় বঙ্গবাসীর অনেক করুণ ইতিহাস।

পরবর্তী সময়ে কোনো পর্যটক বা ইতিহাসবিদ ভেবে দেখলেন না, নীলকুঠি এতো বৃহৎ আকারের হয় না। নীল কুঠিতে হাতীশালা থাকে না, থাকে না সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ মিনার অথবা সৈনিকদের জন্যে গার্ড শেড বা সেনাচৌকি, থাকে না কোনো সুড়ঙ্গ পথ। সাহেবগঞ্জ দুর্গটি বিস্তৃত প্রায় দু’শ’ একর। এখানে আজ অবধি বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ, একটি পঁয়তাল্লিশ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ মিনার, পাহারাদারদের ব্যবহৃত চৌকি, বিভিন্ন পর্যায়ের সৈনিকদের আবাসের ভগ্নাংশ। ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ দুর্গ এলাকার ভেতরে অনেক বাড়িঘর উঠেছে। স্থানীয় জনসাধারণ এবং প্রত্নসম্পদ লুণ্ঠনকারী তস্কররা ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে এই প্রত্নসম্পদের বিভিন্ন স্থাপনার ইট।

দুর্গে রয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ মিনার বা টাওয়ার। এই মিনারটি দুর্গের একমাত্র অক্ষত স্থাপনা। এটির অবস্থান দুর্গের দক্ষিণে এবং দুর্গের বর্ধিত অংশে একটি অনুচ্চ মাটির ঢিবির ওপর। এর বর্তমান উচ্চতা ১৫.৬০ মি. এবং পাদদেশের পরিধি ১০.০৩ মি.। চারটি ধাপে ঊর্ধ্বগামী এ মিনারের প্রতিটি অংশেই এর পরিধি হ্রাস পেয়েছে। এর ছাদ একটি গম্বুজ দিয়ে ঢাকা। প্রতিটি ধাপের পশ্চিম ও পূর্বদিকে খিলান দরজা রয়েছে। মিনারের ভেতরের অংশে চুনা-সুড়কির প্রলেপ রয়েছে। মিনারটির ভেতর অংশে এক সময় একটি শিলালিপি ছিলো। এখন এর অস্তিত্ব না থাকলেও নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া শিলালিপিটির অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব। মিনারটি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তিনটি বক্তব্য প্রচলিত আছে, প্রথমত, এটি একটি চেরাগদানী বাতিঘর ছিলো, দ্বিতীয়ত, পর্তুগীজ সেনারা দূরবর্তী জলসীমার স্বপক্ষীয় নৌ-যান অথবা শত্রু নৌ-যান দূরবীনের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করতো, তৃতীয় মত, এটি দুর্গের স্বাভাবিক স্থাপনার একটি অংশ, শত্রুসেনার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করাই এর উদ্দেশ্য ছিলো। এটি সুড়ঙ্গ পথে দুর্গের অন্য অংশের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো।

ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্য একটি মোগল গ্রাম অলিপুর ও দুটি মসজিদ-স্থাপত্য শৈলীর অনুপম নির্দশন

গ্রামটির অবস্থানঃ চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলাধীন ৫নং হাজীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি গ্রাম অলিপুর। চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের কৈয়ারপুল নামক স্থানে যানবাহন থেকে নেমে কৈয়ারপুল-ওটতলী সড়ক দিয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে প্রায় ২ কিলোমিটার গেলে দেখা যায় ডাকাতিয়া কোলে অলিপুর গ্রাম। রাস্তাটি কেয়ারের আওতায় পাকা করা হয়েছে। পূর্বে এটি ছিলো জেলা পরিষদের রাস্তা। রাস্তাটি ডাকাতিয়ার খেয়া হয়ে ফরিদগঞ্জের রূপসা পর্যন্ত চলে গেছে। তৎকালীন কুমিল্লা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আবিদুর রেজা চৌধুরী এ সড়কটি নির্মাণ করেন। জনাব রেজা চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি পন্ডিত রিয়াজউদ্দিন আহমেদের নামে সড়কটির নামকরণ করা হয় পন্ডিত রিয়াজ উদ্দিন সড়ক।

ওই সময় (সম্ভবতঃ ১৯৩৫-৩৮ সালে) অলিপুর গ্রামটি ছিলো ৬নং হাজীগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তর্গত। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সাবেক এমপি মরহুম আঃ রবের পিতা আমিন মিয়া। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামটির তিন পাশেই বহমান ডাকাতিয়া। এক সময় এই ডাকাতিয়া নদী খুবই প্রমত্তা ছিলো। অলিপুর বাজারটি খুব খ্যাতনামা ব্যবসাকেন্দ্র, বন্দর ছিলো। ডাকাতিয়ার স্রোত ক্ষীণ হয়ে আসার সাথে সাথে অলিপুর বাজারটিও বন্দরের মর্যাদা হারিয়েছে। বর্তমানে অস্থিসারশূন্য কঙ্কালরূপে বিদ্যমান। এখানে এখন আর চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা মধুকর ভিড়ে না। বন্দরের কোলাহল থেমে গেছে, একটি ছোট্ট গ্রাম্য বাজার হিসেবে কোনোরূপে টিকে আছে।

অলিপুর গ্রামটি হাজীগঞ্জ থানার পশ্চিম-দক্ষিণের সর্বশেষ গ্রাম। এ গ্রামের লাগ পশ্চিমেই চাঁদপুর সদর থানার মনিহার গ্রাম। এর পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে সম্পূর্ণ এবং পশ্চিম ও উত্তরে কিয়দংশ ডাকাতিয়া নদীর অবস্থান বলা যায়। নদী পরিবেষ্টিত একটি গ্রামই অলিপুর। এ গ্রামের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ডাকাতিয়া নদী পেরুলেই ফরিদগঞ্জ থানার সুবিদপুর উত্তর ইউনিয়নের বদরপুর গ্রাম এবং পূর্ব পাশে সমেশপুর গ্রাম। উত্তর পাশে রয়েছে হাজীগঞ্জ থানার উচ্চঙ্গা ও বলাখাল গ্রাম। পূর্বকালে অলিপুর নদী দ্বারা পরগণা সদরের সাথে সংযুক্ত ছিলো। অর্থাৎ নৌ যোগাযোগ মুখ্য ছিলো, বতমানে সড়ক যোগাযোগই মুখ্য।

গ্রামটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে গ্রামটির গোড়াপত্তন হয়। চতুর্দিকে নদী পরিবেষ্টিত ছিলো বলে মোগলরা সমৃদ্ধ নৌ-পথের কারণে এ গ্রামটিতে তহসিল কাচারী গড়ে তোলে। এখান থেকে টোরা পরগণার খাজনা আদায়ের কাজটি পরিচালনা করা হতো। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলায় বিদ্যমান ডাকাতিয়া নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা-অঞ্চল উক্ত টোরা পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এ গ্রামের পাশেই সাচনমেঘ গ্রামের অংশবিশেষ টোরা মুন্সীরহাট এবং বর্তমান হাজীগঞ্জ পৌরসভার টোরাগড় গ্রাম উক্ত টোরা পরগণার কথা মনে করিয়ে দেয়। মেঘনার পূর্বপাড় থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের লাকসাম পর্যন্ত এই পরগণা বিস্তৃত ছিলো। পরগণাটি বেশ কিছু তহসিল কাচারীতে বিভক্ত ছিলো, অলিপুর ছিলো তেমনই একটি তহসিল। অলিপুর গ্রামেই থাকতেন উক্ত পরগণার একজন তহসিলদার। যিনি খাজনা আদায়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতেন।

অবশ্য এ তহসিলদার এখনকার মতো ইউনিয়ন পর্যায়ের তহসিলদার ছিলেন না। ১৫২৬ সালে মোগল বাদশা বাবর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল্লী অধিকার করেন ও ভারতে মোগল শাসন কায়েম করেন। ভারতের শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন পদ-পদবীর ব্যবস্থা করেন। ১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করেন। পর্যায়ক্রমে সারা ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। কিন্তু সুবে বাংলায় তার শাসন ততো সুদৃঢ় ছিলো না। কিন্তু তদীয় পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেই সুবে বাংলায় মোগল আধিপত্য সুদৃঢ় করেন। কেন্দ্র, সুবা, পরগণা, তহসিল চার স্তর বিশিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করেন। টোরা পরগণার একটি সমৃদ্ধ তহসিল ছিলো অলিপুর। তহসিলদার ছিলেন মহকুমা প্রশাসকের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

এ প্রশাসকের প্রশাসনিক কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে মোগলদের ঘোড় সওয়ারসহ পদাতিক সৈন্যরা থাকতো, ১৬টি ঘোড়া পাশাপাশি একসঙ্গে দৌড়ানোর মতো বিস্তৃত রাস্তার (গোপাট) অস্তিত্ব কয়েক বছর পূর্বেও এই গ্রামে দৃশ্যমান হতো। এ গ্রামের বাংলা বাড়ি থেকে ডাকাতিয়া নদীর তীরে কাজী বাড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটারব্যাপী এ গোপাটটির অবস্থান ছিলো। এখনো থাক্ নকশায় এ গোপাটের অস্তিত্ব চিহ্নিত করা আছে। এ গ্রামের উক্ত কাজী বাড়ির কাজীরা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এখন কাজী বাড়িতে কাজীরা না থাকলেও তাদের পুকুর (কাজির আন্দি) আজো রয়েছে, যা গ্রামবাসীদের নিকট স্বচ্ছ পানির আধার হিসেবে খ্যাত।

( সংগ্রহীত )

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com