শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫০ পূর্বাহ্ন

English Version
লক্ষ্মীপুরে এক বছরে আত্মহত্যা করেছে ৫৮ জন, চেষ্টা তিন শতাধিক

লক্ষ্মীপুরে এক বছরে আত্মহত্যা করেছে ৫৮ জন, চেষ্টা তিন শতাধিক



 

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরে এক বছরে (২০১৭) সালে ৫৮ জন আতœহত্যা করেছেন। জেলার ছয়টি থানায় এদের মধ্যে ৪৫ জন গলা ফাঁস দিয়ে আতœহত্যা করে। এদের বেশির ভাগই বিষ খেয়ে আতœহত্যা করে। আর অধিকাংশই নারী। গত ২৩ অক্টোবর রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামে বাবার বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন মরিয়ম জাহান (১৯)। এর আগে তার অমতে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামীর সাথে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। স্বামী শরিফ হোসেনে সাথে বাগ্বিতান্ডা করে তার বাবার বাড়িতে চলে এসে আতœহত্যা করেন। ঐ মাসে ২৭ অক্টোবর একই উপজেলার চরপাতা গ্রামে মো. সুজন (১৭) সংসারের কাজ-কর্ম না করে সারাক্ষণ ফেসবুকে ব্যস্ত থাকায় বকাঝঁকা করেন তাঁর মা। পরে সে ঘরের বাঁশের আড়ার সাথে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আতœহত্যা করে।

এমন একটি-দুটি ঘটনা নয়। লক্ষ্মীপুর কোট পুলিশ পরিদর্শকের কার্যালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বেসরকারী হিসেবে আত্মহত্যার সংখ্যা আরও বেশি। কারণ অনেকে থানা পুলিশের ভয়ে সামাজিক ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে আত্মহত্যাকারীর মরদেহ দ্রুত দাফন করে ফেলেন। এই দিকে কোট পুলিশ পরিদর্শকের কার্যালয়ের রেজিষ্টার থেকে জানা গেছে, ২০১৭ সাথে জেলায় ৫৮ জনের আতœহত্যার ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়। আত্মহত্যাকারীদের অধিকাংশই যুবক-যুবতী। এদের মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদর থানায় ১৫জন, চন্দ্রগঞ্জ থানায় ১৩জন, রায়পুর থানায় ১৪জন, রামগতিতে আট জন, কমলনগর চারজন ও রামগঞ্জ থানায় চারজন ।

আত্মহত্যাকারী চার জনের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললে তারা নববার্তাকে জানান , পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, বখাটেদের উৎপাত, অবৈধ মেলামেশা, অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ, যৌতুক, দারিদ্র ও বেকারত্বই আত্মহত্যার চেষ্টার মূল কারণ। আত্মহত্যা বা আতœহত্যার চেষ্টাকারীর সংখ্যা বেড়ে গেলেও সরকারি ভাবে সচেতনতামূলক কোনো কর্মসূচি নেই। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে সরকারি ভাবে সচেতন করার দাবি জানান তাঁরা।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল, রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমেপ্লেক্সে ৩২০ জন কীটনাশক বা ঘুমের বড়ি খাওয়া রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশ তরুণ-তরুনী। আর নারীর সংখ্যা বেশি।বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টাকারীকে সর্বোচ্চ এক বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়ার বিধান আছে। এছাড়া তাঁদের অর্থদন্ডও দেওয়া যায়। তবে গত এক বছরে থানায় একজন আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর বিরুদ্ধেও কোনো মামলা হয়নি। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী নয় জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এর মধ্যে চারজন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চারজন গৃহবধূ এবং একজন বেকার যুবক।

দুজন গৃহবধূ নববার্তাকে জানান, বেকার স্বামী যৌতুকের জন্য প্রায় মারধর করতেন। এজন্য তাঁরা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বাজারের দুটি দোকান থেকে সবজি ক্ষেতে দেওয়ার কথা বলে কীটনাশক কিনে বাড়িতে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অপর দুজন গৃহবধূ জানান, ফসলি জমিতে দেওয়ার জন্য ঘরে কীটনাশক রাখা ছিল। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে বিরোধের পর ওই কীটনাশক দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সদর উপজেলার বশিকপুর ও টুমচর ইউপির দুজন শিক্ষার্থী জানান, বাবা-মায়ের গালাগালির কারণে অভিমান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। দালালবাজার গ্রামের অপর দুজন শিক্ষার্থী প্রেমের কারণে পরিবারিক অশান্তির কথা বলেছেন। চন্দ্রগঞ্জ এলাকার আরেক জনকে বেকারত্বের কারণে পরিবারের লোকজন গালমন্দ করত। এ কারনে তিনি গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা খুচরা সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. সালেহ আহমেদ নববার্তাকে জানান, এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষক। তাঁরা কৃষকের কাছেই কীটনাশক বিক্রি করে থাকেন। অনেক কৃষক তাঁদের ছেলেদেরকে কীটনাশক কিনতে পাঠান। সন্দেহ হলে তাঁরা কীটনাশক বিক্রি করেন না।জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. বেলাল হোসেন খাঁন বলেন, কীটনাশক পানে আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মহত্যার বিষয়টি আমরা জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে কীটনাশকের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সর্তক করা হবে। তিনি আরও জানান, কীটনাশক আইনে বলা আছে, লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা দোকানীর কাছ থেকে কীটনাশক কিনে আত্মহত্যা বা চেষ্টা করলে দায়-দায়িত্ব তার ওপর বর্তাবে না। আর লাইসেন্স ছাড়া কোন ব্যক্তি বা দোকানীর কাছ থেকে কীটনাশক কিনে আত্মহত্যা করলে সকল দায়-দায়িত্ব তার ওপর বর্তাবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার, আ স ম মাহাতাব উদ্দিন নববার্তা ডট কমকে জানান, আত্মহত্যার প্রবনতা রোধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সচেতন করতে হবে। আমি এ পর্যন্ত ৪০-৫০টি সভা ও সেমিনারে আতœহত্যা রোধে সচেতন করে বক্তব্য রেখেছি। তাছাড়াও পুলিশ এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছে। আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইন রয়েছে। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী সুস্থ হয়ে গেলে কেউ আর পুলিশকে অবহিত করে না।

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com