,

বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতায় প্রীতির ‘প্রেমিক’ ও ‘উনিশ বসন্ত’

মাসুদ রানা # এসময়ের স্বাধীনচেতা ও আলোচিত লেখক জান্নাতুন নাঈম প্রীতি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আত্মজীবনী লিখে আলোচনায় আসেন প্রীতি। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬-য় তার লেখা আত্মজীবনী ‘উনিশ বসন্ত’ বেস্টসেলারের তালিকায় উঠে আসে। এবছর প্রকাশিত হয় তার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘প্রেমিক’। সেটিও পাঠকবর্গের মন জয় করে। এবার তার বই পাওয়া যাবে কলকাতার মোহরকুঞ্জে অনুষ্ঠিতব্য ৭ম বাংলাদেশ বইমেলা।

আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত। মেলার ১ নং স্টলে পাওয়া যাবে প্রীতির লেখা উপন্যাস প্রেমিক ও আত্মজীবনী উনিশ বসন্ত। ‘প্রেমিক!’ উপন্যাসটি মূলত একটি মেয়ের শৈশব থেকে শুরু করে পূর্ণ যুবতী হয়ে ওঠার গল্প। উপন্যাসের মূল চরিত্র প্রজ্ঞা। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে এই উপন্যাসটি। স্বাধীনচেতা তরুণী প্রজ্ঞা, যার নিজের একটা জগৎ আছে। সেই জগতের একটা বড় অংশ দখল করে আছে প্রেম, মূল্যবোধ ও মানবিকতা। জীবনের শুরুতেই পারিবারিক ও সামাজিক বৈষম্য আর বৈষম্যের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা হয় তার। ক্লাস সিক্সে থাকতেই সচেতনভাবে প্রেমে পড়ে মেয়েটি। নিগৃহীত হয়। প্রেম সম্পর্কে প্রথমবারের মতো তার ধারণা বদলে যায়। সেইসাথে বয়ঃসন্ধিকালে যৌন নিপীড়ন, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, মানসিক দ্বন্দ্ব, মানসিকতার পরিবর্তন প্রভৃতির সম্মুখীন হয় সে।

এরইমাঝে জীবনে দ্বিতীয়বারের মতন প্রেমে পড়ে সে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা, প্রতারণা, নিজের ব্যক্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে এই প্রেমটিও টেকেনা। পারিপার্শ্বিকতা, সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য আর অবস্থানের কল্যাণে প্রজ্ঞার কাছে প্রেমের সংজ্ঞা বদলে যায়। এই বদলের মাঝেই জীবন এগিয়ে চলে। এরইমাঝে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করে সে। এই পর্যায়ে এসে সমকামিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, সমকামী প্রেম, নতুন প্রেমিক, কর্মস্থল, যৌনতা, সমাজে মেয়েদের অবস্থান, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের মেয়েদের জীবন- প্রভৃতি প্রাধান্য পেয়েছে এই উপন্যাসে।

নানাভাবে ঢাকা ও রাজশাহী শহরের পটভূমি যেমন এসেছে, তেমনি দেশ-বিদেশের পটভূমিও এসেছে। নারী জীবনের নানা বাধা-বিপত্তি, বিভিন্ন দেশে নারীদের অবস্থান, মানবিক স্বীকৃতি ও সামগ্রিকভাবে মানবিকতার কথা উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। মূলত প্রজ্ঞা নামের মেয়েটিরই জীবনে বারবার হোঁচট খাওয়া, উঠে দাঁড়ানোর ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এটি। প্রেম, বিরহ ও বিদ্রোহ- এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। সমগ্র উপন্যাস জুড়ে একটি প্রশ্ন জেগে থাকে- সত্যিই কি শেষ পর্যন্ত সত্যিকার প্রেমিকের দেখা কি পাবে প্রজ্ঞা?"/আর প্রীতির আত্মজীবনী উনিশ বসন্ত লেখা হয় তার বয়স যখনি ঠিক উনিশ বছর। এত কম বয়সে বাংলাদেশের কেউই এত কম বয়সে নিজের আত্মজীবনী লিখেছে বলে শোনা যায় নি। এত কম বয়সে আত্মজীবনী লেখা বিষয়ে প্রীতি বলেন, ‘জীবন আমার কাছে বৈচিত্র্যময়। আর মনে হয় কোনো মানুষের বয়স দিয়ে তার অভিজ্ঞতাকে বিচার করা উচিত নয়।’ জীবনের অভিজ্ঞতাকে অধ্যায় হিসেবে ভাগ করে তুলে ধরেছেন তিনি। একটি অধ্যায়ের নাম ‘নারীবাদ’। সেখানে সমাজে মেয়েদের কিভাবে দেখা হয়, সেটি তুলে ধরেছেন।

রাজশাহীতে গণজাগরণ মঞ্চের শুরু করেছিলেন তিনি এবং তাঁর এক বান্ধবী। অনলাইনেও তখন প্রচুর লেখালেখি করতেন। পুরুষ ও ধর্মান্ধরা সেগুলোর যে নানা ধরনের সমালোচনা করেছেন, সে সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই এই অধ্যায়। তাঁর মা গ্রাম থেকে উঠে আসা এক সাধারণ নারী। সেই সময়ে মেয়েদের কী বলে গালি দেওয়া হতো সেটিও আছে সেখানে। মাকে নিয়েও আছে একটি অধ্যায়। নাম ‘দেবী’। কেন মেয়ের কাছে তিনি অনন্য সে অভিজ্ঞতার কথা আছে তাতে। একটি পরিবারকে তুলে ধরতে মা মুখ্য ভূমিকা রাখেন। পরিবার সম্পর্কে মেয়ের কর্তব্যবোধ বা দায়িত্ববোধ কেমন হবে সেটি প্রতিনিয়ত শিখিয়ে যান। এসব কথাই বলেছেন সেখানে। আছে পুরস্কার না, তিরস্কার? নামের একটি অধ্যায়। তাতে কেন স্বাধীনতা পদক বাতিল করা উচিত সে কথা বলেছেন। নানা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিতর্কিত বিষয়ও আছে—এটিই নিজের বইয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে বললেন তরুণ ও সাহসী এই লেখক।

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি লেখকের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিল্পী। ১৯৯৬ সালে মাগুরায় জন্ম নেয়া প্রীতি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। পাশাপাশি ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট, সিআরআই (ইয়ং বাংলা), তরুণ স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন হিমু পরিবহন ও জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের সাথে। সেইসাথে কাজ করছেন চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হিসেবে।জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী ২০১৫ সালে সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতন ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ, ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডে’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের জন্য সমগ্র সাহিত্যকর্মের উপর প্রথম পুরস্কার পাওয়া, ২০১৪ সালে “ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড” এর সৃজনশীল লেখা শাখার প্রথম পুরস্কার, “Anchor-প্রথম আলো গল্পলেখা প্রতিযোগিতা”য় সেরাদের সেরার খেতাব; ২০০৫, ২০০৬, ২০০৮, ২০১০, ২০১১ তে ঐতিহ্য আয়োজিত জাতীয় গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় পাঁচবারের অন্যতম সেরা গল্পকারের সম্মাননা, ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভসহ চিত্রকলা, আবৃত্তি, বিতর্ক ও সঙ্গীতে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। ‘উনিশ বসন্ত’র জন্য ২০১৬ সালে আত্মজীবনী ‘উনিশ বসন্ত’র জন্য সাহিত্যে ‘বিপ্লবী চে গুয়েভেরা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন প্রীতি।

 

বেশকিছু চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে- এরমধ্যে ২০১৪ সালে দিল্লির দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার জেতা “পোস্টার” ছবিটি উল্লেখযোগ্য। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, পত্রপত্রিকা, ব্লগ, অনলাইন পোর্টাল ও লিটিলম্যাগসহ দেশে ও দেশের বাইরে বেশ কিছু সংকলনে তাঁর লেখা বেরিয়েছে, তাঁর প্রথম গ্রন্থ শিশুদের জন্য লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই- ‘বাংলাদেশ নামটি যেভাবে হল’। আত্মজীবনী ‘উনিশ বসন্ত’ ও প্রথম উপন্যাস ‘প্রেমিক’ ছাড়াও তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- গল্পগ্রন্থ ‘এইসব উড়ে আসা দিন’, কলামসমগ্র ‘নারীর নাড়ি’ ও শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘পেন্সিলে আঁকা গল্প’। তরুণ এই লেখক স্বপ্ন দেখেন দেশকে পৃথিবীর দরবারে অনন্য সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করার।

সূত্রঃ অমৃতবাজার

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com