,

যে মুজিব জনতার সে মুজিব মরে নাই

আবুল কাসেম আদিল # বঙ্গবন্ধু সেই মহামানবের নাম, ৭ই মার্চে যাঁর ডান হাতের তর্জনি সাত কোটি জনতার কণ্ঠ হয়ে ওঠেছিল। সেদিন তাঁর উত্থিত-দর্পিত তর্জনি সাত কোটি জনতার প্রতিনিধিত্ব করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল তাঁর নামে। জিয়াউর রহমানের পঠিত কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রের ঘোষণাও ছিল বঙ্গবন্ধুর নামেই। মু্ক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার তাঁর নামেই পরিচালিত হয়েছিল।

সত্তুরের নির্বাচনে মানুষ শেখ মুজিবকে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান শাসনের জন্য। পাকিস্তান শাসনের জন্য নির্বাচিত মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতা হস্তগত করলেন নতুন নির্বাচন ছাড়া। তবু মানুষের আপত্তি ছিল না। আপত্তি না থাকার কারণ, সদ্য যুদ্ধপরবর্তী বিধ্বস্ত দেশে নির্বাচনের পরিবেশ ছিল না। সবচে বড় কথা, বঙ্গবন্ধু ছাড়া বিকল্প নেতৃত্ব মানুষ ভাবতেই পারত না। যত পছন্দের লোকই হোন, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যে নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটা মানুষের মনেই ছিল না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। আক্ষরিক অর্থেই তখন বাংলাদেশ ছিল এক নেতার এক দেশ। এখানকার আমজনতা দুঃখজনকভাবে দাসমনা হওয়ার কারণে একক নেতৃত্বের বেশি ভাবতে পারে না। এজন্য সবসময় নেতৃত্ব একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। বঙ্গবন্ধু এই সুযোগ ব্যবহার করেছেন। সুযোগের অস্বাভাবিক ব্যবহার করে ভুল করেছেন।

মানুষ যেহেতু বঙ্গবন্ধু ছাড়া বিকল্প নেতৃত্ব ভাবতে পারত না, এবং যেহেতু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব প্রশ্নমুক্ত ছিল — ফলে মানুষের মনোভাবকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার জন্য বাকশাল গঠন করলেও মানুষের আপত্তি থাকার কথা ছিল না। কিন্তু মানুষ বিরূপ হয়েছে। কারণ ততদিনে মানুষের ভালোবেসে দেওয়া ক্ষমতার একটু বেশিই তিনি ব্যবহার করেছিলেন।

আসলে তিনি বেশি ব্যবহার করেন নি। ব্যবহার করেছে তাঁর দলের নেতারা। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করেন নি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা অবাধ লুটপাটে মেতে উঠেছিল। তিনি এসব অরাজকতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেন নি। এসব নেতার মাথার উপর থেকে স্নেহের হাতও তুলে নেন নি। মাঝেমধ্যে ‘আমি পেয়েছি চোরের খনি’ বলে উষ্মা প্রকাশ করলেও, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুষ্কৃতকারীরা দমে যায় নি।

রক্ষীবাহিনী নামক যে এলিট বাহিনী তিনি গঠন করেছিলেন, এরা দুষ্কৃতকারীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। যখন সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদেরও একটির বেশি সামরিক পোশাক ছিল না, যথাযথ আবাসনব্যবস্থা ছিল না, প্রয়োজনীয় অস্ত্র ছিল অপ্রতুল — তখনও রক্ষীবাহিনী ছিল রাজার হালে। জায়গায় জায়গায় রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ লেগে যেত। রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। মানুষের সেন্টিমেন্ট রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং সেনাবাহিনীর পক্ষে ছিল।

জনতার নেতা ক্ষমতাগ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যে এমন এক সংবিধান রচনা করলেন, যার মূলনীতি ছিল এদেশের মানুষের আজবীনের চর্চিত জীবনাচার ও বিশ্বাসের বিরোধী। সংবিধানের চার মূলনীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ছিল এদেশের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তিনি জনতার নেতা ছিলেন। মানুষের মনোভাব তাঁর ভালোই জানা ছিল। তিনি মানুষের কথা শুনতে চান নি, তিনি শুনেছেন সমাজছিন্ন কামাল হোসেন আর আমীরুল ইসলামদের কথা। ফলে জনতার নেতা ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকলেন।

ছিয়াশিতে দল পুনর্গঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নির্মোহ পর্যালোচনা করা উচিত ছিল যে — বঙ্গবন্ধুর মতো অবিসংবাদিত নেতার জীবৎকালেও কেন জাসদের মতো সদ্যগঠিত শেকড়ছিন্ন দলকে ঠেকাতে তেহাত্তরের নির্বাচনে কেন্দ্র দখল করতে হয়েছে, মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে কেন প্রার্থী গুম করতে হয়েছে, সমাজতন্ত্রের মতো ধর্মবিমুখ আদর্শের দলেও কেন অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ ভিড়তে শুরু করেছিল। কারণ একটাই, তারা বঙ্গবন্ধুর বিকল্প খুঁজছিল। বঙ্গবন্ধুর বিকল্প তখনও ছিল না। তবু মানুষ জাসদের মতো খড়কুটা ধরে বাঁচতে চেয়েছে।

আওয়ামী লীগের কি নির্মোহ পর্যালোচনার সাহস আছে, কেন মানুষ বঙ্গবন্ধুর বিকল্প খুঁজছিল? পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পর কেন মানুষ ঘর থেকে বের হয় নি? ঘাতকদের ভয়ে? বঙ্গবন্ধু তো মানুষকে নির্ভীক হতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। বাংলার মানুষ ভয়কে জয় করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণই ছিল। তবু মানুষ বের হয় নি কেন? দুঃখজনকভাবে কোথাও কোথাও আনন্দ মিছিল হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আনন্দ মিছিল হওয়ার মতো পরিবেশ এই দেশে কেন তৈরি হলো, আওয়ামী লীগের ভাবা দরকার ছিল।

বঙ্গবন্ধুকে কারা হত্যা করেছিল, এ নিয়ে আওয়ামী লীগ কয়দিন পর পর নতুন বিতর্কের অবতারণা করে। নিজেদের দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচার করা সত্ত্বেও নতুন বিতর্কের অবতারণা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিবেশ তৈরিকারী তৎকালীন জাসদ নেতাদের পাতে ক্ষমতার দুধভাত তুলে দিয়ে এই প্রশ্ন তোলা রাজনৈতিক গুটিবাজি ছাড়া আর কী হতে পারে। তবু ‘বঙ্গবন্ধু হত্যায় কারা জড়িত’ এই প্রশ্ন আন্তরিকভাবে করলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতারই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে।

বিচার যেহেতু হয়েছে এবং কার্যকরও হয়েছে, তাহলে এ কথা বলতেই হয়, বিষয়টা মীমাংসিত। সুতরাং বঙ্গবন্ধু-হত্যায় কারা জড়িত বারবার এই প্রসঙ্গের অবতারণা অপ্রাসঙ্গিক। এখন পর্যালোচনা করা জরুরি হলো, ১. কেন হত্যা করা হয়েছে; ২. হত্যার পরও কেন দৃশ্যমান প্রতিবাদ হয় নি।

প্রথমটার ব্যাপারে যা বোঝা গিয়েছে, তা হলো হত্যাকারীদের ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। ব্যক্তিগত আক্রোশের অনেক কাহিনি চারদিকে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে আছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক বিষয়ই এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। দ্বিতীয় বিষয়ে আমার ধারণা হলো, কেবল জনবিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জনতার সংযোগ ছিন্ন হয়েছে। তাঁর দলের নেতাদের লুটপাটের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল।

বস্তুত ৭ই মার্চ যে মুজিব রেসকোর্সে জনতার প্রতিনিধি হয়ে ভাষণ দিয়েছেন, ১৫ই আগস্ট সে মুজিব নিহত হন নি। যে মুজিব রেসকোর্সের মহাকবি, যে মুজিব জনতার হৃদয়ের মণি — সে মুজিব ১৫ই আগস্ট মারা যান নি। ১৫ই আগস্ট নিহত হয়েছেন ভিন্ন এক শেখ মুজিব, যিনি স্বাধীনতার পর জন্ম নিয়েছিলেন। ফলে মানুষ প্রতিবাদের গরজ বোধ করে নি।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com