,

যে কারণে ফল বিপর্যয়

মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, সৃজনশীলের সংখ্যা বাড়ানো, তিন শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে বিপর্যয় ও প্রশ্নফাঁস না হওয়ার পরও গুজব-শঙ্কার কারণেই পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। গতকাল ঘোষিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে শিক্ষা বোর্ডগুলো ও শিক্ষাবিদরা প্রাথমিকভাবে এ ধারণা করছেন। কারণ এবার গত বছরের থেকে কমে গেছে পাসের হার, কমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হারও। আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড, কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডে শতাংশের হিসেবে মোট পাসের হার কমেছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর গতবছরের চেয়ে জিপিএ-৫ কমেছে ২০ হাজার ৩০৭ শিক্ষার্থী।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, আগে পাবলিক পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হতো না। অনেক পরীক্ষকই খাতা দেখতেন অসচেতনভাবে। পাসের হার বাড়াতে কেউ কেউ বাড়িয়ে দিতেন নম্বর। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়িত হতো না। তুলনামূলক কম মেধাবীরাও জিপিএ-৫ পেয়ে যেতেন। জানা গেছে, এবারের এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবমূল্যায়ন বা অতিমূল্যায়ন রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শিক্ষা বোর্ডগুলো বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রধান পরীক্ষকদের মাধ্যমে একটি মডেল উত্তর তৈরি করে পরীক্ষকদের দেওয়া হয়েছিল। এই উত্তরমালার আলোকে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রত্যেক পরীক্ষকের মূল্যায়ন করা উত্তরপত্রের ১২ শতাংশ উত্তরপত্র প্রধান পরীক্ষকের পুনঃমূল্যায়ন করারও বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল।

গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফল প্রকাশের জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আগে অনেক শিক্ষকই খাতা ভালোভাবে মূল্যায়ন করতেন না। কোনো কোনো পরীক্ষক খাতার পৃষ্ঠা সংখ্যা বা খাতার ওজন দেখে নম্বর দিতেন। এতে বিপাকে পড়তেন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা। এবার যথাযথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হয়েছে বলেও জানান নাহিদ।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগে অনেকেই অনুমানের ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের নম্বর দিতেন। এ জন্য এবার ফল একটু খারাপ হলেও গুণগত মান বেড়েছে। ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। অভিভাবক মহলে কথা বললে তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ বেশি ছিল। পরীক্ষার আগেই সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে যেতেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রীও একাধিকবার বলেছেন, পরীক্ষার হলে শিক্ষকরা আগে প্রশ্নের উত্তর বলে দিতেন। এসব নানা কারণেই আগের বছরগুলোতে ভালো ফল করতে পেরেছে তুলনামূলক কম মানের শিক্ষার্থীরাও। কিন্তু এ বছর এইচএসসি ও সমমানের প্রশ্নফাঁসের তেমন একটা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ায় পাসের হার কমে যাওয়ার একটি কারণ বলে মনে করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

শিক্ষাবোর্ড সূত্র জানায়, পাসের হার কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়নও একটি বড় কারণ। গত বছর ১৯টি বিষয়ের ৩৬টি পত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়েছিল। এ বছর এইচএসসিতে ২৬টি বিষয়ে ৫০টি পত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়েছে। সে হিসেবে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে বিষয় বেড়েছে ৭টি ও পত্র বেড়েছে ১৪টি। সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষকরাও খুব দক্ষ হয়ে উঠতে না পারায় ছাত্র-ছাত্রীদেরও যথাযথভাবে পাঠদান করতে পারছেন না। তাই সৃজনশীল পদ্ধতি ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে করেন তারা।

সাধারণ ৮টি শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে— পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে ইংরেজিতে তুলনামূলক খারাপ ফল। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এবার ইংরেজিতে ফেল করেছে ২৭ হাজার ৪৬১ জন। গতবার এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ১১৩ জন। গতবারের তুলনায় কেবল এক বিষয়েই ১০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। যশোর শিক্ষাবোর্ডে এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করতে পারেননি। যে কারণে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ উভয় কমে গেছে। একইভাবে ইংরেজির কারণে ফলাফলে বিপর্যয় ঘটেছে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডেও। কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুল খালেক বলেন, ইংরেজিতে ফলাফল বিপর্যয় ঘটার কারণেই মূলত এ শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল খারাপ হয়েছে। ইংরেজিতে খারাপ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করছি। এসব কলেজের সমস্যা কোথায় তা খুঁজে বের করে সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইংরেজিতে ফল বিপর্যয়ের কারণে বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডে মানবিক বিভাগে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার কমেছে। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে বিজ্ঞানে ৮৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ আর বাণিজ্যে ৭৪ দশমিক ৫০ শতাংশ পাস করলেও মানবিকে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একইভাবে কুমিল্লা বোর্ডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে- বিজ্ঞানে ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ পাস করলেও মানবিকে পাস করেছে মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

তবে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় বলতে নারাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান। প্রথিতযশা এ শিক্ষাবিদ বলেন, এবারের এই ফলাফলকে বিপর্যয় বলে আমি মনে করি না। আমি মনে করি গত পাঁচ বা ছয় বছরে হাইব্রিড ফল প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছিল। তাই তাদের জিপিএ প্রাপ্তির হার বেড়েছিল। তাই সে ফলাফলের ওপর আমরা নির্ভর করতে পারিনি। এ বছরও যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন হয়েছে বলে আমি মনে করি না। আমি মনে করি, এবারের ফল সত্যের কাছাকাছি গেছে। এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা উচিত।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com