,

প্রধান বিচারপতির অগস্ত্যযাত্রা?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক মাসের ছুটি নিয়েছেন। কথা ছিল তিনি চলতি মাসের গোড়ায় আদালতের ছুটি শেষ হলে আবার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আমিও তার কাছ থেকে সে রকম আভাস পেয়েছিলাম। কিন্তু বাজারে গুজব ছিল, তিনি আর দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না, স্বেচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তাকে ছুটিতে যেতে হবে। তার অবসর গ্রহণের সময় নিকটবর্তী। সুতরাং তার বেঞ্চে ফেরা আর হবে না। এটাই তার অগস্ত্যযাত্রা। গুজবটা সত্যি হোক আর মিথ্যা হোক, তা সঠিক ধরে নিয়েই প্রধান বিচারপতিকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য আমার আজকের এই লেখা। বাংলাদেশের প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে নিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে আমার অভিন্দন!

প্রধান বিচারপতিকে এই অভিনন্দন জানানোর জন্য অনেকের কাছে, এমনকি আমার অনেক কাছের বন্ধুর কাছেও নিন্দিত হব তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক মিডিয়া ট্রায়ালে অভিযুক্ত কেউ আদালতে সঠিক ও নিরপেক্ষ বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই শত মুখে প্রচারিত ‘কানকথা’ শুনে হুজুগে মাতব সে বয়স আমার নেই। দেশের প্রধান বিচারপতি সম্পর্কেও যদি কোনো ছোট-বড় অন্যায় ও অবৈধ কাজের অভিযোগ থাকে সে সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। অভিযোগ প্রমাণ করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রধান বিচারপতি সিনহা যতই উচ্চপদের অধিকারী হন, তার তীব্র সমালোচনা করতে আমার কলম বিরত হবে না। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি কোনো অন্যায় বা ভুল করলে ড. কামাল হোসেনের মতো তার সাফাই গাইতে আমাকে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকায় বিশিষ্ট লেখক মোনায়েম সরকার আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। সম্প্রতি টেলিফোনে তার সঙ্গে আলাপ করেছি। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘বিচারপতি সিনহা সম্পর্কে আর কিছু লিখবেন না। উনি ভালো লোক নন।’ তার পরপরই সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, যাকে আমি একজন সৎ ও যোগ্য মন্ত্রী বলে এখনও শ্রদ্ধা করি, তার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হতেই তিনি প্রায় ক্রুুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি কী করে প্রধান বিচারপতির পক্ষে লেখেন? তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধের যে প্রমাণ রয়েছে, তা অকাট্য। তাকে সমর্থন জানিয়ে লেখা কি উচিত?’

আমি ড. রাজ্জাকের কথা নীরবে শুনেছি। কোনো জবাব দেইনি। আওয়ামী লীগের যারাই আমাকে টেলিফোন করে প্রধান বিচারপতিকে সমর্থন দিয়েছি বলে অভিযোগ করেছেন, তাদের কারও কথারই আমি জবাব দেইনি। জবাব দেব কেন? তাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে তারা কেউ আমার লেখা পড়েননি। অন্যের কাছে শুনেই আমার লেখা সম্পর্কে নিজের মতামত গঠন করেছেন। সব দেশেই পত্রিকার লেখা পড়ার রেওয়াজটা আজকাল উঠে যাচ্ছে। মুঠোফোনের বোতাম টিপলেই তো খবর এবং খবর ভাষ্য, তার সবটাই পড়ার দরকারও হয় না। অনেকে হয়তো পড়েনও না।

যারা আমার লেখা ভালোভাবে পড়েছেন, তাদের অনেকেই আমার সঙ্গে সহমত পোষণের কথা টেলিফোনে জানিয়েছেন। আমার বক্তব্য ছিল বিচারপতি একজন ব্যক্তি, বিচার বিভাগ একটি ইন্সটিটিউশন। ব্যক্তি অন্যায় করে থাকলে তাকে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু ইন্সটিটিউশনের যেন ক্ষতি অথবা সম্মানহানি করা না হয়। তাহলে দেশের এবং গণতন্ত্রের ভয়ানক সর্বনাশ হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চারটি ভিত্তির মধ্যে প্রধান দুটি ভিত্তি পার্লামেন্ট ও জুডিশিয়ারি। ক্ষমতায় চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ক্ষেত্রে এই দুটি প্রতিষ্ঠান অত্যাবশ্যক। পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব এবং জুডিশিয়ারির স্বাধীনতা ও সম্মান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ। স্বৈরাচারী সরকার এই দুটি ইন্সটিটিউশনের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে চায়। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তা চাইতে পারে না।

বাংলাদেশে এমনিতেই বর্তমান পার্লামেন্ট একটি খোঁড়া প্রতিষ্ঠান। কারণ তাতে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই, তার ওপর বিচার বিভাগও যদি পূর্ণ স্বাধীনতা না পায় তাহলে আওয়ামী লীগ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষায় যতই আগ্রহী হোক, শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বদলে দলতন্ত্রের ছাপ থেকেই যাবে। আমি আওয়ামী লীগের শুভাকাক্সক্ষী ও সমর্থক বলেই তাদের সরকারকে এ সম্পর্কে সতর্ক করা প্রয়োজন মনে করেছি। তাদের একশ্রেণীর নেতা, মন্ত্রী ও সমর্থক যদি ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে আমাকে ভুল বোঝেন, তাহলে আমার কিছু করার এবং বলার নেই।

ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত রায় প্রকাশিত হওয়ার পর যখন দেশময় বিতর্ক শুরু হয়, তখন আমিও এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার একাধিক লেখায় এই রায়ের সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিচারপতির অবজারভেশন বা পর্যালোচনার তীব্র সমালোচনা করেছি। বলেছি এই পর্যালোচনার বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয়। আমি একথাও লিখেছি যে, এই পর্যালোচনা লেখার ব্যাপারে প্রধান বিচারপতি হয়তো দেশের হাসিনাবিদ্বেষী তিনজন বিখ্যাত আইনজীবী, একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়া গ্রুপের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

আমি একথাও লিখেছি, অন্য কোনো ষড়যন্ত্র দ্বারা হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতে না পারায় পাকিস্তানের কায়দায় একটি জুডিশিয়াল ক্যু ঘটানোর চেষ্টা যে হয়েছিল তা অনুমান করা যায়। তাতে প্রধান বিচারপতিকে জড়ানোর চেষ্টাও হয়েছিল হয়তো। কিন্তু তিনি তাতে জড়িত হননি এটা আমার বিশ্বাস। আওয়ামী লীগেরই মনোনীত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে যেমন ষড়যন্ত্রকারীদের সিন্ডিকেটটি ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় তাদের ষড়যন্ত্রে জড়াতে চেয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতির অজ্ঞাতসারেই তাকে জড়িয়ে ফেলেছিল। আমার ধারণা, এবার আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রধান বিচারপতি সিনহাকে ঘিরে অনুরূপ ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ষড়যন্ত্রটি করেছিল ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রের একই সিন্ডিকেট।

আমি শুধু আমার লেখায় নয়, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার ও টেলিফোন আলাপেও তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছি। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে এতটাই ভাবিত ছিলেন যে, সে সময় সরকার উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি লক্ষ্য করেননি। এ সম্পর্কে তাকে অবহিত করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সতর্ক হন। কিন্তু ততদিনে বুড়িগঙ্গার জল অনেক দূর গড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর মন্ত্রী ও নেতা ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত রায়ের এবং সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনার সুস্থ, শোভন আলোচনা এবং সংবিধানের বিধির আলোকে তার প্রতিকারের ব্যবস্থার কথা না বলে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু করেন।

যেমন বিচারপতি সিনহা দু’টাকার উকিল, তিনি পাকিস্তানি, তার এখনই চাকরি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। তিনি ঘুষখোর, তিনি দুর্নীতিবাজ, তিনি যুদ্ধাপরাধী সাকা. চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন ইত্যাদি। এমনকি ছাত্রলীগের এক নেতা পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে অশোভন ও অশালীন উক্তি করেছেন। একটি টেলিভিশন তো তার মিডিয়া ট্রায়ালের অবিরাম ব্যবস্থা করেছিল।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এই প্রচারণা ও নিন্দাবাদ দ্বারা একজন ব্যক্তি বিচারপতিকে নয়, গোটা বিচার বিভাগকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত রায় নিয়ে সুস্থ ও সাংবিধানিক সমালোচনার বদলে যেভাবে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, প্রচার ও গালিগালাজ দ্বারা জুডিশিয়ারি নামক ইন্সটিটিউশনের সম্মান ও মর্যাদা ধ্বংস করা হল, তা আবার পুনরুদ্ধারে কত যুগ লাগবে তা আমার জানা নেই। আমার দুঃখ, গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর এই ঘটনাটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘটল। আর ঘটল এমন সময়, যখন শেখ হাসিনা সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের মানসকন্যা এবং মাদার অব হিউম্যানিটি নামে পরিচিত ও প্রশংসিত হচ্ছেন।

আমি প্রধান বিচারপতিকে সমর্থন দেইনি, সমর্থন দিয়েছি বিচার বিভাগ নামক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান একটি স্তম্ভকে। ব্যক্তিকে ধ্বংস করলে ক্ষতি নেই। কিন্তু ইন্সটিটিউশন ধ্বংস করলে গণতন্ত্র ও দেশের বিশাল ক্ষতি। আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর মন্ত্রী, নেতা ও স্তাবক গণতন্ত্র নামক যে গাছের ডালে বসে আছেন, কালিদাস পণ্ডিতের মতো সেই ডালটিই কাটার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই মূঢ়তার প্রায়শ্চিত্ত একদিন তাদের করতে হবে। এটাই আমার ভয়।

বিচারপতি সিনহা যে একজন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ব্যক্তি এই অভিযোগটি আমাদের শুনতে হল, তিনি ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত রায় দেয়ার পর। তাতে দেশবাসী কী সন্দেহ পোষণ করতে পারে? তিনি যদি এত খারাপ লোকই হন, তাকে প্রধান বিচারপতি পদে নিযুক্তি দেয়ার আগে কি সরকারের তা জানা ছিল না? আর এখন যদি জানা গেল, তাহলে সংবিধান মেনে ইমপিচ করার, বিচার বিভাগের মর্যাদায় হাত না দিয়ে এই শীর্ষপদ থেকে তার সরে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা কি যেত না? প্রধান বিচারপতি সিনহা এক মাসের ছুটি নিয়েছেন। আমার ধারণা, এটা তার অগস্ত্যযাত্রা। তিনি আর এই পদে ফিরে আসবেন না। আমি তাকে চিরকাল স্মরণ রাখব ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডদানে তার অসমসাহসিকতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনে তার লড়াকু ভূমিকার জন্য।

সূত্র: যুগান্তর।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com