,

পঙ্কজ ভট্টাচার্য : নির্মোহ-আপসহীন রাজনীতিক

সালেহ আহমেদ, ঢাকা # বহু আত্মবলিদান ও রক্তসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজতলা নির্মিত হয়েছে। এই চেতনাভূমির শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়েই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কৃষক ও শ্রমিক-জনতার লড়াই-সংগ্রামের বহু স্রোতধারা পেরিয়ে ১৯৭১ সালে আমরা বাঙালি জাতি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও অম্লান। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কথা স্মরণ করলে সবার মানসপটে ভেসে ওঠে রাউজান উপজেলার নয়াপাড়া গ্রাম। যে গ্রামে জন্ম নিয়েছেন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে আলোকিত এই গ্রামেই এক ঐতিহাসিক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৯ সালের ৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আপসহীন রাজনীতিক শ্রী পঙ্কজ ভট্টাচার্য।

বিপ্লব যুগে চট্টগ্রামে যুগান্তর ও অনুশীলন নামে ২টি দল সক্রিয় ছিল। চট্টগ্রামসহ সারা ভারতবর্ষে বিস্তৃত ছিল এ দুটি দলের কার্যক্রম। পঙ্কজ ভট্টাচার্য শৈশবেই বিপ্লবী মাস্টার দা’র মানবমুক্তির দীক্ষায় প্রভাবিত হন। ফলে স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। সেই রাজনীতির জীবন নিয়ে অদ্যাবধি লড়ছেন প্রত্যাশিত সমাজের পথরেখা বিনির্মাণে।

প্রগতিশীল ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারই হলো পঙ্কজ ভট্টাচার্যের আজকের ‘পঙ্কজ ভট্টাচার্য’ হয়ে উঠার ভিত্তিভূমি। চট্টলার ব্রিটিশবিরোধী আপসহীন লড়াকু মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দার, আব্দুস সাত্তার, অমর সেন, বিনোদ বিহারীসহ সময়ের অগ্রগামী ও মার্কসবাদী রাজনীতিকদের ছায়াতলে বেড়ে উঠেছেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য। স্কুল জীবনে ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফুটবল মাঠে সক্রিয় থাকা তাকে কৃতী খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত করেছে। তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ভূমিকা রেখেছেন।


পঙ্কজ ভট্টাচার্য সবার কাছে পঙ্কজ দা হিসেবেই খ্যাত। আশির দশকের প্রথম থেকেই পঙ্কজ দা আমাদের নেতা। তাই অনেক কাছ থেকে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আজও দূর এবং কাছ থেকে তাকে দেখছি, অনুভব করছি। মূলত দাদার হাত ধরেই তিন দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী রাজনীতির মাঠে আমার বিরামহীন পথ চলা। এর মধ্যে রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। একটি মূল্যবোধভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ়তা নিয়ে পঙ্কজ দা’র সাহচর্যে সারাদেশে ছাত্র-যুবদের সংগঠিত করা, পার্টি গড়ে তোলা, ব্যাপক জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ধারাকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছি অদ্যাবধি। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর জনগণের আকাঙ্খার সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে, ব্যাপক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য সামনে রেখে ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’ নামে যে উদ্যোগ দানা বেঁধেছিল তা নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের নিরীহ কৃষক-শ্রমিক জনতাকে। পঙ্কজ ভট্টাচার্য সেই শক্তিকে সমুন্নত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটেছেন সংগঠিত করবার কাজে। ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’ থেকে ‘গণফোরাম’ গঠন করা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে তার হিসাব-নিকাশ করবে ভবিষ্যৎ। কিন্তু আন্তরিকতার অভাব ছিল না তার এই প্রয়াসে।পঙ্কজ ভট্টাচার্য ছিলেন ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, তিনি স্বৈরাচার আইয়ুব-ইয়াহিয়া বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৩ সালে পালন করেছেন ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতির দায়িত্ব। ১৯৬৪-১৯৬৫ ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকরি সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দিয়ে তাকে কারাবন্দি করে।

১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তাননের অন্যতম প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন। ১৯৭০ সালে ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৭২ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত একই পদে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি জিয়া-এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৩ সালে ন্যাপের জাতীয় কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ‘গণফোরাম’ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং গণফোরামের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তিনি কারা নির্যাতিত হন।

সময়ের প্রয়োজনে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ১০ দল, ১১ দল, ১৪ দল, পিডিএফসহ বিভিন্ন প্লাটফর্ম গঠন করে মেহনতী মানুষের রাজনীতি ও তাদের অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। রাজনীতিতে যখন কালোটাকা, পেশীশক্তি, অস্ত্রবাজ-সন্ত্রাসবাদ ও লুটেরা শ্রেণীর দৌরাত্ম্য, দেশের সংখ্যালঘু-আদিবাসী, নিরীহ মানুষ যখনই নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তখনই পঙ্কজ ভট্টাচার্য দেশের বিবেকবান শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের সংগঠিত করে নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং প্রতিবাদ সংগঠিত করেন। বিশেষ করে ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ও পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত তথা চারদলীয় জোট সারাদেশের সংখ্যালঘু আদিবাসী ও নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের যে তা-ব শুরু করেছিল তার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ সংগঠিত করতে পঙ্কজদা সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের ব্যানারে সারাদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রাণে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন ধর্ষিতা শিশু, বৃদ্ধা, মহিলাসহ নির্যাতিত মানুষদের। কিছু এলাকায় সমমনা বন্ধুদের নিয়ে পুনর্বাসনেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

৭৯ বছরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এখনও পঙ্কজদা তরুণ। তিনি এখনও বাংলাদেশের আদিবাসী সংখ্যালঘু নিরীহ জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক। সারাদেশে যেখানে অন্যায়-নির্যাতন সেখানেই তিনি ছুটে যান-অসীম সাহসে। বর্তমানে তিনি ঐক্য ন্যাপের সভাপতি। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মদায়বদ্ধ সংগঠন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য। বাংলাদেশের কেনাবেচার রাজনীতিকে তার সময়ের অনেকেই রং বদলে, দল বদলে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছেন। ভোগ-বিলাসে অনেক সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অথচ পঙ্কজ ভট্টাচার্য মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও রং ও লক্ষ্য কোনটিই বদলাননি। মেহনতি জনতার সরকার ও রাষ্ট্র গড়বেন এই স্বপ্নে তিনি মন্ত্রিত্বেও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে তিনি জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করবেন, মুক্তির পথরেখা আঁকবেন এটিই তার জীবনের প্রত্যয়। জয় হোক জনতার। জয়তু পঙ্কজদা।

[লেখক : সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন]

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com