,

আওয়ামীলীগ দূর্গ নড়াইলের তৃণমূলের চাওয়া নতুন মুখ

বিশেষ প্রতিনিধি : আওয়ামীলীগের সাথে নড়াইল জেলা নামটি ঐতিহাসিক ভাবে জড়িত। আওয়ামীলীগের রাজনীতির দুর্গ নামে পরিচিত এ জেলা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-১ এবং নড়াইল–২ স্বধীনতার পর থেকে নড়াইলের মানুষ বার বার এই সিট দুটি আওয়ামীলীগ কে উপহার দিয়ে আসছে। বিগত কয়েক বারের হয়ে যাওয়া সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে , আওয়ামীলীগের প্রকৃত নেতারা দলীয় নৌকা মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও তাদের নিরাশ করে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শরিক দল থেকে। শরিক দল থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা নড়াইলের নৌকার ভোটারদের কাছে কখনই গ্রহন যোগ্যতা পাইনি।

আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে পরিচিত নড়াইলের -১ (কালিয়া – নড়াগাতি) ও নড়াইল-২(নড়াইল সদর ও লোহাগড়া ) আসন দুটিতে এবার মনোনয়ন দৌড়ে এক ঝাঁক নতুন মুখ তৎপর হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদের একাদশতম নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলেরনেতা-করর্মীদেরও চাওয়া নতুন মুখ। এর কারণ হিসেবে উঠে আসে বর্তমান সংসদদের অসাংগঠনিক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও তাদের দুর্নীতিতে সাধারণ কর্মী সমর্থকরা তাদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এছাড়াও যে সংখ্যালঘু হিন্দু ভোট সকল জাতীয় নির্বাচনে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে তাঁরাও এবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে আওয়ামী নেতাকর্মীদের হাতে । নিরাপত্তার অভাব ও স্থানীয় নেতাদের অত্যাচারে অসংখ্য হিন্দু পরিবার পরিবার দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এলাকার সাধারণ হিন্দু ভোটারেরা। হিন্দু বোদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলেছে। যা আওয়ামী লীগ এর আগামি নির্বাচনে মাথা ব্যথার কারন হিসেবে দেখছে রাজনীতি সচেতন সমাজ।

স্থানীয় নেতাকর্মী মনে করে, আগামি নির্বাচন যেহেতু প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে তাই দলীয় সভানেত্রীর আস্থাভাজন শিক্ষিত এবং ত্যাগী নেতা দেখে জননেত্রী মনোনয়ন দিবেন। যাদের গায়ে কোন দুর্নীতি বা অনিয়মের কালিমা নাই। যারা বিভক্তির সুরে কথা বলে দলের কোন ক্ষতি করেনি তাঁদের হাতে নড়াইলের উন্নয়ন সম্ভব বলেও মনে করে এলাকার সাধারণ ভোটাররা। স্থানীয়দের অভিযোগ টানা দুইবার আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকার পরেও নড়াইলের আসলে দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি। জনেত্রী শেখ হাসিনার সারা দেশের উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান সেখানে নড়াইলের মানুষ সেই উন্নয়ন থেকে হয়েছে বঞ্চিত। তাছাড়া আওয়ামী লীগের গ্রুপিং এখানে উন্ননে বিশেষ বাঁধা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এক নেতা আরেক নেতাকে একদমই সহ্য করতে না পারার মত ঘটনা দীর্ঘদিনের। বিগত ৯ বছরে ক্ষমতাবান গ্রুপের সদস্যরা অসংখ্য মিথ্যা মামলা- হামলা করেছে এমন অভিযোগ তুলেছে নড়াইল জেলা আওয়ামীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামান হিরা। তিনি বিগত ২০১৫ সালে পৌরসভা নির্বাচনে কালিয়া পৌরসভার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। তিনি বলেন , ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ কবিরুল হক মুক্তি সরাসরি আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে হারাতে মাঠে নামে এবং আমাকে এই নির্বাচনে ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে নির্বাচনে আতঙ্ক তৈরি করে আমার জয় ছিনিয়ে নেয়।

’এছাড়াও বিগত ইউপি নির্বাচনে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেন এই সংসদ এমন অভিযোগও করেছেন অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যান। যে বিষয়টি বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবরে মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ আওয়ামীলীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানেন। বিগত ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে নড়াইল-১ আসন থেকে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ধীরেনন্দ্রনাথ সাহা ও নড়াইল ২ থেকে শরিফ খসরুজ্জামান বেশ ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করেন। ২০০১ সালে দলের গ্রুপিং এর বেহাল অবস্থা দেখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজে এই দুই আসন থেকে নির্বাচন করেন এবং জয়লাভ করেন।

পরবর্তীতে উপনির্বাচনে নড়াইল-১ থেকে সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি ধীরেন্দ্রনাথ সাহা বিএনপিতে যোগদান করেন। বিএনপির ভোটবিহীন উপনির্বাচনে বাবু ধীরেন্দ্রনাথ সাহা জয় লাভ করেন। নড়াইল-২ (সদর) এ উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করেন ইসলামি ঐক্যজোট এর চেয়ারম্যান মুফতি মোঃ শহিদুল্লাহ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নড়াইল-২ থেকে মনোনয়ন পান বিগ্রেডিয়ার বাকের হোসেন। তিনি জয়লাভ করেন। এইদিকে নড়াইল-১ থেকে মনোনয়ন পান জোটভুক্ত ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক বিমান বিশ্বাস কিন্তু তিনি সামান্য ব্যবধানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। দশম জাতীয় নির্বাচনে ২০১৪ সালে বিএনপি-জামাতের জ্বালাও পোড়াও ও নির্বাচন প্রতিরোধের মুখে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নড়াইল-১ থেকে সংসদ হন কবিরুল হোক মুক্তি। নড়াইল-২ থেকে ওয়ার্কাস পার্টির শেখ হাফিজুর রহমান। বর্তমান এই দুই সংসদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ করেন নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মোল্লা এমদাদুল হক বলেন, ‘নড়াইল-১ এর বর্তমান সংসদ একজন দুর্নীতিবাজ সংসদ বিগত সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছিল পরে টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করেছে কিন্তু এবার সে শুধু দুর্নীতিই করেননি আওয়ামী লীগ কে ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন।’ তিনি জামাত- বিএনপির নেতাকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এইদিকে নড়াইল -২ সদর এবং লোহাগড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে দলীয় এমপি না থাকায় আওয়ামীলীগ ব্যপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে মনে করে স্থানীয় আওয়ামীলীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীতা পূর্ণ হবে ধরে নিয়ে ক্লিন ইমেজের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন সময়ে এলাকায় প্রচারনা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরছেন তারা। সাধারণ মানুষের কাছের নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর নানা উপায় খুঁজছেনতারা। সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের কাছ থেকে যে সকল সম্ভাব্য মুখের কথা উঠে এসেছে তাঁরা হলেন :

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ এর কয়েকবারের সভাপতি , সাবেক কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের নির্বাহী সদস্য , সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ্যাড.সুবাসচন্দ্র বোস বিগত জাতীয় নির্বাচনেও মনোনয়ন প্রত্যাশি ছিলেন। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগ এর এক নেতা বলেন , নড়াইলে সংখ্যালঘু ভোটার সঙ্খ্যা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ভাগ যার ফলে আওয়ামীলীগ এর জয় পরাজয় অনেকটা তাঁদের ভোটের উপর নির্ভর করে। এই বিবেচনায় জেলার সভাপতি এবার মনোনয়ন পেতে পারেন। যদিয় এবার জেলা পরিষদের নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ থেকে এবার নড়াইল ২ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী এই প্রবীণ নেতা।

নড়াইল-২থেকেনড়াইল জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিজামউদ্দিন খান নিলু। তিনি সাবেক পৌর মেয়র , ছাত্রনেতা ও যুবনেতা হিসেবে নেতা কর্মীর কাছে আস্থাভাজন নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। সদর ও লোহাগরা নিয়ে গঠিত নড়াইল -২ আসনে আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ইতমধ্যে জানান দিয়েছেন । দলের সাংগঠনিক কর্মসূচী ও সামাজিক কার্যক্রমে নিয়মিত উপস্থিতি রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক।

এস, এম, আসিফুর রহমান বাপ্পি বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।তিনি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান কিন্তু ১৪ দলের সিদ্ধান্তে পরবর্তীতে মনোনয়ন দেয়া হয় ওয়াকার্স পার্টির এ্যডভোকেট হাফিজুর রহমানকে। দলও জোটের স্বার্থে তিনি হাফিজুরের পক্ষে কাজ করেন। এবারও মনোনয়ন দৌড়ে তিনি এগিয়ে আছেন। নড়াইল জেলা আওয়ামীলীগ এর সহ-সভাপতিও কালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোল্লা এমদাদুল হক বিগত কয়েকবার নড়াইল-১ এর মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বলে এলাকায় গুঞ্জণ রয়েছে। কালিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচীতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছেন নিয়মিত তিনি।

সাবেক ছাত্রনেতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চ, শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক , জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চার জাতীয় কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এফ এম শাহীন। সারা দেশে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয়রয়েছেনতিনি। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-১ এর তরুণ নেতা হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেনতিনি। বিগত ইউপি ও পৌর নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করায় স্থানীয় সংসদের হুমকির মুখে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখায় আলোচনায় আসেন এই তরুণ নেতা। কালিয়ার উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসাদের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় সাধারণ মানুষের আস্থায় আসেন এই তরুণ।  সাংগঠনিক কর্মসূচীর বাইরে ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরছেন তার নিজস্ব ফেসবুক ও অনলাইন মাধ্যমে।

জেলা আওয়ামীলীগের প্রবীণ নেতা মুক্তিযোদ্ধা শেখ সৈয়দ জানান , ‘আমরা পুরাতন কাউকে চাই না। বিগত ৯ বছরে তাঁদের কাজ এলাকার জনগণ দেখেছে তারা নড়াইলের উন্নয়ন বাজেট কিভাবে লুটপাট করেছে । তাঁদের ভাগ্যের উন্নয়ন করেছে। এলাকাবাসি আর এই সকল দুর্নীতিবাজ সংসদদের দেখতে চায় না।’আমাদের দাবী জননেত্রী শেখ হাসিনা সৎ তরুণ মেধাবী দেখে আমাদের নতুন মুখ উপহার দিবেন। নড়াইলের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নৌকাকে ভালোবাসে যার ফলে নড়াইলকে নৌকার দুর্গ হিসেবা দেশবাসী জানে। আমরাও নড়াইলের দুটি আসন শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে চাই বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে।

নড়াইল – ১ ও ২ আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকলেও এখন প্রকাশ্যে কেউ দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহন করছেন না। নাম প্রকশ্যে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, মিথ্যা মামলা ও হামলা করে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাঁধা দিচ্ছে ক্ষমতাশীল দলের নেতারা। তাছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে নড়াইলে কোন উন্নয়ন হয়নি সব লুটে খেয়েছে আমাদের দুই এমপির পরিবার পরিজন। নড়াইলের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে তারা ব্যর্থ। আমাদের নেত্রী যোগ্য নেতাকে মনোনয়ন দিলে নড়াইলেও আমরা জয় পেতে আশাবাদী। নড়াইল -১ আসনে বিগত কয়েকবার বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম হেরে যান। তবে এবার তারা এই নেতাকে নিয়ে নড়াইল এ বিএনপির একটি আসন পেতে আশাবাদী।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com