সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৩৮ অপরাহ্ন

English Version
মোটর মেকানিক মিজান দেশসেরা আবিষ্কারক

মোটর মেকানিক মিজান দেশসেরা আবিষ্কারক

মোটর মেকানিক মিজান



  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’- এমন চেষ্টা বিফলে যায়নি মিজানের। যশোরের শার্শা উপজেলার এই মোটরসাইকেল মেকানিক মিজান এখন দেশসেরা আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক হতে যাচ্ছেন। মিজানের অ্যাকাডেমিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও আজ সে নিজের আলোয় আলোকিত। নতুন চিন্তা আর নতুন গবেষণায় এখন পর্যন্ত তার আবিষ্কারের সংখ্যা ৮টি। তার গবেষণা ও উদ্ভাবন নিয়ে দেশ জাতি এখন গর্বিত। মিজানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন স্বপ্ন দেখছে গোটা দেশ ও জাতি। জেলার শার্শা উপজলোর নিজামপুর ইউনিয়নের আমতলা গাতিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে ১৯৭১ সালরে ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন মিজগ্রুর রহমান মিজান।

তার ভালো নাম মিজানুর রহমান। বাবার নাম আক্কাস আলী ও মা খোদেজা খাতুন। আজ তারা কেউ বেঁচে নেই। বাবা-মার ৬ সন্তানের মধ্যে পঞ্চম মিজান। বর্তমান শার্শা উপজেলা সদরের শ্যামলাগাছি গ্রামে তিনি বাস করেন। দারিদ্র্যতার কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি মিজান। ৮-৯ বছর বয়সেই বেঁচে থাকার তাগিদে নেমে পড়েন মজুরের কাজে। মাঠে শ্যালো মেশিন চালানো এবং মেরামতের কাজ করেন। পরে নাভারণ বাজারে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ পান তিনি। সেখান থেকেই তার মোটর মেকানিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় তার। বর্তমানে শার্শা বাজারে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ নামে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তার শখ ছিল নতুন কিছু করা, নতুন কিছু জানা। তবে মেকানিক হিসেবে তার ইঞ্জিন তৈরি করতে প্রবল আগ্রহ ছিল। মিজান প্রথমে উদ্ভাবন করেন হাফ ক্রেনসেপ্ট দিয়ে একটি আলগা ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনের সব যন্ত্রপাতি বিদেশি। এ ইঞ্জিনটি একবার জ্বালানি তেল দিয়ে চালু করলে পরে আর তেল লাগতো না। ইঞ্জিনের সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে জ্বালানি তৈরি করে নিজে নিজে চলতো ইঞ্জিনটি।

ঢাকার তাজরিন গার্মেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির পর মিজান দ্বিতীয় গবেষণা করে উদ্ভাবন করেন স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। যা বাসা-বাড়ি, কলকারখানা, অফিস-আদালতে আগুন লাগলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রক্ষার্থে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। এটি বিদ্যুৎ না থাকলেও চলবে। এই যন্ত্রটি অল্প জায়গায় রাখা যায়। কোনো জায়গায় আগুন লাগলে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা নির্ণায়ক যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম ও লাইট অন করে দেয়। তারপর একইসঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে ফোন করে দেয়। পাশাপাশি যন্ত্রটি পানির পাম্পকে সুইচ অন করে দেয়। যা আগুনের অবস্থান নিশ্চিতের ৫-৭ সেকেন্ডের মধ্যেই সম্ভব হয়। অতঃপর পানির পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান পৌঁছে দেয় এবং অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ফাঁপা বলয়ের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগুন নিভে যায়। এটি উদ্ভাবনীর পর ২০১৫ সালে যশোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় মিজান প্রদর্শন করে প্রথমস্থান অধিকার করেন। পরবর্তী সময়ে এটি বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রথম ও দ্বিতীয়স্থান অধিকার করেন।

দেশে পেট্রলবোমায় যখন মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল ঠিক সে সময়ে মিজান উদ্ভাবন করেন তার তৃতীয় উদ্ভাবন অগ্নিনিরোধ জ্যাকেট। এ জ্যাকেট পরে ড্রাইভার বা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারবেন। এতে করে আগুনের মাঝে গিয়ে জানমাল রক্ষা করার সময় তার শরীরে আগুন স্পর্শ করবে না। তার চতুর্থ উদ্ভাবন অগ্নিনিরোধ হেলমেট। এটি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার আগুনে গলার শ্বাসনালী পুড়বে না। তার পঞ্চম উদ্ভাবন হলো প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে মোটরকার। এটা বিদ্যুৎ বা পেট্রলচালিত।

কৃষকদের জন্য স্বয়ংক্রিয় সেচ যন্ত্র উদ্ভাবন হলো তার ষষ্ঠ উদ্ভাবন। কৃষকরা দূর-দূরান্তের মাঠে জমিতে পানি দিতে আর ক্ষেতে যেতে হবে না। বাড়ি বসেই সেচযন্ত্রটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বন্ধ বা চালু করতে পারবেন। তাছাড়া এ যন্ত্রটি জমিতে পানির প্রয়োজন হলে নিজে নিজেই চালু হয় এবং পানির প্রয়োজন না থাকলে এটি একা একাই বন্ধ হয়ে যায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে মিজান তার সপ্তম উদ্ভাবন করেছেন ফ্যামেলি মোটরযান। ব্যবহারযোগ্য এ কার এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

মিজানের অষ্টম উদ্ভাবনে রয়েছে পরিবেশ সেফটি যন্ত্র। এটি পরিবেশ রক্ষার্থে বহুমুখী কাজ করে থাকে। যন্ত্রটি বাড়ি, অফিস বা কলকারখানায় ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। হাতের স্পর্শ ছাড়াই এ যন্ত্রটি পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার হয়। এ যন্ত্রটি উদ্ভাবনের পর ২০১৬ সালের ৫ জুন জাতীয় পর্যায়ে মিজান পরিবেশ পদক লাভ করেন। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মিজান এ পর্যন্ত মোট ১৭টি সাফল্য সনদ ছাড়াও পেয়েছেন অসংখ্য ক্রেস্ট ও সাফল্য পুরস্কার। এরইমধ্যে মিজানের আবিষ্কৃত দেশীয় প্রযুক্তির মোটরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ টু আই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে ছোট ছোট অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করার পদক্ষপেও নেওয়া হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় সাবেক কমিশনার আব্দুস সামাদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়েও একজন অশিক্ষিত লোক বেশ কিছু নতুন জিনিস আবিষ্কার করে রীতিমতো সাড়া ফেলেছে। আমরা তাকে উৎসাহিত করেছি। সে ডিজিটাল মেলাসহ জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি পুুরস্কার পেয়েছে। ২০১৭ সালে পরিবেশবান্ধব যন্ত্র আবিষ্কারে বিশ্ব পরিবেশ পদক নির্ধারিত হওয়ায় ৫ জুন মিজানকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক দেয় পরিবেশে অধিদপ্তর। মিজান জানান, তার স্বপ্ন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা। তার বর্তমান উদ্ভাবন গবষেণা চলছে দূষিত বায়ু শোধন যন্ত্র আবিষ্কারের।

লাইক দিন

Please Share This Post in Your Social Media




Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.



© 2018 Nobobarta । Privacy PolicyAbout usContact DMCA.com Protection Status
Design & Developed BY Nobobarta.com