,

একই মঞ্চে সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর

একই মঞ্চে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১২ টার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। কারাসূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

 

অপরদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মুজাহিদের  ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১২ টা ৪৫ এর  পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মুজাহিদের  ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। কারাসূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার একইসঙ্গে জামায়াতের শীর্ষনেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আপিলের মৃত্যুদণ্ডাদেশের রিভিউয়ের পূর্ণাঙ্গ আদেশ কারাগারে পৌঁছায়।

 

একই মঞ্চে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। শনিবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে ২ মানবতাবিরোধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এটি হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার তৃতীয় ও চতুর্থ ফাঁসির রায় কার্যকর, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হলো এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর।

 

এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল জামায়াতেরই অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার। ‘মিরপুরের কসাই’ আলবদর কমান্ডার কাদের মোল্লাকেও ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল রাত দশটা এক মিনিটেই। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল জুড়ে নারকীয় সব যুদ্ধাপরাধের হোতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির লিভারে টান দিয়ে ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করেন প্রধান জল্লাদ রানা। অন্য ৩ জন জল্লাদ ছিলেন তার সহযোগী। জল্লাদ রানা এর আগে আরেক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের সময় সহকারী জল্লাদের ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯৭১ সালের ৪ বা ৫ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ে চট্টগ্রাম শহরের শহীদ মতিলাল চৌধুরীর রামজন লেনের বাসভবনে মতিলাল চৌধুরী, অরুণ চৌধুরী, যোগেশ চন্দ্র দে, পরিতোষ একত্রিত হন। সেখান থেকে পাকিস্তানি সৈন্যের সহায়তায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী সোবহান ৬ জনকে অপহরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবনে নিয়ে যান। সেই ৬ ব্যক্তির আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেন।

১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় অভিযান চালিয়ে ওই এলাকার শতাধিক ব্যক্তিকে হিন্দু ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সেখানে তাদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৩ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজানের গহিরা শ্রী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ সময় নিজে নূতন চন্দ্র সিংহকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাকাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগৎমল্লপাড়ায় অভিযান চালান। এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দুই সহযোগীর ডাকে সেখানকার হিন্দু নর-নারী কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় জড়ো হয়। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ৩২ জন নারী-পুরুষ মারা যান। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৩ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার অনুসারীদের নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে হামলা চালান। সেনাসদস্যরা বণিকপাড়ায় প্রবেশ করে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে অভিযান চালিয়ে নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনিল বরণ ধরকে গুলি করে। এতে প্রথম ৩ জন শহীদ ও শেষের জন আহত হন। হত্যাকাণ্ড শেষে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী তাদের অনুসারী ও পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে সুলতানপুর গ্রাম ত্যাগ করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৩ এপ্রিল বিকাল ৪টায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় ক্ষীতিশ মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে শান্তি মিটিংয়ের নামে হিন্দু নর-নারীদের একত্রিত করে পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৪ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজান পৌরসভার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার লাশ কাঁথা-কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে তাতে পাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলে। এ অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়, তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আপিল বিভাগ এ অভিযোগ থেকে সাকাকে খালাস দেন।

১৭ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাইভেটকারযোগে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে চট্টগ্রামে শহরে আসছিলেন। পথে হাটহাজারী থানার খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছামাত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা শেখ মোজাফফর আহম্মেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালীতে আসেন। একটি জিপে করে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একই সঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানায় রাজাকার ক্যাম্পে আসেন। বোয়ালখালী থানার কদুরখিল গ্রামে যাওয়ার সময় মুন্সিরহাটের শান্তি দেবকে ধরে নিয়ে আসে। তাকে থানার উত্তর পাশে বণিকপাড়ায় গুলি করে হত্যা করে। অনতিদূরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৩ এপ্রিল পাকিস্তানিরা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে ডাবুয়া গ্রামে মানিক ধরের বাড়িতে এসে তার জিপ গাড়ি ও ধান ভাঙার কল লুট করে নিয়ে যায়। মানিক ধর সাকা চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে থানায় মামলা দায়ের করে। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

২০ এপ্রিল সকালবেলা কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে তাদের অনুসারী এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার হিন্দু অধ্যুষিত শাকপুরা গ্রামে অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের হত্যা করে। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজান থানার জ্যোতিমল্ল গ্রামে গুলি করে বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী রাখাল, বিভূতিভূষণ চৌধুরী, হিরেন্দ্র লাল চৌধুরীকে হত্যা করে। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৫ মে সন্ধ্যার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে শান্তি কমিটির সদস্য আলী আহম্মদ পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে ঘাসিমাঝির পার এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়িঘরে আক্রমণ করে লুটপাট, ৬ জনকে গুলি করে হত্যা, দুজনকে গুরুতর আহত এবং অন্তত ৫ নারীকে ধর্ষণ করে। নিহতরা হলেন নূরুল আলম, আবুল কালাম, জানে আলম, মিয়া খাঁ, আয়েশা খাতুন ও সালেহ জহুর। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। এটি সাকার বিরুদ্ধে ১৩ নম্বর অভিযোগ।

২০ মে বিকাল ৪টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার পথেরহাটের কর্তার দীঘিরপাড়ে হানিফকে আটক করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন ও পরিচালনাধীন গুডসহিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে এক হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে না পারায় হানিফকে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা শেখ মায়মুন আলী চৌধুরীকে আটক করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গুডসহিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পরনের জাঙ্গিয়া ছাড়া সব কাপড়চোপড় খুলে ফেলে হাত-পা বেঁধে তাকে দৈহিক নির্যাতন করা হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

৭ জুন জামাল খান রোড থেকে ওমর ফারুককে ধরে নিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন গুডসহিলের নির্যাতন সেলে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

৫ জুলাই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পোড়োবাড়ী থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গুডসহিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেড় ঘণ্টা তাদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে ওই দিন রাত ১১/১২টার দিকে নিজাম উদ্দিন ও সিরাজকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। সেখানে তারা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দি ছিলেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তৃতীয় সপ্তাহে একদিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর অনুসারীরা চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহারা গ্রামে আবদুল মোতালেব চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তারা সালেহ উদ্দিনকে অপহরণ করেন। এর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়িতে নিয়ে তাকে গুডসহিল নির্যাতন সেলে নেওয়া হয়। সেখানে বাড়ির বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকা সাকা চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় সালেহ উদ্দিনকে উদ্দেশ করে ফজলুল কাদের চৌধুরী জানতে চান, তিনি সালেহ উদ্দিন কি না? এ সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে সালেহ উদ্দিনের বাঁ গালে সজোরে একটি চড় মারেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২৭ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাটহাজারীর নেয়ামত আলী রোডের সাহেব মিয়ার বাড়ি ঘেরাও করে তার দুই ছেলে নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে অপহরণ করা হয়। এর পর রশি দিয়ে বেঁধে গুডসহিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের অপর ভাই মাহবুব আলমের সন্ধান পান। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে গুডসহিলের নির্যাতন কেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের ২৭/২৮ জুলাই বিকেল ৩/৪টার দিকে রাজাকার বাহিনীর আকলাচ মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। এর পর তাকে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু ঘটে। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ৫/৭ তারিখের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার বিনাজুরি গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরী একই জেলার কোতোয়ালি থানার জেল রোডে অবস্থিত নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাগজের দোকানে যান। সেখান থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ৩/৪ দিন আটক রেখে নির্যাতন করা হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে রাত আনুমানিক ৯টায় মো. নুরুল আনোয়ারকে অপহরণ করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগী আলশামস বাহিনীর সদস্যরা মৃত আশরাফ আবদুল হাকিম চৌধুরীর বাসভবন ৪১/২ স্ট্যান্ড রোড সদরঘাট, থানা ডবলমুরিং জেলা চট্টগ্রাম থেকে তাকে অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মো. নুরুল আনোয়ারের কাছ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক সোয়া ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুসলিম ছাত্র পরিষদের সভাপতি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের আলমাস কমান্ডার হামিদুল কবির চৌধুরী খোকা, মাহবুব, সৈয়দ ওয়াহিদুর আলম গং চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার ৪০ আবদুস সাত্তার রোড এলাকার এম সলিমুল্লাহর একজন হিন্দু কর্মচারীকে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে মারধর করতে থাকেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়।

জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, দেশান্তরে বাধ্য করা, ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

পাকিস্তানের বাঙালি সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি দৈনিকে প্রবন্ধ লেখার অপরাধে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ৫ নম্বর চামেলীবাগের ভাড়া করা বাসা থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয় ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানায় বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গি গ্রামে হিন্দুদের প্রায় সাড়ে ৩শ’ বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা। হামলাকারীদের গুলিতে ৫০ থেকে ৬০ জন নরনারী নিহত হন। ওই ঘটনায় ফরিদপুর শহরের হামিদ মাওলানা ছাড়াও ৮/১০ জন অবাঙালি অংশ নেন।

১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুর মসজিদের সামনে থেকে রাজাকাররা ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার গোয়ালচামট (রথখোলার) এলাকার মৃত রমেশ চন্দ্র নাথের ছেলে রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে। বেলা ১১টার দিকে ফরিদপুর পুরনো সার্কিট হাউসে মুজাহিদের উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর আকরাম কোরাইশীর কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে নির্যাতনের পর মুজাহিদের নির্দেশে তাকে হত্যা করার উদ্দেশে বিহারী ক্যাম্পের উত্তর পাশে আব্দুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে ঘরের জানালার শিক ভেঙে রাতে রণজিৎ নাথ বাবু পালিয়ে জীবন বাঁচান।

১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই সকালে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থেকে স্থানীয় রাজাকাররা মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করে। পরে তাকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে আটক রাখা হয়। সেখানে মুজাহিদের কাছ থেকে পাখির বিষয়ে জানতে পেরে তার উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় পাকসেনারা। প্রায় এক মাস ৩ দিন তাকে সেখানে নির্যাতন করা হয়। এতে পাখির বুক ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়।

যুদ্ধ চলাকালে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহিরউদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে আটক করে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে রাখা হয়। ৩০ অগাস্ট রাত ৮টার দিকে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি মুজাহিদ ও সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী সেখানে গিয়ে এক সেনা কর্মকর্তাকে পরামর্শ দেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। এ সিদ্ধান্তের পর সহযোগীদের নিয়ে মুজাহিদ আর্মি ক্যাম্পে আটকদের অমানসিক নির্যাতনের পর জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যা করে।

১৯৭১ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠনের পর সদস্যরা সেখানে প্রশিক্ষণ নিতেন। পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হওয়ার সুবাদে ওই আর্মি ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ছিল মুজাহিদের। সেখানে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন তিনি। এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী নিধনসহ গণহত্যার মতো ঘটনা সংঘটিত হয়।

১৯৭১ সালের ১৩ মে মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে বীরেন্দ্র সাহা, নৃপেন সাহা, শানু সাহা, জগবন্ধু মিত্র, জলাধর মিত্র, সত্য রঞ্জন দাশ, নরদবন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র, উপেন সাহাকে আটক করে। পরে উপেন সাহার স্ত্রী রাজাকারদের স্বর্ণ ও টাকার বিনিময়ে স্বামীর মুক্তি চাইলেও মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকাররা সবাইকেই হত্যা করে। একই সময়ে রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝর্ণা রানীকে ধর্ষণ করে। হিন্দুদের বসতঘরে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়া অনিল সাহা নামে একজনকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রথম, তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। প্রমাণিত ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, ১ ও ৫ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৩ নম্বর অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

আরও অন্যান্য সংবাদ


Nobobarta on Twitter




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com