,

রোহিঙ্গা সংকট : বিশ্ব রাজনীতির ভিন্ন বার্তা

ফনিন্দ্র সরকার: মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বরোচিত রাষ্ট্রীয় হামলা বিশ্ব বিবেককে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। নোবেলজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে জড়িয়ে। এর আগে দেশটিতে প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় সামরিক জান্তার শাসন ছিল। সুদীর্ঘ বছর গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে অং সান সু চি সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জেল খেটেছেন। সু চির সংগ্রাম ও ত্যাগের মহিমায় নোবেল কমিটি আকৃষ্ট হয়ে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছে। শান্তির জন্য নোবেলজয়ীর দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর এমন নির্যাতন-গণহত্যায় বিশ্ববাসী হতবাক, উদ্বিগ্ন। এটাই স্বাভাবিক। এক সময়কার বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধশালী দেশ ছিল মিয়ানমার তথা বার্মা। ভারতবর্ষের শিক্ষিত সজ্জন ব্যক্তিরা বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে চাকরি জোগাড় করতে পারলে গৌরববোধ করতেন। মিয়ানমারের আরাকানের রোশাঙ রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের আসর বসত, কবি আলাওল, মাগন ঠাকুর, নসুরাল্লাহ খাঁ এসব ব্যক্তি ছিলেন রাজসভার কবি। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধকরণে এদের অবদান অনস্বীকার্য।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের আরাকান রাজসভার কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে আজও। তদানীন্তন সমাজব্যবস্থার আলোকে ভ্রাতৃত্ব সম্প্রীতির নানা নিদর্শন রয়েছে মিয়ানমারে। সেই মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে বারুদের গন্ধ। রাখাইনবাসী রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছে নির্বিচারে। প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। এ পর্যায়ে নারী-শিশুসহ প্রায় চার লাখ উখিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গাদের এই অনুপ্রবেশ নতুন নয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটে। তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকার হীন স্বার্থে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটার ফলে বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসী জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। কৌশলগত সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে সে সময়কার বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি অনেকটা চেপে যায়। উল্লেখ্য, কোনোরূপ হামলার শিকার না হয়েও ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। এর পর থেকে নানা কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে সমর্থ হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি নামের বিদ্রোহীরা যতবার চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর, ততবারই মিয়ানমার সেনাবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর। মধ্যযুগীয় বর্বরীয় কায়দায় তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

সাম্প্রতিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতার প্রচ- ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। যেভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে, তা ঠেকাতে না পারলে বাংলাদেশকে ভয়াবহ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, খাবার দেওয়া হচ্ছে, নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। মানুষ হিসেবে যেটা করা উচিত, সেটাই করছে বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু রোহিঙ্গা নির্যাতনের নেপথ্যে ঘটনাপ্রবাহের গভীরে প্রবেশ করা উচিত। রোহিঙ্গাদের ওপর এই হামলা-নির্যাতন বিশ্ব রাজনীতির একটি ভিন্ন বার্তা বহন করছে কিনা, সেটি ভেবে দেখতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, তুরস্ক বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের পক্ষাবলম্বন করেছিল। তাদের অবস্থান সেখানেই আছে। মীর কাসেম আলীর রায় কার্যকর করার সময় তুরস্ক তাদের সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করেছিল। ইন্দোনেশিয়ার অবস্থানও অভিন্ন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যার নিন্দনীয় ঘটনা বটে। এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গারা যাতে স্বসম্মানে রাখাইন রাজ্যে বসবাস করতে পারে, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ একটি সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক চক্রান্ত কিনা, সেটিও ভাবতে হবে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এমনি একটি অবস্থার মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য ধনী দেশের অনেকেই সহজভাবে নিতে পারছে না। তার আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে সরকার অনেকটাই চাপের মুখে পড়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার ধকল সামলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রোহিঙ্গার বোঝা মাথায় নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের না পারছে ফেলতে, না পারছে গ্রহণ করতে। একটি বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের প্রায় বেশিরভাগই নারী-শিশু। পরিবারের পুরুষকর্তাদের অবস্থান কিন্তু রহস্যঘেরা। রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিতে যোগদান করে এসব পুরুষকর্তা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে কিনা! যদি সেটি হয়ে থাকে, তবে মিয়ানমারের প্রতিপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের ওপর দায় চাপানোর একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ওপর দোষ চাপানোর ষড়যন্ত্রকারী দেশের তো অভাব নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে বহুত্ববাদের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে কৌশলগত মিত্রতা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ স্বাধীন স্বদেশ ভূমিতে কোনোরূপ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে, এমন সন্দেহ অমূলক নয়। যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তারা কার্যত মিয়ানমারের নাগরিক নয়। মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক অধিকার দেয়নি কোনো দিনই। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তারা উদ্বাস্তু জীবনযাপন করে আসছিল যুগ যুগ ধরে। মাছ ধরা ও নেশাজাত দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় ছিল তাদের মূল পেশা। রাখাইন রাজ্যে বংশপরম্পরায় রোহিঙ্গারা বসবাস করলেও মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে নাগরিকত্ব আদায় করতে সমর্থ হয়নি। আন্তর্জাতিক বিশ্বও এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব পরিচয়ের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। জাতিসংঘও ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করে দিয়েছিলেন, এর নাম ছিল কফি আনান কমিশন। সেই কফি আনান কমিশনও অকার্যকর ছিল। যে কারণে মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে অমানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অথচ মিয়ানমার আমাদের বাংলাদেশের চেয়ে আড়াই গুণ বড় একটি দেশ। দেশটিতে রোহিঙ্গা ছাড়া পৌনে তিন কোটি লোকের বসবাস। এত বড় একটি দেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঠাঁই হচ্ছে না। নিজ জন্মভূমিতে পরবাসীর মতো বসবাসকারীদের বাংলাদেশে ঠাঁই দেওয়ার জন্য যাদের আহ্বান, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। মানবিক কারণে যেটা করা দরকার সেটা তো বাংলাদেশ করছেই, সে জন্য কারো আহ্বানের অপেক্ষা করেনি বাংলাদেশ। গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে আতিথেয়তা দেখালেও রোহিঙ্গার চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা মাত্রায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। ফলে আশ্রিত রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, টেকনাফ, কক্সবাজার এখন রোহিঙ্গানগরীতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি রোহিঙ্গা পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করায় বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন হুমকিতে পতিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী পক্ষ একটি সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার দায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। যদিও এটি বাংলাদেশ সরকারের দায় নয়। বিএনপি মহাসচিব তার এই বিবৃতির মাধ্যমে একজন রাজনীতিক হিসেবে মূর্খতার পরিচয় দিয়েছেন। রোহিঙ্গারা যখন নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, সে মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করেন। অং সান সু চির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে মিয়ানমারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে ভারত সব সময় সোচ্চার। এ ইস্যুতে ভারত যে কোনো দেশের সঙ্গেই ঐক্য গড়ে তুলতে অগ্রবর্তী ভূমিকা নিয়ে আসছে। রোহিঙ্গা সংকট সামনে রেখে বিশ্বরাজনীতিতে ভিন্ন বার্তা বহন করছে, তাতে আর সন্দেহ কী? এক সময়কার শত্রু এখন মিত্র হবে। মিত্র শত্রু হবে- এটাই স্বাভাবিক।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বর নির্যাতনকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন রাজনীতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে, যেটা বিশ্ব রাজনীতির জন্য ভয়াবহ অশনি সংকেত। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশ্ব বিবেককে জেগে উঠতে হবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা ইস্যুটি সমস্যা নয়, এটা সৃষ্টকৃত সংকট। মনে রাখতে হবে- সমস্যা সমাধানযোগ্য, সংকট সমাধানযোগ্য নয়। সংকটকে মোকাবিলা করতে হয়। এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কাজে লাগাতে যে মহলটি তৎপর, সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সেই মহলটির প্রতি। বাংলাদেশ যাতে হেরে না যায়।

ফনিন্দ্র সরকার: কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com