,

কবি সোহেল হাসান গালিব

জন্মদিনে সোহেল হাসান গালিবের আত্মপাঠ

কবি সোহেল হাসান গালিবের আজ জন্মদিন। এ দিনে কবির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল পৃথিবী নামক গ্রহে নিজেকে আবিষ্কারের অনুভূতি, সফলতা-ব্যর্থতার গল্প। জন্মদিন ঘিরে কবির আত্মকথা নববার্তা.কম-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

পনেরই নভেম্বর
সোহেল হাসান গালিব
মানুষের জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, প্রিয়, অনাবশ্যক বিষয় হলো জন্মদিন। নিজের জন্মদিন সম্পর্কে আমাদের কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকে না। এ হলো পরের কাছে শুনে পাওয়া। সেই শোনাটা যদি ভুলও হয়, তাতে কিছু রকমফের হয় না। মানুষের কল্পনার এবং আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা এতই বেশি যে, ভুল জন্মদিন বুকে আগলে রেখেও সে দিনাতিপাত করে যেতে পারে অনায়াসে, মহানন্দে। অর্থাৎ মানুষের কোনো একটি জন্মদিন হলেই চলে। বিশেষ কোনো তারিখ নয়। ২৯ ফেব্রুয়ারির কথা ভিন্ন বটে।

তারপরও এমন উদারভাবে গ্রহণ করবার মতো কিছু আর নেই। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে জন্ম হলেই হয়তো লাভ করা যায় মানবজীবন। কিন্তু তাতে তুষ্ট হবার যথেষ্ট কারণ নাও থাকতে পারে। ধরা যাক, যদি আমার জন্ম হতো ফিলিস্তিনের কোনো ভগ্নস্তূপে, বোমারু বিমানের ছায়ায় লুণ্ঠিত বাগদাদে, কিংবা আরাকানের কোনো রোহিঙ্গাপল্লিতে, মিলিটারির বেয়োনেট ঝলসে ওঠা অর্জুন গাছের নিচে! আজকের মতো এমন প্রশান্ত চিত্তে জন্মদিনের প্রশস্তি লিখবার জন্য আমার মন সাড়া দিত কি? সীমান্তের বেড়া ডিঙিয়ে এই মরজীবনকে পালাবার পথ করে দেয়াই হতো প্রকৃত জন্মোৎসব।

কিন্তু বছরের যে দিনটিতেই আমাদের জন্ম হোক, চাই না সে দিনটিকে ছেড়ে অন্য কারো জন্মদিন দখল করতে। নিতান্ত বাতুল না হলে। কিন্তু আমরা হামেশাই ভূমি দখল করি, অধিগ্রহণ করি। সে হোক শত্রুসম্পত্তি অথবা খাসজমি। কেবল ধানমণ্ডিতে ফ্ল্যাট হলেই আমদের চলে না, গুলশানে একটি বাগানবাড়িও যে চাই। অথচ যেন-তেন একটি জন্মদিন হলেই চলে যায়। তা নিয়ে কোনো অস্থিরতা জাগে না মনে।

এই রোমাঞ্চকর অনাবশ্যক দিনটিরও কিছু তাৎপর্য আছে বলে অনুভব করি। একটু খেয়াল করলেই আমরা বুঝতে পারব, বছরের আর কোনো দিনই কেবল নিজের জন্য বা নিজেকে নিয়ে নয়। এমনকি বিয়ের দিনটিতেও অন্যের ভাগ আছে। তাই জন্মদিনে নিতান্ত স্বার্থপরের মতো নিজের দিকে নির্লজ্জভাবে ফিরে তাকাবার ব্যাপারে সমাজেরও সম্মতি মেলে। প্ররোচনাও।

যত উৎকটই শোনাক না কেন, ঘটা করে জন্মদিন পালনের মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা থাকা উচিত নয়। বরং প্রত্যেকের জন্মদিনকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা ভালো। আয়ুর পরিধি মাপার জন্য নয়, কর্মের পরিধি বাড়াবার জন্য। কী সক্ষমতা আমার ছিল, মানুষের কী কী দাবি তৈরি হয়েছিল আমাকে ঘিরে, সেসব সংসদে তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের মতো উত্থাপিত হওয়া দরকার। শুধু কেক কাটা আর গ্লাস-ঠুকাঠুকির মধ্যে দিনটিকে নিঃশেষিত না করে জম্পেশ গালাগালি আর অকপট নিন্দামন্দ শুনে একে উদযাপন করা জরুরি। সেই সঙ্গে অন্তত একবর্ষব্যাপী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। কর্মসূচি আকারে তা অন্যের কাছে ঘোষণার জন্য নয় একেবারেই। শুধু নিজের বুকের ভেতর প্রতিধ্বনিত করে তুলবার জন্য।

এ বছর ১৫ নভেম্বরে আমি পূর্ণ করলাম জীবনের ৩৯টি বছর। প্রবেশ করতে যাচ্ছি ৪০ বছরে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। একে আমার আশৈশব নবুয়্যতপ্রাপ্তির কাল মনে হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, বোধিলাভের বছর। সত্যি বলতে কি, এতদিন পর আমার মনে হচ্ছে জীবন সম্পর্কে কিছু সিদ্ধান্তে আমি উপনীত হতে পেরেছি। সে সিদ্ধান্ত দার্শনিক কোনো প্রজ্ঞার নয় ঠিক। তা হলো নিজের জীবনে প্রবেশ করার আনন্দ। প্রকৃত অর্থে, এতদিন পর মনে হচ্ছে, যেন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। তার দাবি পূরণ করতে এবার হয়তো কিছুটা প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

ঘটনাক্রমে, এ বছরই প্রথম আমি ঘরের বাইরে পা ফেলেছিলাম। ভূমধ্যসাগরের জলে সেই পা ডুবিয়ে এসে দিব্যি দেখতে পেলাম, বোঁটা-ছিন্ন সেগুনপাতায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে আমার সন্তান তার ছোট্ট পা-দুটি ভিজিয়ে অন্য এক পরিভ্রমণ খুব সহজেই সেরে নিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই নিজের জগতের মধ্যে আবিষ্কার করে চলেছি নবীন এক সজীবতাকে। নিজের মনকেই খুঁজে চলেছি অবিরাম। এত স্বতন্ত্র সেটা, চট করে চোখে পড়ে না। অবকাশই দেয় না ভেবে দেখার। এরই মধ্যে হঠাৎ জন্মদিন এসে শুধু একটি কথা বলে : তুমি কিন্তু এক অন্য-আমি।

তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর, তবুও উদ্বেলিত সেই জন্মদিন এবার উদযাপনের দায়িত্ব নিয়েছে ‘অগ্রদূত’। এই দিনটিতে তারা প্রকাশ করল আমার পঞ্চম কবিতার বই ‘তিমিরে তারানা’। তাদের এ ভালোবাসায় আমি আপ্লুত। যেহেতু মৃত্যুদিনের কোনো আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই আমাদের, তাই জন্মদিনের ডাকে সম্পূর্ণ সাড়া দেয়াই কর্তব্য। অনাগত যে মুহূর্তগুলি অপরিস্ফুট, ছায়ালিখন মাত্র, তাকে ধীরে নিজের আঙুলে ফুটিয়ে তোলাই একমাত্র কাজ।

বছর দশেক আগে লেখা একটি কবিতা। তার কিছু অংশ আজ মনে পড়ছে বারবার :

প্রথম দিনের কথা আমরা জানি না,
আমাদের জানা নেই কী হবে শেষের দিনে।
—নিজেরই জীবন নিয়ে এত অস্পষ্টতা, এত অনুদ্ভাস!
‘আছি এক মধ্যখণ্ডনের কালে—তমসার কূলে ভেসে ওঠা
কোনো রাংতামাছের হুতাশ’—কেউ দেয় না জবানবন্দি—
দেয় নি সেদিনও কবিয়াল, টপ্পাগানে।

তবে এই খণ্ডিতহৃদয় বেঁচে থাকা, বলো সে কীসের টানে?
প্রশ্নকে আড়াল করে শুধু কপালের ভাঁজ হাত দিয়ে ঢেকে রাখা
আর মগ্ন থাকা—যে প্রথম এসে আমার মৃত্যুসংবাদ বয়ে নিয়ে যাবে
তারই মুখ আঁকবার দুঃসাধ্য চেষ্টায়।
পান করে যাওয়া সারাদিন সারারাত
হাওয়ানল, ধুলোজল—এই এক অমিয়-বিষাদ।

সূত্রঃ আন্তনগর

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com