,

ইতিহাসের সাক্ষী বাহাদুর শাহ পার্ক

এহসানুল মাহবুব জোবায়ের: রাজধানী ঢাকার সদরঘাটের প্রবেশমুখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছোট্ট যে পার্কটি দেখা যায়, সেটি বাহাদুর শাহ পার্ক। তার নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক।
তারও আগে ছিল আল্টাঘর ময়দান। পরিধি আনুমানিক ৭০০ ফুট। উত্তরে ঐতিহাসিক পানির ট্যাংক, কবি নজরুল কলেজ, পূর্বে লক্ষ্মীবাজার আর দক্ষিণে বাংলাবাজার। আয়তন যত ছোটই হোক না কেন, এর ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বড়।
এর নামকরণের অনেক ইতিহাস আজো জীবন্ত। ঢাকা মহানগরীর ইতিহাসে আর্মেনীয়রা একটা বড় অনুষঙ্গ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এ মাঠে আর্মেনিয়ানদের একটি ক্লাবঘর ছিল এবং তারা এখানে বিলিয়ার্ড খেলত। সাধারণ মানুষ বিলিয়াডের বলকে আল্টা বলত। সে থেকে এটি আন্টাঘর ময়দান।
তারপর পরিত্যক্ত ও বিরান এ মাঠে মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজকীয় ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা পাঠ করা হয় ১৮৫৮ সালে। তখন থেকে এটি ভিক্টোরিয়া পার্ক।

ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজরা এটি কিনে নেয়। তারা এটিকে একটি পার্কের রূপ দেয় এবং এর চারদিকে লোহার দিয়ে ঘিরে দিয়ে এর চার কোণায় চারটি দর্শনীয় কামান স্থাপন করে। অচিরেই স্থানটি জীর্ণ হয়ে গেলে ভেঙ্গে নওয়াব আব্দুল গণির উদ্যোগে একটি ময়দান মত তৈরি করা হয়। তখনো এর চারপাশে অনেক আর্মেনীয় বাস করত। ১৮৪০ সালেও এটি ছিল কয়েকটি রাস্তার মাঝে এক টুকরো খালি জায়গায় বৃত্তাকার একটি বাগান ।
ক্লাবঘরটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। ক্লাবটিতে ইংরেজরা বিলিয়ার্ড ছাড়াও র‌্যাকেট, টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলতো এবং আড্ডা দিতো। এখানে পার্টি-ফাংশনও আয়োজন করা হত। ঢাকা ক্লাবের ইতিহাস এবং পুরনো নথিপত্র অনুযায়ী আন্টাঘর ময়দানের কাছে ঢাকা ক্লাবের এক একর জমির ছিল । পুরোন কর্মচারীদের মতে ঢাকা ক্লাব ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এ এলাকা তিন একর জমির জন্য খাজনা প্রদান করতো। বিশ শতকের বিশের দশকে ঢাকার নবাবদের ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রতিপত্তির ভাটা পরলে ক্লাবটির প্রতি তাদের অনুদান কমে যায়। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ঘোড়দোড় আয়োজন এবং আরও অন্যান্য প্রয়োজনে ইংরেজরা ঢাকা ক্লাবটিকে শাহবাগ এলাকায় স্থানান্তরিত করে।
এ ময়দান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে ১৮৫৭ সালে। ১৮৫৭ সালের ২২শে নভেম্বর ইংরেজ মেরিন সেনারা ঢাকার লালবাগের কেল্লায় অবস্থিত দেশীয় সেনাদের নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে আক্রমণ চালায়। কিন্তু সেপাহীরা বাধাঁ দিলে যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে আহত এবং পালিয়ে যাওয়া সেনাদের ধরে এনে এক সংক্ষিপ্ত মার্শালের মাধ্যমে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে তাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। বিচারের পর ১১ জন সিপাই কে আন্টাঘর ময়দানে এনে জন সম্মুখে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়। স্থানীয় লোকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে লাশগুলো বহু দিন যাবৎ এখানকার গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত এই ময়দান এর চারপাশ দিয়ে হাঁটতে ঢাকাবাসী ভয় পেত, কারণ এ জায়গা নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক কাহিনী ছড়িয়ে পরেছিল। সিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজরা তাদের সেনাদের স্মরণে আন্টাঘর ময়দানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল।
আর্মেনীয় ক্লাব ঘরের চার কোণায় বসানো সীমানা নির্দেশক চারটি ব্রিটিশ কামাণ পরবর্তীতে তুলে এনে এই পার্কের চারদিকে বসান হয়। এ পার্কের উন্নয়নে নওয়াব আব্দুল গণির ব্যক্তিগত অবদান ছিল। তাঁর নাতি খাজা হাফিজুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর ইংরেজ বন্ধুরা জনাব হাফিজুল্লাহর স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদা তুলে ১৮৮৪ সালে এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলো।
১৯৫৭ সালে, সিপাহী বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)এর উদ্যোগে এই স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।
পাকিস্থান আমলে সিপাহি বিদ্রোহের শতবর্ষ স্মরণে এবং সিপাহি বিপ্লবের স্মৃতিরক্ষার্থে এখানে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়। ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহের নামে এই সৌধটির নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন

নববার্তা.কম এর সংবাদ পড়তে লাইক দিন নববার্তা এর ফেসবুক ফান পেজে

আরও অন্যান্য সংবাদ


Udoy Samaj

টুইটর




Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com